সিকাডা পোকা কেন ১৩ ও ১৭ নম্বর মৌলিক সংখ্যা পছন্দ করে
উত্তর আমেরিকার গভীর জঙ্গলে এক অদ্ভুত পোকা বাস করে। নাম সিকাডা। এদের জীবনচক্র বড়ই বিচিত্র। টানা ১৭ বছর এরা মাটির নিচে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। কাজ বলতে তেমন কিছুই না, শুধু গাছের শিকড় চুষে রস খাওয়া। তারপর ঠিক ১৭তম বছরের মে মাসে এরা দলবেঁধে মাটি খুঁড়ে ওপরে উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের জঙ্গলে প্রতি একর জমিতে প্রায় দশ লাখ সিকাডা পোকা উঠে আসতে পারে।
মাটির ওপরে এসে এরা একে অপরকে গান শোনায়। মূলত সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার জন্যই এই আয়োজন। সবাই মিলে যখন একসঙ্গে গান ধরে, তখন কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়! স্থানীয় মানুষজন তো ১৭ বছর পর পর সিকাডাদের যন্ত্রণায় বাড়ি ছেড়ে পালাতেও বাধ্য হয়। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ও গায়ক বব ডিলান ১৯৭০ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি নিতে গিয়ে এই সিকাডাদের চিৎকার শুনেছিলেন। সেই সোরগোল শুনেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান ‘ডে অব দ্য লোকাস্টস’।
সঙ্গী খুঁজে পেয়ে নিষিক্ত হওয়ার পর স্ত্রী সিকাডারা মাটির ওপর প্রায় ৬০০ ডিম পাড়ে। এরপর টানা ছয় সপ্তাহ ধরে চলে তাদের এই হুল্লোড়। ধীরে ধীরে সব সিকাডা মারা যায়। জঙ্গল আবার পরের ১৭ বছরের জন্য শান্ত হয়। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি নতুন প্রজন্মের ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। সেগুলো টুপ করে মাটিতে পড়েই সুড়ঙ্গ খুঁড়ে মাটির গভীরে চলে যায়। গিয়েই গাছের শিকড় খুঁজে বের করে খাওয়া শুরু করে। তারপর অপেক্ষা করতে থাকে পরবর্তী গ্রেট সিকাডা পার্টির জন্য, যে পার্টি হবে আরও ১৭ বছর পর!
নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ও গায়ক বব ডিলান ১৯৭০ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি নিতে গিয়ে এই সিকাডাদের চিৎকার শুনেছিলেন।
নিখুঁতভাবে ১৭ বছর গুনতে পারার এই বিষয়টি জীববিজ্ঞানের চরম বিস্ময়। খুব কম সিকাডাই ভুল করে এক বছর আগে বা পরে বের হয়। বেশির ভাগ প্রাণী বা উদ্ভিদ তাপমাত্রা ও ঋতু পরিবর্তন দেখে বার্ষিক চক্র ঠিক করে। কিন্তু মাটির নিচে থেকে পৃথিবীর ১৭ বার সূর্যের চারদিকে ঘুরে আসার বিষয়টা সিকাডারা কীভাবে টের পায়, তা এখনো জানা যায়নি। কিন্তু ওরা ঠিকই নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে আসে।
একজন গণিতপ্রেমীর কাছে সবচেয়ে কৌতূহলের বিষয় হলো ওদের বেছে নেওয়া সংখ্যাটি—১৭। এটি একটি মৌলিক সংখ্যা। সিকাডাদের মাটির নিচে কাটানোর জন্য মৌলিক সংখ্যা বেছে নেওয়ার বিষয়টি কি শুধুই কাকতালীয়? মনে হয় না। কারণ, সিকাডাদের আরও কিছু প্রজাতি আছে, যেগুলো ১৩ বছর মাটির নিচে থাকে। অন্য একটা প্রজাতি থাকে ৭ বছর। খেয়াল করে দেখুন, সবকটিই মৌলিক সংখ্যা।
আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, এরা ভুল করেও যদি ১৭ বছরের আগে বেরিয়ে আসে, তবুও তা অন্তত ৪ বছর আগে বের হয়। তখন ১৩ বছরের চক্রে পড়ে যায়। বোঝাই যাচ্ছে, এই মৌলিক সংখ্যার মধ্যে এমন কিছু একটা আছে যা সিকাডাদের সাহায্য করছে। কিন্তু সেটা কী?
