লোকটার সঙ্গে বজলুর পরিচয় একটা চায়ের টংদোকানে। চা-সিগারেট খেয়ে বিল দিতে গিয়ে দেখে পকেটে মানিব্যাগ নেই। কী আশ্চর্য! এখন উপায়? এই এলাকা তার পরিচিত না। চা–ওলাও পরিচিত না যে বলবে, ‘ভাই, মানিব্যাগ ভুলে বাসায় ফেলে এসেছি, পরে দিয়ে যাব।’ ঠিক তখনই একটা লোক পাশ থেকে বলল,
—আমি বিল দিয়ে দিয়েছি।
—আপনি দিয়েছেন মানে...। লোকটা মৃদু হাসল, বলল,
—এ রকম হতেই পারে। আমার প্রায়ই হয় এমনটা...মানিব্যাগ ভুলে ফেলে আসি, আজ যেমন আপনার হলো।
—সত্যি কী বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাব আপনাকে।
—ছ–টাকার এক কাপ চায়ের দাম দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে না; বরং অন্য একদিন চা খাইয়ে দেবেন আমাকে, ঠিক আছে? আমি এখানে এসে প্রায়ই চা খাই।
তারপর সত্যি সত্যি আবার একদিন এই লোকটার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওই টংদোকানেই। আসলে লোকটার সঙ্গে দেখা হবে বলেই এসেছিল বজলু এখানে। এসে দেখে, ঠিকই ওই লোক বসে চা খাচ্ছে। তাকে দেখে পরিচিতির ভঙ্গি করল। বজলুকে বিল দিতে দিলই না। বলল, ‘মনে করুন আবার মানিব্যাগ ফেলে এসেছেন, হা হা হা।’ তারপর ধীরে ধীরে ভালোই ঘনিষ্ঠতা হলো বজলুর সঙ্গে লোকটার।
তারপর সত্যি সত্যি আবার একদিন এই লোকটার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওই টংদোকানেই। আসলে লোকটার সঙ্গে দেখা হবে বলেই এসেছিল বজলু এখানে। এসে দেখে, ঠিকই ওই লোক বসে চা খাচ্ছে।
একদিন বজলু জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কী করেন?’
লোকটা হাসল। বলল, ‘বিশ্বাস করবেন কী করি বললে?’
—করব না কেন?
—তাহলে বলি, আমি আসলে একজন কনভার্টার।
—কনভার্টার? মানে কী?
—মানে ধরেন...বিষয়টা একটু জটিল। বুঝিয়ে বলব?
—বলেন।
—ধরেন আপনি...আপনার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, উচ্চতা আছে। আছে না?
—আছে। মাথা নাড়ে বজলু।
—সময়কে যদি ধরি, তাহলে আপনার মাত্রা চারটি।
—হ্যাঁ, হিসাবে তা–ই তো।
—এখন আমার কাজ হচ্ছে চার মাত্রার মানুষকে দুই মাত্রায় নিয়ে আসা।
কথা হচ্ছিল লোকটার বাসায় বসে। লোকটার বাসাভর্তি ছোট-বড় বাঁধানো ছবি, সব মানুষের ছবি।
—এ ছবিগুলো দেখেন।
—দেখলাম। এত ছবি কেন? কাদের ছবি? এরা কারা?
—এরা এখন দুই মাত্রার মানুষ। একসময় আপনার-আমার মতো তিন মাত্রার মানুষ ছিল, সময়কে ধরলে চার মাত্রা। এখন এরা সব দুই মাত্রার মানুষ। লোকটা মিটিমিটি করে হাসে। কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ বজলুর কেমন যেন ভয় লাগে। সে বলে, ‘আমি আজ যাই।’
—যাবেন কেন, বসেন। চা খান।
—না, যাই।
একসময় আপনার-আমার মতো তিন মাত্রার মানুষ ছিল, সময়কে ধরলে চার মাত্রা। এখন এরা সব দুই মাত্রার মানুষ। লোকটা মিটিমিটি করে হাসে। কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ বজলুর কেমন যেন ভয় লাগে।
বজলু উঠে দাঁড়নোর চেষ্টা করে। কী আশ্চর্য! উঠতে পারছে না, কী হলো তার! তখনই বজলু খেয়াল করল, সে যে চেয়ারটায় বসেছে সেই চেয়ারটা একটু যেন অদ্ভুত ধরনের। চেয়ারটা তাকে এখন উঠতে দিচ্ছে না কেন? বসার সময় মনে হয়নি চেয়ারটা অদ্ভুত ধরনের। এখন সত্যিই উঠতে পারছে না কেন? কী হলো তার? লোকটা কিন্তু উঠে দাঁড়ায়, পাশের ঘরে যেতে যেতে বলে।
—বজলু সাহেব, অনেক দিন তো থাকলেন চতুর্থ মাত্রার জগতে। দ্বিমাত্রা জগতে চলুন, ভালো লাগবে...
* * *
দেয়ালের একটা ফটো ফ্রেম থেকে বজলু তাকিয়ে দেখে লোকটাকে। লোকটা একটা নতুন মানুষকে নিয়ে ঢুকল ঘরে। সে যেই চেয়ারটায় বসে ছিল, সেই চেয়ারটায় বসাল নতুন মানুষটাকে। লোকটার মুখে মিটিমিটি হাসি। লোকটা নতুন মানুষটার সঙ্গে কথা বলছে। কথাগুলো বজলু ঠিক বুঝতে পারছে না। তবে লোকটার ঠোঁট নাড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে বলছে, ‘আমি একজন কনভার্টার...আমার কাজ হচ্ছে চার মাত্রার মানুষকে দুই মাত্রায় নিয়ে আসা...কী, বিশ্বাস হচ্ছে না ...?’
