ইলেকট্রিক গিটার কীভাবে কাজ করে
রক মিউজিকের ঝনঝনানি শব্দ শুনলে আমরা অনেকেই গিটারের তারের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হই। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, গিটারের ওই পাতলা তার আর কাঠের বডির সঙ্গে ইলেকট্রিক সিগন্যালের সম্পর্ক কী? কেন ইলেকট্রিক গিটারের শব্দ শুনতে আমাদের বিশাল অ্যামপ্লিফায়ার লাগে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের এক চমৎকার নীতিতে, যার নাম তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ।
ইলেকট্রিক গিটারের অন্যতম আবিষ্কারক জর্জ বোশাম্প বলেছিলেন, ‘ইলেকট্রিক গিটারের বডি প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম কিংবা পিতল যা দিয়েই তৈরি হোক না কেন, শব্দের খুব একটা হেরফের হয় না।’
অ্যাকোস্টিক বনাম ইলেকট্রিক গিটার
একটা সাধারণ অ্যাকোস্টিক গিটার যখন আপনি হাতে নেন, আপনি মূলত একটি কাঠের শূন্য বাক্স ধরে আছেন! এর ভেতরে বাতাস ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আপনি যখন এর তারে আঘাত করেন, সেই কম্পন গিটারের কাঠের বডিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভেতরের বাতাসকে কাঁপিয়ে দেয়। বাতাস কাঁপানোর এই বিদ্যাটিই শব্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। গিটারের পেটের মাঝে যে গোল ফুটো থাকে, তা আসলে একটি হেলমহোল্টজ রেজোনেটর হিসেবে কাজ করে, যা শব্দকে তরঙ্গের মতো আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
কিন্তু ইলেকট্রিক গিটারের বেলায় গল্পটা পুরোপুরি ভিন্ন। এর বডিটা সাধারণত নিরেট কাঠ বা অন্য কোনো শক্ত উপাদান দিয়ে তৈরি হয়, যার ভেতর কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৩০-এর দশকে এই গিটারের অন্যতম উদ্ভাবক জর্জ বোশাম্প বলেছিলেন, ‘ইলেকট্রিক গিটারের বডি প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম কিংবা পিতল যা দিয়েই তৈরি হোক না কেন, শব্দের খুব একটা হেরফের হয় না।’
কেন জানেন? কারণ, ইলেকট্রিক গিটারের বডির কাজ শব্দ তৈরি করা নয়, তারের সঠিক টান ধরে রাখা। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে, নিরেট এক টুকরো কাঠ থেকে এত তীব্র, কাঁপন ধরানো শব্দ বের হয় কীভাবে?
গিটারের পেটের মাঝে যে গোল ফুটো থাকে, তা আসলে একটি হেলমহোল্টজ রেজোনেটর হিসেবে কাজ করে, যা শব্দকে তরঙ্গের মতো আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
ইলেকট্রিক গিটারের প্রাণ
গিটারের তারের ঠিক নিচে ধাতব রঙের ছোট যে অংশগুলো দেখেন, সেগুলোকে বলা হয় পিকআপ। এটাই ইলেকট্রিক গিটারের হৃৎপিণ্ড। প্রতিটি পিকআপের ভেতরে থাকে স্থায়ী চুম্বক ও তামার তারের কুণ্ডলী। আপনি যখন গিটারের ধাতব তারগুলো বাজান, তখন সেগুলো চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে কাঁপতে থাকে। এই নড়াচড়ার ফলে ওই কুণ্ডলীর ভেতর অতিক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক প্রবাহের সৃষ্টি হয়। তারের কম্পন যত দ্রুত বা ধীর হয়, বৈদ্যুতিক সংকেতের ধরনও ঠিক ততটাই বদলে যায়।
সংকেত থেকে সুরের সফর
কম্পনের কারণে তার নড়ে। পিকআপের চুম্বক ও কুণ্ডলী সেই কম্পনকে বৈদ্যুতিক তরঙ্গে রূপান্তর করে। এই ছোট বৈদ্যুতিক সংকেতটি কেব্লের মাধ্যমে চলে যায় অ্যামপ্লিফায়ারে। অ্যামপ্লিফায়ার সেই ক্ষুদ্র সংকেতটিকে বিশাল শক্তি দিয়ে বড় করে তোলে এবং লাউডস্পিকারের মাধ্যমে আমাদের কানে পৌঁছে দেয়!
ইলেকট্রিক গিটার আসলে একটি জটিল তড়িৎচুম্বকীয় যন্ত্র। আপনি যখন কোনো রক কনসার্টে গিটারের একক সলো শোনেন, তখন মূলত আপনি তারের যান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে ইলেকট্রন প্রবাহের এক নিখুঁত নৃত্যের ফলাফল শুনছেন। জিমি হেন্ড্রিক্স কিংবা আমাদের আইয়ুব বাচ্চুর সেই জাদুকরী আঙুলের কারসাজি আদতে পদার্থবিজ্ঞানেরই এক চরম উৎকর্ষ।