২ মার্চ দুপুরে কারওয়ান বাজারে আকাশ থেকে কেন কাদাবৃষ্টি পড়ল
ঢাকার শীত বেশ কিছুদিন হলো বিদায় নিয়েছে। বাতাসে এখন বসন্তের আভাস। শীতের শেষ ও বসন্তের এই শুরুটা ঢাকাবাসীর জন্য উপভোগ্য হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন বদলে গেছে আতঙ্কে। মাস্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া রীতিমতো দায় হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ঢাকায় সেভাবে বৃষ্টি না হওয়ায় পরিবেশ এক অস্বস্তিকর রূপ নিয়েছে।
সূর্যের আলো থাকলেও ঢাকার বাতাসে সারাক্ষণ ঝুলে থাকছে ধোঁয়ার ভারী স্তর। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় ঢাকা প্রায়ই শীর্ষস্থানগুলোর একটি দখল করে রাখছে। এই যেমন আজ, ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব অনুযায়ী দুপুর ১টায় ঢাকার একিউআই মান ছিল ২০২। এর মানে বাতাসের মান এখন খুব অস্বাস্থ্যকর।
এ বছর শীতের শেষে ঢাকার বায়ুমান অন্যান্য বছরের তুলনায় খুব একটা ব্যতিক্রম হয়নি। গত কয়েক দিন ধরে ঢাকার আকাশে ঘন ধোঁয়াশা দেখা যাচ্ছে। রাতে এই ধোঁয়াশাকেই কোনো কোনো এলাকায় কুয়াশা বলে ভ্রম হচ্ছে। অনেকেই ভেবেছেন, এ বুঝি বসন্তের আগমনী কুয়াশা! কিন্তু প্রকৃতির ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু।
গতকাল ২ মার্চ দুপুরে ঢাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল ৩০ শতাংশ। বেলা তিনটার দিকে কারওয়ান বাজারে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হলেন। বৃষ্টি এল ঠিকই, তবে তা সাধারণ বৃষ্টির মতো স্বচ্ছ পানির নয়। ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া এই বৃষ্টি থেকে বাঁচতে যাঁরা দৌড়ে আশ্রয়ের খোঁজ নিয়েছিলেন, তাঁরা ছাদের নিচে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, সবার জামায় কাদা লেগে আছে! অর্থাৎ আকাশ থেকে পানির বদলে কাদা ঝরেছে।
আজ, ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব অনুযায়ী দুপুর ১টায় ঢাকার একিউআই মান ছিল ২০২। এর মানে বাতাসের মান এখন খুব অস্বাস্থ্যকর।
আকাশ থেকে কাদা নেমে আসার ঘটনা অবশ্য নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে এমন ঘটনার অনেক নজির পাওয়া যায়। একে ইংরেজিতে বলে মাড রেইন বা ডার্টি রেইন। বাংলায় একে আমরা কাদাবৃষ্টি বলতে পারি। লন্ডনে সাহারা মরুভূমির ধুলা ভেসে এসে বৃষ্টির সঙ্গে মিশে গাড়ি ঢেকে দেওয়ার ইতিহাস আছে। কখনো কখনো লালচে কাদাও আকাশ থেকে নেমে আসে, যাকে বলে ব্লাড রেইন। ২০২২ সালের ২১ মে পশ্চিম ইউরোপ সাহারা মরুভূমির ধুলায় ঢেকে যায়। সে সময় স্পেনের বহু শহরে আকাশ কমলা হয়ে গিয়েছিল। পরে বৃষ্টির সঙ্গে সেই ধুলা নিচে নেমে আসে। আমাদের উপমহাদেশেও মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে বাতাসে যখন ধূলিকণার ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটিও খুব একটা জটিল নয়। বাতাসে সব সময়ই ক্ষুদ্র কণা ভাসে। ধুলা, ধোঁয়া, সালফেট, নাইট্রেট ও কার্বন কণা প্রতিনিয়ত বাতাসে ভাসতে থাকে। এই কণাগুলোকে বলা হয় পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম। ঢাকার শীতকালে নির্মাণকাজ, ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, ভাগাড়ে ময়লা পোড়ানো এবং শুষ্ক মাটির ধুলা মিলিয়ে পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। বাতাস তখন ভারী হয়ে থাকে এবং এই অদৃশ্য কণা আমাদের চোখে ধোঁয়াশা হিসেবে ধরা দেয়।
