২০২৬ কেন গাণিতিকভাবে বিশেষ সংখ্যা
সংখ্যাপ্রেমীদের জন্য ২০২৫ সালটা ছিল দারুণ। কারণ ২০২৫ একটি পূর্ণবর্গ সংখ্যা। মানে ২০২৫ = ৪৫২। এমন ঘটনা আবার ঘটবে ২১১৬ সালে। আবার ২০২৭ সালও কিন্তু সংখ্যার হিসেবে দারুণ। কারণ ২০২৭ একটি মৌলিক সংখ্যা।
সেই তুলনায় আমাদের বর্তমান বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালটাকে অনেকের কাছে বেশ বোরিং মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, এই সংখ্যার মধ্যে বিশেষ কোনো কারিশমা নেই। কিন্তু এই ধারণাটি একদম ভুল! ২০২৬ সংখ্যাটিও কিন্তু দারুণ রহস্যময় এবং মজার সংখ্যা।
সংখ্যারও যে উইকিপিডিয়া আছে, তা জানেন কি? অনলাইন এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইন্টিজার সিকোয়েন্সেস বা OEIS হলো সেই সংখ্যার উইকিপিডিয়া। সেখানে ২০২৬ সংখ্যাটি নিয়ে ২০০-এর বেশি এন্ট্রি আছে! অর্থাৎ, গণিতের ২০০-র বেশি ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বা সিকোয়েন্সে এই সংখ্যাটি নিজের জায়গা করে নিয়েছে। এর মধ্যে কিছু বেশ জটিল জিনিস আছে, যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না। তবে ২০২৬-এর এমন অনেক গাণিতিক বৈশিষ্ট্য আছে যা বেশ সহজ এবং মজার।
যেমন, ২০২৬ সংখ্যাটি প্রায় মৌলিক সংখ্যার দলে পড়ে। ইংরেজিতে একে বলে অলমোস্ট প্রাইম। বিষয়টা একটু ভেঙে বলি। কোনো সংখ্যা মৌলিক হতে হলে তার ঠিক দুটো ভাজক থাকতে হয়, ১ এবং সেই সংখ্যা। যেমন ৭-কে শুধু ১ ও ৭ দিয়েই ভাগ করা যায়, আর কোনো উপায় নেই। গণিতের চোখে এটিই হলো নিখুঁত মৌলিক সংখ্যা।
অনলাইন এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইন্টিজার সিকোয়েন্সেস হলো সংখ্যার উইকিপিডিয়া। সেখানে ২০২৬ সংখ্যাটি নিয়ে ২০০-এর বেশি এন্ট্রি আছে!
এবার আসি ২০২৬ সংখ্যার ব্যাপারে। ২০২৬ সংখ্যাটিকে ১ ও ২০২৬ সংখ্যা দিয়ে তো ভাগ করা যায়-ই, আবার এটি যেহেতু জোড় সংখ্যা, সুতরাং ২ দিয়েও ভাগ করা যায়। ২ দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় ১০১৩, যেটি মৌলিক সংখ্যা। তার মানে, ২০২৬ সংখ্যাটির ভাজক হলো ১, ২, ১০১৩ ও ২০২৬। অর্থাৎ, একটুর জন্য এটা মৌলিক সংখ্যা হতে পারল না। এ জন্য ২০২৬-কে বলা হয় প্রায় মৌলিক সংখ্যা।
তবে নিজে মৌলিক না হলেও এটি মৌলিক সংখ্যা তৈরি করতে পারে। গণিতে একটি বিশেষ ধারা আছে যেখানে ৫ দিয়ে শুরু হয়ে মাঝে অনেকগুলো শূন্য এবং শেষে ৭৭ থাকে। এই ফরম্যাটের সংখ্যাগুলো মৌলিক হয়। যেমন ৫৭৭, ৫০৭৭, ৫০০৭৭...। মজার ব্যাপার হলো, ৫-এর পরে আপনি যদি ঠিক ২০২৬টি শূন্য বসান এবং শেষে ৭৭ যোগ করেন, তবে সেই বিশাল সংখ্যাটি একটি মৌলিক সংখ্যা হবে! অর্থাৎ, ৫ × ১০২০২৬ + ৭৭ একটি মৌলিক সংখ্যা।
টাওয়ার অব হ্যানয় গেমের নাম শুনেছেন? তিনটি খুঁটি আর ভিন্ন ভিন্ন আকারের কিছু চাকতি থাকে এই গেমে। শর্ত হলো, বড় চাকতির ওপর ছোট চাকতি রাখা যাবে, কিন্তু ছোট চাকতির ওপর বড়টা রাখা যাবে না। সাধারণ এই গেমে ‘n’ সংখ্যক চাকতি থাকলে তা সমাধান করতে কমপক্ষে 2n – 1টি চাল দিতে হয়।
গণিতে একটি বিশেষ ধারা আছে যেখানে ৫ দিয়ে শুরু হয়ে মাঝে অনেকগুলো শূন্য এবং শেষে ৭৭ থাকে। এই ফরম্যাটের সংখ্যাগুলো মৌলিক হয়। যেমন ৫৭৭, ৫০৭৭, ৫০০৭৭...।
কিন্তু গণিতবিদরা এই গেমটিকে আরেকটু কঠিন করে বানিয়েছেন। নাম দিয়েছেন ম্যাগনেটিক টাওয়ার অফ হ্যানয়। এখানে চাকতিগুলোর ওপরের পিঠ উত্তর মেরু আর নিচের পিঠ দক্ষিণ মেরু হিসেবে কাজ করে। এক খুঁটি থেকে অন্য খুঁটিতে নিলে চাকতি উল্টে যায়। আর চুম্বকের ধর্ম অনুযায়ী, সমমেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। তাই এখানে শুধু সাইজ মিললেই হবে না, চাকতি বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন মেরুও ঠিক থাকে।
মজার তথ্য হলো, যদি আপনি ৮টি চাকতি নিয়ে এই ম্যাগনেটিক গেমটি খেলতে বসেন, তবে এটি সমাধান করতে আপনাকে ঠিক ২০২৬ বার চাল দিতে হবে!
আপনি যদি কুসংস্কারে বিশ্বাসী হন, তবে এই অংশটুকু এড়িয়ে যেতে পারেন! ১৩ তারিখ শুক্রবার হওয়াকে অনেকে অশুভ মনে করেন। প্রতি বছরই অন্তত একটি মাসে ১৩ তারিখ শুক্রবার হয়। কিন্তু এক বছরে তিনবারের বেশি ১৩ তারিখ শুক্রবার হওয়া সম্ভব নয়। আর ২০২৬ হলো সেই বছর, যেখানে ক্যালেন্ডারের পাতায় আমরা সর্বোচ্চ তিনবার ১৩ তারিখে শুক্রবার পাবো। ক্যালেন্ডার মিলিয়ে দেখুন, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও নভেম্বরের ১৩ তারিখ শুক্রবার।
এর আগে এমনটা ঘটেছিল ২০১৫ সালে। সেই বছরে কী কী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেছিল, তার তালিকা উইকিপিডিয়ায় আছে। আশা করি, ২০২৬-এর তালিকাটি অতটা লম্বা হবে না!
মজার তথ্য হলো, যদি আপনি ৮টি চাকতি নিয়ে এই ম্যাগনেটিক গেমটি খেলতে বসেন, তবে এটি সমাধান করতে আপনাকে ঠিক ২০২৬ বার চাল দিতে হবে!
শেষটা করি একটা মন ভালো করা তথ্য দিয়ে। ব্রিটিশ গণিতবিদ রেজিনাল্ড অ্যালেনবি জনপ্রিয় করেছিলেন হ্যাপি নাম্বার বা সুখী সংখ্যার ধারণাটি। ২০২৬ হলো একটা সুখী সংখ্যা। কোনো সংখ্যা সুখী কি না, তা বের করার নিয়মটা খুব চমৎকার। প্রথমে সংখ্যাটির প্রতিটি অঙ্ককে বর্গ করে যোগ করতে হবে। যোগফলের অঙ্কগুলোকে আবার বর্গ করে যোগ করতে হবে। এভাবে চলতে চলতে যদি ফলাফল শেষে ১ হয়, তবে সেটি সুখী সংখ্যা। আর যদি ১ না হয়ে অন্য কোনো চক্রে আটকে যায়, তবে সেটি দুঃখী সংখ্যা।
এবার চলুন, ২০২৬ সংখ্যাটাকে ভেঙে দেখি, শেষ পর্যন্ত ১ পাওয়া যায় কিনা। ২০২৬ সংখ্যায় মোট চারটি অঙ্ক আছে—২, ০, ২ ও ৬। সবগুলোর বর্গ করে যোগ করলে হবে: ২২ + ০২ + ২২ + ৬২ = ৪ + ০ + ৪ + ৩৬ = ৪৪। এবার ৪৪ সংখ্যাটিকে আবার ভেঙে লিখলে হবে: ৪২ + ৪২ = ১৬ + ১৬ = ৩২। আবার ৩২ = ৩২ + ২২ = ৯ + ৪ = ১৩। এবার ১৩ = ১২ + ৩২ = ১ + ৯ = ১০ এবং সবশেষে ১০ = ১২ + ০২ = ১ + ০ = ১!
ব্যস! যেহেতু শেষে ১ এসেছে, তাই নিঃসন্দেহে ২০২৬ একটি হ্যাপি নাম্বার। অন্যদিকে দুঃখী সংখ্যার উদাহরণ হলো ৩৭। এর অঙ্কগুলোর বর্গের যোগফল করতে থাকলে আপনি যথাক্রমে ৫৮, ৮৯, ১৪৫, ৪২, ২০, ৪, ১৬ হয়ে আবার ৩৭-এ ফিরে আসবেন। মানে এক অনন্ত চক্রে আটকে যাবেন, কখনোই ১-এ পৌঁছাতে পারবেন না।
ভাগ্যিস, ২০২৬ সংখ্যার সেই ঝামেলা নেই। তাই গণিতের ভাষায় আমরা বলতেই পারি, ২০২৬ সালটা সুখেই কাটবে!
