এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের ৩ নক্ষত্র

বিজ্ঞানী তাহমিদ আহমেদ, মারজানা আক্তার এবং মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়োনছবি: এশিয়ান সায়েন্টিস্ট

বিজ্ঞান শুধু গবেষণাগারের চার দেয়ালে বন্দী কোনো বিষয় নয়, এটি বিশ্বকে বদলে দেওয়ার এক নীরব হাতিয়ার। সেই হাতিয়ার হাতে বিশ্বমঞ্চে এবার দ্যুতি ছড়ালেন বাংলাদেশের তিন গবেষক। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজ্ঞানবিষয়ক জনপ্রিয় সাময়িকী এশিয়ান সায়েন্টিস্ট প্রতিবছরের মতো এবারও প্রকাশ করেছে এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকা। ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ এই তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন আমাদের তিন বাংলাদেশি গবেষক।

বিশ্বের বাঘা বাঘা সব গবেষকের ভিড়ে এই অর্জন দেশের বিজ্ঞানপাড়ায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কারা আছেন সাফল্যের এই তালিকায় এবং কী তাঁদের যুগান্তকারী কাজ।

এই তালিকার সবচেয়ে বড় চমক হলেন মারজানা আক্তার। তিনি এবারের তালিকার কনিষ্ঠতম বিজ্ঞানী! বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী পোলট্রি (হাঁস-মুরগি) খাতের সম্পূর্ণ নতুন ও আগে শনাক্ত না হওয়া একটি ভাইরাস আবিষ্কার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দেশের ভাইরাস বা ভাইরোলজি গবেষণায় এটি অত্যন্ত বড় একটি মাইলফলক। মারজানার মেধার স্বীকৃতি মিলেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে জাতিসংঘের ইয়াং উইমেন ফর বায়োসিকিউরিটি ফেলোশিপের জন্য বিশ্বজুড়ে যে মাত্র ১০ জন তরুণীকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, মারজানা ছিলেন তাঁদেরই একজন।

আরও পড়ুন
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মারজানা আক্তার পোলট্রি খাতের সম্পূর্ণ নতুন ও আগে শনাক্ত না হওয়া একটি ভাইরাস আবিষ্কার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

তালিকায় দ্বিতীয় নামটি আমাদের অনেকেরই বেশ পরিচিত—তাহমিদ আহমেদ। মা ও শিশুর অপুষ্টি দূরীকরণ, ডায়রিয়া রোগ প্রতিরোধ ও এর চিকিৎসায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি-এর ইতিহাসে তিনিই প্রথম বাংলাদেশি নির্বাহী পরিচালক, যিনি ২০২১ সাল থেকে সাফল্যের সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই গুণী মানুষটি আন্তর্জাতিকভাবেও জনস্বাস্থ্য গবেষণার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

তৃতীয় জন কাজ করেছেন আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পখাত, পোশাকশিল্প নিয়ে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়োন নজর দিয়েছেন পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদনে। তাঁর বিশেষ প্রকল্প ‘ডিকার্বনাইজেশন ল্যাব ফর টেক্সটাইল প্রসেস ইনোভেশন’-এর মূল লক্ষ্য, পোশাক কারখানার কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনা এবং পরিবেশকে বাঁচানো। কাপড় তৈরির চিরাচরিত ক্ষতিকর পদ্ধতি বদলে ফেলার এই অসাধারণ চেষ্টার কারণে ২০২৫ সালে গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ডে বিশ্বের শীর্ষ ১০ উদ্ভাবকের মধ্যে তাঁর নাম উঠে এসেছিল।

আরও পড়ুন
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়োন নজর দিয়েছেন পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদনে।

এশিয়ান সায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিন ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছর বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এশিয়ার সেরা গবেষকদের একটি তালিকা প্রকাশ করে আসছে। নোবেলজয়ী শিমন সাকাগুচি, সুসুমু কিতাগাওয়া কিংবা গণিতের নোবেলখ্যাত আবেল পুরস্কারজয়ী মাসাকি কাশিওয়ারার মতো বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি একই তালিকায় আমাদের দেশের তিন গবেষকের নাম থাকাটা সত্যিই গর্বের বিষয়।

এর আগে, ২০২১ সালে এশিয়ান সায়েন্টিস্টের সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় তিন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁরা হলেন: বাংলাদেশের মডেল লাইভস্টক অ্যাডভান্সমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সালমা সুলতানা, আইসিডিডিআর,বির গবেষক ফেরদৌসী কাদরী এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সায়মা সাবরিনা। এছাড়া ২০২৩ সালে সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান করে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী এবং অণুজীববিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: এশিয়ান সায়েন্টিস্ট, প্রথম আলো

আরও পড়ুন