বজ্রপাত: মেঘের রাজ্যে বিদ্যুতের রূপকথা

অনেক দূরে নয়, যেন ঠিক আমাদের মাথার ওপরেই বিস্তৃত আছে এক বিশাল নীল রাজ্য, যার নাম আকাশ। দিনের বেলা সেখানে ভেসে বেড়ায় তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘের ভেলা। আর বর্ষাকালে সেই মেঘগুলো কখনো কখনো রূপ নেয় বিশাল কালো দুর্গে। দূর থেকে দেখতে শান্ত মনে হলেও, সেই মেঘের ভেতরে চলতে থাকে এক অদৃশ্য যুদ্ধ। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, মেঘের ভেতরে যখন বরফকণা, শিলাখণ্ড এবং পানির ফোঁটা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয়। সাধারণত মেঘের ওপরের অংশে ধনাত্মক (+) চার্জ এবং নিচের অংশে ঋণাত্মক (-) চার্জ জমা হয়। চার্জের পার্থক্য যখন অত্যধিক বেড়ে যায়, তখন বায়ুর নিরোধক ক্ষমতা ভেঙে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে একটি বৈদ্যুতিক পথের সৃষ্টি হয়। সেই পথ ধরে বিপুল বৈদ্যুতিক স্রোতের আকস্মিক প্রবাহ আকাশ চিরে নেমে আসে সাদা-নীল আলোর ঝলক হয়ে। বিজ্ঞানের ভাষায়, এটাই বজ্রপাত। এককথায়, বজ্রপাত হলো বায়ুমণ্ডলে সঞ্চিত বৈদ্যুতিক শক্তির এক বিশাল ও আকস্মিক নির্গমন।

আরও পড়ুন
তাসে থাকা নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন সাধারণ অবস্থায় সহজে বিক্রিয়া করে না। কিন্তু বজ্রপাতের প্রচণ্ড তাপে তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করে নাইট্রিক অক্সাইড।

আলো আগে, শব্দ পরে কেন

বজ্রপাতের সময় এত উজ্জ্বল আলো কোথা থেকে আসে আর কেনই-বা শব্দ পরে শুনি? এর উত্তর আছে বায়ুর মধ্যেই। বজ্রপাতের সময় বিদ্যুতের স্রোত যে সরু পথ দিয়ে যায়, তার তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর পরিমাণ সূর্যের পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রার (প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি! এই অত্যধিক তাপে বাতাসের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন অণু ভেঙে আয়নে পরিণত হয় এবং সৃষ্টি করে প্লাজমা। প্লাজমা হলো পদার্থের একটি বিশেষ অবস্থা। এই প্লাজমা থেকেই উৎপন্ন হয় সেই চোখ ধাঁধানো সাদা, নীলাভ কিংবা বেগুনি আলোকছটা।

মজার বিষয় হলো, বজ্রপাতের সময় শব্দ শোনার আগেই আমরা আলো দেখি। কারণ আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার, কিন্তু শব্দের গতি প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ৩৪৩ মিটার। আলো শব্দের চেয়ে প্রায় ৮ লাখ ৭৪ হাজার গুণ বেশি দ্রুত চলে। তাই আলোর ঝলক দেখার কয়েক সেকেন্ড পর আমরা সাধারণত বজ্রধ্বনি শুনতে পাই।

বজ্রপাতের সময় বিদ্যুতের স্রোত যে সরু পথ দিয়ে যায়, তার তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

বজ্রপাতের রাসায়নিক রহস্য

বজ্রপাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও কিছু রাসায়নিক রহস্য। বাতাসে থাকা নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন সাধারণ অবস্থায় সহজে বিক্রিয়া করে না। কিন্তু বজ্রপাতের প্রচণ্ড তাপে তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করে নাইট্রিক অক্সাইড।

বজ্রপাতের রাসায়নিক বিক্রিয়াটি হলো: N2 + O2 → 2NO

আবার 2NO + O2 → 2NO2

এই নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে তৈরি করে নাইট্রিক অ্যাসিড। পরে তা মাটিতে মিশে উদ্ভিদের জন্য সরবরাহ করে প্রয়োজনীয় নাইট্রেট। অর্থাৎ বজ্রপাত প্রকৃতির এক বিশাল প্রাকৃতিক সার কারখানা হিসেবেও কাজ করে।

আরও পড়ুন
মজার বিষয় হলো, বজ্রপাতের সময় শব্দ শোনার আগেই আমরা আলো দেখি। কারণ আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার, কিন্তু শব্দের গতি প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ৩৪৩ মিটার।

