অভিজ্ঞতা
ফেনীর বন্যা দুর্যোগে অ্যামেচার রেডিও যেভাবে আলো জ্বালে
আগস্ট মাসে প্রচণ্ড বন্যায় ডুবে যায় ফেনী ও আশপাশের এলাকাগুলো। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সব ধরনের যোগাযোগ। এ সময় একদল অ্যামেচার রেডিও অপারেটর ছুটে যায় ফেনীতে। সেখানে ফেনীর ডিসি অফিস তথা স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলে আশপাশের প্রায় ৭০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায়। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ক এক গল্প এটি। লড়াই করার গল্প, আলো জ্বালার গল্প। সেই অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন ফেনীতে অ্যামেচার রেডিও যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত এম ও বি জিহাদ।
২১ আগস্ট ২০২৪, বুধবার। ঢাকায় সেদিন দুপুর থেকেই আকাশ মেঘলা। খবরে দেখা যাচ্ছে ফেনীর অবস্থা—বন্যা পরিস্থিতি, কতটা পানি উঠল ইত্যাদি। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে আরও কজন অ্যামেচার রেডিও অপারেটর বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে বের হয়েছিলাম সেদিন। উদ্দেশ্য, আমাদের অ্যামেচার রেডিও কমিউনিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য মো. আলমের (কলসাইন: S21AK) সঙ্গে দেখা করা।
মো. আলম ও আমার (এম ও বি জিহাদ, কলসাইন: S21MOB) সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছিলেন তিনজন অ্যামেচার রেডিও অপারেটর—আবদুল্লাহ আল ফাহাদ (S21AF), সাব্বির আহমেদ (S21ACP) ও মুনিরুজ্জামান রিফাত (S21AIG)। রেডিও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন আলোচনার এক পর্যায়ে প্রসঙ্গত ফেনীর কথা উঠল। ততক্ষণে ফেনীর বেশির ভাগ অঞ্চলই ডুবে গেছে, ভেঙ্গে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। মোবাইল টাওয়ারগুলোও অচল হয়ে পড়তে শুরু করেছে। ফলে ফেনীর বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
আমরা জানতাম, যেকোনো দুর্যোগে কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, ফেনীর এ দুর্যোগে আমাদের দ্রুত সাড়া দেওয়া উচিৎ। যোগাযোগ পুনরায় চালু করতে শিগগিরই ফেনীর উদ্দেশে যাত্রা করা প্রয়োজন। কাজেই আড্ডা রূপান্তরিত হলো ‘মিশন ফেনী’র সূচনা পর্বে।
আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ এ অপারেশনের নেতৃত্বের দায়িত্ব নিলেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করি। সবাইকে জানানো হয়, রাত সাড়ে ১০টায় মিটিং।
নির্ধারিত সময়ে মিটিং শুরু হলো। আমরা তালিকা করলাম, কয়টা রেডিও লাগবে, কী কী অ্যান্টেনা নিতে হবে, ফিড কেব্ল কতটুকু লাগবে, পাওয়ার সোর্স কী হবে, আমাদের কাছে কয়টা ব্যাটারি আছে ইত্যাদি। কে কে ফেনী যাবেন এবং সঙ্গে কী নেবেন, সেগুলো নিয়েও আলোচনা হয়। আমি, সাব্বির ও মুনিরুজ্জামান পরদিন সকালে ফেনীর উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। রাতেই বসে কীভাবে যোগাযোগ পুনরায় চালু করব, নিজেরা কীভাবে অপারেট করব, কোন ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্কে অপারেট করা হবে, কাদের কমিউনিকেশন সাপোর্ট দেব, সেসবও ঠিক করে নিই। রাতেই দুটি চিঠিও লিখে ফেলি—একটা ফেনির ডিসি অফিসের জন্য, আরেকটা বাংলাদেশ টেলিকমিউনেশন রেগুলেটরি কমিশনের জন্য।
