কোয়ান্টাম মেকানিকস কেন বলে অতীত সত্যি নয়
অতীত মানেই কি ঘটে যাওয়া নিশ্চিত কোনো ঘটনা? কোয়ান্টাম মেকানিকস বলছে, মোটেও না! আপনি এখন কী দেখছেন, তার ওপর ভিত্তি করে ঠিক হতে পারে অতীতে কী ঘটেছিল। জন হুইলারের বিখ্যাত পরীক্ষা আর কোয়ান্টাম জগতের এই অদ্ভুত ধাঁধা নিয়ে জানুন বিস্তারিত…
১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল। হিটলার মারা গেলেন। ইতিহাসের পাতায় এটাই লেখা। কিন্তু কিছু ঐতিহাসিক বলেন, না, হিটলার মরেননি, বার্লিন থেকে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। যদিও এসব কথা এখন কেউ কানে তোলে না। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত, হয় হিটলার সেদিন মারা গেছেন, নয়তো যাননি। একই সঙ্গে তিনি মৃত এবং জীবিত; এটা তো হতে পারে না!
কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে পা দিলেই এই সাদা-কালো সত্যটা ধোঁয়াশা হয়ে যায়। শ্রোডিঙ্গারের সেই বিখ্যাত বিড়ালের কথা মনে আছে? বাক্সের ভেতর বিড়ালটা একই সঙ্গে জীবিত এবং মৃত! কোয়ান্টাম মেকানিকসের জগতে অতীতের সত্যগুলোও ঠিক এমনই, ঝাপসা ও অনিশ্চিত।
অতীত যখন ধোঁয়াশা, তখন আমরা ভাবি আমাদের দেখা বা না দেখার ওপর পৃথিবীর কোনো কিছু নির্ভর করে না। চেয়ারটা যেখানে আছে, সেখানেই থাকবে। কিন্তু পরমাণু বা ইলেকট্রনের মতো ক্ষুদ্র জগতে ব্যাপারটা ভিন্ন। সেখানে কিছুই নিশ্চিত নয়, সবই সম্ভাবনা।
ধরুন, একটি ইলেকট্রন ছোড়া হলো। সেটা কি বাধার দেয়াল ভেদ করে চলে যাবে, নাকি ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে? তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। একইভাবে কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা বলে, শুধু ভবিষ্যৎ নয়, অতীতও পুরোপুরি নির্ধারিত নয়!
খুব গভীরে গিয়ে যদি দেখি, তবে দেখব ইতিহাস বা অতীত আসলে অনেকগুলো বিকল্প বাস্তবতার এক জগাখিচুড়ি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে সুপারপজিশ
ইলেকট্রনকে ছোড়া হলে সেটা দেয়াল ভেদ করবে নাকি ফিরে আসবে—তা যেমন নিশ্চিত করে বলা যায় না, তেমনি কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা বলে, শুধু ভবিষ্যৎ নয়, অতীতও পুরোপুরি নির্ধারিত নয়!
কোয়ান্টাম জগতে যতক্ষণ না আপনি কিছু মাপছেন, ততক্ষণ কিছুই নির্দিষ্ট নয়। ধরুন, আপনি একটা ইলেকট্রনের অবস্থান মাপলেন। তার মানে এই নয় যে ইলেকট্রনটা আগে থেকেই সেখানে বসে ছিল। বরং আপনার মাপার কারণেই ইলেকট্রনটা সব জায়গায় থাকার অবস্থা থেকে হঠাৎ করে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় প্রকট হলো।
ভাবুন তো, মাপার আগে ইলেকট্রনটা কেমন ছিল? যেন অনেকগুলো ইলেকট্রনের ভূত মহাকাশজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। যেই আপনি মাপলেন, অমনি সব ভূত গায়েব হয়ে একটা নির্দিষ্ট ইলেকট্রন বাস্তবে রূপ নিল!
