খাবার বাছাইয়ের সমীকরণ

সকালে উঠেই নাক উঁচু করে খাবারঘরে উঁকি দেন আলম সাহেব। খাবার নিয়ে একটু খুঁতখুঁতে স্বভাব তাঁর। দুবার গরম করা ভাত মুখে রোচে না তাঁর। তিন কোনা সমান করে কাটা স্যান্ডউইচ না হলে তো জমেই না সকালটা। আর সবশেষে চাই একটু লাল টুকটুকে মিষ্টি। বাড়ির ছোট্ট সদস্য জিহানের আবার ব্রকোলি সহজে মুখে ওঠে না। খাবার নিয়ে এমন সব বাছ–বাছাইয়ের কোনো কারণ আছে কি? খাদ্য বাছাইয়ের এমন সব ভিন্নতা পেছনের বিজ্ঞান নিয়ে জানাচ্ছেন আলিমুজ্জামান।

পেট পুরে খেয়েও কেন মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করে?

রাতের খাবারের টেবিলে পেট ভরে খাওয়ার পরও মিষ্টির জন্য প্লেট বাড়িয়ে দেয় অনেকে। ভরা পেটে মিষ্টির জন্য প্রবল এই আগ্রহকে ব্যাখ্যা করা যায় বিজ্ঞানের ভাষায়। ‘নির্ধারিত স্বাদে তৃপ্তির আস্বাদ’—এমন মজার শব্দে মানুষের এই প্রবণতার ব্যাখ্যা দেন গবেষকেরা। একই ধরনের খাবারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে নতুন খাবারে মুখের স্বাদ ফিরে পাওয়ার জন্য মানুষ এমন করে বলে ধারণা গবেষকদের। অভ্যাসের কারণেই ধীরে ধীরে খাবারভেদে বিভিন্ন অনুভূতির সৃষ্টি হয় মানুষের মনে। একটু মিষ্টি বা ফল জিবে আলাদা স্বাদের অনুভূতি তৈরি করে। পেট ভরার পরও শেষ পাতের সামান্য ফল বা মিষ্টিই আসল স্বাদ বা পরিপূর্ণ তৃপ্তি দেয়। এই অতিরিক্ত খাবার শুধু স্বাদে নয়; বরং পুষ্টিতেও বৈচিত্র্য আনে।

দ্বিতীয়বার ভাত গরম করা কি নিরাপদ?

অনেকের ধারণা, ভাত দ্বিতীয়বার গরম করলে তা খাওয়ার উপোযোগী থাকে না। আসলে ঠান্ডা করলেই ভাতের গুণাগুণ কিছুটা নষ্ট হয়। চালে Bacillus cereus নামের এক ব্যাকটেরিয়ার ডিম্বাণু থাকে। এগুলো ভাত রান্না কিংবা গরম করার সময় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। কিন্তু ঠান্ডা ভাত ফেলে রাখলে এ ডিম্বাণু থেকে ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। ধীরে ধীরে ব্যাকটেরিয়াগুলোর সংখ্যা বেড়ে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে ভাতে। ফলে ভাত খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। তবে ভাত বারবার গরম করেও এই ডিম্বাণুগুলো ধ্বংস করা যায় না। কারণ এর শক্ত আবরণ ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপেও নষ্ট হয় না। সে ক্ষেত্রে গরম ভাত ঠান্ডা করে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করলে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারবে না।

লাল মিষ্টি কেন বেশি সুস্বাদু?

অধিকাংশ মিষ্টি লাল রঙের বানানো হয়। কারণ পাকা ফল লাল দেখে মানুষ অভ্যস্ত। তাই লাল মিষ্টির ক্ষেত্রেও এমন যুক্তি মেনে নেয়। তাই বাজারের অন্য মিষ্টি ভালো হলেও লাল মিষ্টিরই কাটতি বেশি।

গবেষকদের মতে, মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই রং দেখে খাবারের স্বাদ বোঝার চেষ্টা করত। কাঁচা কমলা, আম ইত্যাদি টক স্বাদের এবং এদের রং সবুজ। তাই সবুজ যেকোনো ফল মুখে দেওয়ার আগে টক মনে হয়। আবার পাকা আম কিংবা লিচুর রং লাল। লাল মিষ্টি তাই দেখলেই সুস্বাদু মনে হয়।

বার্গার কিংবা মুরগির মাংসের মতো স্টেক কেন নিরাপদ নয়?

