পানি ছাড়াই আগুন নেভাবে শব্দ
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের পাহাড়ি এলাকা। চারদিকে শুকনো ঝোপঝাড়। হঠাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল দাবানল। আগুনের লেলিহান শিখা এক ঝোপ থেকে আরেক ঝোপে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘরবাড়ি সব ছাই হওয়ার জোগাড়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! আগুনের মাঝখানেও একটা বাড়ি অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে। কোনো পানি ছিটানো হচ্ছে না, ফায়ার সার্ভিসও নেই। তবুও আগুনের শিখা ওই বাড়ির গায়ে লাগলেই আগুন নিভে যাচ্ছে।
কোনো জাদুর মন্ত্র নয়, আগুন নেভাচ্ছে শব্দ! শুনতে অবাক লাগলেও বিজ্ঞানীরা এখন আগুন নেভাতে পানির বদলে ব্যবহার করছেন অদৃশ্য শব্দতরঙ্গ। একে বলা হচ্ছে অ্যাকুস্টিক ফায়ার সাপ্রেশন।
আগুন নেভে কীভাবে
আগুন জ্বলার জন্য মূলত তিনটি জিনিস লাগে—তাপ, জ্বালানি ও অক্সিজেন। এর যেকোনো একটি সরিয়ে নিলেই আগুন আর জ্বলে না। আমরা পানি দিয়ে তাপ কমাই, অথবা বালি দিয়ে অক্সিজেন বন্ধ করি। বিজ্ঞানীরা এবার শব্দ দিয়ে ঠিক এই কাজটাই করছেন।
শব্দতরঙ্গ বাতাসের অক্সিজেন অণুগুলোকে ধাক্কা দেয় এবং জ্বালানি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আগুনের চারপাশের অক্সিজেন সরে গেলে আগুন নিভে যেতে বাধ্য হয়।
জিওফ ব্রুডার একসময় নাসায় এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি এখন সনিক ফায়ার টেক নামে এক কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ব্যাপারটা খুব সহজ করে বুঝিয়েছেন। আগুনের অক্সিজেন দরকার। কিন্তু শব্দের কম্পন দিয়ে অক্সিজেন অণুগুলোকে এত দ্রুত কাঁপানো হয় যে, আগুন সেটা আর সহ্য করতে পারে না। ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর তৈরি যন্ত্রটি ২৫ ফুট দূর থেকেই আগুন নেভাতে সক্ষম।
শব্দতরঙ্গ বাতাসের অক্সিজেন অণুগুলোকে ধাক্কা দেয় এবং জ্বালানি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আগুনের চারপাশের অক্সিজেন সরে গেলে আগুন নিভে যেতে বাধ্য হয়।
শব্দ যখন নীরব ঘাতক
শব্দ দিয়ে আগুন নেভানোর ধারণা একদম নতুন নয়। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (ডারপা) এটা নিয়ে কাজ করেছিল। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা বিশাল স্পিকারের মতো যন্ত্র দিয়ে আগুন নিভিয়ে দেখিয়েছিল।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। আগে যেসব শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করা হতো, সেগুলো ছিল বেশ জোরালো এবং মানুষের কানে লাগত। মোটামুটি ৩০ থেকে ৬০ হার্জের শব্দ।
জিওফ ব্রুডার এখানে বুদ্ধি খাটিয়েছেন। তিনি ব্যবহার করছেন ইনফ্রাসাউন্ড। এর কম্পন ২০ হার্জের নিচে। এই শব্দ মানুষ কানে শুনতে পায় না। তবে আগুনের বিরুদ্ধে দূর্দান্ত কাজ করে। তাছাড়া এই শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে।
সাধারণত দাবানলের সময় উড়ে আসা ছোট ছোট আগুনের ফুলকি থেকেই ঘরবাড়িতে আগুন লাগে। সনিক ফায়ার টেকের সিস্টেমে বাড়ির ছাদে ও কার্নিশে বিশেষ ধাতব পাইপ বসানো থাকে। সেন্সর আগুনের আঁচ পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় শব্দের পিস্টন।
জিওফ ব্রুডার ব্যবহার করছেন ইনফ্রাসাউন্ড। এর কম্পন ২০ হার্জের নিচে। এই শব্দ মানুষ কানে শুনতে পায় না। তবে আগুনের বিরুদ্ধে দূর্দান্ত কাজ করে। তাছাড়া এই শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে।
এতে অদৃশ্য এক সুরক্ষা দেওয়াল তৈরি হয়। আগুনের ফুলকি এই দেওয়াল ভেদ করে জ্বলে উঠতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আর্নল্ড ট্রুভ অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই প্রযুক্তি শুধু ছোট আগুনের ক্ষেত্রে কাজ করে। দাউ দাউ করে জ্বলা বিশাল অগ্নিকুণ্ড নেভানো এখনই সম্ভব নয়। তবে দাবানল থেকে ঘরবাড়ি বাঁচাতে ওই ছোট ফুলকি ঠেকানোই আসল।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে। শিগগিরিই প্রায় ৫০টি বাড়িতে এই সাউন্ড ফায়ার এক্সটিংগুইশার বসানো হবে। পানি ছাড়া শুধু আওয়াজ দিয়ে আগুন নেভানোর দিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়!