মৌলিক সংখ্যা ও ডেভিড বেকহামের ২৩ নম্বর জার্সি
অসীম মৌলিক সংখ্যার অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা - ১
১, ২, ৩, ৪, ৫... গোনা খুব সহজ, তাই না? এক যোগ করলেই তো পরের সংখ্যাটা পাওয়া যাবে। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো না থাকলে আমরা পুরোই অচল হয়ে যেতাম। কিছুক্ষণের জন্য ধরে নেই আমরা সংখ্যার হিসাব বুঝি না। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের খেলা হচ্ছে। কোন দল জিতল? আমরা জানি না। শুধু জানি, দুই দলই অনেক গোল দিয়েছে। কিংবা ধরুন, একটি বইয়ের মাঝখানে কোথাও লটারি জেতার উপায় বলা আছে। আপনি কি তা খুঁজে পাবেন? এভাবে বললে কি নির্দিষ্ট কোনো পৃষ্ঠা খুঁজে পাওয়া সম্ভব? সংখ্যা ছাড়া এমন তথ্য একদম অকেজো। পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সংখ্যার ভাষা বুঝতেই হবে!
প্রাণিজগতেও সংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। বন্য প্রাণীদের কোনো দল শত্রু দলের মুখোমুখি হলে তারা মারামারি করবে নাকি পালাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয় সংখ্যা গুনে। শত্রু দলের সদস্য সংখ্যা তাদের চেয়ে বেশি কি না, তা ওরা যাচাই করে দেখে। ওদের এই টিকে থাকার ব্যাপারটা কিছুটা হলেও গাণিতিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। অথচ সংখ্যার এই আপাত-সহজ তালিকার আড়ালেই লুকিয়ে আছে গণিতের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি।
২, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩...সংখ্যাগুলো মৌলিক সংখ্যা। অবিভাজ্য এই সংখ্যাগুলোই বাকি সব সংখ্যার ভিত্তি। গণিতের হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন বলতে পারেন এসব মৌলিক সংখ্যাকে। সংখ্যার গল্পের এই মূল নায়কেরা অসীম সংখ্যার সাগরে ছড়িয়ে থাকা রত্নপাথরের মতো!
বন্য প্রাণীদের কোনো দল শত্রু দলের মুখোমুখি হলে তারা মারামারি করবে নাকি পালাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয় সংখ্যা গুনে। শত্রু দলের সদস্য সংখ্যা তাদের চেয়ে বেশি কি না, তা ওরা যাচাই করে দেখে।
এত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও জ্ঞানের সন্ধানে আমরা যত ধাঁধার মুখোমুখি হয়েছি, মৌলিক সংখ্যা তার মধ্যে অন্যতম কঠিন ধাঁধা। কীভাবে মৌলিক সংখ্যা খুঁজে বের করতে হয়, তা এক বিশাল রহস্য। কারণ, একটার পর আরেকটা মৌলিক সংখ্যা খুঁজে পাওয়ার কোনো জাদুকরী সূত্র নেই। এগুলো যেন মাটির নিচে পোঁতা গুপ্তধন; কারও কাছে নেই সেই গুপ্তধনের ম্যাপ!
এই লেখায় আমরা ধীরে ধীরে জানব, বিভিন্ন সংস্কৃতি কীভাবে মৌলিক সংখ্যাগুলো খুঁজে পেয়েছে। সংগীতশিল্পীরা কীভাবে এর ছন্দ কাজে লাগিয়েছেন। আরও জানব, ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কেন মৌলিক সংখ্যা ব্যবহার করা হয়। কীভাবে ইন্টারনেটে গোপন তথ্য সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে মৌলিক সংখ্যা।
একদম শেষে মৌলিক সংখ্যা নিয়ে এমন এক গাণিতিক রহস্যের কথা জানাবো, যা সমাধান করতে পারলে আপনি পেয়ে যাবেন এক মিলিয়ন ডলার! তবে গণিতের সবচেয়ে বড় সেই ধাঁধাগুলোর একটির মুখোমুখি হওয়ার আগে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা একটি গাণিতিক রহস্য দিয়ে শুরু করা যাক।
একটার পর আরেকটা মৌলিক সংখ্যা খুঁজে পাওয়ার কোনো জাদুকরী সূত্র নেই। এগুলো যেন মাটির নিচে পোঁতা গুপ্তধন; কারও কাছে নেই সেই গুপ্তধনের ম্যাপ!