যাত্রা শুরু
পরদিন সকাল ৮টায় চিঠি নিয়ে মো. সহিদুজ্জামান সানি ও ফাহিমুল ইসলাম ফেনী ডিসি অফিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। আর আমি সহ ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ দলের বাকি দুজন ইকুইপমেন্ট জোগাড় করতে শুরু করি। এরমধ্যেই ফেনী শহরে অবনস্থানরত আমাদের একজন অ্যামেচার রেডিও অপারেটর আসিফ উদ-দৌলা (S21NWR) কল করে পরিস্থিতি জানায় আমাদের, বলে দ্রুত ফেনী যেতে। সাড়ে ৯টার দিকে আমি, সাব্বির এবং মুনিরুজ্জামান আমাদের রেডিও, ব্যাটারি, অ্যান্টেনা, ফিড কেব্লসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিসসহ ফেনীর উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা দিই।
কুমিল্লা পর্যন্ত বাস ঠিকঠাকই চলে, এরপর বাধে বিপত্তি। দীর্ঘ জ্যামে বসেই সন্ধ্যা ঘনায়। ফেনী থেকে আমরা তখন প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। এদিকে আমাদের আগে যে দুজন চিঠি নিয়ে গেছে, তাদেরও খুঁজে পাচ্ছি না। ঢাকার সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এত যন্ত্রপাতি নিয়ে হাঁটাও সম্ভব না, সিএনজি বা অন্য যানবাহন নিয়েও অতদূর যাওয়া সম্ভব না। উপায় নেই, বাধ্য হয়ে উল্টোদিকের লেনে একটা গাড়ি যেতে পারে, এমন জায়গাটুকু আমাদের গাড়ি, ত্রাণ ও স্পিডবোটবাহী ট্রাকের জন্য নির্ধারণ করে নেওয়া হলো। সেগুলো এক সারিতে আমাদের বাসের পেছন পেছন চলল। আমরা চললাম পায়ে হেঁটে—আমি, সাব্বির ও মুনিরুজ্জামানের হাতে ওয়াকিটকি। ওভাবেই নিজেরা পথ করে নিয়ে, জ্যাম সরিয়ে চলতে লাগলাম ফেনীর উদ্দেশে।
ফেনী ডিসি অফিস
প্রায় ১৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে গাড়িবহর নিয়ে স্থানীয় গ্রামের রাস্তা চিনে অবশেষে অনুমানিক রাত ৯-১০টার দিকে ফেনী ডিসি অফিস পৌঁছালাম। গিয়ে দেখি, আমাদের আগের দুজন ১ ঘণ্টা আগে পৌঁছেছে। চিঠি দিয়ে সব অনুমতি নিয়েছে তারা। এ সময় ফেনীর ডিসি অফিসও ছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বিদ্যুৎ সংযোগ ছিলো না। মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করছিল না। ডিসি অফিস অন্য উপজেলাগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছিল না। জানা যাচ্ছিল না, সেখানে কী হচ্ছে।
ডিসি অফিস আমাদের সব ধরনের অনুমতি দেয়, দ্রুত কাজ শুরু করতে বলে। আমরা তৎক্ষণাৎ ডিসি অফিসে একটি রেডিও কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন করি। ডিসি অফিসের অদূরে একটি ১৫ তলা ভবনের ওপরে বসানো হয় শক্তিশালী অ্যান্টেনা। এটাই ছিল আমাদের মূল রেডিও কন্ট্রোল স্টেশন
আমাদের পেয়ে ফেনীর জেলা প্রশাসক শাহিনা আক্তার উচ্ছ্বসিত হলেন। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে আমরা যে যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে পারি, তা ওনারা ভাবেননি। সেই মুহূর্তে এই যোগাযোগই সবচেয়ে জরুরি ছিল ওনাদের জন্য।
