রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস ফুরিয়ে গেলে কী হবে
আপনার হাতের স্মার্টফোনটা কী দিয়ে তৈরি জানেন? মেটাল নিশ্চয়ই! কিন্তু কোন কোন মেটাল? সেগুলো কি পৃথিবীতে প্রচুর আছে? মোটেই না। মোবাইল তৈরিতে যেসব উপাদান ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে আছে রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস। বাংলায় বলা হয় বিরল মৃত্তিকা মৌল। নাম শুনেই বোঝা যায়, এগুলো খুব বিরল বা দুর্লভ। এই দুলর্ভ উপাদান কোনগুলো?
পর্যায় সারণির একদম নিচের দিকে দুটো আলাদা সারি আছে। ওই সারির মৌলের মধ্যে আছে ল্যান্থানাম, সিরিয়াম ও নিওডিমিয়ামের মতো মোট ১৭টি বিশেষ মৌল। এদের বিশেষত্ব হলো, এদের ইলেকট্রন বিন্যাস খুব অদ্ভুত। বাইরের দিকের ইলেকট্রনগুলো এমনভাবে থাকে যে সহজে অন্য কিছুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে না।
ফলে এদের চুম্বকীয় শক্তি ও রাসায়নিক ধর্মগুলো খুব নির্ভরযোগ্য। আর এই গুণটাই এদের বানিয়ে দিয়েছে স্মার্টফোন, ইলেকট্রিক গাড়ি ও মেডিকেল যন্ত্রপাতির মূল কাঁচামাল!
নামে রেয়ার হলেও, এরা কিন্তু প্লাটিনাম বা স্বর্ণের চেয়েও পরিমাণে বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো, এগুলো মাটির নিচে একসঙ্গে পাওয়া যায় না। অন্য অনেক উপাদানের সঙ্গে মিশে থাকে খুব অল্প পরিমাণে। তাই এগুলো খুঁজে বের করে আলাদা করা এক বিরাট মহাযজ্ঞ! একটা উদাহরণ দিই। ১০০০ কেজি রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট বের করতে হাজার হাজার টন বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়।
ল্যান্থানাম, সিরিয়াম ও নিওডিমিয়ামের মতো মোট ১৭টি বিশেষ মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাস খুব অদ্ভুত। বাইরের দিকের ইলেকট্রনগুলো এমনভাবে থাকে যে সহজে অন্য কিছুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে না।
এখন পর্যন্ত মানুষ প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট মাটির নিচ থেকে তুলে ফেলেছে। আর আমাদের হাতে জমা আছে প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে রেয়ার আর্থ এলিমেন্টের সবচেয়ে বড় খনি চীনের দখলে। তাঁদের কাছে আছে ৪৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন রিজার্ভ এবং উৎপাদনও ওরাই সবচেয়ে বেশি করে। এরপর ভিয়েতনামের কাছে ২২ মিলিয়ন, ব্রাজিল ও রাশিয়ার কাছে যথাক্রমে ২১ ও ১২ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বিশাল ভাণ্ডার আছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভাণ্ডারে আছে প্রায় ৬.৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এখন যে হারে আমরা ফোন, ল্যাপটপ ও ইলেকট্রিক গাড়ি বানাচ্ছি, বিজ্ঞানীরা বলছেন আগামী ৬০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে এই ভাণ্ডার শেষ হয়ে যেতে পারে! তখন কী হবে?
এই মৌলগুলো মাটি থেকে তোলা মোটেও সহজ কাজ নয়। এর জন্য দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রথমত ওপেন-পিট মাইনিং, যেখানে মাটি খুঁড়ে আকরিক বের করে ধাতু আলাদা করা হয়। দ্বিতীয়ত পদ্ধতির নাম ইন-সিটু লিচিং। এই পদ্ধতিতে সোজা মাটির নিচে পাইপ দিয়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল পাম্প করে ধাতুগুলো তুলে নেওয়া হয়। খুব সহজ করে বললাম বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ কাজটি অনেক ঝামেলার। তাছাড়া এই দুটি পদ্ধতিই পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। বিষাক্ত কেমিক্যাল মাটির নিচের পানিতে মিশে যায়, আর বাতাসের সঙ্গে মেশে তেজস্ক্রিয় ধুলো।
তবে বিজ্ঞানীরাও তো আর বসে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির রসায়নবিদ জাস্টিন উইলসন ও তাঁর দল নতুন এক উপায় বের করেছেন। তাঁরা বাতিল হয়ে যাওয়া পুরোনো ইলেকট্রনিক গ্যাজেট থেকে এই রেয়ার আর্থ এলিমেন্টগুলো আবার উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ, আপনার ফেলে দেওয়া নষ্ট ফোনটাই হয়তো ভবিষ্যতে নতুন ফোনের কাঁচামাল হবে! তবে এর জন্য দরকার উন্নত প্রযুক্তি আর সরকারি সহায়তা।