ডেভিড বেকহাম কেন ২৩ নম্বর জার্সি বেছে নিয়েছিলেন
২০০৩ সালে ডেভিড বেকহাম রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিলে একটা প্রশ্ন নিয়ে বেশ গুঞ্জন শুরু হয়। তিনি কেন ২৩ নম্বর জার্সি পরে খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন? অনেকের কাছেই তাঁর এই জার্সি পছন্দের ব্যাপারটা অদ্ভুত মনে হয়েছিল। কারণ, ইংল্যান্ড জাতীয় দল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে তিনি বরাবরই ৭ নম্বর জার্সি গায়ে খেলতেন। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে তখন ৭ নম্বর জার্সিটা পরতেন রাউল। তিনি বেকহামের জন্য নিজের জার্সিটা ছাড়তে রাজি হননি। বাধ্য হয়ে বেকহামকে ২৩ নম্বর জার্সি নিতে হয়েছে। তবে তিনি তো চাইলে অন্য কোনো সংখ্যার জার্সিও নিতে পারতেন, ২৩ নম্বরই কেন নিলেন?
বেকহামের এই পছন্দের পেছনে নানা মানুষ নানা রহস্যের গন্ধ পেয়েছেন। তাঁর এই জার্সি রহস্য নিয়ে তৈরি হয়েছে থিওরি। সেগুলো যে সব সত্যি, তা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবে মিথ্যা বলেও তো প্রমাণিত হয়নি!
এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল মাইকেল জর্ডান থিওরি। রিয়াল মাদ্রিদ চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জায়গা করে নিতে। ভেবেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল জনসংখ্যার কাছে তাদের রেপ্লিকা জার্সি বিক্রি করে কিছু মুনাফা করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল তখনো জনপ্রিয় হয়নি। মার্কিনরা বেসবল ও বাস্কেটবল পছন্দ করে। ওসব খেলায় স্কোর হয় অনেক বেশি, ৯৮ থেকে ১০০ পর্যন্ত। খেলা শেষেও পাওয়া যায় নিশ্চিত একদল বিজয়ী। কিন্তু ফুটবলে ৯০ মিনিট বা তারও বেশি সময় মাঠে দৌড়াদৌড়ি করেও সবসময় নিশ্চিত বিজয়ী পাওয়া না। মাঝেমধ্যে গোলশূন্য ড্র হয়।
রিয়াল মাদ্রিদ চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জায়গা করে নিতে। ভেবেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল জনসংখ্যার কাছে তাদের রেপ্লিকা জার্সি বিক্রি করে কিছু মুনাফা করবে।
এই থিওরি মাথায় রেখে রিয়াল মাদ্রিদ একটু খোঁজখবর নিয়ে জানল, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাস্কেটবল খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বুলসের মাইকেল জর্ডান। তিনি পুরো ক্যারিয়ারে ২৩ নম্বর জার্সি পরে খেলেছেন। তাই রিয়াল মাদ্রিদকে এখন শুধু একটা ফুটবল জার্সির পেছনে ২৩ নম্বর বসাতে হবে। তাহলেই মাইকেল জর্ডানের জার্সি নম্বরের সঙ্গে দর্শকেরা ফুটবলের জার্সির কানেকশন খুঁজে পাবে। রিয়াল মাদ্রিদও ঢুকে যেতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে!
