০.৯৯৯...এবং ১ কি সমান

পূর্ণ সংখ্যা লিখতে আমরা অনেক সময় ০.৯৯৯…কে ১ হিসেবেই লিখি। এতে কি আমাদের ভুল হয়?ছবি: ম্যাটডিজাইন ২৪ / গেটি ইমেজ

প্রশ্নটা খুব সাধারণ, অসীম সংখ্যক ০.৯৯৯ এবং ১ কি সমান? মানে ০.৯৯৯…বলা আর ১ বলা মানে কি একই কথা? বোঝার সুবিধার জন্য বা পূর্ণ সংখ্যা লিখতে আমরা অনেক সময় ০.৯৯৯…কে ১ হিসেবেই লিখি। এতে কি আমাদের ভুল হয়? হলেও কতটা?

ছোটবেলায় আমরা হাতের কর গুণে সংখ্যা শিখি। এরপর একটু বড় হলে ভগ্নাংশ এবং দশমিকের সঙ্গে পরিচিত হই। যেমন, ১/৩ একটি ভগ্নাংশ। একে দশমিকে প্রকাশ করলে হয় ০.৩৩৩...; অর্থাৎ, দশমিকের পর ৩ চলতেই থাকবে। গণিতের ভাষায় একে বলে পৌনঃপুনিক বা আবৃত্ত দশমিক।

অন্যদিকে কিছু ঘাড়ত্যাড়া সংখ্যা আছে, যাদের বলা হয় অমূলদ সংখ্যা। যেমন, পাই বা রুট টু। এদের দশমিকের পরের সংখ্যাগুলো কোনো নিয়ম না মেনেই অসীম পর্যন্ত চলতে থাকে। তাই এদের সঠিক মান লেখার বদলে আমরা শুধু একটা চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করে খালাস পাই!

এবার আমাদের সেই পুরোনো প্রশ্নে ফেরা যাক, ০.৯৯৯...এবং ১ কি সত্যিই সমান? গণিতবিদেরা বলেন, ‘অবশ্যই সমান!’ বিষয়টা একটু ম্যাজিক করে বুঝিয়ে দিই।

আমরা জানি, ১/৩ = ০.৩৩৩...। এবার এই সমীকরণের দুই পাশেই ৩ দিয়ে গুণ করতে হবে, অর্থাৎ ১/৩ × ৩ = ০.৩৩৩… × ৩। বাঁ দিকে ১/৩-কে ৩ দিয়ে গুণ করলে কাটাকাটি হয়ে হয় ১। আর ডান দিকে ০.৩৩৩...কে ৩ দিয়ে গুণ করলে হয় ০.৯৯৯...। তাহলে কী দাঁড়াল? ০.৯৯৯... = ১! হলো না ম্যাজিক?

আরও পড়ুন
১/৩ একটি ভগ্নাংশ। একে দশমিকে প্রকাশ করলে হয় ০.৩৩৩...; অর্থাৎ, দশমিকের পর ৩ চলতেই থাকবে। গণিতের ভাষায় একে বলে পৌনঃপুনিক বা আবৃত্ত দশমিক।

তবে ম্যাজিক বাদ দিয়ে গণিতের ভাষায়ও একে প্রমাণ করা যায়। সে জন্য জ্যামিতিক ধারা নামে একটি দারুণ নিয়ম আছে। ভয় নেই, জিনিসটা খুব সহজ! ধরা যাক, ০.৯ লিখলাম। এটি ১ থেকে মাত্র ০.১ দূরে আছে। এবার লিখলাম ০.৯৯। এটি ১ থেকে আরও কাছে, মাত্র ০.০১ দূরে। তারপর ০.৯৯৯ লিখলে দূরত্ব কমে দাঁড়াল ০.০০১। এভাবে যত বেশি ৯ বসাতে থাকব, ১-এর সঙ্গে এর দূরত্ব তত কমতে থাকবে। এখন যদি এই ৯-এর সংখ্যাটা অসীম পর্যন্ত চলতে থাকে, তবে তাদের মাঝখানের এই দূরত্ব কমতে কমতে ঠিক শূন্য হয়ে যাবে! আর দূরত্ব যদি শূন্যই হয়, তবে ০.৯৯৯...এবং ১ তো একই জিনিস!

কিন্তু তবুও কেউ কেউ হয়তো ঘাড়ত্যাড়ামি করে বলবেন, ‘মানি না, এই দুটি সমান না! ০.৯৯৯... সব সময়ই ১-এর চেয়ে একটুখানি ছোট।’ গণিতের দুনিয়ায় চাইলে আপনি এমন অদ্ভুত নিয়ম বানাতেই পারেন! কিন্তু যদি বানান, তবে আপনাকে কিছু গোলমেলে পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে।

প্রথমত, সংখ্যা রেখার একটা নিয়ম আছে। যেকোনো দুটি আলাদা সংখ্যার ঠিক মাঝখানে সব সময় আরেকটি সংখ্যা খুঁজে পাবেন। কিন্তু আপনি যদি বলেন ০.৯৯৯... এবং ১ আলাদা সংখ্যা, তবে তাদের মাঝখানে আপনি পৃথিবীর কোনো সংখ্যাই বসাতে পারবেন না! অর্থাৎ, আপনার সংখ্যার রেখাটা মাঝখান থেকে ভেঙে গেল!

দ্বিতীয়ত, অঙ্কের সবচেয়ে সাধারণ একটি নিয়ম হলো, যেকোনো সংখ্যাকে ১ দিয়ে গুণ করলে সেই সংখ্যাটিই পাওয়া যায়। কিন্তু ওপরের নিয়ম না মানলে ০.৯৯৯...কে ১ দিয়ে গুণ করলে সেটা ১ হয়ে যাবে! অর্থাৎ পুরো গণিতের নিয়মকানুনই তখন উল্টেপাল্টে যাবে।

আরও পড়ুন
যদি এই ৯-এর সংখ্যাটা অসীম পর্যন্ত চলতে থাকে, তবে তাদের মাঝখানের এই দূরত্ব কমতে কমতে ঠিক শূন্য হয়ে যাবে! আর দূরত্ব যদি শূন্যই হয়, তবে ০.৯৯৯...এবং ১ তো একই জিনিস!

তবে মজার ব্যাপার হলো, গণিতের একটা বিশেষ গোপন জগৎ আছে, যার নাম ননস্ট্যান্ডার্ড অ্যানালাইসিস। এই জগতে অসীম ক্ষুদ্র নামে একধরনের সংখ্যা থাকে। এগুলো শূন্যের এতই কাছাকাছি যে সাধারণ সংখ্যা দিয়ে এদের বোঝানো যায় না।

এই বিশেষ জাদুর জগতে আপনি চাইলে ০.৯৯৯... এবং ১-কে আলাদা বলতে পারেন। তখন বলা যাবে, ০.৯৯৯…এবং ১ একে অপরের চেয়ে মাত্র এক ইনফিনিটেসিমাল পরিমাণ ছোট-বড়। তবে এই জগতের নিয়মকানুন এতই কঠিন ও প্যাঁচানো যে সাধারণ গণিতবিদেরা এদিকে খুব একটা পা বাড়ান না।

তাহলে সবশেষে আমরা কী বুঝলাম? আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে সাধারণ গণিত ব্যবহার করি, তাতে ০.৯৯৯... এবং ১ নিঃসন্দেহে সমান এবং একই জিনিস বলা যায়!

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন