দুই শতাব্দী পর পরীক্ষাগারে ধরা দিল ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটের কেলাস

ছবি: ড্রিমটাইম.কম

সম্প্রতি জার্নাল অব আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র রসায়নের জগতে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে। গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ‘সিনথেটিক অব ক্রিস্টালাইন ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেট’। চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটি এবং ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁরা পরীক্ষাগারে ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটের (Ca(HCO₃)₂) কঠিন কেলাস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

এর আগে গবেষকেরা এই যৌগের এমন রূপ কখনো দেখেননি। সাধারণত পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় শুধু এই যৌগের দেখা মিলত। এর আগে যে চেষ্টা হয়নি, তা নয়। কিন্তু যতবারই গবেষকেরা পানি থেকে একে আলাদা করতে চেয়েছেন, ততবারই এটি নিজের রূপ বদলে ফেলেছে। রূপান্তরিত হয়েছে ক্যালসিয়াম কার্বনেটে (CaCO₃)। এটি ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল।

স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ে আমরা পড়েছি, খর পানির মধ্যে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের আয়ন (Ca²⁺, Mg²⁺) মিশে থাকে। এ কারণেই সেই পানি দিয়ে ঘরের আয়না বা বেসিনের ট্যাপ মুছলে শুকানোর পর সাদা সাদা ছোপ পড়ে। সাধারণত বৃষ্টির পানি বা ভূগর্ভস্থ পানি যখন চুনাপাথর বা কলিচুনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন এই খনিজ পদার্থগুলো থেকে আয়নগুলো পানিতে মিশে যায়। মূলত এদের উপস্থিতির জন্যই পানি খর হয়। কিন্তু এই ধাতুগুলো পানির ভেতরে কীভাবে মিশে থাকে?

আরও পড়ুন
খর পানির মধ্যে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের আয়ন মিশে থাকে। এ কারণেই সেই পানি দিয়ে ঘরের আয়না বা বেসিনের ট্যাপ মুছলে শুকানোর পর সাদা সাদা ছোপ পড়ে।

এর উত্তর হলো, বাইকার্বনেট লবণ হিসেবে। তবে পানি শুকিয়ে গেলে বাইকার্বনেটের অস্তিত্ব আর থাকে না, পড়ে থাকে কেবল ক্যালসিয়াম কার্বনেট। কারণ পানির শক্তিশালী পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ ধর্ম। ফলে বাইকার্বনেট থেকে প্রোটন বেরিয়ে গিয়ে তা কার্বনেটে পরিণত হয়। এটাই আমাদের দীর্ঘদিনের জানা বিজ্ঞান।

তাহলে উপায় কী? চীনা বিজ্ঞানীরা এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন কীভাবে? তাত্ত্বিক রসায়ন বলে, দুর্বল পোলার দ্রাবককে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। বিজ্ঞানী কং ও তাঁর দল তা-ই পানির বদলে কাজে লাগালেন সহজলভ্য ও নির্জলা অ্যালকোহল ইথানল। এটা পানির তুলনায় কম পোলার। প্রথমে তাঁরা ক্যালসিয়াম ডাইক্লোরাইড (CaCl₂) এবং অ্যামোনিয়াকে (NH₃) ইথানলে দ্রবীভূত করেন। এরপর এই মিশ্রণে পাম্প করে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) গ্যাস পাঠানো হয়। এই CO₂ এবং NH₃ দ্রবণে বাইকার্বনেট আয়নের (HCO₃⁻) জন্ম দেয়। এই আয়নগুলো ক্যালসিয়াম আয়নের (Ca²⁺) সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করে Ca(HCO₃)₂-এর কেলাস। এভাবেই প্রথমবারের মতো পরীক্ষাগারে জন্ম নিল ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটের কেলাস।

আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হওয়া এই পরীক্ষার ব্লু-প্রিন্ট পাওয়া যায় তাত্ত্বিক কম্পিউটেশনাল রসায়নের জটিল বিশ্লেষণে। গবেষকেরা দেখেন, পোলারিটি কম হওয়ায় ইথানল বাইকার্বনেট আয়নের হাইড্রক্সিল (O–H) বন্ধনকে শক্তিশালী করে। ফলে প্রোটন (H⁺) আর আলাদা হয়ে যেতে পারে না এবং যৌগটি ভেঙে CaCO₃-এ পরিণত হয় না। অর্থাৎ দ্রাবক পাল্টে ফেললেই মিলবে রাসায়নিক স্থিতিশীলতা! শুধু ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটই নয়, এই পদ্ধতিতে গবেষকেরা পরীক্ষাগারে স্ট্রনশিয়াম ও বেরিয়াম বাইকার্বনেটের কেলাসও তৈরি করেছেন। এতদিন এগুলোর অস্তিত্ব কেবল তাত্ত্বিক রসায়নেই সীমাবদ্ধ ছিল।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা দেখেন, পোলারিটি কম হওয়ায় ইথানল বাইকার্বনেট আয়নের হাইড্রক্সিল বন্ধনকে শক্তিশালী করে। ফলে প্রোটন আর আলাদা হয়ে যেতে পারে না এবং যৌগটি ভেঙে CaCO₃-এ পরিণত হয় না।

ক্রিস্টালোগ্রাফিতে এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন খুব পরিচিত একটি কৌশল। এর সাহায্যে স্ফটিক কোনো পদার্থের ত্রিমাত্রিক গঠন সহজেই নির্ণয় করা যায়। সাধারণত এক্স-রে কেলাসের ওপর আপতিত হলে অপবর্তনের সৃষ্টি হয়। সেই অপবর্তন প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে কেলাসের সুনির্দিষ্ট গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবগঠিত স্ফটিকের গঠন ক্যালসিয়াম কার্বনেটের মতোই রম্বোহেড্রাল। রম্বোহেড্রাল জ্যামিতিক এবং স্ফটিক বিজ্ঞানের একটি বিশেষ গঠন। এর ছয়টি তলই সমান দৈর্ঘ্যের রম্বস।

কিন্তু এক্ষেত্রে কাঠামোর ভেতরে ছিদ্রের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। বিজ্ঞানী কং ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেছেন, নবগঠিত এই কেলাসের মধ্যে ছিদ্রের আধিক্যের ফলে ঘন আয়নিত স্তরগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়। সমন্বয়হীন কিছু হাইড্রক্সিল গ্রুপ (–OH) স্তরগুলোর মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। গবেষকেরা এটিকে ক্যালসিয়াম অ্যাসিটেটে (Ca(CH₃COO)₂) পাওয়া ঝুলন্ত মিথাইল গ্রুপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এসব কারণে ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটের কেলাসটি বেশ ফাঁপা ও হালকা হয়।

চীনা বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা শুধু রসায়নবিদদের দীর্ঘদিনের অধরা স্বপ্নই পূরণ করেনি, এর মাধ্যমে কার্বন-ক্যাপচার প্রযুক্তির গবেষণার নতুন দিগন্তের আভাস মিলেছে। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, এ ধরনের ধাতব-বাইকার্বনেট যৌগের মাধ্যমে আমাদের চিরপরিচিত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে (CO₂) খনিজ আকারে জমা করা যেতে পারে। এটি একবার সম্ভব হলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আধুনিক বিশ্ব অনেকটাই এগিয়ে যাবে।

লেখক: পদার্থবিদ, স্টেট ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কলকাতা

আরও পড়ুন