জুরাসিক পার্ক মুভির মতো ডাইনোসরের রক্ত কি ৮ কোটি বছর টিকতে পারে
১৯৯০ সাল। বইয়ের দোকানে তখন মাইকেল ক্রাইটনের লেখা এক সায়েন্স ফিকশন নিয়ে তোলপাড়। বইয়ের নাম জুরাসিক পার্ক। সেই গল্পে বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের রক্ত থেকে ডিএনএ নিয়ে আবার ডাইনোসরদের ফিরিয়ে এনেছিলেন। ক্রাইটন তাঁর গল্পে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি এমনভাবে সাজিয়েছিলেন, মনে হতো এটা একদিন সত্যিই সম্ভব হবে। কিন্তু মুভি আর বাস্তবে যে আকাশ-পাতাল তফাত!
জুরাসিক পার্ক মুভিতে বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের রক্ত পেয়েছিলেন অ্যাম্বারে আটকে থাকা মশার পেটে। কিন্তু বাস্তবে এমনটা ঘটা প্রায় অসম্ভব। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ডাইনোসর গবেষক সুজি মেইডমেন্টের মতে, অ্যাম্বারের ভেতর পোকাদের বাইরের খোলসটা টিকে থাকলেও ভেতরের নরম অংশ বা রক্ত নষ্ট হয়ে যায়। তাহলে কি ডাইনোসরের রক্ত পাওয়ার আশা একেবারেই ছেড়ে দিতে হবে?
বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, হাড়গোড় ছাড়া ডাইনোসরের আর কিছুই কোটি কোটি বছর ধরে টিকে থাকতে পারে না। চামড়া, মাংস বা রক্তনালির মতো নরম অংশগুলো বড়জোর ৪০ লাখ বছর টিকতে পারে। কিন্তু ডাইনোসরেরা তো পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে! তাই নরম টিস্যু পাওয়ার আশা ছিল দুরাশা।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ডাইনোসর গবেষক সুজি মেইডমেন্টের মতে, অ্যাম্বারের ভেতর পোকাদের বাইরের খোলসটা টিকে থাকলেও ভেতরের নরম অংশ বা রক্ত নষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু ২০০৫ সালে জীবাশ্মবিদ মেরি সোয়াইজার এক অসম্ভব কাণ্ড ঘটিয়ে বসলেন। তিনি একটি টি-রেক্সের হাড়ের ভেতর এমন কিছু পেলেন, যা দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে তিনি দেখলেন ছোট, গোল, লাল রঙের কিছু একটা। এগুলো দেখতে অবিকল মেরুদণ্ডী প্রাণীর লোহিত রক্তকণিকার মতো!
সোয়াইজার এবং তাঁর দল নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। তাঁরা নিশ্চিত হলেন, এগুলো আসলে ডাইনোসরের রক্তনালি এবং লোহিত রক্তকণিকার মতোই কিছু একটা। তবে তিনি সাবধানী ছিলেন। তিনি দাবি করেননি যে এগুলো অবিকল তাজা রক্ত। তিনি বলেছিলেন, এগুলো রক্তের রাসায়নিক রূপান্তর বা ফসিল।
প্রথম দিকে অনেকেই তাঁর এই আবিষ্কারকে পাত্তা দেননি। কেউ কেউ বলেছিলেন, এগুলো হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া বা বাইরের দূষণ। কিন্তু সোয়াইজার দমে যাননি। তিনি এবং অন্য বিজ্ঞানীরা আরও গবেষণা চালিয়ে গেলেন। ২০১৫ সালে একদল গবেষক ৮০ কোটি বছরের পুরোনো এক হ্যাড্রোসরের জীবাশ্মে রক্তনালি খুঁজে পেলেন। পরীক্ষায় দেখা গেল, এগুলো কোনো ব্যাকটেরিয়া নয়, বরং ওই ডাইনোসরেরই নিজস্ব টিস্যু!
২০২৩ সালে বিজ্ঞানীরা আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন। তাঁরা নিশ্চিত করলেন, ডাইনোসরের হাড়ের ভেতর হিমোগ্লোবিনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এমনকি কানাডার গবেষকেরা বিখ্যাত টি-রেক্স পাঁজরের হাড়েও রক্তনালির খোঁজ পেলেন।
২০১৫ সালে একদল গবেষক ৮০ কোটি বছরের পুরোনো এক হ্যাড্রোসরের জীবাশ্মে রক্তনালি খুঁজে পেলেন। পরীক্ষায় দেখা গেল, এগুলো কোনো ব্যাকটেরিয়া নয়, বরং ওই ডাইনোসরেরই নিজস্ব টিস্যু!
তাহলে কি এবার আমরা জুরাসিক পার্ক বানাতে পারব? দুর্ভাগ্যবশত, না।
কারণ রক্ত বা নরম টিস্যু পাওয়া মানেই অক্ষত ডিএনএ পাওয়া নয়। ডিএনএ অত্যন্ত ভঙ্গুর। এটি কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়। সুজি মেইডমেন্ট এবং তাঁর দল ২০১৫ সালে ডাইনোসরের রক্তকণিকা পেলেও তার ভেতরে কোনো ডিএনএ খুঁজে পাননি।
তার মানে, আমরা হয়তো ডাইনোসরের রক্ত বা তার ফসিল খুঁজে পেয়েছি, যা আমাদের জীবাশ্মবিজ্ঞানের ধারণাই বদলে দিয়েছে। কিন্তু সেই রক্ত থেকে ডাইনোসরকে পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্নটা এখনো কল্পবিজ্ঞানই রয়ে গেল। তবে বিজ্ঞানের এই অদম্য যাত্রায় ভবিষ্যতে হয়তো আরও বড় কোনো চমক অপেক্ষা করছে!