ট্রেনের চাকা ধাতুর তৈরি, গাড়ির চাকা কেন রাবারের

আমাদের চারপাশে কত রকমেরই না যানবাহন! ছোট গাড়ি থেকে শুরু করে বিশাল লম্বা ট্রেন—সবই ছুটছে নিজ নিজ গতিতে। নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, রাস্তায় চলা গাড়িগুলোর চাকায় কালো রঙের রাবারের টায়ার থাকে, কিন্তু রেললাইনের ওপর দিয়ে চলা ট্রেনের চাকাগুলো শক্ত লোহার বা ধাতুর তৈরি। সবই তো যানবাহন, তাহলে এদের চাকার উপাদানে এত ভিন্নতা কেন? ট্রেন কেন রাবারের চাকায় চলে না, আর গাড়িই বা কেন লোহার চাকায় ঘোরে না? এর পেছনের রহস্যটা আসলে কী?

এই রহস্যের জট খুলতে হলে আমাদের প্রথমে বিজ্ঞানের তিনটি সহজ বিষয় বুঝতে হবে। যেকোনো যানবাহনের চাকা কেমন হবে, তা মূলত নির্ভর করে ঘর্ষণ, গতি এবং চলার পথ বা ভূখণ্ডের ওপর। ঘর্ষণ হলো একধরনের বাধাদানকারী বল, যা দুটি বস্তুর পৃষ্ঠ একে অপরের সংস্পর্শে এলে গতির বিপরীত দিকে কাজ করে। সহজ কথায়, রাস্তা যত মসৃণ হবে, ঘর্ষণ তত কম হবে এবং গাড়ি তত দ্রুত ছুটবে। আবার যানবাহনটি কত দ্রুত চলবে এবং সেটি মসৃণ হাইওয়ে নাকি কাদা-পানিতে ভরা এবড়োখেবড়ো পথ দিয়ে যাবে, তা বিবেচনা করাও খুব জরুরি।

এখন ভাবুন ট্রেনের কথা। ধরে নিন, আপনাকে হাজার হাজার টন ওজন নিয়ে, তীব্র গতিতে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতে হবে। এই কঠিন কাজটিই প্রতিদিন করে দেখায় আমাদের চেনা ট্রেন। ঠিক এ কারণেই ট্রেনের জন্য লোহার চাকা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন
ঘর্ষণ হলো একধরনের বাধাদানকারী বল, যা দুটি বস্তুর পৃষ্ঠ একে অপরের সংস্পর্শে এলে গতির বিপরীত দিকে কাজ করে। সহজ কথায়, রাস্তা যত মসৃণ হবে, ঘর্ষণ তত কম হবে এবং গাড়ি তত দ্রুত ছুটবে।

ট্রেন চলে একদম সমান ও মসৃণ রেললাইনের ওপর দিয়ে, যেখানে কোনো স্পিডব্রেকার বা গর্ত থাকে না। ট্রেনের মূল লক্ষ্য হলো, একবার গতি পেয়ে গেলে তা ধরে রাখা। লোহার লাইনের ওপর লোহার চাকা যখন ঘোরে, তখন ঘর্ষণ হয় একদম ন্যূনতম। ফলে সামান্য শক্তিতেই বিশাল ট্রেন অনায়াসে দ্রুতগতিতে ছুটে চলতে পারে। তা ছাড়া ট্রেনের ওজন ও ভরবেগ অনেক বেশি থাকে বলে একে চাইলেও হুট করে থামানো যায় না।

তা ছাড়া একটি ট্রেন সাধারণ গাড়ির চেয়ে বহুগুণ ভারী হয়ে থাকে। এখন ট্রেনের চাকায় যদি রাবার ব্যবহার করা হতো, তবে বিশাল ওজনের কারণে রাবার ও রেললাইনের মধ্যে ঘর্ষণ হতো অনেক বেশি। তখন ভারী ট্রেনটিকে চালাতে ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শক্তির অপচয় হতো। অর্থাৎ, রাবারের চাকা ট্রেনের গতি বাড়ানোর বদলে উল্টো তাকে টেনে ধরে রাখত। তাই ট্রেনের জন্য রাবারের চাকা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়।

কিন্তু আমাদের সাধারণ গাড়িগুলোর গল্প একদম আলাদা। ট্রেন তো শুধু রেললাইনের ওপর চলে, কিন্তু একটি গাড়িকে চলতে হয় রাস্তায়; মাঝেমধ্যে রাস্তাবিহীন পথেও! আবার অনেক সময় ভাঙাচোরা রাস্তা কিংবা কাদা-বালির মধ্য দিয়েও গাড়ি চালাতে হয়। এই অসমতল ও পিচ্ছিল রাস্তায় গাড়িকে নিরাপদে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন চাকার শক্ত গ্রিপ। এই গ্রিপের ক্ষমতা তখনই তৈরি হয়, যখন চাকা এবং রাস্তার মধ্যে যথেষ্ট ঘর্ষণ থাকে; যা কেবল রাবারই দিতে পারে। লোহার চাকা হলে গাড়ি রাস্তায় বিন্দুমাত্র গ্রিপ পেত না, ফলে পিছলে যেকোনো সময় খাদের মধ্যে পড়ে যেত!

আরও পড়ুন
ট্রেনের চাকায় যদি রাবার ব্যবহার করা হতো, তবে বিশাল ওজনের কারণে রাবার ও রেললাইনের মধ্যে ঘর্ষণ হতো অনেক বেশি। তখন ভারী ট্রেনটিকে চালাতে ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শক্তির অপচয় হতো।

এ ছাড়া গাড়িকে একটু পর পর ব্রেক চাপতে হয়, হুট করে থামাতে হয়। রাবারের টায়ার এই ঘন ঘন ব্রেক করার কাজটিকে সহজ ও নিরাপদ করে তোলে। সবচেয়ে বড় কথা, রাস্তার ছোটখাটো গর্তের কারণে তৈরি হওয়া ঝাঁকুনিগুলো রাবারের টায়ার নিজের ভেতরে শুষে নেয়। ফলে গাড়ির ভেতরের যাত্রীদের কোনো ঝাঁকুনি সহ্য করতে হয় না, যা স্টিলের চাকা থাকলে কখনোই সম্ভব হতো না।

তবে ট্রেনের চাকা নিয়ে চমৎকার দুটি তথ্য জেনে রাখা ভালো। প্রথমত, ট্রেনের চাকা কিন্তু একদম সোজা সিলিন্ডারের মতো গোল নয়। চাকার ভেতরের দিকে ফ্ল্যাঞ্জ নামে একটি উঁচু কিনারা থাকে, যা রেললাইনের ঠিক ভেতরে বসে চাকাটিকে ট্র্যাক থেকে পাশে পিছলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ায় কিন্তু রাবারের চাকাওয়ালা ট্রেনও আছে! প্যারিস, মন্ট্রিল বা মেক্সিকো সিটির কিছু সাবওয়ে ট্রেন কংক্রিটের ট্র্যাকে রাবারের টায়ার ব্যবহার করে চলে। এগুলো শব্দ কম করে এবং দ্রুতগতি তুলতে পারে ঠিকই, কিন্তু এতে শক্তি খরচ অনেক বেশি হয় এবং টায়ার দ্রুত ক্ষয়ে যায়। তাই এই নকশা বিশ্বজুড়ে খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স এবিসি

আরও পড়ুন