গণিতের নোবেলখ্যাত ফিল্ডস মেডেল পেলেন ৪ তরুণ গণিতবিদ

উপরের বাঁ থেকে ঘড়ির কাঁটার দিকে: ইউ ডেং, জন পারডন, হোং ওয়াং এবং জ্যাকব জিমারম্যানছবি: সাইমন্স ফাউন্ডেশন

নোবেল পুরস্কারের কথা উঠলে প্রায়ই একটা প্রশ্ন শোনা যায়, গণিতে কেন নোবেল দেওয়া হয় না? আলফ্রেড নোবেল কেন তাঁর উইলে গণিত রাখেননি, তা নিয়ে নানা মুখরোচক গালগল্প আছে। সেসবে আজ না যাই। তবে গণিতবিদদের মন খারাপ করার কিছু নেই, কারণ তাঁদের জন্য আছে নোবেলের চেয়েও দুর্লভ এক সম্মাননা—ফিল্ডস মেডেল।

নোবেল দেওয়া হয় প্রতিবছর, কিন্তু ফিল্ডস মেডেল দেওয়া হয় চার বছর পর পর। শুধু তা-ই নয়, যাঁদের বয়স ৪০ বছরের নিচে, কেবল তাঁদেরই এই পুরস্কার দেওয়া হয়। কানাডীয় গণিতবিদ জন চার্লস ফিল্ডসের হাত ধরে ১৯৩৬ সালে প্রথমবারের মতো এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল, তরুণ গণিতবিদদের অসাধারণ কাজের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের আরও উৎসাহিত করা। প্রতি চার বছরে মাত্র দুই থেকে চারজন তরুণ গণিতবিদ এই সম্মাননা পান।

২০২৬ সালের ফিল্ডস মেডেল বিজয়ী ৪ তরুণ গণিতবিদ
ছবি: সিনহুয়া/লি রুই

গত ২৩ জুলাই (বাংলাদেশ সময় ২৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় বসেছিল গণিতবিদদের সবচেয়ে বড় আসর ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ম্যাথমেটিশিয়ানস। সেখানেই ঘোষণা করা হয় ২০২৬ সালের ফিল্ডস মেডেল বিজয়ীদের নাম। এবারের বিজয়ীরা গণিতের এমন সব জট খুলেছেন, যা শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। বাতাসে ঘুরতে থাকা সুচ, ডোনাটের গায়ে পেঁচানো গিঁট কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে এক সুতোয় গাঁথার মতো অদ্ভুত সব বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন
কানাডীয় গণিতবিদ জন চার্লস ফিল্ডসের হাত ধরে ১৯৩৬ সালে প্রথমবারের মতো ফিল্ডস মেডেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল, তরুণ গণিতবিদদের অসাধারণ কাজের স্বীকৃতি দেওয়া।

শুরুতেই আসি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ ইউ ডেংয়ের কথায়। পদার্থবিজ্ঞানে দুটি জগৎ আছে। একটা আমাদের চোখের সামনের বড় জগৎ, একে আমরা ম্যাক্রোস্কোপিক বলি। আরেকটা হলো পরমাণুর ভেতরের অতি ক্ষুদ্র জগৎ বা মাইক্রোস্কোপিক জগৎ। এই দুই জগতের নিয়মকানুন একেবারে আলাদা। ডেং এবং তাঁর সঙ্গীরা এই দুই জগৎকে এক সুতোয় গেঁথেছেন।

ব্যাপারটা একটু সহজ করে বলি। ধরুন, আপনি স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছেন। দর্শকেরা মিলে গ্যালারিতে ওয়েভ বা ঢেউ তৈরি করছে। সম্প্রতি ফিফা বিশ্বকাপে নরওয়ের সমর্থকেরা যেভাবে ঢেউ তুলেছিলেন গ্যালারিতে, ধরুন সেরকম ঢেউ। পুরো গ্যালারির এই ঢেউটা হলো ম্যাক্রোস্কোপিক বা বড় রূপ। এবার ধরুণ, ব্রাজিল ও নরওয়ের ম্যাচে মাঠে বসে খেলা দেখছেন রোনালদো বা রোনালদিনহো। গ্যালারির এই একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি কীভাবে হাত তুলছেন বা বসছেন, সেটা হলো মাইক্রোস্কোপিক রূপ।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ ইউ ডেং
ছবি: কোয়ান্টা ম্যাগাজিন