২০২২ সালের ২১ মে পশ্চিম ইউরোপ সাহারা মরুভূমির ধুলায় ঢেকে যায়। সে সময় স্পেনের বহু শহরে আকাশ কমলা হয়ে গিয়েছিল। পরে বৃষ্টির সঙ্গে সেই ধুলা নিচে নেমে আসে।
মেঘের ভেতরে যখন পানির কণা তৈরি হয়, তখন সেগুলো সাধারণত কোনো ক্ষুদ্র কণাকে কেন্দ্র করেই গঠিত হয়। এই কণাগুলোকে বলে কনডেনসেশন নিউক্লিয়াস। অর্থাৎ ধূলিকণা অনেক সময় বৃষ্টির ফোঁটা তৈরির সূচনা করে। বাতাসে অতিরিক্ত ধুলা থাকলে বৃষ্টির ক্ষুদ্র ফোঁটা সেই ধূলিকণাকে জড়িয়ে নেয়। ফোঁটাগুলো আকারে ছোট হলে মাটিতে নামার আগেই অনেক সময় বাষ্পীভূত হয়ে যায়। কিন্তু ধূলিকণাগুলো কাদার মতো চিহ্ন রেখে ঠিকই নিচে ঝরে পড়ে। তখন আমরা এমন বৃষ্টির মুখে পড়লে জামায় কাদার ছোপ দেখতে পাই।
কারওয়ান বাজারের ঘটনাটি সম্ভবত এমনই এক পরিস্থিতির ফল। শীত ও বসন্তের শুরুর কয়েক দিন ধরে জমে থাকা ধুলা ও দূষণ স্তর হালকা বৃষ্টির সংস্পর্শে এসে কাদায় পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি অল্প ও খুব কম সময়ের জন্য হওয়ায় পরিষ্কার বৃষ্টির পানি পাওয়ার সুযোগ ছিল না। মূলত আকাশ থেকে পরিষ্কার বৃষ্টির বদলে বাতাসে ভাসমান কণাগুলোই কাদা হয়ে নিচে নেমে এসেছে।
এখানে আরেকটি আবহাওয়াগত বিষয়ও কাজ করে। শীতকালে ঢাকায় প্রায়ই তাপমাত্রার টেম্পারেচার ইনভারশন তৈরি হয়। স্বাভাবিক সময়ে উষ্ণ বাতাস ওপরে উঠে যায়। কিন্তু ইনভারশনের সময় ঠান্ডা বাতাস নিচে আটকে থাকে এবং ওপরে একটি উষ্ণ স্তর তৈরি হয়। ফলে নিচের দূষণ ওপরে উঠতে না পেরে শহরের নিচেই আটকে থাকে। এই আটকে থাকা স্তরেই ধুলা ও ধোঁয়া জমে। পরে যখন সামান্য বৃষ্টি হয়, তখন সেই জমে থাকা কণাগুলো দ্রুত ধুয়ে মাটিতে নেমে আসে।
শীত ও বসন্তের শুরুর কয়েক দিন ধরে জমে থাকা ধুলা ও দূষণ স্তর হালকা বৃষ্টির সংস্পর্শে এসে কাদায় পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি অল্প ও খুব কম সময়ের জন্য হওয়ায় পরিষ্কার বৃষ্টির পানি পাওয়ার সুযোগ ছিল না।
এ ধরনের কাদাবৃষ্টি কখনো কখনো আমাদের বেশ উপকার করে। কারণ বৃষ্টি দূষণের একটি বড় অংশ ধুয়ে মাটিতে নামিয়ে আনে। ফলে সাময়িকভাবে বাতাস কিছুটা পরিষ্কার হয়। তবে এর ভেতরে একটি গভীর সতর্কবার্তাও লুকিয়ে আছে। বৃষ্টির ফোঁটা যদি এত ধুলা নিয়ে নামে যে চোখে কাদা দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে বাতাসে দূষণ কণার ঘনত্ব কতটা অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে!
ঢাকার বসন্তের প্রথম বৃষ্টি আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হওয়ার কথা ছিল। অথচ এই বাতাসেই আমরা শ্বাস নিচ্ছি। আকাশ থেকে পড়ছে কাদা। আমাদের আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বাতাস কতটা ভারী ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, সেটা এমন কাদাবৃষ্টির মুখে পড়ার আগেই আমাদের জানা ও প্রতিরোধ করা জরুরি।