স্যালমোনেলা (Salmonella), ই কলির (E Coli) মতো ব্যাকটেরিয়া প্রাণিদেহে বাস করে তাদের সহযোগী হিসেবে। ওই প্রাণীর মৃত্যুর পর ব্যাকটেরিয়াগুলো মাংসে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সব প্রাণীর মাংস খেলে পরজীবী ব্যাকটেরিয়া আমাদের পেটে চলে যায়। এই ব্যাকটেরিয়ার কারণে ডায়রিয়া, বমি ও পেট খারাপের মতো অসুখ হয় আমাদের। এ থেকে বাঁচার উপায় হলো, এ মাংস ৪৫ মিনিট ধরে রান্না করা। এতে মাংসের তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়াবে এবং পুরোপুরি ধ্বংস হবে ব্যাকটেরিয়া।

অন্যদিকে স্টেক সরাসরি গরুর মাংস থেকে কেটে নেওয়া হয়। এর বাইরের দিকে থাকা অসাড় চামড়ায় প্রচুর ব্যাকটেরিয়া থাকে। সেগুলো ধ্বংস করা যায় না। তাই কোনো স্টেকই আসলে খাওয়ার জন্য নিরাপদ নয়।

পেট খারাপ থাকলে বার্গার না খাওয়াই ভালো। কারণ বার্গারের ভেতরে কিমা করে মাংস মিশিয়ে দেওয়া হয়। তাই বার্গারের মাংসও সঠিকভাবে সেদ্ধ করা উচিত।

গলা পনির কেন বেশি সুস্বাদু?

২০১১ সালে অক্সফাম বিশ্বের ১৭টি দেশের মানুষের পছন্দের খাবার নিয়ে জরিপ চালায়। জরিপে ১২টি দেশের বেশির ভাগ মানুষের পছন্দের তালিকায় ছিল পিৎজা। গবেষকদের মতে, পিৎজার এই জনপ্রিয়তার কারণ নরম ময়দার তাল নয়, রসাল টমেটোও নয়, বরং গলে যাওয়া পনির। ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলতে শুরু করে শক্ত পনির। তখন দুধের প্রোটিনগুলো তরল হতে শুরু করে। ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে দুধের প্রোটিন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। তখন থেকে থকথকে ক্রিমের মতো পনির পাওয়া যায়। এই গরম গলে যাওয়া পনিরই পিৎজার স্বাদ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।

সবুজ ব্রকোলি বাচ্চাদের শত্রু কেন?

ব্রকোলিতে আছে গ্লুকোসিনোলেট (Glucosinolate) নামের এক বিশেষ উপাদান। এটা আমাদের মুখে তেতো স্বাদ তৈরি করে। মানুষের ডিএনএতে থাকে TAS2R38 নামের এক বিশেষ জিন। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় শিশুদের স্বাদগ্রন্থির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। ফলে তাদের শরীরে এই বিশেষ জিনের পরিমাণও বেশি। তাই তেতো খাবার আরও বেশি তেতো লাগে শিশুদের কাছে। তাই ব্রকোলি তাদের জিবে ভয়াবহ তেতো স্বাদ তৈরি করে।

শিশু যত বড় হয়, জিবে এই স্বাদগ্রন্থির সংখ্যা কমে ব্রকোলি জিবে সয়ে আসে। গবেষকদের মতে, আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা সব সময় তেতো স্বাদ থেকে দূরে থেকেছেন। কারণ অধিকাংশ বিষাক্ত খাবার ছিল তিতকুটে। তাই মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমাদের মধ্যে তিতা খাবারের প্রতি অনীহা।

স্যান্ডউইচ কি চার কোনা বা ত্রিভুজাকৃতি করেই কাটতে হবে?

৯০ দশকের শুরু থেকেই নিয়মিত বিতর্ক হয়েছে স্যান্ডউইচের আকৃতি নিয়ে। তবে সম্প্রতি ইউগভ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানায়, আমেরিকায় প্রায় ৬০ শতাংশ স্যান্ডউইচ কাটা হয় চতুর্ভুজ আকারে। ৯×১২ সেন্টিমিটার হিসাবে চতুর্ভুজ আকারে কোনো স্যান্ডউইচ কাটলে তা থেকে ২১ ঘন সেমি পুরু ও ৯ ঘন সেমি আবরণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে ত্রিভুজাকার করে কাটলে পাওয়া যাবে ২১ ঘন সেমি পুরু ও ১৫ ঘন সেমি আবরণ পাওয়া যায়, যা আগের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি।

গবেষকদের মতে, ত্রিভুজাকারে স্যান্ডউইচ কাটলে সেটা আরও আকর্ষণীয়, সুস্বাদু বলে মনে হয়। ফলে মনস্তাত্ত্বিক কারণেই এর স্বাদ বেড়ে যায়, মানুষকে এর প্রতি আগ্রহী করে তোলে।

আরও পড়ুন