দুই বন্ধু ভাগাভাগি করে একটা কেক খাবে। কিন্তু ভাগাভাগি করতে গেলেই বাধে সমস্যা। বড় ভাগ, ছোট ভাগ নিয়ে তো সমস্যা থাকেই! তাহলে উপায় কী? খুব সহজ! একজন কাটবে, আর অন্যজন বেছে নেবে। এটাই যুগ যুগ ধরে চলে আসা সবচেয়ে সহজ নিয়ম।
কিন্তু ভাগিদার দুইয়ের বেশি হলে তৈরি হয় সমস্যা। মানুষ যত বাড়ে, কেক ভাগের অঙ্কটা তত বেশি প্যাঁচালো হতে থাকে। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এই কঠিন সমস্যার জট খোলার জন্য আছে এক জাদুকরী উপায়। আমাদের কাছে আছে একটি জাদুর ছুরি, নাম মুভিং নাইফ! এই ছুরি শুধু কেকই কাটে না, ভাগের সব ঝামেলাও এক নিমিষে মিটিয়ে দেয়।
একটা গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। ট্রেনের রেস্তোরাঁ কামরায় দুজন লোক খেতে বসেছে। একজন বেশ হৃষ্টপুষ্ট, স্বাস্থ ভালো; অন্যজন ছোটখাটো। দুজনেই ওয়েটারকে মাছ অর্ডার দিল।
খাবার যখন এল, দেখা গেল প্লেটে দুটো মাছ। একটা মাছ বেশ বড়, আরেকটা ছোট। বড়সড় লোকটা আগে সুযোগ পেয়ে টপ করে বড় মাছটা নিজের প্লেটে তুলে নিল। ছোটখাটো লোকটা এতে বেজায় চটলেন। বললেন, ‘এটা কিন্তু খুব অভদ্রতা হলো ভাই!’ বড় লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কেন? আপনাকে যদি আগে বেছে নিতে বলা হতো, আপনি কী করতেন?’ ছোট লোকটা একটু ভাব নিয়ে বলল, ‘আমি ভদ্রতা বজায় রাখতাম। ছোট মাছটাই নিতাম।’ বড় লোকটা তখন হেসে বলল, ‘তাহলে সমস্যা কী? আপনি তো সেটাই পেলেন!’
পুরোনো এই কৌতুকটা একটা দারুণ সত্য সামনে নিয়ে আসে। পরিস্থিতি ভেদে একেকজনের কাছে জিনিসের ভ্যালু একেক রকম। আর কিছু মানুষকে খুশি করা সত্যিই কঠিন!
গত ৫০ বছর ধরে গণিতবিদেরা এই ন্যায্য ভাগ নিয়ে রীতিমতো লড়াই করছেন। তবে মাছ দিয়ে নয়, তাঁদের উদাহরণের বস্তু হলো কেক। জ্যাক রবার্টসন এবং উইলিয়াম ওয়েব কেক কাটিং অ্যালগরিদম: বি ফেয়ার ইফ ইউ ক্যান নামে একটা চমৎকার বইও লিখেছেন। চলুন দেখা যাক, সবাইকে খুশি রেখে একটা কেক কাটা যায় কি না!
সবচেয়ে সহজ হলো দুজন মানুষের মধ্যে ভাগ করা। এখানে ন্যায্য মানে প্রত্যেকে মনে করবে সে অন্তত অর্ধেকের বেশি বা সমান পেয়েছে। কেউ অন্তত তার চেয়ে বেশি পায়নি। মজার ব্যাপার হলো, দুজনের পছন্দ যদি আলাদা হয়, তবে ভাগ করা আরও সহজ। ধরুন, অনি কেকের ওপরের চেরি পছন্দ করে আর বাবু পছন্দ করে ক্রিম। তখন অনিকে চেরিগুলো আর বাবুকে ক্রিমগুলো দিয়ে দিলেই দুজনে খুশি। ঝামেলা বাঁধে যখন দুজনেই এক জিনিস চায়!
