উত্তপ্ত কড়াইয়ে পানির ফোঁটা লাফায় কেন

রান্না করার সময় গরম কড়াইয়ে পানি ছিটিয়ে দেখেছেন কখনো? পানিটা বাষ্প না হয়ে মুক্তার মতো আকার নেয়। কীভাবে আগুনের তাপেও পানি বাষ্প না হয়ে দিব্যি টিকে থাকে? এই সূত্র কাজে লাগিয়ে কীভাবে তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের স্মার্ট ইঞ্জিন?

১৯৩  ডিগ্রি সেলসিয়াসে পানির ফোঁটা পাত্রে নাচতে শুরু করেছবি: আলেকজান্দ্রে ডোটা / সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি

একটি পাত্রে পানি নিয়ে গরম করলে পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে শুরু হয় বুদবুদ তৈরি। এই বুদবুদগুলো পানির তল থেকে ওপরে উঠে ফেটে যায় এবং জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়। সেগুলো আমরা দেখতে পাই। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনার নাম স্ফুটন। কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছেন, পাত্রটিকে যদি আরও অনেক বেশি উত্তপ্ত করা হয়, তখন তাতে পানির ফোঁটা কেমন আচরণ করে? ১৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পানি নাচতে শুরু করে। অর্থাৎ, পানি বাষ্প না হয়ে পিংপং বলের মতো ঘুরতে থাকে। কেন এমন হয়?

আসলে, পানির স্ফুটনাঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রায় উত্তপ্ত পাত্রের সংস্পর্শে পানির ফোঁটা আসলেই পানির ফোঁটার নিচের অংশটুকু মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পে রূপান্তরিত হয়। এই বাষ্পই পানির ফোঁটার গায়ে একটি অদৃশ্য জ্যাকেটের মতো কাজ করে।

পানি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম হলে বুদবুদ তৈরি হয়
ছবি: গেটি ইমেজ

ফলে পানির ফোঁটা আর সরাসরি গরম পাত্রের সংস্পর্শে আসতে পারে না। বাষ্পের এই স্তরের কারণে পানির ফোঁটা ও পাত্রের সংযোগস্থলে ঘর্ষণের মান প্রায় শূন্য হয়ে যায়। ফলে ফোঁটাটি তখন পাত্রের ভেতরে পিংপং বলের মতো এদিক সেদিক দৌড়ে বেড়ায়।

এই অবস্থায় ফোঁটাটি চারপাশে থাকা বাষ্পের স্তর থেকে তাপ শোষণ করে খুব ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হতে থাকে। যেহেতু জলীয় বাষ্প ধাতব পাত্রের তুলনায় কম তাপ পরিবহন করতে পারে, তাই পাত্রের প্রচণ্ড তাপ ফোঁটার গায়ে সরাসরি লাগতে পারে না। ফলে ফোঁটাটি চট করে ফুটে বাষ্পে পরিণত হয় না, বরং বেশ কিছুক্ষণ ভেসে থাকে ও নড়াচড়া করে। অতিরিক্ত উত্তপ্ত পৃষ্ঠে বাষ্পের এই যে ইনসুলেশন তৈরি হয়, তার নাম লিডেনফ্রস্ট প্রভাব।

আরও পড়ুন
পানির স্ফুটনাঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রায় উত্তপ্ত পাত্রের সংস্পর্শে পানির ফোঁটা আসলেই পানির ফোঁটার নিচের অংশটুকু মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পে রূপান্তরিত হয়।

জার্মান বিজ্ঞানী জোহান গটলব লেইডেনফ্রস্ট ১৭৫৬ সালে প্রথম এই ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। তাঁর নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়। যে তাপমাত্রায় পৌঁছালে এই ঘটনা ঘটে, তাকে বলা হয় লিডেনফ্রস্ট বিন্দু।

পানি ছাড়া অন্যান্য তরলের ক্ষেত্রেও এটি দেখা যেতে পারে। কিন্তু ঠিক কোন তাপমাত্রায় এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটবে, তা বলা মুশকিল। তরলের ফোঁটার আয়তন, তরলের প্রকৃতি এবং পাত্রের পৃষ্ঠের ওপর নির্ভর করে লিডেনফ্রস্ট বিন্দুর মান। এটি তরলের পৃষ্ঠটানের ওপর সরাসরি নির্ভর না করলেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যেসব তরলের পৃষ্ঠটান বা সারফেস টেনশন বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে উচ্চতর তাপমাত্রায় লিডেনফ্রস্ট বিন্দু লক্ষ্য করা যায়।