মজার ব্যাপার হলো, আপনি কী মাপবেন, তার ওপর নির্ভর করে ইলেকট্রনটা কেমন আচরণ করবে। আপনি যদি অবস্থান মাপেন, তবে সে কণার মতো আচরণ করবে। আর যদি গতি মাপেন, তবে ওটা হবে তরঙ্গের মতো। অর্থাৎ, আপনার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে ওটা কণা হবে, নাকি তরঙ্গ!
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো, আপনি বর্তমানে কী মাপছেন, তার ওপর নির্ভর করে ইলেকট্রন অতীতে কণা ছিল নাকি তরঙ্গ ছিল, সেটা ঠিক হয়! যেন বর্তমান থেকে হাত বাড়িয়ে আপনি অতীতের ঘটনাকে প্রভাবিত করছেন।
বিখ্যাত পদার্থবিদ জন হুইলার বলেছিলেন, বর্তমানে রেকর্ড হওয়ার আগপর্যন্ত অতীতের কোনো অস্তিত্ব নেই। ১৮০১ সালে টমাস ইয়াং একটা পরীক্ষা করেছিলেন। দুটি সরু ছিদ্রের মধ্য দিয়ে আলো ফেললে দেখা যায়, আলো তরঙ্গের মতো আচরণ করে। পর্দায় তৈরি করে ডোরাকাটা দাগ। কিন্তু আলো তো ফোটন নামের কণা দিয়েও তৈরি। তাহলে কণা হয়ে সে কীভাবে একসঙ্গে দুটো ছিদ্র দিয়ে যায়?
আপনি বর্তমানে কী মাপছেন, তার ওপর নির্ভর করে ইলেকট্রন অতীতে কণা ছিল নাকি তরঙ্গ ছিল!পদার্থবিদ জন হুইলার বলেছিলেন, বর্তমানে রেকর্ড হওয়ার আগপর্যন্ত অতীতের কোনো অস্তিত্ব নেই।
আমরা যদি গোপনে দেখি ফোটনটি কোন ছিদ্র দিয়ে যাচ্ছে, তখন সে আর তরঙ্গের মতো আচরণ করে না। তখন আচরণ করে কণার মতো। ডোরাকাটা দাগও উধাও হয়ে যায়! অর্থাৎ দর্শক দেখছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে ফোটনের চরিত্র।
হুইলার এই পরীক্ষায় এক নতুন মোড় আনলেন। তিনি বললেন, ফোটন ছিদ্র পার হয়ে যাওয়ার পর আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে আমরা তার দিকে তাকাব কি না। একে বলে ডিলেড চয়েস এক্সপেরিমেন্ট। এর ফলাফল হলো অবিশ্বাস্য! ফোটন ছিদ্র পার হয়ে যাওয়ার পরও যদি শেষে আমরা মাপি বা দেখি, তবে সে কণার মতো আচরণ করে। আর যদি না দেখি, তবে সে তরঙ্গের মতো আচরণ করে। মানে ফোটন অতীতে কোন পথ বেছে নিয়েছিল, তা ঠিক হচ্ছে ভবিষ্যতে আমাদের দেখার সিদ্ধান্তের ওপর!
অতীত কি তাহলে মুছে ফেলা যায়? না, এই পরীক্ষা অতীতকে বদলে দেয় না। বরং এটি দেখায়, আমরা না দেখা পর্যন্ত অনেকগুলো অতীত একসঙ্গে মিলেমিশে থাকে। আমরা যখন কোনো কিছু মাপি বা দেখি, তখন সেই অনেকগুলো সম্ভাবনা থেকে একটা নির্দিষ্ট অতীত বেছে নেওয়া হয়। বাকি সম্ভাবনাগুলো বাতিল হয়ে যায়। একে কোয়ান্টাম ইরেজার বলে।
আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ শুধুই ভ্রম।’ তিনি পুরোপুরি ভুল ছিলেন না। আমাদের দেখা বড় জগতে অতীত একটি নির্দিষ্ট ঘটনা হলেও কোয়ান্টাম বা অতিক্ষুদ্র জগতে অতীত অনেকগুলো ঝাপসা বাস্তবতার সমষ্টি। সেখানে কী হয়েছিল, তা নির্ভর করে আমরা এখন কী দেখছি তার ওপর!