বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন ও জার্নালের শুরুর কথা

বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদকোলাজ

বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। এই ইতিহাসের শুরুর দিকে অবশ্য ম্যাগাজিন নয়, বলতে হবে একটি জার্নালের কথা। ফিলোসফিক্যাল ট্রানজেকশনকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক জার্নাল। এটি দীর্ঘকাল প্রকাশিত হয়। ১৬৬৫ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটির প্রথম সেক্রেটারি হেনরি ওল্ডেনবার্গের হাত ধরে চালু হয় এ জার্নাল। তিনি জার্নালের প্রথম প্রকাশক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে ডেনিস দ্য সালো ১৬৬৫ সালের প্রথম দিকে জার্নাল দেস স্ক্যাভ্যান্স প্রকাশ করেন। অনেকেই ডেনিসের এ জার্নালকে প্রথম বৈজ্ঞানিক জার্নাল বলে মনে করেন।

বিশ্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক জার্নাল ফিলোসফিক্যাল ট্রানজেকশন

একদম সহজ করে বললে, জার্নালে প্রকাশিত হয় গবেষণাপত্র। আর বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো সহজ ভাষায় প্রকাশিত হয় বিজ্ঞানবিষয়ক জনপ্রিয় ধারার ম্যাগাজিনে। প্রথমটি, অর্থাৎ জার্নাল মানে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষায় প্রমাণিত গবেষণাপত্র প্রকাশের সুযোগ। আর দ্বিতীয়টি, অর্থাৎ ম্যাগাজিনের কাজ বিজ্ঞানবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো, গবেষণাপত্রগুলোর কথা সবাইকে জানানো, বিজ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া। যেমন সায়েন্টিফিক আমেরিকান। এখন অবশ্য এসব ম্যাগাজিনকে আর শুধু ম্যাগাজিন বলার উপায় নেই। প্রায় সবকটিরই ম্যাগাজিনের পাশাপাশি রয়েছে ওয়েবসাইট, তাতে প্রকাশিতও হচ্ছে নিত্যনতুন ফিচার, আর্টিকেল, আপডেটসহ আরও অনেক কিছু।

ব্রিটিশ সায়েন্টিফিক জার্নাল নেচার প্রকাশিত হয় লন্ডন থেকে। ১৮৬৯ সাল থেকে প্রকাশ হচ্ছে জার্নালটি। আজ এটি বিজ্ঞানের জগতে অন্যতম নির্ভরযোগ্য জার্নাল হিসেবে বিবেচিত হয়। ফিলোসফিক্যাল ট্রানজেকশনকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক জার্নাল।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান

১৮৪৫ সাল থেকে সায়েন্টিফিক আমেরিকান প্রকাশ শুরু হয় আমেরিকাতে। এই ম্যাগাজিন বিজ্ঞানে আগ্রহী পাঠকদের জন্য বিভিন্ন গবেষণা ও ফিচার প্রকাশ করে। মার্কিন উদ্ভাবক রুফাস পোর্টার ছিলেন সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর প্রথম প্রকাশক। প্রথম দিকে ৪ পৃষ্ঠার সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হতো এটি। ১৮৬০ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের লাইফবয়া উদ্ভাবনের ফিচারসহ নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এ ম্যাগাজিনে, লিখেছেন আলবার্ট আইনস্টাইন থেকে শুরু করে নিকোলা টেসলার মতো বিজ্ঞানীও।

অন্যদিকে, ব্রিটিশ সায়েন্টিফিক জার্নাল নেচার প্রকাশিত হয় লন্ডন থেকে। ১৮৬৯ সাল থেকে প্রকাশ হচ্ছে জার্নালটি। আজ এটি বিজ্ঞানের জগতে অন্যতম নির্ভরযোগ্য জার্নাল হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৮৭২ সালে চালু হয় পপুলার সায়েন্সদ্য পপুলার সায়েন্স মান্থলি নামে শুরু হয় ম্যাগাজিনটি। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে অটোমোবাইল, মহাকাশসহ নানা কিছু নিয়ে ফিচার প্রকাশ করে পপুলার সায়েন্স

পপুলার সায়েন্স ম্যাগাজিন
আরও পড়ুন
কম্পিউটার্স অ্যান্ড পিপল নামে একটি ম্যাগাজিন ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। এই ম্যাগাজিন প্রথম কম্পিউটার ম্যাগাজিন হিসেবে খ্যাত।
ম্যাগাজিন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

আরেকটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৮ সালে। ১৯০৫ সাল থেকে এই ম্যাগাজিন ছবি প্রকাশ করতে শুরু করে। এদিকে ১৮৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সায়েন্স জার্নাল প্রকাশ করেন নিউইয়র্কের সাংবাদিক জন মাইকেল। তিনি টমাস আলভা এডিসন ও আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের অর্থায়নে এই জার্নাল প্রকাশ করতে শুরু করেন।

১৯২৬ সালে প্রথম সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন অ্যামেইজিং স্টোরিজ প্রকাশিত হয়। প্রথম দিককার অন্যতম সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিনের মধ্যে রয়েছে এয়ার ওয়ান্ডার স্টোরিজ (১৯২৯-৩০), অ্যাসটাউন্ডিং স্টোরিজ অব সুপার-সায়েন্স (১৯৩০), অ্যাভন সায়েন্স ফিকশন রিডার (১৯৫১-১৯৫২), ক্যাপটেন ফিউচার (১৯৪০-১৯৪৪)।

সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন অ্যামেইজিং স্টোরিজ

কম্পিউটার্স অ্যান্ড পিপল নামে একটি ম্যাগাজিন ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। এই ম্যাগাজিন প্রথম কম্পিউটার ম্যাগাজিন হিসেবে খ্যাত।

এ ছাড়াও অনেক বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় এখন। সব এই ছোট্ট লেখায় বলা সম্ভব নয়। বরং এবারে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিজ্ঞানবিষয়ক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের কথা বলা যাক সংক্ষেপে।

উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক পত্রিকা বিজ্ঞানসেবধি। ১৮৩২ সালের এপ্রিল মাসে এই পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটিতে লর্ড ব্রোহেমের বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধগুলোর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। বাবু অমলচন্দ্র গাঙ্গুলি ও কাশীপ্রসাদ ঘোষ অনুবাদ করতেন এই মাসিক পত্রিকার জন্য।

আরও পড়ুন
মহাকাশ বার্তা, অহরহ, জিরো টু ইনফিনিটি, পাই টু ইনফিনিটি, মহাবৃত্তসহ বেশ কিছু বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে বাংলা ভাষায়।
বিজ্ঞানচিন্তা জুন ২০২৩ সংখ্যার প্রচ্ছদ

বাংলাদেশের প্রথম বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন বিজ্ঞান সাময়িকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ ইব্রাহীমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো এটি। দীর্ঘকাল প্রকাশিত হয় ম্যাগাজিনটি। ৫০ বছরের বেশি সময় প্রকাশিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে অনিয়মিত হতে হতে বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৫-২০০৬ সাল থেকে শুরু হয় সায়েন্স ওয়ার্ল্ড-এর যাত্রা। বিজ্ঞানবক্তা আসিফ দীর্ঘদিন এটি সম্পাদনা করেছেন। পরে এটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়াও মহাকাশ বার্তা, অহরহ, জিরো টু ইনফিনিটি, পাই টু ইনফিনিটি, মহাবৃত্তসহ বেশ কিছু বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। এ ছাড়াও বাংলা ভাষায় শুধু সায়েন্স ফিকশন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে একটি ম্যাগাজিন—মৌলিক। আহসান হাবীবের সম্পাদনায় হাসান খুরশীদ রূমীসহ আরও অনেকে এতে কাজ করেছেন।

২০১৬ সাল থেকে আব্দুল কাইয়ুমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে বিজ্ঞানচিন্তা। এ বছর ম্যাগাজিনটি ৮ পেরিয়ে পা রাখল ৯ বছরে। সর্বস্তরে বিজ্ঞান প্রসারে ম্যাগাজিনটি বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, বিজ্ঞানচিন্তা