যাহোক, ডিসি অফিস আমাদের সব ধরনের অনুমতি দেয়, দ্রুত কাজ শুরু করতে বলে। আমরা তৎক্ষণাৎ ডিসি অফিসে একটি রেডিও কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন করি। ডিসি অফিসের অদূরে একটি ১৫ তলা ভবনের ওপরে বসানো হয় শক্তিশালী অ্যান্টেনা। এটাই ছিল আমাদের মূল রেডিও কন্ট্রোল স্টেশন (ফেনী কন্ট্রোল)। সব সফলভাবে সম্পন্ন হলো।
মূল কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপনের পর রেডিওতে আসিফ উদ-দৌলার কল পাই। তিনি জানান, ওনার বাসায় পানি উঠেছে। উনিসহ বাকিরা তিনতলায় আশ্রয় নিয়েছেন। এর কিছুক্ষণ পর ওনার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভোর নাগাদ আমাদের আরও কজন অপারেটর ফেনী পৌঁছায়।
অপারেশন শুরু
পরদিন সকালবেলা ৮টা থেকে এলাকাভিত্তিক ভাগ করে নিয়ে স্পিডবোট ত্রান ও উদ্ধারকর্মীসহ যাত্রা শুরু করে। আমরা এলাকাভিত্তিক প্রতিটা বোটে একজন করে অ্যামেচার রেডিও অপারেটর সঙ্গে দিয়ে দিই। কারণ, তখনও মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল। বোটগুলো যাত্রা শুরু করে, আমাদের অপারেটররা নিজেদের সঙ্গে থাকা হ্যান্ডহ্যাল্ড ওয়াকিটকির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আপডেট পাঠাতে শুরু করে।
ফেনী কন্ট্রোল থেকে প্রতিনিয়ত মোবাইল অপারেটরদের আপডেট নেওয়া হচ্ছিল এবং সেসব ডিসি অফিসে রিলে করা হচ্ছিল। যেমন কোথায় কতজন মানুষ আটকে রয়েছেন, কোথায় খাবার লাগবে, কোথাও আরও উদ্ধার কাজ প্রয়োজন কি না ইত্যাদি। ডিসি অফিস এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। সেই সিদ্ধান্ত আবার আমরা মূল কন্ট্রোলকে পাঠাচ্ছিলাম, সেগুলো ওখান থেকে ফিল্ড অপারেটরদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
পরিকল্পনাটা হলো, আর্মি ক্যাম্প ও ডিসি অফিস আমার মাধ্যমে যুক্ত থাকবে ও জরুরি বার্তা আদান-প্রদান করবে। মোবাইল নেটওয়ার্ক যেহেতু আপাতত অচল, তাই আমি এবং ডিসি অফিসের রেডিও কন্ট্রোল স্টেশনই ডিসি অফিস ও আর্মি ক্যাম্পের জরুরি যোগাযোগের মূল মাধ্যম
আমরা কজন ডিসি অফিস থেকে এসব কোঅর্ডিনেট করছিলাম। দুপুর নাগাদ ডিসি অফিসের ফেনির আর্মি বেইসক্যাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের দরকার পড়ে, আর্মির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য। আমি নিজের হ্যান্ডহেল্ড ওয়াকিটকি নিয়ে ফেনীর এডিএম (এডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আরমান শাকিল)-এর সঙ্গে বেইসক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা দিই। আর্মি ক্যাম্পের অপারেশন রুমে ঢুকে বসে পড়ি আমরা।
পরিকল্পনাটা হলো, আর্মি ক্যাম্প ও ডিসি অফিস আমার মাধ্যমে যুক্ত থাকবে ও জরুরি বার্তা আদান-প্রদান করবে। মোবাইল নেটওয়ার্ক যেহেতু আপাতত অচল, তাই আমি এবং ডিসি অফিসের রেডিও কন্ট্রোল স্টেশনই ডিসি অফিস ও আর্মি ক্যাম্পের জরুরি যোগাযোগের মূল মাধ্যম।
