পরমাণুর ছবি রঙিন হয় না কেন

যে অণু-পরমাণু খালি চোখে দেখাই যায় না, তার ছবিই বা তোলা হয় কীভাবে?ছবি: গেটি ইমেজ

দৈনন্দিন জীবনে আমরা কত কিছুরই না ছবি তুলি! প্রতিটি ছবিতেই থাকে নানা রঙের সমারোহ। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, বিজ্ঞানীরা যখন কোনো পরমাণুর ছবি তোলেন, তখন সেখানে কোনো রং দেখা যায় না কেন? তা ছাড়া, যে অণু-পরমাণু খালি চোখে দেখাই যায় না, তার ছবিই বা তোলা হয় কীভাবে? চলুন, আজ এসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

মানুষের কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। চারপাশের জগৎকে আমরা সব সময় আরও স্পষ্টভাবে দেখতে চাই। কিন্তু পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক, অর্থাৎ পরমাণু দেখার ক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ লেন্স বা ক্যামেরা পুরোপুরি হার মেনে যায়। অনেকের মনে হতে পারে, লেন্সকে অনেক বেশি জুম করলেই হয়তো পরমাণুর ছবি তোলা সম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানের বাস্তবতা এত সহজ নয়, বরং তা আরও বেশি জটিল ও চমকপ্রদ।

চারপাশে আমরা যা কিছু রঙিন দেখি, তা মূলত আলোর প্রতিফলনের খেলা। কোনো বস্তুর ওপর যখন আলো পড়ে, তখন বস্তুটি নির্দিষ্ট কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে নেয় এবং বাকিটা প্রতিফলিত করে। এই প্রতিফলিত আলোই আমাদের চোখে রং হয়ে ধরা দেয়। কিন্তু পরমাণুর ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, এটি দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে হাজার গুণ ছোট। কোনো বস্তুর আকার আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে ছোট হলে, আলো সেখান থেকে প্রতিফলিত হওয়ার বদলে পাশ কাটিয়ে চলে যায় বা বিচ্ছুরিত হয়। ফলে সাধারণ আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরমাণু দেখা একপ্রকার অসম্ভব।

আরও পড়ুন
কোনো বস্তুর ওপর যখন আলো পড়ে, তখন বস্তুটি নির্দিষ্ট কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে নেয় এবং বাকিটা প্রতিফলিত করে। এই প্রতিফলিত আলোই আমাদের চোখে রং হয়ে ধরা দেয়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, দৃশ্যমান আলোর বদলে গামা রশ্মি ব্যবহার করা হয় না কেন? তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট করার কথা ভাবলে প্রথমেই গামা রশ্মির কথা মাথায় আসতে পারে, কারণ এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরমাণুর আকারের প্রায় সমান। কিন্তু মুশকিল হলো, গামা রশ্মির শক্তি অত্যন্ত বেশি। এত উচ্চশক্তির তরঙ্গ কোনো পরমাণুর ওপর ফেললে তা পরমাণুটিকে জায়গা থেকে সরিয়ে দিতে পারে, এমনকি পুরোপুরি ধ্বংস করেও ফেলতে পারে। ব্যাপারটা অনেকটা কাচের তৈরি সূক্ষ্ম কোনো জিনিসের ছবি তোলার জন্য তার ওপর হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার মতো!

এই বড় সমস্যার দারুণ এক সমাধান দেয় আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি অদ্ভুত ধারণা—কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা। ইলেকট্রন মূলত একটি কণা হলেও এটি যখন অতি উচ্চগতিতে ছুটে চলে, তখন তরঙ্গের মতো আচরণ শুরু করে। বিজ্ঞানীদের মতে, ইলেকট্রনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্ভর করে তার ভরবেগের ওপর। ইলেকট্রনের গতি বাড়িয়ে বা কমিয়ে আমরা ইচ্ছেমতো এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট করতে পারি, যা পরমাণুর ছবি তোলার জন্য একদম উপযুক্ত।

এই নীতি ব্যবহার করেই তৈরি হয়েছে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ। এই যন্ত্রে ইলেকট্রনগুলোকে একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করে প্রচণ্ড গতি দেওয়া হয়। এরপর সাধারণ কাচের লেন্সের বদলে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক লেন্স ব্যবহার করে ইলেকট্রন রশ্মিকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ফোকাস করা হয়। এই রশ্মি যখন কোনো নমুনার ভেতর দিয়ে যায়, তখন কিছু ইলেকট্রন শোষিত হয় এবং কিছু বিচ্ছুরিত। শেষে একটি ফ্লুরোসেন্ট ডিটেক্টরে নমুনাটির একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়। এটি অনেকটা এক্স-রে পদ্ধতির মতোই কাজ করে।

আরও পড়ুন
গামা রশ্মির শক্তি অত্যন্ত বেশি। এত উচ্চশক্তির তরঙ্গ কোনো পরমাণুর ওপর ফেললে তা পরমাণুটিকে জায়গা থেকে সরিয়ে দিতে পারে, এমনকি পুরোপুরি ধ্বংস করেও ফেলতে পারে।

পরমাণুর পর প্রশ্ন আসে এর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস দেখার। নিউক্লিয়াস আরও ক্ষুদ্র হওয়ায় সেখানে আরও ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই পর্যায়ে ইলেকট্রনের শক্তি এত বেশি হয়ে যায় যে তা নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একে বুলেট দিয়ে বেলুনের ছবি তোলার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে! সরাসরি ছবি না পাওয়া গেলেও উচ্চশক্তির ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে সেই বিচ্ছুরণ থেকে বিজ্ঞানীরা দারুণ সব তথ্য পেয়েছেন। এভাবেই আবিষ্কৃত হয়েছে, নিউক্লিয়াসের ভেতর থাকা প্রোটন ও নিউট্রনগুলো আরও ক্ষুদ্র কণা কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি।

পরমাণুর জগৎকে চেনা কেবল একজোড়া শক্তিশালী লেন্সের ব্যাপার নয়, এটি পদার্থবিজ্ঞানের গভীর নিয়মগুলোকে কাজে লাগিয়ে অজানাকে জানার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা। আজ আমরা পরমাণুর যে সাদাকালো স্থিরচিত্র দেখি, তা আসলে বিজ্ঞানের এক অনন্য জয়যাত্রা।

লেখক: শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন