ইরানে কালো বৃষ্টি কেন পড়ছে, এটা কতটা বিপজ্জনক
দীর্ঘ খরা শেষে একপশলা স্বস্তির বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিল ইরানের রাজধানী তেহরানের মানুষ। কিন্তু আকাশ থেকে যখন বৃষ্টি নামল, তখন সবার চোখেমুখে কেবলই আতঙ্কের ছাপ। পরিষ্কার পানির বদলে আকাশ থেকে ঝরছে আলকাতরার মতো কালো রঙের বিষাক্ত জলের ফোঁটা! চারপাশের রাস্তাঘাট, গাড়ি, এমনকি বাড়ির বারান্দা পর্যন্ত ঢেকে গেছে কালো কালিতে।
গত ৮ মার্চের এই ভয়াবহ দৃশ্য শুধু ইরান নয়, বরং আশপাশের দেশগুলোর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশাল অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে। কিন্তু আকাশ থেকে এমন কালো বৃষ্টি ঝরার পেছনের কারণ কী? এটি মানুষের জন্য কতটা বিপদের কারণ হতে পারে?
আসলে কী ঘটেছিল
৭ ও ৮ মার্চ রাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামরিক হামলায় ইরানের তেহরান এবং আলবোর্জ প্রদেশের অন্তত চারটি বড় তেল সংরক্ষণাগার এবং একটি তেল স্থানান্তর কেন্দ্রে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। এই বিশাল অগ্নিকাণ্ডের ফলে রাতের আকাশ যেমন আগুনে লাল হয়ে ছিল, তেমনি দিনের বেলা পুরো শহর ঢেকে যায় ঘন কালো ধোঁয়ায়। আর এই ধোঁয়াই মূলত কালো বৃষ্টির প্রধান কারণ।
৭ ও ৮ মার্চ রাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামরিক হামলায় ইরানের তেহরান এবং আলবোর্জ প্রদেশের অন্তত চারটি বড় তেল সংরক্ষণাগার ও একটি তেল স্থানান্তর কেন্দ্রে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়।
বৃষ্টির রং কেন কালো হলো
যুক্তরাজ্যের লিসেস্টার ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী আন্না হ্যানসেল জানান, তেলের খনিতে লাগা এই আগুন কোনো সাধারণ গাড়ির পেট্রল পোড়ার মতো নয়। এখানকার তেল অনেক ঘন এবং অপরিশোধিত। এগুলো পোড়ার সময় প্রচুর পরিমাণে পোড়া এবং আধাপোড়া কার্বন কণা বা কালি তৈরি করে ধোঁয়ার সঙ্গে আকাশে উড়ে যায়।
যখন এই দূষিত ও ঘন ধোঁয়ার স্তরের ভেতর দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা নিচে নামতে শুরু করে, তখন জলের ফোঁটাগুলো বাতাসের ওই কালো কালি ও বিষাক্ত কণাগুলোকে ধুয়ে নিজেদের সঙ্গে মাটিতে নিয়ে আসে। আর এ কারণেই বৃষ্টির পানির রং পুরোপুরি কালো হয়ে যায়।
অ্যাসিড বৃষ্টি কী এবং কেন হচ্ছে
তেহরানের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই বৃষ্টির সময় তাদের চোখ জ্বলছিল এবং গলায় প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল। কর্তৃপক্ষ এর কারণ হিসেবে অ্যাসিড বৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছে।
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, অ্যাসিড বৃষ্টি আবার কী? অপরিশোধিত তেলের ভেতর প্রচুর পরিমাণে সালফার এবং নাইট্রোজেন থাকে। তেল যখন পোড়ে, তখন এই উপাদানগুলো বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে মিশে সালফার ডাই-অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাসগুলো যখন মেঘের বৃষ্টির পানির সঙ্গে মেশে, তখন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তা সালফিউরিক অ্যাসিড এবং নাইট্রিক অ্যাসিডে পরিণত হয়। আর এই অ্যাসিডমিশ্রিত বিষাক্ত জলই যখন আকাশ থেকে ঝরে, তাকে আমরা অ্যাসিড বৃষ্টি বলি। এই অ্যাসিড মানুষের ত্বক, চোখ ও গলার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
অপরিশোধিত তেল যখন পোড়ে, তখন তেলের ভেতরে থাকা সালফার এবং নাইট্রোজেন বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে মিশে সালফার ডাই-অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড গ্যাস তৈরি করে।
কালো বৃষ্টির ভেতর আর কী কী আছে
বিজ্ঞানী হ্যানসেলের মতে, এই কালো বৃষ্টি অত্যন্ত বিষাক্ত। এতে শুধু কার্বন নেই, বরং আছে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পলিয়ারোমেটিক হাইড্রোকার্বন। যেহেতু মিসাইলের আঘাতে বড় বড় ভবন ধ্বংস হয়েছে, তাই এই ধোঁয়ার সঙ্গে কংক্রিট, কাচ এবং প্লাস্টিকের অতি সূক্ষ্ম কণাও মিশে আছে। এমনকি বিস্ফোরণের কারণে অপরিশোধিত তেলের ছোট ছোট ফোঁটাও আকাশে উড়ে গিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে নিচে নেমে আসতে পারে।
হ্যানসেলের মতে, এই দূষণ ১৯৫২ সালে লন্ডনে হওয়া কুখ্যাত গ্রেট স্মগ বা ধোঁয়াশার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভয়াবহ হতে পারে!
মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এটি কতটা ক্ষতিকর
এই কালো বৃষ্টি সরাসরি মানুষের শরীরে লাগলে তা ধুয়ে ফেলা যায়। কিন্তু এর ক্ষতিকর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এই বৃষ্টির পানি যদি কোনোভাবে খাবার পানির উৎসে বা জলাশয়ে মেশে এবং মানুষ তা পান করে, তবে পেটব্যথা, বুকজ্বালা বা ডায়রিয়ার মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বৃষ্টির চেয়েও বড় বিপদ হলো বাতাসে ভাসমান ধোঁয়া। অত্যন্ত সূক্ষ্ম এই কণাগুলো নিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসের গভীরে এবং রক্তে মিশে যেতে পারে। ফলে হৃদ্রোগ, ফুসফুসের ক্যানসার, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই বিষাক্ত কণাগুলো মাঠে থাকা ফসল, গবাদিপশু এবং নদীর মাছে মিশে যেতে পারে। মানুষ যখন এই খাবারগুলো খাবে, তখন এই বিষ ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে জমে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে।
কালো বৃষ্টির চেয়েও বড় বিপদ হলো বাতাসে ভাসমান ধোঁয়া। অত্যন্ত সূক্ষ্ম এই কণাগুলো নিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসের গভীরে এবং রক্তে মিশে যেতে পারে।
অন্যান্য দেশেও কি এই দূষণ ছড়াতে পারে
তেলের বড় ফোঁটাগুলো হয়তো কাছাকাছিই ঝরে পড়বে, কিন্তু ধোঁয়ার অতি সূক্ষ্ম কণাগুলো বাতাসের ওপর ভর করে শত শত বা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে উড়ে যেতে পারে। সাহারা মরুভূমির ধুলো যেমন বাতাসে উড়ে যুক্তরাজ্য পর্যন্ত পৌঁছায়, তেমনি এই বিষাক্ত ধোঁয়াও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিজ্ঞানী হ্যানসেল সতর্ক করে বলেছেন, ‘পরিবেশের এ ধরনের বড় কোনো ক্ষতি কখনোই কোনো দেশের সীমানা মানে না।’
বাঁচার উপায় কী
এমন পরিস্থিতিতে যতটুকু সম্ভব বাড়ির ভেতরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ। বাইরে বের হলে অবশ্যই ভালো মানের ফেস মাস্ক এবং চোখ বাঁচাতে গগলস ব্যবহার করা উচিত। আর খাওয়ার পানিতে কোনো রকম কালো কণা বা অদ্ভুত স্বাদ পেলে সরাসরি বোতলজাত পানি পান করতে হবে।