আমার হাতের রেডিও বেজেই চলেছে। মূল কন্ট্রোলের ফ্রিকোয়েন্সি এবং ডিসি কন্ট্রোলের ফ্রিকোয়েন্সিতে টিউন করা আমার রেডিও। ফলে প্রতিনিয়ত ফিল্ডে কোন অপারেটর কোথায় আছে, কোন এলাকায় কী সমস্যা হচ্ছে, কোথায় কতজন মানুষ আটকা পড়েছেন—এসব তথ্য আসছে, যোগাযোগও করা যাচ্ছে। এ সময় অপারেশন রুমে আসেন আর্মি অফিসাররা, জানতে চান কী হচ্ছে। ওনাদের পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। এরপর নতুন কেউ এলে ওনারাই আমার হয়ে সব বুঝিয়ে বলছিলেন। একপর্যায়ে কমান্ডিং অফিসার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আরেফিন সব শুনে জানতে চাইলেন, আর্মি অপারেশনগুলোতেও যোগাযোগের ব্যাপারে সাহায্য করতে পারব কি না আমরা। কারণ, তাঁদের দূরের ক্যাম্প ও রেসকিউ বোটগুলোর সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছিল। সে রাতেই তিনি আমাকে আর্মি ক্যাম্পে একটা কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন করতে বলেন। বলেন, পরদিন থেকে আর্মির অপারেশনগুলোয় যোগাযোগ সহায়তা দিতে। ডিসি কন্ট্রোলের দায়িত্ব সাব্বিরের হাতে ছেড়ে দিয়ে আমি তখন আর্মির অপারেশনগুলোয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোঅর্ডিনেট করার দায়িত্ব নিই।
পরদিন সকালেই আমি মহিপাল আর্মি ক্যাম্পে একটি কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন করি। পাশাপাশি বিভিন্ন অস্থায়ী আর্মি ক্যাম্প এবং রেসকিউ ইউনিট বা বোটের সঙ্গে আমাদের কিছু রেডিও অপারেটর দিয়ে দেই। ফলে আর্মি ক্যাম্প থেকে কমান্ডিং অফিসাররা আমাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সহজেই দূরের ক্যাম্প ও রেসকিউ বোটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিল। জরুরি মেসেজ বা বার্তা আদান-প্রদান সহজ হয়ে আসে এর ফলে। পাশাপাশি বেইস থেকে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় রেসকিউ বা ত্রাণের খবর থাকলে তা সেই এলাকায় অবস্থানরত টিমকেও দ্রুত জানিয়ে দেওয়া যাচ্ছিল। আমরা আর্মির মেডিকেল ক্যাম্পেও সফলভাবে আরেকটি কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন করি। পরে ফেনী কন্ট্রোলের দায়িত্ব কাউসার রিফাত (S21CAN) নিজের কাঁধে তুলে নেন। ততক্ষনে আমাদের সাথে যোগ দেন আমাদের আরো দুজন অপারেটর দিপ্ত মজুমদার(S21HK) এবং মাহমুদ আসিফ(S21NN) ।
আসিফ উদ-দৌলার সঙ্গে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হলেও বারবার তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে রেডিওর মাধ্যমে আমরা ওনাকে খুঁজে পাই। এভাবে ওনার বাসায় কিছু শুকনো খাবার, পানি এবং পানি বিশুদ্ধ করার ট্যাবলেট পাঠানো সম্ভব হয়।
অপারেশনের নানাদিক
আমরা পুরো যোগাযোগব্যবস্থা এক ছাদের নিচে নিয়ে আসি। এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা ফেনীর ডিসি অফিসের কাজগুলোতে সহায়তা করছিলাম, ডিসি অফিস থেকে পরিচালিত উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ অপারেশনগুলা পর্যবেক্ষণ করছিলাম। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীদের কাজগুলোও দেখছিলাম। আবার আর্মির অপারেশনগুলোও মনিটর করা হচ্ছিল। অর্থাৎ ডিসি অফিস, আর্মি ক্যাম্প, কোথায় কেমন ত্রাণ মজুদ আছে, কোন এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে হবে—এই সব তথ্য আমাদের কাছে আসছিল। এগুলোর মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বজায় রাখছিলাম আমরা। এই কাজগুলো করা হলো কীভাবে?
ফিল্ড অপারেটররা ব্যবহার করতেন হ্যান্ডহ্যাল্ড ওয়াকিটকি। ব্যাটারি ব্যাকআপের একটা বিষয় ছিল এ ক্ষেত্রে। তাই অপারেটররা প্রতি ৩০ মিনিট পরপর মূল কন্ট্রোলকে নিজেদের অবস্থানের রিপোর্ট দিত। পাশাপাশি কোনো তথ্য আদান-প্রদানের প্রয়োজন হলেও তাও করা হতো এ সময়। বাকি সময় তাদের রেডিও বন্ধ থাকত
মূল কন্ট্রোল, তথা ফেনী কন্ট্রোলের সঙ্গে সব ফিল্ড অপারেটর যুক্ত ছিল। এদিকে ফেনী কন্ট্রোলের সঙ্গে যুক্ত ছিল আর্মি এবং ডিসি কন্ট্রোল। ওয়ান-টু-ওয়ান (সরাসরি) যোগাযোগের দরকার না পড়লে ফেনী কন্ট্রোলের মাধ্যমেই আর্মি ক্যাম্প বা ডিসি অফিস গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদান করত।
ফিল্ড অপারেটররা ব্যবহার করতেন হ্যান্ডহ্যাল্ড ওয়াকিটকি। ব্যাটারি ব্যাকআপের একটা বিষয় ছিল এ ক্ষেত্রে। তাই অপারেটররা প্রতি ৩০ মিনিট পরপর মূল কন্ট্রোলকে নিজেদের অবস্থানের রিপোর্ট দিত। পাশাপাশি কোনো তথ্য আদান-প্রদানের প্রয়োজন হলেও তাও করা হতো এ সময়। বাকি সময় তাদের রেডিও বন্ধ থাকত। এভাবে কম ব্যাকআপ দেয়, এমন রেডিও দিয়েও দিনভর কাজ করা যেত। আর কোনো অপারেটর পরপর দুটি কল মিস করলে তার জন্য জারি করা হতো মিসিং অ্যালার্ট।
পুরো অপারেশনের কোর্ডিনেশনের কাজে আবদুল্লাহ আল ফাহাদ ঢাকায় রয়ে যান প্রথম কদিন। তিনি ঢাকা থেকে ফেনীতে আমাদের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন ফজলে রাব্বি (S21RC) ও মো. মারুফ (S21FIA)। অতিদ্রুত তাঁরা একটি ইয়াগি এন্টেনা বানিয়ে স্থাপন করেন বাংলাদেশ স্কাউটস হেডকোয়ার্টারে। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন তাহসিন আবির (S21IT)। টেস্টে দেখা যায়, ঢাকা থেকে পাঠানো বার্তা ফেনীতে রিসিভ করা যাচ্ছে। কিন্তু ফেনী থেকে আমাদের বার্তা ঢাকা স্টেশনে ভালোভাবে রিসিভ করা যাচ্ছিল না। পরে সিদ্ধান্ত হলো, ঢাকা থেকে জরুরি কোনো রেস্কিউ মিশনের সংবাদ বা বার্তা এসে সেটা ফেনী কন্ট্রোলকে পাঠানো হবে। ফেনী কন্ট্রোল সেটা রিসিভ করে আর্মি কন্ট্রোলে পাঠাবে। ফাহাদ ঢাকার কোর্ডিনেশন শেষ করে ২-৩ দিন পর টিমের সঙ্গে ফেনীতে যোগ দেন।
ফেনীর পাশাপাশি নোয়াখালীতে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হলে আমাদের আরও চার অপারেটর—হাসিবুল হাসান সিয়াম (S21HMX), সুফিয়ান ( S21LEJ), সারতাজ শাহাদাৎ (S21STJ) ও আবিদ হাসান (S21VX) নোয়াখালীতে গিয়ে রেডিও যোগাযোগ স্থাপন করেন।
এসব কাজে যে রেডিও ইকুইপমেন্টগুলো ব্যবহৃত হয়, সেগুলো হলো: বেইস রেডিও, হ্যান্ডহ্যাল্ড ওয়াকিটকি, ব্যাটারি (পাওয়ার সোর্স), ইয়াগি অ্যান্টেনা এবং অমনিডিরেকশনাল (চতুর্দিক থেকে আশা সিগন্যাল শনাক্ত করতে পারে, এমন) অ্যান্টেনা। আর আমাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা প্রশাসন, আর্মি বা সেনাবাহিনী, স্কাউট, ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট এবং স্বেচ্ছাসেবীরা।
এই পুরো অপারেশনে আমরা সফলতার সঙ্গে প্রায় ৭০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বানিয়েছিলাম। কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল অবশ্য। যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণ রেডিও ডিভাইস ও ইকুইপমেন্টের অভাব। আমাদের কাছে পোর্টেবল যন্ত্রপাতি বা রেডিমেড কিছু ছিল না। নিজেদের যেসব রেডিও ডিভাইস ছিল, সেগুলো—যেমন বাসার ছাদে বসানো অ্যান্টেনা, কেব্ল ইত্যাদি খুলে নিয়েই আমরা কাজে নেমে পড়েছিলাম। এখানে সেই বিষয়টি আবার মনে করিয়ে দিতে চাই যে আমরা মূলত অ্যামেচার রেডিও অপারেটর।
অ্যামেচার রেডিও কী
টেকনিক্যাল হবি বা শখ হিসেবে বিশ্বজুড়েই সমাদৃত অ্যামেচার রেডিও। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে গবেষণা করা, কত কম পাওয়ারে কত দূরে দূরে রেডিও ব্যবহার করে কথা বলা যায়, অ্যান্টেনা বানানো, সেগুলো পরীক্ষা করা—অ্যামেচার রেডিও অপারেটর বা হ্যাম নিয়মিতই এসব কাজ করেন।
একজন অ্যামেচার রেডিও অপারেটর বিভিন্ন দেশের অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের সঙ্গে বিনামূল্যে রেডিও ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারেন। আবার স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহার করেও কথা বলা যায়। এই শখে আসলে কাজের শেষ নেই। শখ হিসেবে শুরু হলেও অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা স্বেচ্ছাসেবা হিসেবে দেশের দুর্যোগকালে সরকার, প্রসাশন বা স্থানীয়দের যোগাযোগ সহায়তা দেন।
এ জন্য সাধারণত ভিএইচএফ (ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি), ইউএইচএফ(আল্ট্রা হাই-ফ্রিকোয়েন্সি) ও এইচএফ(হাই ফ্রিকোয়েন্সি) ব্যান্ডে রেডিও ব্যবহার করা হয়। এইচএফের কম্পাঙ্ক ৩-৩০ মেগাহার্জ। ভিএইচএফের কম্পাঙ্ক ৩০-৩০০ মেগাহার্জ আর ইউএইচএফের কম্পাঙ্ক ৩০০ মেগাহার্জ থেকে ৩ গিগাহার্জ। প্রতিটি ব্যান্ডে আবার অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের জন্য কিছুটা কম্পাংক বরাদ্দ করা আছে। এই কম্পাঙ্কে শুধু অ্যামেচার রেডিও অপারেটররাই ব্যবহার করেন।
ভিএইচএফ ও ইউএইচএফ সিগন্যালগুলো মূলত লাইন অব সাইট বা সরলরেখা ধরে চলে। মানে, আপনার রেডিও থেকে সিগন্যাল বের হওয়ার পর সোজা চলতে থাকে সামনের দিকে। এই পথে বাধা এলে সিগন্যালের শক্তি কমে যায়। ধরুন, আপনি ৬ তলা একটি ভবনে থাকেন। সেটার ২ তলায় আপনার বাসা। সামনে রাস্তায় আপনার বন্ধু দাঁড়িয়ে। আপনি নিজের রুম থেকে যদি আপনার বন্ধুর নাম ধরে চিৎকার করেন, সেই আওয়াজ আপনার চারপাশের দেয়ালে বাড়ি খাবে। এতে কিছুটা শক্তি ক্ষয় হবে। ফলে আপনার বন্ধু এ চিৎকারের শব্দ কিছুটা আস্তে শুনবে। ক্ষেত্রবিশেষে না-ও শুনতে পারে। কিন্তু আপনি যদি আপনার বাসার ছাদে বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকেন, তাহলে