তবে এর সমাধান মানুষ ২ হাজার ৮০০ বছর আগেই বের করেছে! নিয়মটা হলো, ‘অনি কাটবে, বাবু বেছে নেবে’। অনি যদি চালাকি করে এক টুকরো ছোট আর এক টুকরো বড় কাটে, তবে বাবু তো বড়টাই নেবে! অনি তখন ঠকবে। তাই অনি নিজের স্বার্থেই কেকটা এমনভাবে কাটবে যেন তার চোখে দুটি টুকরোই সমান মনে হয়। তাহলে বাবু তার পছন্দেরটা নিলেও দিনশেষে কেউ অভিযোগ করতে পারবে না।
কিন্তু দুজনের জায়গায় তিন জন থাকলেই শুরু হবে সমস্যা। ধরুন, এবার আমাদের কাছে আছে সোহানা, সোনিয়া ও তানিয়া। তিনজনেই চায় কেকের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ পেতে। মানে চোখের দেখায় অন্তত কেউ ঠকতে চায় না।
প্রথমে একটা ভুল পদ্ধতির কথা বলি। কারণ অনেকেই এই পদ্ধতিতে ভাগ করতে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাধান হয় না। ধরুন, সোহানা কেকটাকে দুই ভাগ করল। তাঁর হিসেবে একপাশে থাকবে তিনভাগের এক ভাগ, অন্যপাশে তিন ভাগের দুই ভাগ। অর্থাৎ, প্রথম ভাগটা করবে সোহানা। এরপর সোনিয়া ওই তিন ভাগের দুই ভাগ কেকটাকে আবার অর্ধেক আকারে ভাগ করবে। তাহলে সোহানা প্রথমে এক-তৃতীয়াংশ কেটে রেখেছে। শেষে সোনিয়া আবার বাকি দুই-তৃতীয়াংশকে সমানভাগে ভাগ করেছে। শুধু তানিয়া কেক ভাগ করেনি। তাই সবার শুরুতে তানিয়া পছন্দ করে যেকোনো একভাগ কেক নেবে। সে চাইলে শুরুতে সোহানার ভাগ করা এক-তৃতীয়াংশ নিতে পারে অথবা পরে সোনিয়ার ভাগ করা অংশ থেকেও নিতে পারে একটা টুকরো। এরপর নেবে সোনিয়া। যেহেতু সোহানা সবার শুরুতে কেক ভাগ করেছে, তাই সে নেবে সবার শেষে।
এখানে সমস্যা হলো, তানিয়া হয়তো সোহানার প্রথম কাটা ১/৩ অংশটাকে খুব ছোট মনে করতে পারে। সোহানা ইচ্ছে করেও একটু ছোট কাটতে পারে বা অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেও টুকরোটি ছোট হতে পারে। ওই অংশ বড় হলে তানিয়া নিশ্চয়ই বড় অংশ নিয়ে নেবে। কিন্তু যদি ছোট হয়, তবে তানিয়া ও সোনিয়া অন্য টুকরো দুটি নিয়ে নেবে এবং সোহানাকে শেষ পর্যন্ত নিজের কাটা ছোট টুকরোটাই নিতে হবে। যদিও সে এই ছোট টুকরোটি নিতে চায় না! তাই এই পদ্ধতি ন্যায্য নয়।
টেবিলে কেক রাখা আছে। একটা ছুরি কেকের একপাশ থেকে ধীরে ধীরে অন্যপাশে যাচ্ছে এবং কেক কাটছে। সোহানা, সোনিয়া ও তানিয়া সেদিকে তাকিয়ে আছে।
তাহলে সঠিক সমাধান কী? ১৯৪৪ সালে হুগো স্টেইনহাউস পোল্যান্ডের এক ক্যাফেতে বসে এর সমাধান বের করেন। একে বলে ছাঁটাই পদ্ধতি। প্রথমে সোনিয়া কেক থেকে একটা টুকরো কাটবে যা তার মতে সমান তিন ভাগের এক ভাগ। সেই টুকরোটা যাবে সোনিয়ার কাছে। সোনিয়া যদি মনে করে ওটা ১/৩-এর চেয়ে বড়, সে ওটাকে কেটে ছোট করবে। আর যদি মনে করে ঠিক আছে বা ছোট, তবে যেমন আছে তেমনই রাখবে। এরপর ওটা যাবে তানিয়ার কাছে। তানিয়া চাইলে ওটা নেবে, না চাইলে নেবে না। যদি তানিয়া কেক নেয়, তবে বাকি কেক ও ছাঁটাই করা অংশ এক করে সোহানা ও সোনিয়া আগের ‘আমি কাটি তুমি নাও’ পদ্ধতিতে ভাগ করে নেবে। এখানে লজিকটা হলো, যে অসন্তুষ্ট হবে সে আসলে আগের কোনো ধাপে ভুল চয়েস করেছিল বা ঠিকমতো কাটেনি। তাই দোষটা তার নিজের ঘাড়েই বর্তাবে!