কেউ কেউ আবার এর পেছনে অশুভ ইঙ্গিত খুঁজে পেয়েছিলেন। জুলিয়াস সিজারের পিঠে নাকি ২৩ বার ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছিল। বেকহামের এই ২৩ নম্বর কি তাহলে কোনো অশুভ লক্ষণ? অনেকে আবার ভেবেছিলেন, ২৩ নম্বরের সঙ্গে হয়তো বেকহামের স্টার ওয়ার্স প্রীতির কোনো যোগসূত্র আছে। প্রথম স্টার ওয়ার্স মুভিতে প্রিন্সেস লিয়াকে ডিটেনশন ব্লক AA23-তে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। অনেকে বেকহামকে ডিসকর্ডিয়ানিস্টদের গোপন সদস্য ভেবেছিলেন? ডিসকর্ডিয়ানিস্ট একটি আধুনিক কাল্ট বা গোষ্ঠী। তারা বিশৃঙ্খলার পূজা করে। ২৩ সংখ্যাটি নিয়ে তাদের আধ্যাত্মিক পাগলামি রয়েছে।
কিন্তু এসব বাদ দিয়ে গণিতপ্রেমীদের কাছে ২৩ প্রথমে একটি মৌলিক সংখ্যা। মৌলিক সংখ্যা মানে যাকে ১ এবং ওই সংখ্যা ছাড়া অন্য কোনো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায় না। ২৩ মৌলিক সংখ্যা কারণ এই সংখ্যাটিকে ১ ও ২৩ ছাড়া আর কোনো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায় না। কিন্তু ১৫ মৌলিক সংখ্যা নয়, কারণ ১৫ = ৩ × ৫। অর্থাৎ ১৫-কে ১ ও ১৫ ছাড়াও ৩ ও ৫ দিয়ে ভাগ করা যায়।
রিয়াল মাদ্রিদকে এখন শুধু একটা ফুটবল জার্সির পেছনে ২৩ নম্বর বসাতে হবে। তাহলেই মাইকেল জর্ডানের জার্সি নম্বরের সঙ্গে দর্শকেরা ফুটবলের জার্সির কানেকশন খুঁজে পাবে।
গণিতে মৌলিক সংখ্যাগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অন্য সব পূর্ণসংখ্যা তৈরি হয় মৌলিক সংখ্যাগুলো গুণ করে। উদাহরণ হিসেবে ১০৫ সংখ্যাটিকে ধরা যাক। এই সংখ্যাটি ৫ দিয়ে ভাগ করা যায়। তাই আমরা লিখতে পারি ১০৫ = ৫ × ২১। এখানে ৫ একটি মৌলিক সংখ্যা। কিন্তু ২১ মৌলিক সংখ্যা নয়। কারণ, ২১ = ৩ × ৭ লেখা যায়। তাহলে ১০৫-কে লেখা যায় ৩ × ৫ × ৭। এর পর আর ভাঙা সম্ভব নয়। তাঁর মানে, আমরা মৌলিক সংখ্যাগুলোতে পৌঁছে গেছি। ১০৫-কে এই ১, ৩, ৫, ৭ ও ১০৫ ছাড়া আর কোনো ভাবে প্রকাশ করা যাবে না। খেয়াল করে দেখুন, ১ ও ১০৫ ছাড়া বাকি সবগুলো সংখ্যা মৌলিক।
যেকোনো সংখ্যার ক্ষেত্রেই আমরা এটা করতে পারি। কারণ প্রতিটি সংখ্যা হয় নিজেই মৌলিক, নাহয় সংখ্যাটিকে ভেঙে লিখলে যে উৎপাদকগুলো পাবো, সেগুলো মৌলিক (১ এবং ওই সংখ্যা ছাড়া)।
মৌলিক সংখ্যাগুলো সব সংখ্যার গাঠনিক একক। হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন কিংবা সোডিয়াম ও ক্লোরিন পরমাণু দিয়ে যেমন অণু তৈরি হয়, ঠিক তেমনি মৌলিক সংখ্যা দিয়ে তৈরি হয় অন্য সব সংখ্যা। গণিতের জগতে ২, ৩, বা ৫ হলো হাইড্রোজেন, হিলিয়াম কিংবা লিথিয়ামের মতো পরমাণু। এই সংখ্যাগুলোই গণিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদের কাছেও যে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা বেশ পরিষ্কার।
বেকহামের সময়ের রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবল দলটির দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে মনে হবে, তাদের বেঞ্চে হয়তো কোনো গণিতবিদ বসে ছিলেন। একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখবেন, বেকহাম যখন দলে যোগ দেন, তখন রিয়াল মাদ্রিদের প্রায় সব সেরা খেলোয়াড়েরা মৌলিক সংখ্যার জার্সি পরতেন। ডিফেন্ডার কার্লোস পরতেন ৩ নম্বর জার্সি; মিডফিল্ড জিদান ৫ নম্বর জার্সি; স্ট্রাইকার রাউল ও রোনালদোর জন্য বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ৭ এবং ১১ নম্বর জার্সি। তাই বেকহাম হয়তো ২৩ নম্বর জার্সিটাই বেছে নিয়েছিলেন!
