গন্ধ কোথায় হারিয়ে যায়?

ময়লার স্তুপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নাক চেপে ধরি। ফুল বা সুগন্ধির আশপাশে থাকলে নিজেদের অজান্তেই মন ভালো হয়ে যায়। বদ্ধ ঘর উৎকট গন্ধে ভরে গেছে? জানালা-দরজা খুলে ঘরের মধ্যে বায়ুপ্রবাহ বাড়িয়ে নিলেই হয়, সমস্যার সমাধান। কিছু সময়ের মধ্যেই গন্ধ ভ্যানিশ। আবার ধরুন, তীব্র গরমে ঘামের গন্ধ থেকে বাঁচতে শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সারাদিনের চলাচলে সেটাও রাতে এসে আর খুঁজে পাবেন না।

গন্ধ যে শুধু আমাদের ভালো বা খারাপ লাগার অনুভূতি তৈরি করে, তা কিন্তু নয়। ভয়ংকর বিপদ থেকেও বাঁচিয়ে দেয় অনেক সময়। তবে সে যাই হোক না কেন, গন্ধের ব্যাপারে একটা জিনিস নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন—এটা বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকে না। ওপরের উদাহরণগুলোর মতো, উৎস খুব বড় বা তীব্র না হলে একই জায়গায় গন্ধের বেশি সময় থাকার সুযোগ নেই। হারিয়ে যায়। কিন্তু হারিয়ে যায় কোথায়?

দ্বিতীয়ত, গন্ধের কণাগুলো বাতাসের বিভিন্ন কণার সঙ্গে বিক্রিয়া করে নতুন কণা তৈরি করতে পারে। এসব নতুন কণা যদি আমাদের ঘ্রাণ রিসেপ্টরে ধরা না পড়ে, তাহলে গন্ধও পাব না

গন্ধ মূলত বিশেষ ধরনের রাসায়নিক মৌল বা যৌগের কণা। বিশেষ ধরনের বলতে, যেসব কণা আমাদের নাকে থাকা ঘ্রাণ শনাক্তকরণ কোষের (Smell Receptor) সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায়, সেসবকে বোঝানো হচ্ছে। এই বিশেষ ধরনের কণাকে বলা হয় ঘ্রাণের অণু (Odor Molecules) ।

বাতাসে ভেসে বেড়ানো এসব কণা শ্বাসের মাধ্যমে নাকে ঢোকে। ঘ্রাণ শনাক্তকরণ কোষকে উদ্দীপ্ত করে। আমরা গন্ধ পাই। গন্ধের সঙ্গে ঘনত্বের একটা বড় সম্পর্ক আছে। ঘ্রাণ শনাক্তকরণ কোষ বাতাসের সব কণাকে ধরতে পারে না। অর্থাৎ সেগুলোর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে না। আবার যেসব কণার ঘ্রাণ পাওয়া যায়, সেগুলোর ঘনত্ব কমে গেলে আমরা আর ঘ্রাণ পাই না। এই ঘনত্বের পরিমাণ অবশ্য সব ক্ষেত্রে সমান নয়। নির্দিষ্ট গন্ধের জন্য বাতাসে ঘ্রাণ-কণার ঘনত্ব নির্দিষ্ট। অর্থাৎ এর কম হলে আমরা গন্ধ পাব না। এর মানে, কোনোটার ঘনত্ব কম হলেও গন্ধ পাওয়া যায়, আর কোনোটার ঘনত্ব হতে হয় অনেক বেশি।

উদাহরণ দিই। বাতাসের প্রতি ১০০ কোটি অণুতে দুটি হাইড্রোজেন সালফাইড অণু উপস্থিত থাকলেই আমরা পচা ডিমের গন্ধ টের পাই। অন্যদিকে নেইল পলিশের (অ্যাসিটন) গন্ধ টের পাওয়ার জন্য এর চেয়ে প্রায় ৫০ হাজার গুণ বেশি ঘনত্বের প্রয়োজন।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
খাবারের স্বাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘ্রাণ

এবারে আসল প্রশ্নে আসি। গন্ধ কোথায় মিলিয়ে যায়? ঘটনাটি মূলত দুভাবে ঘটে। প্রথমত, বাতাস প্রবাহমান। গন্ধের অণুগুলো বাতাসের অণুর মাঝে ক্রমাগত ছোটাছুটি করছে। অণুর ধাক্কায় ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ফলে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে ওই ঘ্রাণ-কণার ঘনত্ব কমছে। তাই আমাদের নাক আর গন্ধটি শনাক্ত করতে পারছে না। এ সময় আমরা আর গন্ধ পাই না। মনে হয় যেন হারিয়ে গেল গন্ধটা।

দ্বিতীয়ত, গন্ধের কণাগুলো বাতাসের বিভিন্ন কণার সঙ্গে বিক্রিয়া করে নতুন কণা তৈরি করতে পারে। এসব নতুন কণা যদি আমাদের ঘ্রাণ রিসেপ্টরে ধরা না পড়ে, তাহলে গন্ধও পাব না। হঠাৎ মনে হবে গন্ধটা হারিয়ে গেল। আসলে তো হারায়নি। হয় বদলে গেছে, নয়তো ছড়িয়ে গেছে। ঘটনা এতটুকুই।

আমাদের নাকে প্রায় ৪০০ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন ঘ্রাণ শনাক্তকারী কোষ আছে। এগুলোর সাহায্যে আমরা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ শনাক্ত করতে পারি। ভাগ্যিস পারি, তা না হলে সুগন্ধ-দুর্গন্ধ নিয়ে পৃথিবীতে চলা বিপুল কর্মযজ্ঞ ঘটতই না কখনো। খাবার হতো ভীষণ বিস্বাদ।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

সূত্র: সায়েন্স ফোকাস