ইউ ডেং কেন চলতি বছর ফিল্ডস মেডেল পেলেন

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ইউ ডেংছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

ধরুন, বিশাল একটি বিলিয়ার্ড টেবিলে আপনি খেলছেন। সেখানে একটি বা দুটি নয়, কোটি কোটি বল একসঙ্গে লাফালাফি করছে, ছুটে বেড়াচ্ছে, একে অপরের সঙ্গে অবিরাম ধাক্কা খাচ্ছে। এখন আপনাকে যদি বলা হয়, প্রতিটি বল ঠিক কোন দিকে যাবে এবং কত বেগে ধাক্কা খাবে, তার নিখুঁত হিসাব বের করে দিতে! মাথাটা হয়তো একটু ঘুরে যাবে। মানুষের মস্তিষ্ক তো বটেই, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের পক্ষেও কোটি কোটি কণার এমন আলাদা হিসাব রাখা এক কথায় অসম্ভব। কিন্তু এই অসম্ভবকেই গাণিতিক সূত্রে বেঁধে ফেলেছেন এক তরুণ জাদুকর।

তাঁর নাম ইউ ডেং। বয়স মাত্র ৩৭ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের এই অধ্যাপক এ বছর জিতে নিয়েছেন অনূর্ধ্ব-৪০ বছর বয়সী গণিতবিদদের জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মাননা ফিল্ডস মেডেল। অন্যান্য গণিতবিদেরা যেখানে খাতা-কলমে বিমূর্ত সব সংখ্যা ও আকার নিয়ে মেতে থাকেন, ডেংয়ের কাজ সেখানে সরাসরি আমাদের এই মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, তার বাস্তব উত্তর খোঁজা।

চলতি বছর গণিতবিদদের জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মাননা ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেছেন ইউ ডেং
ছবি: সিনহুয়া/লি রুই

আমাদের পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণগুলোকে সাধারণত দুটি বড় ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো একেবারে ক্ষুদ্র কণার হিসাব। যেমন নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্র। এই সূত্র দিয়ে আপনি একটি নির্দিষ্ট কণা বা ওই বিলিয়ার্ড বলের গতিবিধি বের করতে পারবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, কোটি কোটি কণার ক্ষেত্রে এই সূত্র দিয়ে হিসাব মেলাতে গেলে খাতার পাতা ও জীবনের সময়, দুটোই ফুরিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন
অন্যান্য গণিতবিদেরা যেখানে খাতা-কলমে বিমূর্ত সব সংখ্যা ও আকার নিয়ে মেতে থাকেন, ডেংয়ের কাজ সেখানে সরাসরি আমাদের এই মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, তার বাস্তব উত্তর খোঁজা।

অন্যদিকে রয়েছে আরেক ধরনের সমীকরণ, যা অনেকগুলো কণার সম্মিলিত আচরণ কেমন হবে, তা পরিসংখ্যানের সাহায্যে অনুমান করে। ধরুন, আপনি ঢাকার কোনো এক ব্যস্ত কাঁচাবাজারে দাঁড়িয়ে আছেন। সেখানে একজন নির্দিষ্ট মানুষ কীভাবে দামাদামি করছেন বা হাঁটছেন, সেটা হলো নিউটনের সূত্র। আর ওপর থেকে ড্রোনের সাহায্যে পুরো বাজারের হাজারো মানুষের কেনাকাটে দেখা যায়, সেটা হলো পরিসংখ্যানের সমীকরণ।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ওই একজন মানুষের হাঁটাচলার সাধারণ হিসাব থেকে কি কোনোভাবে পুরো বাজারের সব মানুষের হাঁটাচলার নিখুঁত গাণিতিক নিয়ম বের করা সম্ভব? ১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট তাঁর বিখ্যাত অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যার তালিকায় ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলেছিলেন। তালিকার ৬ নম্বর সমস্যাটি ছিল, ‘কীভাবে একেবারে ক্ষুদ্র বা সাধারণ নিয়মগুলো থেকে পদার্থবিজ্ঞানের বিশাল সূত্রগুলো তৈরি করা যায়?’ উদাহরণ হিসেবে তিনি গ্যাসের কথা বলেছিলেন। গ্যাসের ভেতরের কোটি কোটি অণুর ছোটাছুটি থেকে কীভাবে পুরো গ্যাসের আচরণ বোঝা যাবে, সেটাই ছিল তাঁর মূল প্রশ্ন।