গরম চুলার প্লেটে লিডেনফ্রস্টের প্রভাব অনুভব করা একটি জলের ফোঁটা
ছবি: উইকিপিডিয়া

মজার ব্যাপার হলো, প্যারাফিন মোমের ফোঁটা নিয়ে পরীক্ষা করার সময় এটি প্রথম বিজ্ঞানীদের নজরে আসে। বিশুদ্ধ পানি ও তামার পাত্র ব্যবহার করলে লিডেনফ্রস্ট প্রভাব দেখা যায় ২৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কিন্তু গ্লিসারল এবং সাধারণ অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে অনেক কম তাপমাত্রায় এটি দেখা যায়। এর নেপথ্যে রয়েছে ঘনত্ব ও সান্দ্রতার মাঝে ক্রিয়াশীল এক জটিল টানাটানি খেলা।

এ বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য তাত্ত্বিক মডেল তৈরির জন্য গবেষকেরা বিগত দুই দশক ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাঁরা তরলের প্রকৃতি, পাত্রের আকার ও উপাদান পরিবর্তন করে দেখছেন নতুন প্যাটার্ন তৈরি হয় কি না। শুধু মাত্রাতিরিক্ত উত্তপ্ত করলেই যে এমনটি হবে তা নয়। যেমন তরল নাইট্রোজেনের মতো ক্রায়োজোনিক পদার্থের ক্ষেত্রে সাধারণ কক্ষ তাপমাত্রাতেই এইরকম ঘটনা দেখা যেতে পারে। কারণ তরল নাইট্রোজেনের স্ফুটনাঙ্ক অনেক কম। ক্ষেত্রবিশেষে এই লিডেনফ্রস্ট প্রভাবের ধারণা কাজে লাগিয়ে হাইড্রোফোবিক সিস্টেম তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, তরলকে কঠিন পৃষ্ঠ থেকে আলাদা রাখা হয়।

আরও পড়ুন
যে তাপমাত্রায় পৌঁছালে লিডেনফ্রস্ট প্রভাব ঘটনা ঘটে, তাকে বলা হয় লিডেনফ্রস্ট বিন্দু। তরলের ফোঁটার আয়তন, তরলের প্রকৃতি এবং পাত্রের পৃষ্ঠের ওপর নির্ভর করে লিডেনফ্রস্ট বিন্দুর মান।

এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা বিশেষ থার্মোস্ট্যাট তৈরি করেছেন। এটি খুব ঠান্ডা হলে হিটার চালু করে এবং সঠিক তাপমাত্রায় পৌঁছালে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এই লিডেনফ্রস্ট থার্মোস্ট্যাটগুলো মূলত পানির ফোঁটার শক্তি ব্যবহার করে কাজ করে। যখন তাপমাত্রা খুব বেশি হয়, তখন এটি সিস্টেমকে শীতল করার জন্য পানির ফোঁটাগুলোকে একদিকে সরিয়ে দেয়; আবার তাপমাত্রা কমে গেলে ফোঁটাগুলোকে ঠেলে দেয় অন্যদিকে। ফলে সিস্টেমটির সঠিক তাপমাত্রা বজায় থাকে।

লিডেনফ্রস্ট থার্মোস্ট্যাটগুলো মূলত পানির ফোঁটার শক্তি ব্যবহার করে কাজ করে
ছবি: ইউনিভার্সিটি অব বাথ

এছাড়া, যেসব ইঞ্জিন উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করে, লিডেনফ্রস্ট প্রভাব ব্যবহার করে তার যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারলে অত্যধিক তাপ থেকে সেগুলোকে রক্ষা করা যেতে পারে। ফলে ইঞ্জিনের ক্ষয়-ক্ষতির সম্ভাবনা কমবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

লেখক: গবেষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, স্টেট ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কলকাতা

আরও পড়ুন