এরপর ১৯৬১ সালে লিওনার্ড ডুবিনস এবং এডউইন স্প্যানিয়ার আরও এক অদ্ভুত সমাধান দেন। টেবিলে কেক রাখা আছে। একটা ছুরি কেকের একপাশ থেকে ধীরে ধীরে অন্যপাশে যাচ্ছে এবং কেক কাটছে। সোহানা, সোনিয়া ও তানিয়া সেদিকে তাকিয়ে আছে। ছুরিটা যত এগোয়, টুকরোটাও তত বড় হয়। যে মুহূর্তে কারও মনে হবে, এই টুকরোটা এখন ন্যায্য তিন ভাগের এক ভাগ হয়েছে, সে সঙ্গে সঙ্গে বলবে, ‘থামো!’ যে সবার আগে থামতে বলবে, সেই ওই টুকরোটা পাবে।
এতে একটা মজার ব্যাপার ঘটে। কেউই খুব লোভ করতে পারে না। কারণ বেশি অপেক্ষা করলে অন্য কেউ আগে থামিয়ে দিতে পারে। আবার খুব তাড়াহুড়াও করা যায় না, কারণ তাহলে নিজের ভাগের চেয়ে ছোট টুকরো পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রথম টুকরোটি একজন পেয়ে গেলে, বাকি কেক নিয়ে একইভাবে আবার ছুরি চালানো হয়। এবার দুজন নিজেদের মধ্যে সমান ভাগ নিশ্চিত করে নেয়। এভাবে প্রত্যেকে নিজের দৃষ্টিতে অন্তত ন্যায্য অংশ পেতে পারে। এই পদ্ধতিতে যতজন ইচ্ছা মানুষের মধ্যে কেক ভাগ করা যায়।
তবে এখানে একটা সমস্যা আছে। সেটা হলো প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময়। আমার মনে হলো থামব, কিন্তু বলতে বলতে ছুরি একটু এগিয়ে গেল! এর সমাধান হলো, ছুরিটা খুব আস্তে চালানো, অথবা ধরে নেওয়া যে সবার রিফ্লেক্স সুপারফাস্ট।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা কিংবা জেরুজালেম ভাগাভাগির ক্ষেত্রেও গণিতের এই ফেয়ার ডিভিশন কাজে লাগতে পারত। কিন্তু মুশকিল হলো, রাজনীতিতে মানুষের পছন্দ সময়ের সঙ্গে বদলে যায়।
তবে এই পদ্ধিতেও মানুষ বাড়লে কেক কাটার জটিলতা বাড়ে। যেমন, এখানে n জন মানুষের জন্য (n-1) বার ছুরি চালাতে হয়। এটা সবচেয়ে কম। যেমন n = ১ জন মানুষ হলে n - 1 = ১ – ১ = ০। অর্থাৎ, কেক কাটার প্রয়োজন নেই, পুরোটাই সে একা খাবে। n = ৩ জন মানুষ হলে n - 1 = ৩ – ১ = ২। মানে দুই বার এই পদ্ধতিতে কেক কাটতে হবে।
আবার ধরুন, সোহানা ও সোনিয়া খাচ্ছে, হঠাৎ তানিয়া এল। তখন সোহানা তার ভাগ ৩ টুকরো করবে, সোনিয়া তার ভাগ ৩ টুকরো করবে। তানিয়া প্রতিজনের কাছ থেকে এক টুকরো করে নেবে। কিন্তু মানুষ বাড়লে এই পদ্ধতিতে কাটার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ে। তখন সূত্র হয় (n! - 1)। এটা অনেক বড় সংখ্যা!
এতক্ষণ যে এত কেক কাটার কথা বললাম, তা কি শুধু কেক খাওয়ার জন্য? মোটেই না। জার্মানি যখন ভাগ হলো, তখন প্রথমে বার্লিনকে আলাদা রেখে বাকি দেশ ভাগ হলো। পরে বার্লিনকে আবার আলাদা করে ভাগ করা হলো। ঠিক যেন কেক কাটার অ্যালগরিদম!
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা কিংবা জেরুজালেম ভাগাভাগির ক্ষেত্রেও গণিতের এই ফেয়ার ডিভিশন কাজে লাগতে পারত। কিন্তু মুশকিল হলো, রাজনীতিতে মানুষের পছন্দ সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। তাই রাজনীতিকে অঙ্কের নিয়মে ফেলা কঠিন!
তবে আপনি বন্ধুর জন্মদিনে বা নিজের জন্মদিনেও কিন্তু এই নিয়মে কেক কাটতে পারেন। এতে সবাই যেমন সমানভাগে কেক পাবে, তেমনি আপনার বুদ্ধির প্রশংসাও করবে!