ইলেকট্রনিক প্রভাব ও মানব-চুম্বকের গুজব

বজ্রপাতের ইলেকট্রনিক রহস্যও কম আশ্চর্যের নয়! একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের সময় কয়েক হাজার থেকে এক লাখ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত কারেন্ট প্রবাহিত হতে পারে। ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, যা আশপাশের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মোবাইল টাওয়ার, বিদ্যুতের লাইন কিংবা কম্পিউটার পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই কারণেই উঁচু ভবনের মাথায় লাগানো হয় লাইটনিং অ্যারেস্টার, যা বজ্রপাতের বিদ্যুৎ নিরাপদে মাটিতে পৌঁছে দেয়।

প্রচলিত আছে, বজ্রপাতে মানুষ মারা গেলে নাকি চুম্বক হয়ে যায়, যার বাজারমূল্য অনেক! এটি মূলত লোককথা, গুজব ও কল্পকাহিনির মিশ্রণ। বজ্রপাতকে ঘিরে রহস্য ও ভয় দীর্ঘদিন জনমনে এমন বিশ্বাস তৈরি করেছে। এই সুযোগে প্রতারক চক্র কখনো কখনো মানব চুম্বক, বজ্রপাতে তৈরি চুম্বক বা অলৌকিক বস্তু বলে মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করে থাকে। এমন দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের সময় কয়েক হাজার থেকে এক লাখ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত কারেন্ট প্রবাহিত হতে পারে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

অমীমাংসিত রহস্য: বল লাইটনিং ও গামা রশ্মি

তবে বজ্রপাতের সব রহস্য এখনো সমাধান হয়নি। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে একটি অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে গবেষণা করছেন, যার নাম বল লাইটনিং। কখনো কখনো বজ্রপাতের পর আকাশে বা মাটির কাছাকাছি জ্বলন্ত গোলকের মতো আলো ভেসে বেড়াতে দেখা যায়। এটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হতে পারে এবং হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। শত শত প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা থাকলেও এর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, বজ্রপাতের সময় মাঝেমধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে মহাকাশের দিকে অত্যন্ত শক্তিশালী গামা রশ্মি নির্গত হয়। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন টেরেস্ট্রিয়াল গামা-রে ফ্ল্যাশ। পৃথিবীর আকাশ কীভাবে এত শক্তিশালী বিকিরণ তৈরি করে, তা-ও এখনো গবেষণার বিষয়।

আরও পড়ুন
একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের সময় কয়েক হাজার থেকে এক লাখ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত কারেন্ট প্রবাহিত হতে পারে। ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, যা আশপাশের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

মহাজাগতিক শক্তির খোঁজে

বজ্রপাত নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ নতুন নয়। ১৭৫২ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তাঁর বিখ্যাত ঘুড়ি পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন, বজ্রমেঘে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা থাকে এবং বজ্রপাত মূলত একধরনের বৈদ্যুতিক নির্গমন। তা ছাড়া বজ্রপাত, পৃথিবী ও আয়নমণ্ডলের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে নিকোলা টেসলা ধারণা করেছিলেন, পৃথিবী নিজেই একটি বিশাল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, যার শক্তি একদিন তারহীনভাবে সংগ্রহ ও পরিবহন করা যাবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন মানুষ হয়তো বায়ুমণ্ডলের এই বিপুল বৈদ্যুতিক শক্তিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।

আজও বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা বজ্রপাতের প্রতিটি ঝলক বিশ্লেষণ করছেন। কারণ, এই রহস্য বুঝতে পারলে আমরা শুধু আবহাওয়াকেই নয়, মহাকাশের অনেক অজানা ঘটনাকেও ভালোভাবে বুঝতে পারব।

শিল্পীর কল্পনায় বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের বিখ্যাত ঘুড়ি পরীক্ষার ছবি
ছবি: কীথ ল্যান্স/গেটি ইমেজ

তাই বজ্রপাত শুধু ভয়ের কোনো ঘটনা নয়; এটি পদার্থ, রসায়ন, আবহাওয়া এবং মহাকাশবিজ্ঞান গবেষণার এক অপূর্ব মিলনস্থল। বর্ষার অন্ধকার আকাশে যখন বিদ্যুতের সাদা রেখা আঁকা হয়, তখন মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই তার গোপন গবেষণাগারের দরজা এক মুহূর্তের জন্য খুলে দিয়েছে। রূপকথা শুধু রাজকন্যা ও জাদুর দেশেই নয়, লুকিয়ে আছে আমাদের মাথার ওপরে মেঘের রাজ্যেও। আর সেই রূপকথার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম বজ্রপাত।

লেখক: বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, এনআইবি

আরও পড়ুন