সকাল সাড়ে ৮টা। কুয়াশা কেটে গিয়ে হাসছে সূর্য। সঙ্গে হাসছে একদল খুদে বিজ্ঞানী। রংপুরের ভারী কুয়াশা কেটে গেছে তাদের হাসি-আনন্দে।
রংপুর জিলা স্কুল প্রাঙ্গনে বসেছে খুদে বিজ্ঞানীদের মিলনমেলা। বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসবের রংপুর আঞ্চলিক পর্ব। আজ শনিবার সকাল পর্দা ওঠে এ উৎসবের। উৎসবে উপস্থিত ছিলেন রংপুরের বরেণ্য অধ্যাপক, গবেষক ও শিক্ষাবিদেরা।
সকাল সাড়ে ৮টা থেকে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করে রংপুর জিলা স্কুল প্রাঙ্গনে। উৎসাহী মুখ, সবাই হাসছে। কেউ কেউ আবার দল বেঁধে নিয়ে আসছে প্রজেক্ট। কারো কারো সঙ্গে এসেছে বাবা, মা বা বড় ভাই-বোন। কিন্তু সবার চোখে মুখেই দারুণ উৎসাহ। সবাই নিজের সৃষ্টিশীলতা দেখাতে চায়। কেউ কুইজ প্রতিযোগিতায় চিন্তাশীল সব প্রশ্নের সঠিক দিয়ে, আর কেউ তাক লাগিয়ে দেওয়া প্রজেক্ট প্রদর্শনীর মাধ্যমে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সবাই কলেজ মাঠে উপস্থিত। প্রতিবারের মতো জাতীয় সঙ্গীতের জন্য লাইন ধরে দাঁড়ায় শিক্ষার্থীরা। উৎসবের সূচনা হয় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে। এ সময় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ আর মিজানুর রহমান এবং উৎসবের পতাকা উত্তোলন করেন বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স হুমায়ুন কবির ও প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আরিফুল হক রুজু।
উদ্বোধনী মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, বিকাশের সহাকারী ব্যবস্থাপক শাকিল মাহবুব, বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার, সহসম্পাদক উচ্ছ্বাস তৌসিফ এবং সম্পাদনা দলের সদস্য কাজী আকাশ।
পতাকা উত্তোলন শেষে স্বাগত বক্তব্য দেন রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ আর মিজানুর রহমান। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, 'এই যে তোমরা এখানে এসেছ, এটা আমাকে উজ্জীবিত করে। এত শিক্ষার্থী বিজ্ঞানে উৎসাহী, তারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। এটা আমার জন্য ভালো লাগার। মুঠোফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ ও বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে, দেশের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানে উৎসাহী করে তুলতে এই উৎসবের আয়োজন করছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ!'
প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আরিফুল হক রুজু বলেন, 'বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন প্রকাশের পাশাপাশি এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বিজ্ঞানচিন্তা শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা, তোমরা ভালো থাকবে, বিজ্ঞানচর্চা করবে ও সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তুলবে। তোমাদের প্রতি রইল আমার আন্তরিক শুভকামনা। বিজ্ঞান উৎসব সফল হোক।'
'শীতকালে আমরা খেজুরের রস পাই, কিন্তু বছরের অন্য সময় খেজুর গাছের রস পাওয়া যায় না কেন?' 'সূর্যের আলো সাত রঙের সমষ্টি, কিন্তু চাঁদের আলোও কি একইরকম?' 'বাস্তবে কি টেলিপোর্টেশন করা সম্ভব?' 'বিকাশে কীভাবে মুহূর্তে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা পাঠানো হয়?'-এরকম কত জিজ্ঞাসা তাদের!
বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স হুমায়ুন কবির বলেন, 'আমাদের বাচ্চারা যেন বিজ্ঞানমনস্ক হয়, দেশ এবং বিদেশে বিজ্ঞানের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যেন সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে, সেই উদ্দেশ্যেই বিকাশ ও বিজ্ঞানচিন্তা মিলে এই উৎসবের আয়োজন করছে।'
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন গাজী মাজহারুল আনোয়ার সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, 'বিজ্ঞান মানুষকে যৌক্তিক চিন্তা করতে শেখায়। এর মধ্যে রয়েছে গণিত, পদার্থবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা। এই সবই মূলত যৌক্তিক চিন্তার বিভিন্ন ধরনের প্রয়োগ। প্রকৃতি নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলে। সেই নিয়মগুলো শেখা, জানা ও প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন-ই আসলে বিজ্ঞানের কাজ। বিজ্ঞানের পথচলা। তোমরা এই পথ ধরে উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে যাও, এই কামনা করি।'
বক্তব্য শেষে গাজী মাজহারুল আনোয়ার বেলুন উড়িয়ে রংপুর বিজ্ঞান উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করে।
তারপর শুরু হয় কুইজ প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীরা সবাই নির্দিষ্ট আসন বিন্যাস মেনে বসে পড়ে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে। ওদিকে প্রজেক্ট নিয়ে হাজির ৪০টি দল। অভিভাবক ও দর্শকরা ঘুরে ঘুরে সেসব প্রজেক্ট দেখেন। আর বিচারকাজ শুরু করেন প্রজেক্ট বিচারকরা।
কুইজ শেষে রংপুর জিলা স্কুলের অডিটোরিয়ামে শুরু হয় উৎসবের পরের পর্ব। ছন্দে আনন্দ নৃত্যশিল্পী গোষ্ঠী নাচের তালে মন জুড়িয়ে দেয় সবার। নাচ শেষ হতেই জাদুর ঝাঁপি খুলে ধরেন জাদুকর রাজীব বসাক। তাঁর শূন্য হাতে ফুল ফোটে, মন্ত্রমুগ্ধ চোখে দেখেন দর্শক। জাদুর রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব। 'শীতকালে আমরা খেজুরের রস পাই, কিন্তু বছরের অন্য সময় খেজুর গাছের রস পাওয়া যায় না কেন?' 'সূর্যের আলো সাত রঙের সমষ্টি, কিন্তু চাঁদের আলোও কি একইরকম?' 'বাস্তবে কি টেলিপোর্টেশন করা সম্ভব?' 'বিকাশে কীভাবে মুহূর্তে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা পাঠানো হয়?'-এরকম কত জিজ্ঞাসা তাদের! এসব প্রশ্নের জবাব দেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গাজী মাজহারুল আনোয়ার, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিজন মোহন চাকী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান, রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দি মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মারুফ হোসেন মাহাবুব এবং বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স হুমায়ুন কবির।
একসময় ভেবেছিলাম নাসার বিজ্ঞানী হব। সেটা হয়নি, কিন্তু এখন আমি একটি জেলার দায়িত্ব পেয়েছি। তোমরা আমার চেয়েও ভালো করবে ভবিষ্যতে। আমি তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করি।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে উপস্থিত হন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, রংপুরের জেলা প্রশাসক চিত্রলেখা নাজনীন। প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আরিফুল হক রুজু তাঁকে মঞ্চে এসে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
চিত্রলেখা নাজনীন বলেন, 'একসময় ভেবেছিলাম নাসার বিজ্ঞানী হব। সেটা হয়নি, কিন্তু এখন আমি একটি জেলার দায়িত্ব পেয়েছি। তোমরা আমার চেয়েও ভালো করবে ভবিষ্যতে। আমি তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করি।'
তাঁর বক্তব্য শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গাজী মাজহারুল আনোয়ার, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিজন মোহন চাকী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আরিফুল হক রুজু, বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার এবং বিকাশের ইভিপি ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স হুমায়ুন কবির।
কুইজের নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে ১০ জন করে মোট ২০ জনকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রজেক্ট পর্বের পুরস্কার ছিল ১০টি। তবে বিশেষ বিবেচনায় আরও দুটি প্রজেক্টসহ মোট ১২টি প্রজেক্টের ২৮জন শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করা হয় প্রজেক্ট বিভাগে।
কুইজ প্রতিযোগিতায় নিম্নমাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে প্রথম ও সেরাদের সেরা হয়েছে রংপুর জিলা স্কুলের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ফাহিম ফয়সাল। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইসা হক মিমি। আর তৃতীয় হয়েছে রংপুর জিলা স্কুলের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মঞ্জুর মোর্শেদ রাতিন। মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে প্রথম ও সেরাদের সেরা হয়েছে পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যাণ্ড কলেজ, রংপুরের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মুশফিকুর রহমান। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে একই স্কুলের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আশিকুর রহমান (জনি)। আর তৃতীয় হয়েছে দ্য মিলিনিয়াম স্টার স্কুল অ্যাণ্ড কলেজের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী একান্ত আবেদীন অনন্য।
প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে প্রথম ও সেরাদের সেরা হয়েছে দ্য মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল অ্যাণ্ড কলেজের ৮ম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী—আবিদ অর্ণব, নাফিস আল ফারুক ও অর্ঘ্য সরকার রূপ। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যাণ্ড কলেজ, রংপুরের ৯ম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী—মো. মেজবাহুল হাসান রাহাত ও মো. নওরোজ রাফি। তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে একই স্কুলের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী—মো. ফারহাত রুহান।
প্রশ্নোত্তর পর্ব ও পুরস্কার বিতরণী পর্ব সঞ্চালনা করেন শিবলী বিন সারওয়ার। এ ছাড়া অনুষ্ঠানের বাকি অংশ সঞ্চালনা করেন রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দি মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মারুফ হোসেন মাহাবুব। বিজয়ীদের সঙ্গে অতিথিদের ছবি তোলার মাধ্যমে পর্দা নামে খুদে বিজ্ঞানীদের এই মিলনমেলার।
‘বিজ্ঞানে বিকাশ’ স্লোগান সামনে রেখে সাতটি বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আঞ্চলিক উৎসব। ইতিমধ্যেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহী বিজ্ঞান উৎসবের আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর একে একে অনুষ্ঠিত হবে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক উৎসব। সবশেষে জাতীয় পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে এ আয়োজন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে আঞ্চলিক উৎসবের বিজয়ীরা।
বিজ্ঞান উৎসবে ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রজেক্ট প্রদর্শনী ও কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে। প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একটি ক্যাটাগরিতে অংশ নেবে। এ ছাড়া কুইজ প্রতিযোগিতায় থাকবে দুটি ক্যাটাগরি। নিম্নমাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে অংশ নেবে ৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এবং মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে অংশ নেবে ৯ম-১০ম শ্রেণি ও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। শুধু নিবন্ধনকারী শিক্ষার্থীরা এই দুই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে।
বিজ্ঞান উৎসবের যেকোনো খবর জানতে চোখ রাখুন bigganchinta.com-এ, বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসব ও বিজ্ঞানচিন্তার ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে, প্রথম আলো অনলাইন ও প্রিন্টে এবং বিজ্ঞানচিন্তার প্রিন্ট সংস্করণে।