মৌলিক সংখ্যাগুলো সব সংখ্যার গাঠনিক একক। হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন কিংবা সোডিয়াম ও ক্লোরিন পরমাণু দিয়ে যেমন অণু তৈরি হয়, ঠিক তেমনি মৌলিক সংখ্যা দিয়ে তৈরি হয় অন্য সব সংখ্যা।
রিয়াল মাদ্রিদের গোলরক্ষকের কি ১ নম্বর জার্সি পরা উচিত
রিয়াল মাদ্রিদের সব বড় খেলোয়াড়েরা যদি মৌলিক সংখ্যার জার্সি পরে খেলেন, তাহলে বেচারা গোলরক্ষকের কী হবে? তাঁর কি ১ নম্বর জার্সি পরা উচিত? অথবা প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে বললে, ১ কি মৌলিক সংখ্যা?
এর উত্তরটা বেশ মজার—হ্যাঁ এবং না। আজ থেকে দুই শ বছর আগে মৌলিক সংখ্যার তালিকায় ১ ছিল। যেহেতু ১-কে অন্য কোনো পূর্ণসংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায় না, শুধু ১ দিয়েই ভাগ করা যায়, তাই ১ মৌলিক সংখ্যা।
কিন্তু বর্তমানে আর ১-কে মৌলিক সংখ্যা হিসেবে ধরা হয় না। কারণ, মৌলিক সংখ্যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এরা অন্য সংখ্যা তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আপনি যদি কোনো সংখ্যাকে একটি মৌলিক সংখ্যা দিয়ে গুণ করেন, তবে সম্পূর্ণ নতুন একটি সংখ্যা পাবেন। ১ অবিভাজ্য হতে পারে, কিন্তু ১ দিয়ে কোনো সংখ্যাকে গুণ করলে আপনি একই সংখ্যা পাবেন, নতুন কোনো সংখ্যা তৈরি হবে না। এ জন্য ১-কে মৌলিক সংখ্যার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মৌলিক সংখ্যা শুরু ২ থেকে। ১ মৌলিক সংখ্যা না হওয়ার আরও কিছু কারণ আছে, সেগুলো বিজ্ঞানচিন্তার ২০২৬ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় পাবেন।
যাহোক, অন্তত এটা পরিষ্কার যে রিয়াল মাদ্রিদই প্রথম মৌলিক সংখ্যার মাহাত্ম্য আবিষ্কার করেনি। তাহলে কাদের মাথায় এটা প্রথম এসেছিল? প্রাচীন গ্রিকদের? চীনাদের? নাকি মিশরীয়দের?
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেল, বাঘা বাঘা সব গণিতবিদদের হারিয়ে মৌলিক সংখ্যা সবার আগে আবিষ্কার করেছে অদ্ভুতুড়ে এক ছোট্ট পোকা! সেই পোকার গল্প বলব আগামী পর্বে।