গণিতবিদেরা বহু বছর ধরে এই দুই জগতের মধ্যে সেতু গড়ার চেষ্টা করে আসছিলেন। তাঁরা গ্যাসের কণাগুলোর ঘনত্বের পরিবর্তন বোঝাতে বোলজম্যান সমীকরণ নামে একটি সূত্র ব্যবহার করতেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তাঁরা গাণিতিক যুক্তির সাহায্যে মাত্র কয়েক সেকেন্ড বা খুব সামান্য সময়ের জন্যই এই সূত্রটি মেলাতে পারতেন। দীর্ঘমেয়াদি কোনো হিসাবের ক্ষেত্রে এটি কাজ করত না। ফলে সমাধানটা শুরুতেই আটকে ছিল।

আরও পড়ুন
২০২১ সালে ইউ ডেং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ জহের হানির সঙ্গে মিলে ওয়েভ কাইনেটিক ইকুয়েশনের একটি সম্পূর্ণ সমাধান বের করেন। এটি মূলত টার্বুলেন্স নিয়ে কাজ করে।

ঠিক এখানেই বাজিমাত করেছেন ইউ ডেং। তবে তাঁর এই যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। চীনের শেনজেনে বেড়ে ওঠা ডেংয়ের গণিতের হাতেখড়ি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটিতে। সেখানেই তাঁর আংশিক অন্তরক সমীকরণ নিয়ে তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু একটা পর্যায়ে তাঁর মনে হয়, এই জটিল সমীকরণগুলো সমাধানের জন্য গণিতের যেসব টুল দরকার, তা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। হতাশ হয়ে তিনি এই বিষয়টি থেকে দূরে সরে যান।

তবে গণিতের পোকা যার মাথায় একবার ঢুকেছে, সে কি আর দূরে থাকতে পারে! ২০১৮ সালের দিকে তিনি আবারও ফিরে আসেন পুরোনো ভালোবাসার কাছে। ২০২১ সালে তিনি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ জহের হানির সঙ্গে মিলে ওয়েভ কাইনেটিক ইকুয়েশনের একটি সম্পূর্ণ সমাধান বের করেন। এটি মূলত টার্বুলেন্স বা তরলের বিক্ষুব্ধ গতি নিয়ে কাজ করে। টার্বুলেন্স জিনিসটা কী? চায়ের কাপে চামচ দিয়ে নাড়া দিলে যে ঘূর্ণি তৈরি হয়, কিংবা আকাশে মেঘের কারণে উড়োজাহাজ হঠাৎ যেভাবে কাঁপতে থাকে, সেটাই হলো টার্বুলেন্স।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ ইউ ডেং
ছবি: কোয়ান্টা ম্যাগাজিন

টার্বুলেন্সের এই সাফল্যের পর ডেংয়ের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় বহুগুণ। তিনি নজর দেন সেই অধরা বোলজম্যান সমীকরণের দিকে। সমীকরণটা মোটেও সহজ ছিল না। ডেং, হানি এবং জিয়াও মা নামে আরেক তরুণ গণিতবিদ মিলে এই বিশাল সমস্যাটাকে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা পুরো সমস্যাটিকে ছোট ছোট এবং সহজে সমাধানযোগ্য টুকরোতে ভাগ করেন।

আরও পড়ুন
ডেং এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি ভীষণ আনন্দিত। শুধু নিজের জন্য নয়, বরং আমি গণিতের যে শাখাটিকে প্রতিনিধিত্ব করছি, সেটি এত বড় একটি স্বীকৃতি পাচ্ছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

টানা কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ২০২৪ সালে তাঁরা প্রকাশ করেন তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণা। তাঁরা দেখিয়ে দেন, কীভাবে নিউটনের গতির সাধারণ নিয়মগুলো থেকে ধাপে ধাপে বোলজম্যান সমীকরণটি নিখুঁতভাবে তৈরি করা যায়। ২০২৫ সালে এক ফলো-আপ পেপারে তাঁরা দাবি করেন, হিলবার্টের সেই ৬ নম্বর সমস্যার অন্তত বোলজম্যান সমীকরণের অংশটুকু তাঁরা পুরোপুরি সমাধান করে ফেলেছেন! এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা একটি ধাঁধার অবসান ঘটল তাঁদের হাত ধরে।

এবারের ফিল্ডস মেডেল পাওয়ার পর উচ্ছ্বসিত ডেং এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি ভীষণ আনন্দিত। শুধু নিজের জন্য নয়, বরং আমি গণিতের যে শাখাটিকে প্রতিনিধিত্ব করছি, সেটি এত বড় একটি স্বীকৃতি পাচ্ছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

ইউ ডেং প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রকৃতি বা মহাবিশ্ব যতই খামখেয়ালি ও বিশৃঙ্খল হোক না কেন, তার প্রতিটি ক্ষুদ্র আচরণের পেছনেই লুকিয়ে আছে এক নিখুঁত গাণিতিক ছন্দ। আর সেই ছন্দ একবার ধরতে পারলে পুরো মহাবিশ্বের নিয়মকানুন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন