৩৫০ বছরের পুরোনো যে গাণিতক রহস্যে আজও মুগ্ধ করে
২৬ সংখ্যাটির দিকে একটু ভালোভাবে তাকালে দারুণ একটি গাণিতিক সৌন্দর্য চোখে পড়বে। এর ঠিক আগের সংখ্যাটি ২৫, যা একটি পূর্ণবর্গ সংখ্যা। মানে ৫-এর স্কয়ার বা বর্গ করলে হয় ২৫। এর ঠিক পরের সংখ্যাটি হলো ২৭, যা একটি পূর্ণঘন সংখ্যা, মানে ৩-এর কিউব। অর্থাৎ, একটি স্কয়ার এবং একটি কিউব সংখ্যার ঠিক মাঝখানে স্যান্ডউইচের মতো বসে আছে ২৬। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, শূন্য থেকে অসীম পর্যন্ত সংখ্যাতত্ত্বের বিশাল মহাসাগরে এমন আর একটি সংখ্যাও নেই।
এই যে নিখুঁত গাণিতিক প্রমাণ, এটি আসলে কী? কীভাবে এর দেখা মেলে? কেনই বা যুগের পর যুগ গণিতবিদেরা এমন প্রমাণের পেছনে পাগলের মতো ছুটে বেড়ান? ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত সায়মন সিংয়ের বিখ্যাত ফার্মাস লাস্ট থিওরেম বইয়ে মূলত এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। বইটি এমন একটি গাণিতিক সূত্রের প্রমাণের গল্প বলে, যে রহস্যের জট খুলতে গণিতবিদদের সময় লেগেছিল পাক্কা সাড়ে তিন শ বছর! আর এই দীর্ঘ সময়ের গল্প বলতে গিয়ে সায়মন সিং অত্যন্ত সুনিপুণভাবে পুরো গণিতের ইতিহাসটাই পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন।
গল্পের শুরু পিথাগোরাসকে দিয়ে। সমকোণী ত্রিভুজ নিয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত সূত্রটির কথা নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে। সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ হলো অন্য দুটি বাহুর বর্গের যোগফলের সমান। অর্থাৎ x2 + y2 = z2। পিথাগোরাসের আগেও অনেকেই এই পদ্ধতি জানতেন। কিন্তু পিথাগোরাসকে আলাদা করে মনে রাখার কারণ, তিনি শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই থামেননি, বরং অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন, যেকোনো সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রেই এই সূত্রটি খাটবে।
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত সায়মন সিংয়ের ফারম্যাটস লাস্ট থিওরেম বইটি এমন একটি গাণিতিক সূত্রের প্রমাণের গল্প বলে, যে রহস্যের জট খুলতে গণিতবিদদের সময় লেগেছিল পাক্কা সাড়ে তিন শ বছর!
বইটির এই অংশটি পড়ার সময় আপনি হয়তো বেশ অবাক হবেন। পিথাগোরাস শুধু গণিতবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন গাণিতিক প্রমাণ খোঁজা এক গোপন সংঘের প্রতিষ্ঠাতাও! সাইক্লোন নামের এক ব্যক্তিকে সেই সংঘে যোগ দিতে না দেওয়ায়, সে চরম আক্রোশে পিথাগোরাসকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল; এমন ঐতিহাসিক ঘটনাও বইটিতে উঠে এসেছে।
তবে এই বইয়ের আসল নায়কের মঞ্চে প্রবেশ ঘটে সতেরো শতকে। মানুষটির নাম পিয়েরে দ্য ফার্মা। পেশায় তিনি ফ্রান্সের একজন বিচারক। কিন্তু তাঁর আসল প্রতিভা লুকিয়ে ছিল গণিতে। শুরুতে যে ২৬ সংখ্যাটির অনন্য হওয়ার কথা বললাম, সেটিও তিনিই প্রমাণ করেছিলেন। তবে তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে তাঁর শেষ উপপাদ্য।
ফার্মার এই উপপাদ্যটি পিথাগোরাসের সূত্রের একটি ছোট্ট সম্প্রসারণ। পিথাগোরাসের সমীকরণে আমরা অসংখ্য পূর্ণসংখ্যা বসিয়ে সমাধান বের করতে পারি। কিন্তু ফার্মা বললেন, সমীকরণটিতে যদি বর্গের বদলে অন্য যেকোনো পাওয়ার বা ঘাত বসানো হয়, তবে এমন কোনো পূর্ণসংখ্যাই পাওয়া যাবে না, যা এই সমীকরণটিকে মেলাতে পারে।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ১৬৩৭ সালের দিকে ফার্মা দাবি করেছিলেন, তাঁর কাছে এর একটি চমৎকার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু তিনি কোথাও সেই প্রমাণের কথা বিস্তারিত লিখে যাননি!