সিকাডাদের আরও কিছু প্রজাতি আছে, যেগুলো ১৩ বছর মাটির নিচে থাকে। অন্য একটা প্রজাতি থাকে ৭ বছর। খেয়াল করে দেখুন, সবকটিই মৌলিক সংখ্যা।
বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও সিকাডাদের এই মৌলিক সংখ্যার প্রতি আসক্তির ব্যাখ্যায় একটি গাণিতিক তত্ত্ব দাঁড়িয়ে গেছে। তত্ত্ব জানার আগে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। একটি বনে সাধারণত সিকাডার একটি দলই থাকে। তাই খাবার ভাগাভাগি নিয়ে মারামারি করার কোনো ব্যাপার নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো মৌলিক সংখ্যার সিকাডা দল বেরিয়ে আসে। তবে ২০০৯ ও ২০১০ সাল ছিল সিকাডা মুক্ত। এর ঠিক উল্টোটা ঘটে ২০১১ সালে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ১৩ বছর চক্রের সিকাডাদের বিশাল একটি দল বেরিয়ে আসে। ঘটনাক্রমে ২০১১ সালটাও মৌলিক সংখ্যা। তবে সিকাডাদের সাল হিসাব করে মৌলিক সংখ্যা বের করার মতো ক্ষমতা আসলেই আছে কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তবে এরা যে ১৩ বা ১৭ বছর পরপরই বেরিয়ে আসে, তা তো নিশ্চিত। কিন্তু কেন এরা এত বছর পর বেরিয়ে আসে? সিকাডাদের এই মৌলিক সংখ্যার জীবনচক্রের একটি গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব আছে। হতে পারে বনে এমন কোনো শিকারি প্রাণী ছিল, যারা নির্দিষ্ট সময় পর পর এসে সিকাডাদের খেয়ে ফেলত।
ফলে সিকাডারা হয়তো মাটির নিচে লুকিয়ে থেকে ১৭ বছর পরেই উঠে আসত। এতে ওই শিকারি প্রাণীদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যেত। কিন্তু একসঙ্গে সব সিকাডা জোট বেঁধে ওই প্রাণীর ভয়ে মাটির নিচে চলে গেছে বলে মনে হয় না। যেগুলো মৌলিক সংখ্যা মানেনি, সেগুলো হয়তো শিকারির পেটে চলে গেছে।
তবে ২০০৯ ও ২০১০ সাল ছিল সিকাডা মুক্ত। এর ঠিক উল্টোটা ঘটে ২০১১ সালে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ১৩ বছর চক্রের সিকাডাদের বিশাল একটি দল বেরিয়ে আসে।
উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরুন, একটা শিকারি প্রাণী প্রতি ৬ বছর পর পর বনে আসে। এখন সিকাডারা যদি ৭ বছর পর পর বের হয়, তবে শিকারির সঙ্গে তাদের দেখা হবে প্রতি ৪২ বছরে একবার। কিন্তু সিকাডারা যদি ৮ বছর পর পর বের হয়, তবে শিকারির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে প্রতি ২৪ বছরেই। আর ৯ বছর পর পর বের হলে প্রতি ১৮ বছরেই তারা শিকারির মুখে পড়বে।
উত্তর আমেরিকার জঙ্গলজুড়ে হয়তো সবচেয়ে বড় মৌলিক সংখ্যা খুঁজে বের করার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলেছিল। সিকাডারা এই কৌশলে এতই সফল হয়েছে যে, সেই শিকারি প্রাণীরা হয়তো না খেয়ে মরে গেছে অথবা জঙ্গল ছেড়ে পালিয়েছে। ফলে সিকাডারা তাদের অদ্ভুত এই মৌলিক সংখ্যার জীবনচক্র নিয়ে দিব্যি টিকে আছে।
শুধু সিকাডাই নয়, এমন আরও অনেকেই আছে যারা মৌলিক সংখ্যার এই জাদুকরী ছন্দকে কাজে লাগিয়েছে। তবে সে ব্যাপারে কথা হবে পরের পর্বে।