১৮০০ শতকের শেষ দিক থেকেই গ্যাসের বড়সড় আচরণ বোঝার জন্য বোলজম্যান সমীকরণ নামে একটি হিসাব ব্যবহার করা হতো। ডেং মূলত একটি একক বস্তুকণার চলাফেরা হিসাব করে পুরো গ্যাসের আচরণ কেমন হবে, তা বের করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ১৯০০ সালে বিখ্যাত গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্টের ছুড়ে দেওয়া একটি শতাব্দীপ্রাচীন ধাঁধার সমাধান করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানকে আরও নিখুঁত করার পথে এটি এক বিশাল লাফ।

আরও পড়ুন
পদার্থবিজ্ঞানে দুটি জগৎ আছে। একটা আমাদের চোখের সামনের বড় জগৎ, একে আমরা ম্যাক্রোস্কোপিক বলি। আরেকটা হলো পরমাণুর ভেতরের অতি ক্ষুদ্র জগৎ বা মাইক্রোস্কোপিক জগৎ।

এবারের আরেক বড় চমক নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের হোং ওয়াং। প্রায় ৯০ বছরের ইতিহাসে তিনি মাত্র তৃতীয় নারী, যিনি এই পুরস্কার পেলেন। তিনি সমাধান করেছেন পাঁচ দশকের পুরোনো কাকায়া কনজেকচার।

ব্যাপারটা কী? ধরুন, আপনার হাতে বিশাল একটা বাঁশ বা সুচ আছে। আপনি খুব ছোট একটা ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে সুচটিকে শূন্যে ভাসিয়ে এমনভাবে ঘোরাতে চান, যেন সেটা সব দিকে মুখ করতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, সুচটি ঘোরানোর জন্য সবচেয়ে ছোট কতটুকু জায়গা আপনার দরকার হবে?

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের হোং ওয়াং
ছবি: কোয়ান্টা ম্যাগাজিন

দ্বিমাত্রিক বা সমতলের জন্য এর সমাধান আগেই হয়েছিল। কিন্তু ত্রিমাত্রিক জগতে, অর্থাৎ বাতাসে ভাসমান অবস্থায় এই হিসাব মেলানো যাচ্ছিল না। ওয়াং এবং তাঁর দল প্রমাণ করেছেন, সুচের নড়াচড়াকে যদি আমরা অনেকগুলো টিউব বা নলের মতো কল্পনা করি, তবে এর পুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয় জায়গার মধ্যে একটা বিশেষ গাণিতিক সম্পর্ক থাকে। গণিতবিদেরা একে এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী আবিষ্কার বলছেন।

স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন পারডন আবার কাজ করেছেন জ্যামিতি ও টপোলজি নিয়ে। তাঁর কাজের ক্ষেত্রটা শুনলে আপনার হয়তো ইয়ারফোনের তারের কথা মনে পড়ে যাবে। পকেটে রাখলে ইয়ারফোনের তার যেভাবে প্যাঁচ খেয়ে যায়, গণিতবিদেরা এই প্যাঁচ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেন। পারডন হিসাব কষেছেন ডোনাটের মতো গোল রিংয়ের গায়ে পেঁচানো গিঁট নিয়ে।

আরও পড়ুন
ওয়াং এবং তাঁর দল প্রমাণ করেছেন, সুচের নড়াচড়াকে যদি আমরা অনেকগুলো টিউব বা নলের মতো কল্পনা করি, তবে এর পুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয় জায়গার মধ্যে একটা বিশেষ গাণিতিক সম্পর্ক থাকে।

১৯৮০-এর দশকে গণিতবিদ মিখাইল গ্রোমভ একটা প্রশ্ন রেখেছিলেন—দুটি বিন্দুর সোজা দূরত্বের তুলনায় একটা গিঁট কতটা প্যাঁচানো হতে পারে? পারডন দেখিয়েছেন, এই গিঁটের দূরত্বের অনুপাতই বলে দেয় গিঁটটা সর্বোচ্চ কতটা জটিল হতে পারে। সমাধানটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা হয়তো পারডন নিজেও শুরুতে বুঝতে পারেননি।

পাশাপাশি তিনি ২০ বছর ধরে ঝুলে থাকা এমএনওপি (MNOP) কনজেকচারেরো প্রমাণ দিয়েছেন। এটি মূলত জ্যামিতিক আকারের ওপর আঁকা বক্ররেখা নিয়ে কাজ করে। আমাদের মহাবিশ্বের ভৌত বাস্তবতা যে কোয়ান্টাম স্ট্রিং দিয়ে তৈরি বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, সেই কোয়ান্টাম থিওরি বুঝতে এই জ্যামিতিক আকারগুলো দারুণ কাজে আসবে।

স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন পারডন কাজ করেছেন জ্যামিতি ও টপোলজি নিয়ে
ছবি: কোয়ান্টা ম্যাগাজিন

সবশেষে বলতে হয় টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাকব জিমারম্যানের কথা। তিনি কাজ করেছেন বীজগণিতীয় জ্যামিতি নিয়ে। তিনি গণিতে ও-মিনিমালিটি নামে একটি দারুণ ধারণা নিয়ে এসেছেন। এটি অনেকটা ফিল্টারের মতো কাজ করে।

ধরুন, একটা বিশাল দালানের গঠন বুঝতে আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে। জিমারম্যানের এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আপনি সেই বিশাল দালানের ভেতরের সহজ ও ছোট ছোট ইটগুলো গবেষণা করেই পুরো দালানের বৈশিষ্ট্য বুঝে ফেলতে পারবেন। জটিল মডেলগুলোকে এমন মডেলে পরিণত করা হয়, যেখানে শুধু তুলনা করেই সব হিসাব বের করা যায়।

আরও পড়ুন
জ্যাকব জিমারম্যান কাজ করেছেন বীজগণিতীয় জ্যামিতি নিয়ে। তিনি গণিতে ও-মিনিমালিটি নামে একটি দারুণ ধারণা নিয়ে এসেছেন। এটি অনেকটা ফিল্টারের মতো কাজ করে।

এর মাধ্যমে তিনি গণিতের বিখ্যাত মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমের হজ কনজেকচার প্রমাণের অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। টপোলজির সঙ্গে বীজগণিতের একটা দারুণ সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন তিনি। জানেন নিশ্চয়ই, মিলেনিয়াম প্রবলেম নামে গণিতে কিছু সমস্যা আছে। সেগুলোর কোনোটা সমাধান করতে পারলেই আপনি হয়ে যাবেন মিলিনিয়ার। এই সমস্যাগুলোর যেকোনোটা সমাধানের জন্য ১০ লাখ ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করা আছে। তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে মিলেনিয়াম প্রবলেম।

জ্যাকব জিমারম্যানের কাজ করেছেন বীজগণিতীয় জ্যামিতি নিয়ে
ছবি: গেটি ইমেজ

সব মিলিয়ে এবারের ফিল্ডস মেডেল যেন গণিতের এক বিশাল উৎসব। কে জানে, হয়তো এই তরুণদের আবিষ্কারগুলোর হাত ধরেই আগামী দিনের মহাকাশবিদ্যা, কোয়ান্টাম ফিজিকস এবং প্রযুক্তিতে অভাবনীয় কোনো বিপ্লব ঘটে যাবে!

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

আরও পড়ুন