ফার্মা বললেন, পিথাগোরাসের সমীকরণটিতে যদি বর্গের বদলে অন্য যেকোনো পাওয়ার বা ঘাত বসানো হয়, তবে এমন কোনো পূর্ণসংখ্যাই পাওয়া যাবে না, যা এই সমীকরণটিকে মেলাতে পারে।
ফার্মার এই এক দাবির কারণে পরবর্তী ৩৫০ বছর ধরে বিশ্বের তাবৎ গণিতবিদেরা এই প্রমাণের খোঁজে প্রায় পাগল হয়ে ঘুরতে লাগলেন। সায়মন সিং এই দীর্ঘ ইতিহাসকে চমৎকার কিছু চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে আছেন ফরাসি নারী গণিতবিদ সোফি জার্মেইন। তিনি সে যুগের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাধ্য হয়ে পুরুষের ছদ্মনামে গোপনে নিজের কাজ চালিয়ে যেতেন। আছেন এভারিস্ত গ্যালয়েস নামের এক রগচটা বিপ্লবী তরুণ, যিনি গণিতে এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের পরপরই একটি ডুয়েলে প্রাণ হারান। আর আছেন জাপানের প্রতিভাবান তরুণ গণিতবিদ ইউতাকা তানিয়ামা, ফার্মার উপপাদ্য প্রমাণের মূল ভিত্তি দাঁড় করালেও যিনি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
দীর্ঘ এই নাটকের শেষ অঙ্কের নায়ক আধুনিক গণিতবিদ অ্যান্ড্রু ওয়াইলস। বহু সাধনার পর ১৯৯৪ সালে তিনি শেষ পর্যন্ত ফার্মার উপপাদ্যটির সঠিক প্রমাণ হাজির করেন। ওয়াইলস খুব একটা প্রচারের আলোয় আসতে পছন্দ করেন না, কিন্তু সায়মন সিং তাঁর এই বইয়ে ওয়াইলসের চরিত্রের এক গভীর ও জীবন্ত ছবি এঁকেছেন।
ওয়াইলসের কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। তিনি গণিতের সম্পূর্ণ দুটি আলাদা শাখা ‘এলিপটিক কার্ভস’ এবং ‘মডুলার ফর্মস’-এর মধ্যে একটি যৌক্তিক সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। এর আগে গণিতবিদেরা ভাবতেন, এই দুটি শাখার মধ্যে কোনো মিলই নেই। তবে গল্পের সবচেয়ে টানটান উত্তেজনার জায়গাটি আসে যখন ওয়াইলস আবিষ্কার করেন, তাঁর প্রথম প্রমাণটিতে একটি ভুল ছিল! একজন গণিতবিদের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু দমে না গিয়ে ছাইভস্ম থেকে উঠে এসে তিনি পুনরায় সেই ভুল শুধরে নিয়ে আসেন।
জাপানের প্রতিভাবান তরুণ গণিতবিদ ইউতাকা তানিয়ামা, ফার্মার উপপাদ্য প্রমাণের মূল ভিত্তি দাঁড় করালেও যিনি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
প্রায় তিন দশক আগে লেখা হলেও বইটি এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। এই বই এবং ওয়াইলসের প্রমাণের একটি বড় ভিত্তি হলো ল্যাংল্যান্ডস প্রোগ্রাম, যা ১৯৬৭ সালে গণিতবিদ রবার্ট ল্যাংল্যান্ডস প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, একদম গভীরে গেলে গণিতের সব শাখার মধ্যেই একটা অদৃশ্য যোগসূত্র পাওয়া যায়। এই যোগসূত্রগুলো খুঁজে পেলে গণিতের এক শাখার হাতিয়ার দিয়ে অন্য শাখার কঠিন সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। ওয়াইলসের কাজ ছিল সেই যোগসূত্র খোঁজার শুরুর দিকের একটা বড় সাফল্য। আর এই ল্যাংল্যান্ডস প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ করে ২০২৪ সালেও গণিতবিদেরা হারমোনিক অ্যানালাইসিসে নতুন প্রমাণ হাজির করেছেন।
আপনি যখন বইটি পড়া শেষ করবেন, তখন আপনার মনে হবে যেন বিমূর্ত শিল্পের কোনো বিশাল গ্যালারি ঘুরে এলেন। গাণিতিক প্রমাণগুলো আসলে দারুণ কোনো শিল্পকর্মের মতোই। আপনি অবাক হয়ে ভাববেন, কী অসাধারণ জাদুকরী শক্তিতে গণিতবিদেরা এই কাজগুলো করেছেন! দৈনন্দিন জীবনের সাদামাটা অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে এক অদেখা গাণিতিক জগতের সৌন্দর্যে হারিয়ে যাওয়ার জন্য এই বইটি আপনার পড়া উচিত।