চিতা ও লেপার্ডের মধ্যে পার্থক্য কোথায়

লেপার্ড (বামে) ও চিতা (ডানে)ছবি: বিবিসি ওয়াইল্ডলাইফ

টেলিভিশনে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডিসকভারি অথবা অ্যানিমেল প্ল্যানেট চ্যানেল খুললে আমরা প্রায়ই একটা কমন ডকুমেন্টারি দেখতে পাই—চিতাবাঘ আর বন্য হরিণের চিরচেনা শত্রুতা। কখনো কখনো শিকারি প্রাণীটি চিতার পরিবর্তে লেপার্ডও হতে পারে। তবে সমস্যা হলো, দেখতে এরা অনেকটা একই রকম বলে এদের পার্থক্যগুলো সহজে ধরা যায় না। মোটা দাগে চিতা আর লেপার্ডের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। এই লেখায় সেগুলো বোঝার চেষ্টা করব।

চিতা ও লেপার্ড উভয়ই ফেলিড গোত্রের প্রাণী। এদের লম্বা লেজ আছে এবং গায়ের রং ও ছোপগুলো দেখতে বেশ কাছাকাছি। আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় এদের পাওয়া যায় এবং শিকার করার ক্ষেত্রেও এরা প্রায় একই ধরনের প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল।

চিতা ও লেপার্ড উভয়ই ফেলিড গোত্রের প্রাণী
ছবি: দ্য ওয়াইল্ডলাইফ ডায়েরিজ

কিন্তু একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, গড়ন ও চেহারায় এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শুধু তাই নয়, আচরণগত বৈশিষ্ট্য ও বসবাসের বিস্তৃতি বিচার করলে দেখা যাবে, প্রথম দেখায় যতটা মিল মনে হয়, বাস্তবে এরা ততটা একরকম নয়। চিতা প্যানথারা গণের অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই এরা গর্জন করতে পারে না। কিন্তু লেপার্ড প্যানথারা গণের বলে বাঘ বা সিংহের মতো গর্জন করতে পারে।

গায়ের ছোপ আর রং বাদ দিলে লেপার্ড ওজনে অনেক বেশি ভারী, পেশিবহুল ও শক্তিশালী। সাধারণভাবে লেপার্ডরা চিতার তুলনায় আকারে বেশ বড়। ওজনও চিতার তুলনায় অনেক বেশি। লেপার্ডরা চিতার তুলনায় বেশ শক্তিশালী, কিন্তু এদের গতি বা ক্ষিপ্রতা চিতার মতো নয়।

আরও পড়ুন
চিতা ও লেপার্ড উভয়ই ফেলিড গোত্রের প্রাণী। এদের লম্বা লেজ আছে এবং গায়ের রং ও ছোপগুলো দেখতে বেশ কাছাকাছি। আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় এদের পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, চিতা স্থলভাগের সবচেয়ে দ্রুতগামী প্রাণী। এদের পুরো শরীরটাই যেন গতির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণে গড়া। ওজনেও হালকা, আকারেও লেপার্ডদের চেয়ে বেশ সরু ও ছিপছিপে। দ্রুত ছুটতে পারাই চিতার প্রধান শক্তি। তাই দৈহিক শক্তির চেয়ে গতির কারণেই এরা বেশি পরিচিত।

চিতা ও লেপার্ডের গায়ে কালচে ছোপ থাকলেও ধরনগুলো একে অপরের চেয়ে বেশ আলাদা। চিতার ছোপগুলো সাধারণত গোল বা ডিম্বাকৃতির হয় এবং এগুলো নিরেট রঙের। কিছু ছোপ আবার স্পষ্ট দাগের চেয়ে কালির ছিটেফোঁটার মতো দেখায়।

স্থলভাগের সবচেয়ে দ্রুতগামী প্রাণী চিতা
ছবি: গেটি ইমেজ

কিন্তু লেপার্ডের গায়ের ছোপগুলো একসঙ্গে জোট বেঁধে গোলাপ ফুলের মতো রোজেট আকৃতি তৈরি করে। শরীরের মূল অংশে এই রোজেটগুলোর মাঝখানে সাধারণত বাদামি বা হলদেটে রং দেখা যায়। তবে পা, বুক ও মুখের মতো জায়গায় এই নকশাগুলোর কেন্দ্রভাগ প্রায়ই পুরোপুরি কালো থাকে।

মুখের গড়নে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো চিতার মুখে থাকা কালো টিয়ারলাইন। চিতার এই টিয়ারলাইন এদের চোখের ভেতরের কোণ থেকে নেমে এসে মুখের কোণা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। লেপার্ডের মুখে এমন কোনো দাগ থাকে না এবং ছোপগুলো চিতার তুলনায় বেশি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।

লেপার্ডদের মুখ হয় লম্বাটে, চোয়াল বড় ও অনেক বেশি শক্তিশালী
ছবি: গেটি ইমেজ

চোখের রঙের ক্ষেত্রেও পার্থক্য আছে। চিতার চোখ সাধারণত বাদামি রঙের হয়। আর লেপার্ডদের চোখ হয় উজ্জ্বল হলুদ বা সবুজাভ। চিতার মুখ তুলনামূলকভাবে গোলাকার এবং দাঁত ছোট, বিপরীতে লেপার্ডদের মুখ লম্বাটে, চোয়াল বড় ও অনেক বেশি শক্তিশালী।

আরও পড়ুন
চিতার ছোপগুলো সাধারণত গোল বা ডিম্বাকৃতির হয় এবং এগুলো নিরেট রঙের। কিন্তু লেপার্ডের গায়ের ছোপগুলো একসঙ্গে জোট বেঁধে গোলাপ ফুলের মতো রোজেট আকৃতি তৈরি করে।

চিতার নাসারন্ধ্র ও ফুসফুস শরীরের আকারের তুলনায় বেশ বড়। এতে দ্রুত দৌড়ানোর সময় পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। চিতা স্থির অবস্থা থেকে মাত্র ৩ সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৬৪ মাইল বেগে দৌড়াতে পারে। দৌড়ানোর সময় ভারসাম্য রাখতে চিতার চ্যাপ্টা লেজটি কাজ করে রাডারের মতো।

তবে চিতার এই সর্বোচ্চ গতি বেশিক্ষণ থাকে না। তাই শিকার ধরতে হলে চিতাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ সেরে ফেলতে হয়। অন্যদিকে, লেপার্ডরা গতির অভাব পুষিয়ে নেয় গাছে ওঠার অসাধারণ দক্ষতা ও প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে। লেপার্ডের সামনের পা পেছনের পায়ের চেয়ে শক্তিশালী। আকারে বড় না হলেও মজবুত। এতে লেপার্ডদের ক্ষেত্রে শরীরের সামনের ভারী অংশের ভারসাম্য রক্ষা করা আর শিকারকে কাবু করা সহজ হয়। নিজের শরীরের ওজনের চেয়েও ভারী কোনো শিকারকে টেনে গাছে তুলে নিতে পারে। এতে অন্য শিকারিরা খাবার ছিনিয়ে নিতে পারে না।

চিতার চোখ সাধারণত বাদামি রঙের হয়। আর লেপার্ডদের চোখ হয় উজ্জ্বল হলুদ বা সবুজাভ
ছবি: ভিয়াতু

বেশিরভাগ বিড়ালজাতীয় প্রাণীদের নখ পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। ফলে প্রয়োজন ছাড়া নখ বের হয় না। এ কারণেই নখগুলো যথেষ্ট ধারালো থাকে। কিন্তু চিতার নখ বেশিরভাগ সময় বের হয়ে থাকে। তাই এদের নখগুলো তুলনামূলকভাবে ভোঁতা। চিতার এই নখ দৌড়ানোর সময় স্পাইক জুতার মতো মাটিতে ভালোভাবে আঁকড়ে ধরতে সাহায্য করে। কিন্তু লেপার্ডদের নখ পুরোপুরিভাবে গুটানো যায়। তাই এদের পায়ের ছাপ দেখেও এই দুই প্রজাতিকে আলাদা করা যায়। চিতার পায়ের ছাপে সাধারণত নখের দাগ দেখা যায়, লেপার্ডের ক্ষেত্রে তা থাকে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

সূত্র: বিবিসি ওয়াইল্ডলাইফ, হাউস্টাফওয়ার্কস ও ব্রিটানিকা

আরও পড়ুন