নিচে দাঁড়ানো আপনার বন্ধু শুধু নয়, আশপাশের বাড়িগুলো থেকেও এ শব্দ শোনা যাবে। কারণটা আর কিছু নয়। আপনি উঁচু জায়গা থেকে শব্দ সৃষ্টি করছেন এবং সেটা বাধা ছাড়াই অনেকটা ছড়িয়ে পড়ছে। ভিএইচএফ ও ইউএইচএফ প্রায় একইভাবে কাজ করে। অ্যান্টেনা যত উঁচু জায়গায় বসানো হবে, সামনে বাধা যত কম থাকবে, সিগন্যাল ছড়িয়ে পড়বে তত দূরে। ফেনীর বন্যায় আমরা মূলত এই দুটি ব্যান্ডই ব্যবহার করেছিলাম।
আমাদের মূল কন্ট্রোল ছিল একটি ১৫ তলা বাসার ছাদে। সাধারণত যেসব হ্যান্ডহেল্ড রেডিও (ওয়াকিটকি) আমরা দেখি, সেগুলা ইউএইচএফ ও ভিএইচএফ ব্যান্ডের রেডিও হয়ে থাকে। এই দুই ব্যান্ডে (BAND) স্থানীয় যোগাযোগ ভালোভাবেই করা যায়। ভালো অ্যান্টেনা ও সক্ষমতা বেশি হলে এক জেলা থেকে আরেক জেলার সঙ্গেও কথা বলা যায়। আর স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে আশপাশের কিছু দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়। কিন্তু যদি বেশি দূরের স্টেশন হয়, যেমন আপনি রয়েছেন বাংলাদেশে আর অন্য স্টেশনটি রয়েছে যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে, তখন ব্যবহার করতে হয় এইচএফ। এ রেডিও ব্যবহার করে খুব সহজেই পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যোগাযোগ করা যায়। এখানে বলা প্রয়োজন, এইচএফের সিগনালগুলো বায়ুমণ্ডলের ওপরের অংশে আয়োনোস্ফিয়ার অঞ্চলে ধাক্কা খেয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এভাবে এইচএফ রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করা বা কথা বলা যায়।
সাধারণত বিভিন্ন আকার ও সক্ষমতার রেডিও ডিভাইস ব্যবহার করেন অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা। হ্যান্ডহ্যাল্ড ওয়াকিটকিগুলো সাধারণত ৫-১০ ওয়াটের হয়, আর বেজ রেডিওগুলো হয় ২৫-১০০ ওয়াট। তবে বেশি পাওয়ার বা সক্ষমতার রেডিও হলেই যে অনেক দূরে কথা বলা যাবে, বিষয়টা ঠিক তা নয়। সবকিছু নির্ভর করে অ্যান্টেনা সিস্টেম, অ্যান্টেনার ধরন, প্রপাগেশন, নয়েজ লেভেল (অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দের মাত্রা), স্টেশনের অবস্থান ও উচ্চতাসহ আরও অনেক কিছুর ওপর।
বাংলাদেশে অ্যামেচার রেডিও অপারেটর হতে হলে বিটিআরসি আয়োজিত একটি পরীক্ষায় পাশ করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে লাইসেন্স ও কলসাইনের জন্য আবেদন করতে হয়। কলসাইন মিললেই রেডিওতে কথা বলার অনুমতি বা সুযোগ পাওয়া যায়। আমার কলসাইন যেমন S21MOB। মোবাইল ফোনে যেমন কথা বলার জন্য নম্বর প্রয়োজন, তেমন রেডিওতে কথা বলার জন্য প্রয়োজন এই কলসাইন। ওপরের কলসাইনগুলোতে নিশ্চয়ই দেখেছেন, সবকটিই S2 দিয়ে শুরু। আসলে কলসাইনের প্রথম S2 অংশ দিয়ে বাংলাদেশ বোঝায়। আর S21 দিয়ে বোঝায় বাংলাদেশি হ্যাম। বাকি অংশটা প্রত্যেকের নিজস্ব কলসাইন।