অদৃশ্য দৈত্য, বিকিরণ এবং এক বিজ্ঞানীর কাণ্ড

১৮৯৬ সালে ১ মার্চ তেজষ্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। তেজস্ক্রিয়তার বিজ্ঞান, আবিষ্কারক হেনরি বেকরেল ও আবিষ্কারের কাহিনি লিখেছেন বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার

শত বছরের নিঃসঙ্গতার লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একবার বলেছিলেন, ‘একটা লেখা আরেকটা লেখার জন্ম দেয়। এক বই আরেক বইয়ের জন্ম দেয়।’ কথাটা বিজ্ঞানজগতের জন্যও শতভাগ সত্য। বিজ্ঞানেও একটা আবিষ্কার আরেকটা আবিষ্কারের পথ দেখায়, উসকে দেয় অন্য বিজ্ঞানীদের চিন্তার জগৎ। তেমনি একটা ঘটনা এক্স-রে আবিষ্কার। এ যুগে এক্স-রে পাড়ার দোকানের (ক্লিনিকের) ভাত-মাছের মতো আটপৌরে ব্যাপার। চিকিৎসকের পরামর্শে চাইলেই ঝটপট প্রয়োজনীয় এক্স-রে করে ফেলা যায়। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে ঘটনাটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। সেটাই একটু বলা যাক।

মাত্র কদিন আগেই আকস্মিকভাবে রহস্যময় এক রশ্মি আবিষ্কার করেছেন জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেম রন্টজেন। সময়টা ১৮৯৫ সালের শেষ দিকের, ৮ নভেম্বর। বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালালেন তিনি এই অদ্ভুতুড়ে রশ্মি নিয়ে। কিন্তু এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা গেল না। কোনো কিছু জানা না থাকলে বা অজানা রাশিকে গণিতে এক্স (X) দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। গণিতের সেই মার্কাই ব্যবহার করে অজানা রশ্মিটিকে বিজ্ঞানী রন্টজেন নাম দিলেন এক্স-রে। বাংলায় যাকে বলা হয় এক্স-রশ্মি বা রঞ্জন রশ্মি।

নিজের গবেষণাগারে বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেল

এক্স-রে রশ্মি আবিষ্কারের প্রায় ৫০ দিন পর ঘটনাটা জনসমক্ষে প্রকাশ করলেন রন্টজেন। ভুতুড়ে রশ্মির অদ্ভুত কাণ্ডকারখানার খবরটা জার্মান পত্রপত্রিকাগুলো লুফে নিল। হুড়োহুড়ি পড়ে গেল সাংবাদিকদের মধ্যে। তাঁদের মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতার কারণে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হলো নতুন আবিষ্কারের খবরটি। চারদিকে হইচই পড়ে গেল। লোকমুখে কিছুদিনের মধ্যেই রশ্মিটির নাম দাঁড়িয়ে গেল রন্টজেন রে বা রন্টজেন রশ্মি। সেকালের সেরা প্রযুক্তি মোর্স কোডের মাধ্যমে দিন না ফুরাতেই খবর পৌঁছে গেল পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয়। ইউরোপের অন্যান্য দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলোয়ও শিরোনাম দখল করে বসল খবরটি। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন বিজ্ঞানী রন্টজেন। বেশ একটা খ্যাতির রোদ পোহাতে লাগলেন তিনি। রন্টজেনের দেখাদেখি আরও অনেকে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাইলেন। এক্স-রে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এর প্রকৃতি বোঝার চেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী। আবার ভ্যাকুয়াম টিউব ছাড়া অন্য কোথাও বা অন্য কোনো পদার্থে এক্স-রে পাওয়া যায় কি না, তা–ও তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখতে শুরু করলেন অন্য কয়েকজন গবেষক।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বসে এক সকালে বেশ আয়েশ করে খবরটা পড়লেন অ্যান্টনি হেনরি বেকেরেল। সে দেশের সেতু ও মহাসড়ক বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী তিনি। কিন্তু খবরটা পড়ে একটু নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলেন হেনরি। বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লেন—একবার, দুবার করে বেশ কয়েকবার। তাঁর মধ্যেও চাপা একটা উত্তেজনা দেখা দিল ভুতুড়ে রশ্মির আবিষ্কারের খবরে।

সেকালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রতি সপ্তাহে পদার্থবিজ্ঞানের একটা সভা বসত দেশটির নামকরা একাডেমি দ্য হিস্ট্রি ন্যাচারেলিতে (ফ্রান্স মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি)। বিজ্ঞানে, বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহী অনেকেই ছিলেন ওই সভার নিয়মিত দর্শক-শ্রোতা। এ দলের একজন ছিলেন বেকেরেলও। পারতপক্ষে কোনো সভা বাদ দেন না। আরও বিস্তারিত বললে, ওই প্রতিষ্ঠানের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। তাঁর দাদা অ্যান্টনি বেকেরেল এবং বাবা আলেকজান্ডার-এডমন্ড বেকেরেল একসময় ওই চেয়ারে প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৮৯১ সালে এডমন্ড বেকেরেল মারা যাওয়ার পর এ পদে দায়িত্ব নেন ছেলে হেনরি বেকেরেল। এ দায়িত্বের পাশাপাশি সেতু ও মহাসড়ক বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বও পালন করতেন তিনি। হেনরির পর এ পদের দায়িত্ব নেন তাঁরই ছেলে জেন বেকেরেল। ১৯৪৮ সালে জেন অবসর নেওয়ার পর দীর্ঘ ১১০ বছর পর গুরুত্বপূর্ণ পদটি বেকেরেল পরিবারের বাইরের কেউ দায়িত্ব পান।

কুরি দম্পতির সঙ্গে হেনরি বেকেরেল (বাঁমে)

যাহোক, ১৮৯৬ সালের ২০ জানুয়ারিতে বসল একটি সভা। স্বাভাবিকভাবেই সেদিন বিশেষ করে আলোচিত হলো রন্টজেনের সদ্য আবিষ্কৃত এক্স-রে সম্পর্কে। জানা গেল, ভ্যাকুয়াম টিউব বা ক্যাথোড রে টিউবের কাচের দেয়ালে ক্যাথোড রশ্মি ধাক্কা খেলে সেখানে একটা প্রতিপ্রভার সৃষ্টি হয়। সেখান থেকেই অজানা এক্স-রশ্মি বেরিয়ে আসে। এ আলোচনা শুনে বেকেরেলের চাপা উত্তেজনার আগুনে আরেকটু ঘি পড়ল বইকি।

সভা শেষে সেদিন প্রায় সবাই বাড়ি ফিরতে লাগলেন মাথায় করে এক্স-রের ভাবনা নিয়ে। রহস্যময় রশ্মিটা কী হতে পারে, তারই সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অনেকেই নিজের মতো একেকটা তত্ত্ব খাড়া করতে লাগলেন। আর বিজ্ঞানী রন্টজেনের চেয়েও নতুন আর বড় কিছু একটা আবিষ্কার করার আকাশকুসুম কল্পনা ভর করল অনেকের মাথায়।

নিজের মতো একটা হাইপোথিসিস খাড়া করেছিলেন প্রকৌশলী হেনরি বেকেরেলও। তিনি ভাবলেন, বৈদ্যুতিক নির্গমনে ক্যাথোড রে টিউবে প্রতিপ্রভা থেকে যদি নতুন রশ্মির সৃষ্টি হয়, তাহলে কোনো প্রতিপ্রভা পদার্থ থেকেও কি এমন কোনো রশ্মি বেরিয়ে আসতে পারে? প্রতিপ্রভা পদার্থ নিয়ে আগে কিছু কাজ করেছিলেন তিনি। সত্যি বলতে গেলে, পারিবারিকভাবেই তিন পুরুষ ধরে এ বিষয়ে গবেষণা করছিলেন তাঁরা। তাই সে সম্পর্কে বেশ ভালোই ধারণা ছিল তাঁর। প্রতিপ্রভা এমন ধরনের পদার্থ, যেগুলো সূর্যের বা অন্য কোনো আলো শোষণ করে, পরে সেই আলো বিকিরণ বা নিঃসরণ করতে পারে।

এভাবে অন্য বিজ্ঞানীরা যখন অন্য পদার্থে বা অন্য কোনো উপায়ে এক্স-রের খোঁজ শুরু করলেন, ঠিক তখন তিনি বেছে নেন প্রতিপ্রভা পদার্থ। দিন কয়েকের মধ্যেই দাদার সময় থেকে প্যারিসের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে প্রতিপ্রভা পদার্থের খোঁজ করতে লাগলেন তিনি। যেখানে যা পেলেন, তার সব জড়ো করতে লাগলেন।

প্রতিপ্রভা পদার্থ নিয়ে তাঁর এই কাজের পেছনে কারণও ছিল যথেষ্ট। ভ্যাকুয়াম টিউবের জন্য দরকার হয় বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি। তা বেশ ব্যয়বহুল। আবার তাঁর কাছে কোনো ক্যাথোড রে টিউবও ছিল না। অবশ্য তার প্রয়োজনও বোধ করেননি তিনি। কারণ, তাঁর কাছে পর্যাপ্ত প্রতিপ্রভা পদার্থ ছিল। প্রতিপ্রভা পদার্থের সুবিধা হলো, এ থেকে বিকিরণ পেতে তেমন কিছুর দরকার হয় না। স্রেফ রোদে ফেলে রাখলেই হলো। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এই প্রতিপ্রভা পদার্থের ওপর পড়লে পদার্থটি উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করে। সে কারণে একটা পরীক্ষার জন্য যতগুলো সম্ভব প্রতিপ্রভা পদার্থ জোগাড় করলেন বেকেরেল। সেগুলোকে একে একে রোদে রেখে কাগজে মুড়ে নিলেন। এরপর অন্ধকার ঘরে ওই কাগজে মোড়ানো পদার্থটি রেখে দিলেন একটা ফটোগ্রাফিক প্লেটের কাছে।

যৌগটিকে আগের নিয়মে সূর্যের আলোয় ফেলে রাখলেন বেকেরেল। এরপর একটা কালো কাগজে তা মুড়িয়ে অন্ধকার ঘরে একটা ফটোগ্রাফিক প্লেটের কাছে রেখে দিলেন তিনি। এই আভা যদি সাধারণ আলো হয়, তাহলে তা কালো কাগজ ভেদ করে বেরিয়ে আসার কথা নয়। আবার তার ফলে পাশে রাখা ফটোগ্রাফিক প্লেটও অপরিবর্তিত থাকার কথা। কিন্তু ওই আভায় যদি এক্স-রশ্মি থাকে, তাহলে সেটি কাগজ ভেদ করে বেরিয়ে আসবে
আরও পড়ুন

তাঁর ধারণা ছিল, ওই সব পদার্থ থেকে যদি এক্স-রে নিঃসৃত হয়, তাহলে তা ফটোগ্রাফিক প্লেটের রাসায়নিককে গাঢ় করে তুলবে। প্লেটগুলো ডেভেলপ করা হলে সেখানে দাগ দেখা যাওয়ার কথা। গোটা একটা সপ্তাহ সব কটি পদার্থ নিয়ে একে একে পরীক্ষা করলেন তিনি। এরপর যথারীতি ফটোগ্রাফিক প্লেটগুলো একে একে ডেভেলপও করা হলো। কিন্তু ভাবনামতো তেমন ফল পাওয়া গেল না। একটু যেন হতাশই হলেন হেনরি বেকেরেল। নতুন করে ভাবতে বসলেন আবারও।

কদিন পর, অর্থাৎ ৩০ জানুয়ারি পত্রিকায় এক্স-রে বিষয়ে একটা আর্টিকেল পড়ে নতুন আশা জাগল তাঁর। সেটি পড়েই তিনি সেকালের ব্যয়বহুল প্রতিপ্রভা যৌগ কেনার চেষ্টা শুরু করলেন। যৌগটি ছিল ইউরানিল পটাশিয়াম সালফেট (UO2SO4), যা আসলে ইউরেনিয়ামের একটা সালফেট। হলুদ রঙের বালুর মতো কঠিন এক বস্তু। এ যৌগের ভেতরের ইউরেনিয়াম সূর্যের অতিবেগুনি আলোতে রাখা হলে, তা পরে আলো নিঃসরণ করে। ঠিক যেন জোনাকির মতো। বেকেরেল নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, যৌগটি কি এক্স-রশ্মি নিঃসরণ করে? সেটাই যাচাই করতে এই ইউরানিল পটাশিয়াম সালফেট নিয়ে এবার আগের নিয়মে পরীক্ষাটি করে দেখলেন। এবার ফলাফল পাওয়া গেল একেবারে হাতেনাতে। চোখে–মুখে খুশির আলো ছড়িয়ে পড়ল বেকেরেলের।

যৌগটিকে আগের নিয়মে সূর্যের আলোয় ফেলে রাখলেন বেকেরেল। এরপর একটা কালো কাগজে তা মুড়িয়ে অন্ধকার ঘরে একটা ফটোগ্রাফিক প্লেটের কাছে রেখে দিলেন তিনি। এই আভা যদি সাধারণ আলো হয়, তাহলে তা কালো কাগজ ভেদ করে বেরিয়ে আসার কথা নয়। আবার তার ফলে পাশে রাখা ফটোগ্রাফিক প্লেটও অপরিবর্তিত থাকার কথা। কিন্তু ওই আভায় যদি এক্স-রশ্মি থাকে, তাহলে সেটি কাগজ ভেদ করে বেরিয়ে আসবে। প্রমাণ হিসেবে ফটোগ্রাফিক প্লেট ডেভেলপ করা হলে তাতে দাগও দেখা যাবে।

সত্যি সত্যিই পরীক্ষায় ফটোগ্রাফিক প্লেটে গাঢ় দাগ পড়তে দেখা গেল। এত দিন পর প্রথমবারের মতো সফল হয়ে আনন্দে নেচে উঠল বেকেরেলের মন। তিনি ভাবলেন, ওই আভার মধ্যে নিশ্চয়ই এক্স-রশ্মি পাওয়া গেছে। এভাবে রন্টজেনের মতো কোনো রকম জটিল ও ব্যয়বহুল ভ্যাকুয়াম টিউব সেটআপ ব্যবহার না করেই এক্স-রে পেয়েছেন বলে ভেবে বসলেন তিনি। কিন্তু তাঁর ভাবনাটা ছিল আসলে ভুল। তিনি নিজেও জানতেন না, হাজার বছর ধরে পরমাণুর গহিনে লুকিয়ে বা ঘুমিয়ে থাকা এক দৈত্যের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে বসেছেন তিনি।

এ বিষয়ে একটা গবেষণা প্রবন্ধ লিখতে মনস্থির করলেন বেকেরেল। তবে ঘটনাটা সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে চাইলেন। সে জন্য আরেকবার চেষ্টা করে দেখা দরকার বলে ভাবলেন তিনি। ২৬ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার পরীক্ষার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা। সারা দিন সূর্যের দেখা পাওয়া গেল না। তার পরের কয়েক দিনও অবস্থার তেমন উন্নতি হলো না। আকাশে সূর্যের মুখ দেখা গেল না আগের মতোই।

সত্যি সত্যিই পরীক্ষায় ফটোগ্রাফিক প্লেটে গাঢ় দাগ পড়তে দেখা গেল। এত দিন পর প্রথমবারের মতো সফল হয়ে আনন্দে নেচে উঠল বেকেরেলের মন। তিনি ভাবলেন, ওই আভার মধ্যে নিশ্চয়ই এক্স-রশ্মি পাওয়া গেছে
আরও পড়ুন

আরেকটা ফটোগ্রাফিক প্লেটের পাশে কালো কাগজে মোড়ানো যৌগটি রেখে সূর্যের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বেকেরেল। প্রতিদিনই ভাবেন, সূর্য উঠলেই যৌগটা রোদে ফেলে রাখবেন। কিন্তু টানা কয়েক দিন সূর্যের দেখা না পেয়ে একসময় বিরক্ত হয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু তারপরও কী ভেবে ফটোগ্রাফিক প্লেটটা ডেভেলপ করলেন। তিনি দেখতে চাইছিলেন, কয়েক দিন আগে সূর্যের আলোয় যৌগটি রাখার ফলে সেটা থেকে কিছু বিকিরণ এখনো বেরিয়ে আসে কি না।

অবাক কাণ্ড! ডেভেলপ করা ফটোগ্রাফিক প্লেটটিতে আগের চেয়ে আরও বেশি দাগ দেখা গেল। বোঝা গেল, সূর্যের আলোতে না রেখেও যৌগটি থেকে বিকিরণ নিঃসরণ হয়েছে। আসলে পরবর্তী সময়ে আরও কিছু পরীক্ষায় দেখা গেল, যৌগটি সব সময়ই বিকিরণ নিঃসরণ করে। তাঁর পরীক্ষাগুলোর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে, এক্স-রে নিঃসরণে ফটোগ্রাফিক প্লেটের ওপর গাঢ় দাগ ফেলার পেছনের কারণ আসলে প্রতিপ্রভা যৌগ নয়। কারণ, অনেকগুলো প্রতিপ্রভা পদার্থের মধ্যে কেবল একটাই ফটোগ্রাফিক প্লেটে দাগ সৃষ্টি করতে পেরেছে। আর সেটা হলো ইউরেনিয়ামের সালফেট যৌগ।

এভাবে আসলে মৌলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক ঘুমন্ত দৈত্যকে আবিষ্কার করে বসেন বেকেরেল। সেটা এক্স-রে নয়, সম্পূর্ণ নতুন একধরনের রশ্মি। কিন্তু সেটা কী, তা জানতেন না বেকেরেল। বেশ কিছুদিন সেটা তাঁর কাছে রহস্য হয়ে রয়ে গেল। কারণ, এ বিষয়ে ১৮৯৭ সালে একটা গবেষণাপত্র লেখার পর অন্য বিষয়ে মনোযোগ দেন বেকেরেল। এক্স-রে মাতামাতি কিংবা রন্টজেনের রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার পেছনেও একটা কারণ ছিল। সেটা হলো, চিকিৎসাক্ষেত্রে এক্স-রের ব্যবহারিক সম্ভাবনা দেখা গেল। কিন্তু ইউরেনিয়াম যৌগ নিয়ে তেমন কোনো সম্ভাবনা পাওয়া গেল না। এর ফলে অনেকটাই চাপা পড়ে যায় ইউরেনিয়াম যৌগ থেকে বেরিয়ে আসা রহস্যময় রশ্মি নিয়ে। অবশেষে পোল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে পড়তে আসা তাঁরই এক শিক্ষার্থী উদ্‌ঘাটন করলেন সেই রহস্যের। তিনি পোলিশ বংশোদ্ভূত ফরাসি বিজ্ঞানী মেরি স্কোলদোভস্কা কুরি।

১৮৯৮ সালে মেরি কুরি প্রমাণ করলেন, ওই যৌগের মধ্যে ইউরেনিয়াম পরমাণু সক্রিয়ভাবে এই বিকিরণ নিঃসরণের জন্য দায়ী। ইউরেনিয়ামকে একটা রেডিওঅ্যাকটিভ বা তেজস্ক্রিয় উপাদান হিসেবে নামকরণ করলেন কুরি। তিনি আরও প্রমাণ করলেন, থোরিয়াম নামের আরেকটি মৌলও তেজস্ক্রিয়। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯০৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান হেনরি বেকেরেল। অবশ্য তাঁর সঙ্গে সেবার পুরস্কারে ভাগ বসান কুরি দম্পতি—মেরি কুরি ও তাঁর স্বামী পিয়েরে কুরি।

আরও পরে দেখা গেল, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম তিন ধরনের বিকিরণ নিঃসরণ করে। চুম্বকের উপস্থিতি এই বিকিরণের কয়েকটি একদিকে সামান্য একটু বেঁকে যায়। আর বিকিরণের কিছু অংশ আরেক দিকে বেঁকে যায় এবং তা অনেক বেশি পরিমাণে। কিন্তু বিকিরণের একটা অংশ তারপরও সোজা পথে চলতে থাকে, যেন সেখানে কোনো চুম্বকের উপস্থিতি নেই। নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড এই তিন বিকিরণকে গ্রিক বর্ণমালার তিনটি বর্ণ দিয়ে নামকরণ করলেন। যে বিকিরণ একটু বেঁকে যায়, তার নাম দিলেন গ্রিক বর্ণমালার প্রথম বর্ণ দিয়ে আলফা রে বা আলফা রশ্মি। যে বিকিরণ আরেকটু বেশি বেঁকে যায়, তার নাম দিলেন দ্বিতীয় বর্ণ দিয়ে বিটা রে বা বিটা রশ্মি। আর যে বিকিরণ কোথাও বেঁকে যায় না, তৃতীয় বর্ণ অনুযায়ী তার নামকরণ করা হলো গামা রে বা গামা রশ্মি। সেটা আরেক গল্প। আরেক দিনের জন্য তোলা রইল।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: নিউক্লিয়ার পাওয়ার/আইজ্যাক আসিমভ

অ্যাটমিক অ্যাওকেনিং/জেমস মাহাফি

উইকিপিডিয়া