কণা প্রতিকণার লড়াই
কণা ও প্রতিকণা—দেখা হলেই ধ্বংস। পদার্থ-প্রতিপদার্থের সংঘর্ষে তৈরি হয় বিপুল শক্তি। আমার-আপনার দেহ থেকেও বেরোয় এসব কণা। অথচ মহাবিশ্বে এসব কণার দেখা পাওয়া ভার। কোথায় গেল সব প্রতিকণা? কীভাবে এরা ধ্বংস করে দেয় পদার্থদের?
আমরা সবাই মৌলিকভাবে পরমাণু দিয়ে তৈরি। না, ভুল বললাম। আরও মৌলিকভাবে তৈরি ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন কণা দিয়ে। আবারও ভুল। ইলেকট্রন মৌলিক হলেও প্রোটন ও নিউট্রন মৌলিক নয়। এগুলো তৈরি কোয়ার্ক কণা দিয়ে। নিউট্রনের কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই। তবে প্রোটনের চার্জ ধনাত্মক, আর ইলেকট্রনের ঋণাত্মক। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ কিংবা মহাবিশ্বের সব জড় পদার্থ এই কণাগুলো দিয়েই তৈরি।
তাত্ত্বিকভাবে প্রতিকণা দিয়েও তা হতে পারত। ইলেকট্রনের মতোই আছে আরেক কণা, যার সবকিছু ইলেকট্রনের মতোই। শুধু চার্জ ব্যতিক্রম। ধনাত্মক চার্জধারী এ কণার নাম পজিট্রন। একইভাবে প্রতিকণা আছে প্রোটনেরও। নাম অ্যান্টিপ্রোটন। নিউট্রনের চার্জ নেই। তবু আছে প্রতিকণা। আগেই বলেছি, নিউট্রন মৌলিক কণা নয়। প্রোটনের মতো কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি। নিউট্রন তৈরি একটি আপকোয়ার্ক (চার্জ +২/৩) ও দুটি ডাউনকোয়ার্ক (চার্জ –১/৩) দিয়ে। মোট চার্জ শূন্য। তাই উল্টোভাবে প্রতিনিউট্রনে থাকে একটি অ্যান্টিআপকোয়ার্ক (চার্জ -২/৩) ও দুটি অ্যান্টিডাউনকোয়ার্ক (চার্জ +১/৩)। নিউট্রনের মতোই এটিরও মোট চার্জ শূন্য।
এভাবে পজিট্রন, অ্যান্টিপ্রোটন ও অ্যান্টিনিউট্রন নিয়ে তৈরি হয় অ্যান্টিঅ্যাটম বা প্রতিপরমাণু। আর প্রতিপরমাণু দিয়েই তৈরি হয় অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থ। এই যে আমি–আপনি! কণাপদার্থবিদ্যার ভাষায় পদার্থ। হতে পারতাম প্রতিবস্তু বা প্রতিপদার্থ।
দেহটা কণার বদলে প্রতিকণা দিয়ে তৈরি হলেই তা হতো প্রতি-আমি বা প্রতি-আপনি। এভাবে হতো প্রতি-পৃথিবী বা প্রতি-মহাবিশ্ব। একের সঙ্গে অপরের দেখা হলেই কেবল দুটিই ধ্বংস। পদার্থ-প্রতিপদার্থ উধাও হয়ে তৈরি হবে শক্তি। তবে দেখা না হলে আলাদা আলাদা জগতে টিকে থাকতে পারবে কণা ও প্রতিকণার মহাবিশ্ব।
ইলেকট্রনের মতোই আছে আরেক কণা, যার সবকিছু ইলেকট্রনের মতোই। শুধু চার্জ ব্যতিক্রম। ধনাত্মক চার্জধারী এ কণার নাম পজিট্রন। একইভাবে প্রতিকণা আছে প্রোটনেরও। নাম অ্যান্টিপ্রোটন।
কণার পাশাপাশি প্রতিকণারাও বাস্তবে আছে। আমাদের চারপাশেই আছে। এই যেমন, কলা থেকেই নির্গত হয় প্রতিবস্তু। কলায় আছে বিশেষ একধরনের পটাশিয়াম। পরমাণুটির এ আইসোটোপের নাম পটাশিয়াম-৪০। তেজস্ক্রিয় ভাঙনপ্রক্রিয়ায় প্রতি ৭৫ মিনিটে এটি থেকে একটি পজিট্রন বের হয়। পটাশিয়াম-৪০-এর অর্ধায়ু ১২৫ কোটি বছর। মানে তেজস্ক্রিয় উপায়ে ভেঙে এ সময় পর এটি এর অর্ধেক পরিমাণে নেমে আসে। এই আইসোটোপ আছে আমাদের দেহেও। তার মানে, আমার-আপনার দেহ থেকেও বের হচ্ছে পজিট্রন। অবশ্যই এগুলো অতিমাত্রায় ক্ষণস্থায়ী।
মহাকাশ থেকেও পৃথিবীতে আসে প্রতিকণা। অল্প পরিমাণ প্রতিবস্তু মহাজাগতিক রশ্মি আকারে প্রতিনিয়ত আসে পৃথিবীতে। প্রতি বর্গমিটারে ১টি থেকে ১০০টি পর্যন্ত প্রতিকণা এভাবে চলে আসে। পজিট্রন তৈরি হয় বজ্রমেঘের ওপরও। ২০১৬ সালের এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্ল্যাকহোল ও নিউট্রন তারাও প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রন-পজিট্রন প্লাজমা তৈরি করে।
কণা ও প্রতিকণা সব সময় জোড়ায় জোড়ায় তৈরি হয়। বিগ ব্যাংয়ের সামান্য পরে এটাই ঘটেছিল। সেই বিশাল বিস্ফোরণের এক সেকেন্ডের বহু ভাগের এক ভাগের কম সময় পরই শুরু হয় এটা। এ সময় ঘন ও উত্তপ্ত মহাবিশ্ব ছিল কণা ও প্রতিকণায় ভরপুর। সৃষ্টি হচ্ছিল, আর বিপরীত কণার সঙ্গে সংঘর্ষে ধ্বংস হচ্ছিল। কণা ও প্রতিকণা একই সঙ্গে সৃষ্টি ও ধ্বংস হলে মহাবিশ্বে শক্তি ছাড়া কিছুই থাকার কথা নয়। থাকার কথা নয় কোনো বস্তুর উপস্থিতি।
তবে খুব অল্প কিছু কণা বেঁচে যায়। প্রতি ১০০ কোটিতে ১টি। আজ আমরা এসব কণার গড়া পদার্থই দেখি। গত কয়েক দশকে কণাপদার্থবিদেরা দেখিয়েছেন, পদার্থবিদ্যার সূত্র কণা ও প্রতিকণার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় না। কণা ও প্রতিকণার রূপান্তর স্বতঃস্ফূর্ত। ধ্বংসের আগে কাজটা হয় বহু লক্ষবার। কাজটায় হস্তক্ষেপ করে কোনো এক অজানা নিয়ামক। ফলে প্রতিকণাদের হারিয়ে মহাবিশ্বের দখল নেয় কণার দল।
পটাশিয়াম-৪০-এর অর্ধায়ু ১২৫ কোটি বছর। মানে তেজস্ক্রিয় উপায়ে ভেঙে এ সময় পর এটি এর অর্ধেক পরিমাণে নেমে আসে। এই আইসোটোপ আছে আমাদের দেহেও।
ধরুন, টেবিলে একটা কয়েন ঘুরছে। পড়ে গিয়ে হেড বা টেল পড়বে। তবে পড়ার আগপর্যন্ত একে হেড বা টেল—কোনোটাই বলা যাবে না। নির্ভেজাল মুদ্রার হেড ও টেল পড়ার সম্ভাবনা সমান ৫০ ভাগ করে। অনেক বেশি মুদ্রা টস করা হলে এর ফলাফল দেখা যাবে। এই যেমন, ১ হাজার বার টস করলে প্রায় ৫০০ করে হেড ও টেল পড়বে। একইভাবে প্রাথমিক মহাবিশ্বের অর্ধেক কণা থেকে বস্তু ও বাকি অর্ধেক থেকে প্রতিবস্তু তৈরি হওয়ার কথা।
তবে বিশেষ কোনো কারণ ঘটলে মুদ্রায় হেড ও টেলের সংখ্যায় ব্যতিক্রম হতে পারে। এই যেমন, মুদ্রার টেবিলে কোনো বিশেষ মার্বেল ছেড়ে দেওয়া হলো, যা মুদ্রাকে শুধু একদিকে পড়তে বাধ্য করবে। এমন অজানা কোনো প্রক্রিয়া হয়তোবা প্রতিকণার চেয়ে বেশি কণা তৈরি হতে কাজ করেছিল। কী সেই অজানা প্রক্রিয়া? জানা নেই কারও।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কণাত্বরক যন্ত্র হয়তো সে প্রক্রিয়ার কথা জানাতে পারবে। সার্নের সেই যন্ত্রের নাম লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার (এলএইচসি)। যে যন্ত্রে উচ্চশক্তিতে তৈরি করা হয় কণা ও প্রতিকণা। তবে গবেষণার প্রয়োজন ছাড়াও বাস্তব কাজেও ব্যবহার আছে প্রতিকণার।
প্রতিকণার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের মিলনের গল্প। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের হাতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় কোয়ান্টাম তত্ত্বের। ১৯২০–এর দশকের কথা। পদার্থবিদেরা চেষ্টা চালাচ্ছেন প্ল্যাঙ্কের শক্তির কোয়ান্টার ধারণা পরমাণু ও এর উপাদানে প্রয়োগ করতে। ওই দশকের শেষের দিকে শ্রোডিঙ্গার ও হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম তত্ত্বকে দাঁড় করিয়ে ফেললেন। কিন্তু সমস্যা থেকে গেল। কোয়ান্টাম তত্ত্ব শুধু খাটে ধীরে চলা কণার জন্য। উচ্চ (বা আপেক্ষিকতাবাদী) বেগে এ তত্ত্ব কাজ করে না।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কণাত্বরক যন্ত্র হয়তো সে প্রক্রিয়ার কথা জানাতে পারবে। সার্নের সেই যন্ত্রের নাম লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার। যে যন্ত্রে উচ্চশক্তিতে তৈরি করা হয় কণা ও প্রতিকণা।
সমাধান এল পল ডিরাকের হাত ধরে। তাঁর ডিরাক সমীকরণ উচ্চ বেগে চলা ইলেকট্রনের জন্যও কাজ করল। পুরো পরমাণু এখন মেনে চলে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এ কাজের জন্য তিনি ১৯৩৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তবে এ সমীকরণ সমস্যাও একটা তৈরি করল। যেমনটা বলেছিলেন জর্জ বার্নার্ড শ। বিজ্ঞান একটা সমস্যা সমাধান করতে আরও দশটা নতুন সমস্যা তৈরি করে। x2 = 4 সমীকরণের দুটি সমাধান আছে। ২ ও (-২)। দুটির জন্যই সমীকরণ সমান সত্য। ডিরাকের সমীকরণেও এমন দুটি সমাধান আছে। একটায় ইলেকট্রনের শক্তি ঋণাত্মক, আরেকটায় ধনাত্মক।
তবে চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান বলে, কণার শক্তি সব সময় ধনাত্মক হবে। ডিরাক তাই এ ব্যতিক্রমী কণার ব্যাখ্যায় সচেষ্ট হলেন। বললেন, প্রতিটি কণারই একটি বিপরীত কণা বা প্রতিকণা আছে। যার সবকিছু একই, শুধু চার্জ বিপরীত। ইলেকট্রনের আছে প্রতিইলেকট্রন। ডিরাক প্রতিকণা ও প্রতিবস্তু দিয়ে গড়া সম্পূর্ণ এক মহাবিশ্বের কথাও অনুমান করেন। আসলে অন্য কোনো গ্রহ বা নক্ষত্রও প্রতিবস্তু দিয়ে গড়া হতেই পারে৷ তাতে পরমাণু তৈরি হবে পজিট্রন ও অ্যান্টিপ্রোটন দিয়ে।
১৯৩২ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পজিট্রনের দেখা পান। পজিটিভ বা ধনাত্মক চার্জের কারণে পজিট্রন নামটা তিনিই দেন। তাঁর ২০ বছর আগে ভিক্টর হেস মহাজাগতিক রশ্মি আবিষ্কার করেন। এ আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান এ দুই বিজ্ঞানী।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এরপর নতুন নতুন প্রতিকণা আবিষ্কৃত হতে থাকে। ১৯৫৫ সালে বিভাট্রন যন্ত্রে ধরা পড়ে অ্যান্টিপ্রোটন। একে তখন ডাকা হতো ‘নেগেটিভ প্রোটন’ বলে। একই যন্ত্র পরের বছর আবিষ্কার করে অ্যান্টিনিউট্রন কণা। এর মাধ্যমে পরমাণু তৈরির জন্য প্রয়োজন তিন কণারই (ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন) প্রতিকণা পাওয়া গেল।
১৯৩২ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পজিট্রনের দেখা পান। পজিটিভ বা ধনাত্মক চার্জের কারণে পজিট্রন নামটা তিনিই দেন।
পরমাণুর কেন্দ্রকে বলা হয় নিউক্লিয়াস, যেখানে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন। ১৯৬৫ সালে জানা গেল, কণার মতো প্রতিকণাও নিউক্লিয়াস বানায়। এ সময় পাওয়া গিয়েছিল অ্যান্টিডিউটেরন নিউক্লিয়াস। অ্যান্টিডিউটেরন দ্বিগুণ ভরের হাইড্রোজেন ডিউটেরনের প্রতিপরমাণু।
সাধারণ হাইড্রোজেনে শুধু একটি প্রোটন থাকে। নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সঙ্গে নিউট্রন থাকলে সে হাইড্রোজেনকে বলে ডিউটেরন। ১৯৭০-এর দশকে রাশিয়ার একদল বিজ্ঞানী প্রোটন-নিউক্লিয়াস সংঘর্ষে অ্যান্টিহিলিয়ামের দেখা পান। ১৯৯৫ সালে সার্নের গবেষণাগারে তৈরি হয় প্রতিপরমাণু প্রতিহাইড্রোজেন।
কিন্তু প্রতিবস্তু তৈরি ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য কাজ। সামান্য পরিমাণ বানাতেই খরচ হয় বিলিয়ন ডলার। তার ওপর এর সংরক্ষণের কাজও জটিল। সাধারণ পদার্থ দিয়ে তৈরি কোনো পাত্রে তো আর একে রাখা যাবে না। দেখা হলেই যেখানে ধ্বংস, সেখানে একত্রে বসবাস অসম্ভব। বুদ্ধি একটা অবশ্য আছে। বিজ্ঞানীরা এ জন্য কাজে লাগান পেনিং ট্র্যাপ নামের এক যন্ত্র।
প্রতিপদার্থকে চার্জিত কণা হিসেবে তড়িৎ ও চুম্বকক্ষেত্রের সমন্বয়ে তৈরি ক্ষেত্রের মধ্যে ধরে রাখা হয়। গবেষণার কাজে সার্ন ও ফার্মিল্যাবে তৈরি হয় প্রতিবস্তু। এখানে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ ন্যানোগ্রাম প্রতিবস্তু তৈরি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এ কাজে ছাড়িয়ে গেছে সবাইকে। এ হিসাবে দেখা যায়, সব মিলিয়ে তারা তৈরি করেছে এক হাজার কোটি পজিট্রন।
প্রতিবস্তুর প্রায়োগিক ব্যবহার আছে প্রচুর। মেডিকেল ইমেজিংয়ে কাজে লাগে পজিট্রন নির্গমন। ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায় অ্যান্টিপ্রোটন। রকেটে প্রতিবস্তু ব্যবহারের প্রস্তাব ঘুরছে বিজ্ঞানীদের মাথায়। বুদ্ধিটা সরল ও চমৎকার। বস্তু ও প্রতিবস্তুর মিশ্রণ থেকে পাওয়া যাবে বিপুল শক্তি। প্রস্তাবিত যেকোনো রকেটের চেয়ে যার শক্তির ঘনত্ব হবে বেশি।
অ্যান্টিডিউটেরন দ্বিগুণ ভরের হাইড্রোজেন ডিউটেরনের প্রতিপরমাণু। সাধারণ হাইড্রোজেনে শুধু একটি প্রোটন থাকে। নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সঙ্গে নিউট্রন থাকলে সে হাইড্রোজেনকে বলে ডিউটেরন।
ফিরে আসি কণা-প্রতিকণার লড়াইয়ে। দেখা হলেই একে অপরকে ধ্বংস করে কেন এরা? কোয়ান্টাম তত্ত্বে কণারা নিছক কণাই নয়, তরঙ্গও বটে। প্রতিকণার আসলে শুধু চার্জই আলাদা নয়, তরঙ্গের চিহ্নও বিপরীত। এভাবে ভাবলেই বোঝা সহজ হয়ে যায়। সাইরেন বাজিয়ে গাড়ি কাছে এলে উচ্চ শব্দ শোনা যায়। দূরে গেলে আবার শব্দ কমে। আসলে আগের ও পরের তরঙ্গের মিলন তরঙ্গের বিস্তারকে বড় বা ছোট করে দেয়। আলোর ক্ষেত্রেও এটা হয়।
দুটি আলো নিক্ষেপ করলে কিছু জায়গায় উজ্জ্বল আর কিছু জায়গা অনুজ্জ্বল হয়। আবার বিপরীত দিক থেকে আসা আলো দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিন্দুকে অন্ধকার করেও দেওয়া সম্ভব। একই কাজ করা যায় শব্দতরঙ্গ দিয়ে। বাস্তবেও আছে। এর নাম নয়েস ক্যানসেলেশন প্রযুক্তি। এটা আসলে একটা হেডফোন। যার মধ্যে থাকে একটি নিজস্ব মাইক্রোফোন। আশপাশের নয়েসের সমান ও বিপরীত তরঙ্গ তৈরি করে শব্দকে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়।
কোয়ান্টাম তত্ত্বে কণা-তরঙ্গগুলো ফিল্ড বা ক্ষেত্রে স্পন্দিত হয়। সামুদ্রিক তরঙ্গে যেমন সমুদ্র ফিল্ড হিসেবে কাজ করে। একইভাবে ইলেকট্রন, কোয়ার্করাও ইলেকট্রন বা কোয়ার্ক ফিল্ডে স্পন্দিত হয়। ইলেকট্রন ফিল্ড একদিকে স্পন্দিত হলে, তাকে আমরা ইলেকট্রন বলি। অন্যদিকে স্পন্দিত হলে বলি পজিট্রন। কারণ, ইলেকট্রন চার্জ পায় বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। বিপরীত দিকে স্পন্দন তৈরি করে বিপরীত চার্জ। তাই দেখা হলেই এক তরঙ্গ আরেকটিকে বিনাশ করে দেয়। তাদের শক্তিটুকু ফিরে যায় বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে। তৈরি হয় গামা রশ্মি।
সামুদ্রিক তরঙ্গে যেমন সমুদ্র ফিল্ড হিসেবে কাজ করে। একইভাবে ইলেকট্রন, কোয়ার্করাও ইলেকট্রন বা কোয়ার্ক ফিল্ডে স্পন্দিত হয়। ইলেকট্রন ফিল্ড একদিকে স্পন্দিত হলে, তাকে আমরা ইলেকট্রন বলি।
কণা ও প্রতিকণার মিলনে কী তৈরি হবে, তা নির্ভর করে কণার প্রকৃতির ওপর। ইলেকট্রন ও পজিট্রনের দেখায় তৈরি হয় বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় শক্তি। আরও ভালো করে বললে, গামা রশ্মি। গামা বিকিরণ আমরা খালি চোখে দেখি না। তবে যন্ত্রে ধরা পড়ে এর অস্তিত্ব।
অবশ্য কণার ওপর নির্ভর করে শক্তির পাশাপাশি অন্য কণাও তৈরি হতে পারে। এই যেমন নিউট্রিনো ও বিভিন্ন ফ্লেভারের কোয়ার্ক। এই নতুন কণার ভর আগের কণার চেয়ে কম হবে। কারণ সোজা, কিছু ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই শক্তি থাকে মূলত তাপ ও আলো রূপে।
আমরা সাধারণত ইলেকট্রন-প্রোটনদের বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের কথা ভাবি। তবে এ কণারা অন্য বলও অনুভব করে। ইলেকট্রন অনুভব করে দুর্বল নিউক্লীয় বল। প্রোটনরা অনুভব করে দুর্বল ও শক্তিশালী নিউক্লীয় বল। বস্তু ও প্রতিবস্তুর মিলনে এই দুই ধরনের বল থেকেই শক্তি নির্গত হয়। বহুল আলোচিত হিগস বোসন আসলে একধরনের দুর্বল নিউক্লীয় বলের শক্তি।
তবে দুর্বল ও শক্তিশালী নিউক্লীয় বলের পাল্লা খুব স্বল্প। বেশি দূরত্বে থেকে এরা কাজ করতে পারে না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের পাল্লা অসীম। তবে কণাদের উচ্চ বেগ ও শক্তি প্রদান করলে অ-বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় শক্তি উৎপন্ন হতে পারে। যে কাজটা হয় সার্ন বা ফার্মিল্যাবে।
প্রতিকণা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে। হয় বিগ ব্যাংয়ের সময় কোনো অজানা কারণে আসলেই কম প্রতিকণা তৈরি হয়েছিল, নাহয় দূর মহাবিশ্বের কোথাও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে। কারণটা যা–ই হোক, আপাতত সেটাই আমাদের জন্য ভালো। দেখা হলেই যে ধ্বংস!