ডপেলগ্যাঞ্জার

অলংকরণ: আরাফাত করিম

পাঁচ দিন পর অফিসে গিয়ে রীতিমতো চমকে গেল রিয়াদ। এই কদিন জ্বরে ভুগেছে। একেবারে হাড়কাঁপানো জ্বর। বলতে গেলে হুঁশ ছিল না রিয়াদের। রমিজা খালা মাথায় পানি ঢেলেছে, কখনো কয়েক চামচ স্যুপ খাইয়ে দিয়েছে, একবার মনে হয় ঘামে ভেজা সপসপে গেঞ্জিও পাল্টে দিয়েছে। কিছুই ঠাওর করতে পারেনি সে। এ রকম জ্বর তার আগে কখনো হয়নি। তো জ্বর থেকে উঠে দুর্বল শরীরে অফিসের জন্য রেডি হওয়ার সময় রমিজা খালা হা হা করে উঠেছিল আজ সকালে, ‘আইজই অপিস যাইতে অইব ক্যান? আরও দুই দিন শুইয়া থাকেন। অখনো শরীলডা পুরা ঠিক অয় নাই।’

শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে রিয়াদ বলেছিল, ‘না খালা। যেতে হবে। অনেক জরুরি কাজ পড়ে আছে। তা ছাড়া কাল তো শুক্রবার, কাল আবার রেস্ট নেওয়া যাবে।’

তবে অফিসে যাওয়ার জন্য মেট্রো ধরতে গিয়ে ভালোভাবেই সে টের পেল যে শরীরটা এখনো ঠিক হয়নি। মাথা ঘুরছে। কদম এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মাথার ভেতরটা কেমন খালি হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই অফিসে ঢুকে তার পাশের ডেস্কে বসা নতুন মেয়েটিকে দেখে মাথাটা আরও এলোমেলো হয়ে গেল। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। সে কি জ্বরের ঘোরে ভুল দেখছে নাকি? সহকর্মী জিসান কানাডা ইমিগ্র্যান্ট হয়ে চলে যাওয়ার পর এই জায়গায় নতুন একজনকে নেওয়া হয়েছে, তা সে আগেই শুনেছিল। কিন্তু ইরা? তা কীভাবে সম্ভব? রিয়াদ বোকার মতো ইরার দিকে তাকিয়ে রইল।

আরও পড়ুন
শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে রিয়াদ বলেছিল, ‘না খালা। যেতে হবে। অনেক জরুরি কাজ পড়ে আছে। তা ছাড়া কাল তো শুক্রবার, কাল আবার রেস্ট নেওয়া যাবে।’

মেয়েটা ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তার পরনে হালকা বেগুনি রঙের একটা সুতি শাড়ি, চুলগুলো ছাড়া, একটু কোঁকড়ানো। ইরা কখনো শাড়ি পরত না। ওর চুলও এতটা কোঁকড়া ছিল না। তবু চিনতে একটুও ভুল হচ্ছে না। প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠে রিয়াদ এবার সামনে এগিয়ে গেল। নাম ধরে ডাকতে যাবে, ঠিক তখনই মেয়েটা হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চয় রিয়াদ হাসান। দুই দিন হয় জয়েন করেছি, অথচ আপনার সঙ্গে আজই প্রথম দেখা হচ্ছে। ছুটিতে ছিলেন? সিক?’

রিয়াদ থতমত খেয়ে গেল। ইরা তাকে চিনতে পারেনি? আজই প্রথম দেখা হচ্ছে তাদের? কী আবোলতাবোল বলছে এসব?

মেয়েটা এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি নীরা। পরশু জয়েন করেছি। এটাই প্রথম চাকরি। কোনো অভিজ্ঞতা নেই। একটু শিখিয়ে-টিখিয়ে দেবেন।’

নীরা? ও তাহলে ইরা নয়? সত্যিই তো, ইরা কীভাবে এখানে আসবে? আজ থেকে সাত বছর আগে ইরা দেশ ছেড়েছে। স্বামী–সন্তান নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হয়েছে। রিয়াদ শুনেছে যে স্বামীর সঙ্গে সিডনি গিয়ে ইরা মাস্টার্স করেছে, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করে এখন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। এই ফালতু অ্যাড ফার্মে কেন সে চাকরি করতে আসবে? তাহলে এই মেয়েটি কে? ইরার তো কোনো বোনও নেই!

আরও পড়ুন
নাম ধরে ডাকতে যাবে, ঠিক তখনই মেয়েটা হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চয় রিয়াদ হাসান। দুই দিন হয় জয়েন করেছি, অথচ আপনার সঙ্গে আজই প্রথম দেখা হচ্ছে। ছুটিতে ছিলেন? সিক?’

বাকি সারাটা দিন ইরার মতো হুবহু দেখতে নীরা নামের মেয়েটা পাশে বসে বকবক করে গেল। কীভাবে সে এই চাকরি পেল। চাকরিটা ওর কত দরকার ছিল। বাড়িতে বাবা অসুস্থ। স্ট্রোক করে বিছানায়। তা স্ট্রোক করবেই–বা না কেন, কোনো কথা শোনে না। ডায়াবেটিস আছে, তবু মিষ্টি খায় যখন-তখন। প্রেশারের ওষুধ খেতে ভুলে যায়। এখন প্যারালাইসিস হয়ে শয্যাশায়ী। বোঝো এখন মজা ইত্যাদি ইত্যাদি। রিয়াদ হতভম্ব হয়ে শুনল। ইরাও অনেক কথা বলত। কথা শুরু হলে আর থামতে পারত না। নিতান্ত অপরিচিত কাউকেও অনর্গল নিজের কথা অকপটে বলে যেতে পারত সে। সত্যি কি তাহলে এই মেয়ে ইরা নয়? ওহ্‌, ইরার তো বাবাই নেই। কিশোরী বয়সেই তার বাবা মারা গেছেন। তার পর থেকে ভাইয়ের কাছে মানুষ।

‘আমার কোনো ভাই নেই, বুঝলেন,’ নীরা নামের মেয়েটি এখনো বকবক করছে। ‘আমি বাসার বড় মেয়ে। সব দায়িত্ব এখন আমার। বাবার ওষুধের পেছনেই মাসে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। কী আর করা! শিল্পী হওয়ার ইচ্ছা ছিল একসময়। বেশ কটি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছি, জানেন? কিন্তু সব ছেড়েছুড়ে এখানে জয়েন করতে হলো। তা–ও ভাগ্যিস চাকরিটা দীপু ভাই জোগাড় করে দিল। দীপু ভাইকে চেনেন তো? চারুকলার দীপু ভাই? উনি বলে না দিলে তো আমার চাকরিটাই হতো না। আমার তো কোনো এক্সপেরিয়েন্স নেই অ্যাড ফার্মে কাজ করার।’

রিয়াদ একটা নিশ্বাস ফেলল গোপনে। এ তো আসলে পুরাই ইরা; কিন্তু ইরা নয়। পৃথিবীতে এমন আশ্চর্য ঘটনাও ঘটে! বিকেলের দিকে রিয়াদের আবার শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করল। কেমন দুর্বল লাগছে, মাথা ঘুরছে একটু। বমিও পাচ্ছে। সে উঠে গিয়ে বসকে বলে এল, আগেভাগে বাড়ি চলে যেতে চায়। শরীরটা পুরোপুরি সারেনি। ফিরে এসে দেখে, নীরা নামের মেয়েটা উদ্বিগ্ন হয়ে বসে আছে।

আরও পড়ুন
রিয়াদ হতভম্ব হয়ে শুনল। ইরাও অনেক কথা বলত। কথা শুরু হলে আর থামতে পারত না। নিতান্ত অপরিচিত কাউকেও অনর্গল নিজের কথা অকপটে বলে যেতে পারত সে।

‘প্রেশার কমে গেছে মনে হয়? স্যালাইন গুলে দেব? জ্বরের পর এমন হয়, প্রেশার কমে যায়। ডাব খেতে হয় অনেক। বাসায় যেতে পারবেন একা? উবার ডেকে দেব?’

উবার ডাকার মতো সংগতি নেই রিয়াদের। মেট্রোই ভরসা। আল্লাহ ভরসা। রওনা দেওয়া যাক। কিন্তু বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে গেল রিয়াদ। মনে হচ্ছে, অজ্ঞান হয়ে যাবে। বমিও হলো একবার। বাসায় ঢুকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে গেল সে। তারপর কোনো কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরতে দেখে, সে হাসপাতালে। পাশে বন্ধু তন্ময় বসে আছে।

চোখ মেলতে তন্ময় বলল, ‘তুই এত অসুস্থ, আমাকে জানাসনি কেন? ভাগ্যিস রমিজা খালা তোর ফোন নিয়ে কল করছিল।’

রিয়াদ দুর্বল গলায় বলল, ‘তুই ডাক্তার মানুষ। ব্যস্ত থাকিস। ডিস্টার্ব করতে চাইনি।’

‘অসুস্থ হলে তো মানুষ ডাক্তারকেই আগে ফোন করে। কী আশ্চর্য! শোন, তোর কয়েকটা টেস্ট করতে দিতে হবে। টাইফয়েড হলে সাধারণত মানুষ এমন জ্বরের ঘোরে অচেতন হয়ে যায়। মেনিনজাইটিস বা এনকেফালাইটিসও হতে পারে। মাথাব্যথা আছে? ঘাড়ব্যথা?’

রিয়াদের মনে পড়ল, প্রচণ্ড ঘাড়ব্যথা করছিল গত দু–এক দিন। চোখও ঝাপসা লাগছিল আজ কাজ করার সময়।

সিস্টার এসে রক্ত নিয়ে গেল। কী একটা ইনজেকশন পুশ করে গেল। স্যালাইন ঝুলছে। রিয়াদ উঠে বসার চেষ্টা করল একটু।

‘তোর কাজ নেই?’ তন্ময়কে বলল রিয়াদ। ‘তুই কাজে যা। আমি ঠিক আছি।’

তন্ময় গম্ভীর মুখে একটা পত্রিকা পড়ছিল। মুখ না তুলেই বলল, ‘না, আজ আমার ডে অফ।’

একটু ইতস্তত করে বলল রিয়াদ, ‘তোকে একটা কথা বলা দরকার। মনে হয় জ্বরের ঘোরে আমি ভুল দেখেছি। তবু বলা দরকার। মাথা আউলায়ে গেছে মনে হয়।’

আরও পড়ুন
উবার ডাকার মতো সংগতি নেই রিয়াদের। মেট্রোই ভরসা। আল্লাহ ভরসা। রওনা দেওয়া যাক। কিন্তু বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে গেল রিয়াদ। মনে হচ্ছে, অজ্ঞান হয়ে যাবে।

তন্ময় মুখ তুলে তাকালে রিয়াদ তাকে ইরার ডুপ্লিকেট নীরা মেয়েটার কথা বলল। তার মনে পড়ল, ডুপ্লিকেট নামে একটা সিনেমাও আছে, যেখানে নায়কের মতো দেখতে ভিলেন ছিল একটা। ভিলেনের সব অপকর্মের দায় নায়কের ঘাড়ে এসে পড়ত। কিন্তু এটা তো সিনেমা নয়। বাস্তবে কি এমনটা ঘটা সম্ভব?

‘তুই বলতে চাচ্ছিস যে গোটা একটা দিন তোর ওই মেয়েটাকে ইরাই মনে হয়েছে? অল্প সময়ের বিভ্রান্তি নয়? পুরা দিন ধরে?’

‘মোটেও কোনো বিভ্রান্তি বা ভুল দেখা নয়। মেয়েটা ইরার মতো দেখতে, ইরার মতো করেই কথা বলে। খুব সামান্য কিছু পার্থক্য আছে। ড্রেসআপ আর ফ্যাশন সেন্সে। কিন্তু ইরাই বলা যায়।’

‘অথচ সে আসলে ইরা নয়?’

‘হুম।’

তন্ময় একটু নড়েচড়ে বসল। গম্ভীর মুখে বলল, ‘আমি শুনেছি, পৃথিবীতে এক ট্রিলিয়ন মানুষের মধ্যে একজন লুক অ্যালাইক থাকতে পারে। মানে আইডেনটিক্যাল টুইন বাদে দেখতে হুবহু একজনের মতোই আরেকজন। বিজ্ঞানে একে বলে ডপেলগ্যাঞ্জার। রহস্যজনকভাবে এদের কিছু জেনেটিক সিমিলারিটি থাকে। কেন এমন হয়, তা কেউ জানে না। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।’

‘কী?’ রিয়াদ উৎসুক হলো।

অলংকরণ: আরাফাত করিম

‘আমার মনে হয়, পুরো জিনিসটাই তোর মস্তিষ্কের বানানো। তোর পাশে বসা নতুন কলিগটি মোটেও ইরার মতো দেখতে নয়। সে অন্য যে কেউ। তোর তখন ডিলিউশন হচ্ছিল। মানে বিভ্রান্তি। জ্বরের পর এমনটা হতে পারে। তোর আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। ব্রেনের ভেতর কোনো ইনফেকশন হয়েছে কি না, কে জানে।’

রিয়াদ একটু দমে গিয়ে বলল, ‘এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার টাকা আমার নেই। আমাকে ছেড়ে দে। আমি সুস্থ আছি।’

‘উঁহু। ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং। এই রোগের একটা নামও আছে। ক্যাপগ্রাস সিনড্রোম। এই রোগ হলে কোনো একজনকে নিজের খুব আপনজনের মতো দেখতে মনে হয়।

সাধারণত সিজোফ্রেনিয়া হলে বা মাথায় আঘাত পেলে এ ধরনের সিনড্রোম দেখা দিতে পারে। দাঁড়া, আমার এক বন্ধু আছে নিউরোলজিস্ট। সে আরও ভালো বুঝতে পারবে, তোর এই রোগ হয়েছে কি না। তবে তার আগে দেখতে হবে, ওই মেয়ে আসলেই ইরার মতো দেখতে কি না।’

‘তুই কাল আমার অফিসে চলে যা। আজ শুক্রবার। শনিবার আমাদের অফিস খোলা থাকে হাফ বেলা। মেয়েটার নাম নীরা। তুই দেখা করে আয়।’

আরও পড়ুন
‘মোটেও কোনো বিভ্রান্তি বা ভুল দেখা নয়। মেয়েটা ইরার মতো দেখতে, ইরার মতো করেই কথা বলে। খুব সামান্য কিছু পার্থক্য আছে। ড্রেসআপ আর ফ্যাশন সেন্সে। কিন্তু ইরাই বলা যায়।’

পরদিন বিকেলে তন্ময় আরও একজনকে সঙ্গে করে নিয়ে এল। রিয়াদের কেবিনে ঢুকে প্রথমে পরিচয় করিয়ে দিল সে, ‘এই যে তোকে যার কথা বলেছিলাম। রূপম, আমার বন্ধু। নিউরোলজিস্ট।’

রিয়াদ বেডে উঠে বসে বলল, ‘তুই কি আমার অফিসে গিয়েছিলি?’

তন্ময় মুখ কালো করে বলল, ‘হ্যাঁ।’

রিয়াদ হেসে বলল, ‘ইরার মতো দেখতে মেয়েটাকে দেখেছিস, তাই না?’

‘হুম। হুবহু ইরা। কথা বলার ভঙ্গিও ইরার মতোই। আমাকে চিনতে পারেনি। আমি তোর বন্ধু শুনে তোর কথা জিজ্ঞাসা করল। কেমন আছিস–টাছিস এই সব।’

‘তোকে চিনবে কেন? ও তো ইরা নয়। ইরার ডপেলগ্যাঞ্জার। নীরা। তাই না?’ বলে হো হো করে হাসল রিয়াদ। তারপর রূপমের দিকে ফিরে বলল, ‘দেখলেন তো ডাক্তার রূপম? তন্ময় ভেবেছিল আমার ডিলিউশন হচ্ছে। কী জানি কঠিন একটা রোগ—ক্যাপগ্রাস সিনড্রোম—আমার নাকি ওটা হয়েছে। কিন্তু দেখলেন তো, আমি ভুল দেখিনি।’

একটা চেয়ার টেনে বসল রূপম। তারপর বলল, ‘মজার বিষয় কী জানেন, রিয়াদ সাহেব? একজন মানুষের জিনোমে প্রায় তিন বিলিয়ন ডিএনএ জোড়া থাকে। এর মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশই কিন্তু আরেকজন মানুষের সঙ্গে আইডেনটিক্যাল। মানে হুবহু এক। মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ডিএনএ সিকোয়েন্স একজন থেকে আরেকজনকে এত আলাদা করে দেয়। খুব আশ্চর্য ব্যাপার না?’

রিয়াদ অবাক হলো শুনে। দুনিয়াতে যে এত রকমের এত বিচিত্র চেহারা ও স্বভাবের মানুষ, তাদের মধ্যে তফাত কেবল ওই শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ডিএনএ সিকোয়েন্স? আজব তো।

আরও পড়ুন
‘হুম। হুবহু ইরা। কথা বলার ভঙ্গিও ইরার মতোই। আমাকে চিনতে পারেনি। আমি তোর বন্ধু শুনে তোর কথা জিজ্ঞাসা করল। কেমন আছিস–টাছিস এই সব।’

রূপম বলে চলেছে, ‘এই বৈচিত্র্যের পেছনের কারণটা হলো সিঙ্গেল নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম বা এসএনপি। ডিএনএ বেজের একটা নির্দিষ্ট জিনোমিক পজিশনে থাকে এই জিনিস। একজন মানুষের শরীরে এ রকম চার–পাঁচ মিলিয়ন এসএনপি আছে। দুজন মানুষের সাদৃশ্য নির্ভর করে কত শতাংশ এসএনপি পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়, তার ওপর। ভাই–বোনদের মধ্যে ৮৪ থেকে ৮৭ শতাংশ এসএনপি মিলে যেতে পারে। কাজিনদের সঙ্গে মিলতে পারে বড়জোর ৭৫ শতাংশ। কিন্তু ডপেলগ্যাঞ্জার হতে হলে এই সাদৃশ্য হতে হবে ৯৫ শতাংশের ওপর। এটা খুবই অসম্ভব একটা ব্যাপার।’

‘আসলেই অসম্ভব?’ রিয়াদ জিজ্ঞাসা করল।

‘না, একদম অসম্ভব নয়।’ রূপম বলল, ‘দেখতেই পাচ্ছেন, একজন ডপেলগ্যাঞ্জারের সঙ্গে আপনার নিজেরই দেখা হয়ে গেল। এ রকমটা পৃথিবীতে অনেকবারই ঘটেছে। নীল ডগলাস নামের এক আইরিশ ভদ্রলোক একবার বিমানে উঠে নিজের সিটে বসতে গিয়ে দেখেন যে তাঁর পাশের সিটে তাঁর মতোই একজন বসে আছেন! বিমানের সবাই আশ্চর্য হয়ে তাঁদের দেখছিল। কেউ কেউ ছবিও তুলে রেখেছিল। পরে এই দুই ডপেলগ্যাঞ্জারের ছবি ভাইরাল হয়, তাঁরা বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দিতে আসেন।’

রিয়াদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, ‘তাহলে আমাকে এবার বাড়ি যেতে দিন। বুঝতেই পারছেন, আমার কোনো রোগবালাই নেই।’

অলংকরণ: আরাফাত করিম

‘তা নেই বলেই মনে হচ্ছে,’ বলল রূপম। ‘কিন্তু আপনাকে একটা অনুরোধ করব। আপনার সঙ্গে কি ইরার যোগাযোগ আছে?’

‘কেন?’

‘তাহলে আমরা ইরা ও নীরার ডিএনএ সিকোয়েন্স মিলিয়ে দেখতাম। বেশ মজার একটা এক্সপেরিমেন্ট হতো। জোশি নামের এক কানাডিয়ান বিজ্ঞানী এ রকম ৩২ জোড়া ডপেলগ্যাঞ্জার নিয়ে একটা জেনেটিক স্টাডি করেছিলেন। বেশ মজার কিছু ফাইন্ডিং উঠে এসেছিল ওতে। এরপর এ নিয়ে আর বড় কোনো গবেষণা হয়নি।’

রিয়াদ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘ইরার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। তবে ঠিকানা জানা আছে। সে নর্দান সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করে। রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট।

তার স্বামী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। নাম রাশেদুর রহমান। ইরার ফেসবুক আইডি আছে, ইনস্টাগ্রামও। আমি দেখেছি, কিন্তু কখনো রিকোয়েস্ট পাঠাইনি। এবার কি আমাকে ছাড়বেন?’

আরও পড়ুন
নীল ডগলাস নামের এক আইরিশ ভদ্রলোক একবার বিমানে উঠে নিজের সিটে বসতে গিয়ে দেখেন যে তাঁর পাশের সিটে তাঁর মতোই একজন বসে আছেন! বিমানের সবাই আশ্চর্য হয়ে তাঁদের দেখছিল।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে রিয়াদ প্রথম যেদিন অফিসে গেল, সেদিন নীরাকে আরও বেশি ইরার মতো দেখাচ্ছিল। কারণ, নীরা চুল ছোট করেছে, শাড়ির বদলে কুর্তি আর প্যান্ট পরেছে, ঠিক ইরার মতো। ওকে দেখেই কলকল করে উঠল নীরা, ‘আরে, আপনি আপনার ফোন নাম্বারটাও আমাকে দেননি। কী দুশ্চিন্তায় যে পড়েছিলাম! পরে আপনার একজন বন্ধু এসে জানালেন যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখন কেমন আছেন?’

‘চিন্তার কিছু নেই। আমার কিছু হয়নি ইরা।’

‘ইরা না, আমি নীরা! আপনি আমার নামও ভুলে গেছেন!’ অভিমানী হলো নীরা।

রিয়াদ অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। এই চাকরিটা তাকে ছাড়তে হবে। নয়তো সে এ রকম ভুল করতেই থাকবে। যতবারই নীরার দিকে চোখ পড়ছে, ততবারই মনটা কেমন করে উঠছে। নাহ্‌, এই অশান্তি আর নেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু চাকরি ছাড়লে চলবেটা কেমন করে?

হাসপাতাল থেকে চলে আসার পরও রিয়াদের শরীরটা পুরোপুরি ভালো হয়নি। মাথাটা প্রায়ই ব্যথা করে। ঘাড়ও। প্রেশার মেপে দেখেছে, সব স্বাভাবিক আছে। রাতে ঘুমের মধ্যে অস্থির লাগে। বারবার ঘুম ভেঙে যায়। কয় দিনের মধ্যে ওজনও কমে গেছে। রমিজা খালা রোজ ক্যাট ক্যাট করে, ‘কইলাম একটা ভালা ডাক্তার দেখান। নিশ্চয় কুনো জটিল অসুখ বান্ধাইছেন। চেহারাখান কেমুন হয়া গেছে।’

অগত্যা একদিন আবার তন্ময়কে নিয়ে ডাক্তার রূপমের কাছে গেল রিয়াদ। রূপম তার চোখের মণি প্রসারিত করে অনেকক্ষণ ধরে একটা যন্ত্র দিয়ে দেখল। হাত–পায়ের গিঁটে হাতুড়ির মতো একটা জিনিস দিয়ে বাড়ি দিয়ে পরীক্ষা করল। তারপর গম্ভীর মুখে বলল, ‘ইন্ট্রাক্রেনিয়াল প্রেশার বেশি মনে হচ্ছে। অপটিক ডিস্ক ফুলে আছে।’

আরও পড়ুন
রিয়াদ অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। এই চাকরিটা তাকে ছাড়তে হবে। নয়তো সে এ রকম ভুল করতেই থাকবে। যতবারই নীরার দিকে চোখ পড়ছে, ততবারই মনটা কেমন করে উঠছে।

‘মানে?’ রিয়াদ প্রশ্ন করল।

‘মাথার এমআরআই করতে হবে একটা।’

রিয়াদ একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘ডাক্তার রূপম, খুলে বলুন। খারাপ কিছু কি?’

‘এখনই বলা যাচ্ছে না। ব্রেন টিউমার হতে পারে। দেখা যাক।’

রিয়াদকে একটা এমআরআই যন্ত্রের ভেতর ঢোকানো হলো। হিমশীতল একটা ঘর, যেন কবর। কানে গোঁজা ইয়ার প্লাগে মৃদু মিউজিক বাজছে। মাথার ওপর একঘেয়ে ঝিঁঝিঁ শব্দ। রিয়াদ চোখ বুজে কোনোমতে পড়ে রইল। ব্রেন টিউমার হলেই–বা কী, তার চিকিৎসা করার মতো টাকাপয়সা নেই। কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ মরে যাওয়াই ভালো। ভালোই হয়েছে, চাকরিটা আর করতে হবে না। ইরারূপী নীরার পাশে বসে আর কাজ করতে হবে না। একটা মূর্তিমান অশান্তি থেকে রেহাই মিলল।

একদিন হাসপাতালে তাকে দেখতে এল নীরা। রিয়াদ তখন প্রচণ্ড মাথাব্যথায় চোখ বন্ধ করে বেডে শুয়ে আছে। নীরা পাশে এসে বসে মৃদুস্বরে বলল, ‘আপনার জন্য অফিসের সবাই টাকা তুলছে। অপারেশন লাগবে শুনেছি। আমি খুব বেশি দিতে পারি নাই, নতুন চাকরি। তা ছাড়া বাবাও অসুস্থ। যেটুকু পারি, আপনার জন্য দোয়া করছি।’

রিয়াদ অতি কষ্টে হাসল একটু। ঠিক ইরার মতো। ও একদম ইরার মতো।

‘আমি অপারেশন করব না, ইরা। এমনিতেও বাঁচব না। শুধু শুধু এসব করার দরকার নেই।’

‘আমি ইরা নই, নীরা। আপনি সব সময় আমার নাম ভুলে যান কেন?’

রিয়াদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘সরি। আমি আসলে নাম ভুলে যাইনি। মানুষ ভুল করে ফেলি। আপনাকে ইরার একটা ছবি দেখাব। তাহলেই বুঝতে পারবেন।’

‘ইরা কে?’

‘আপনার ডপেলগ্যাঞ্জার।’

‘মানে?’

উত্তর দেওয়ার আগেই রিয়াদের খিঁচুনি শুরু হয়ে গেল। নীরা ভয়ে চিৎকার করতে লাগল, ‘সিস্টার, সিস্টার। তাড়াতাড়ি আসেন। কী হলো? রিয়াদ ভাই, কী হলো আপনার? ডাক্তার, ও ডাক্তার...’

আরও পড়ুন
রিয়াদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘সরি। আমি আসলে নাম ভুলে যাইনি। মানুষ ভুল করে ফেলি। আপনাকে ইরার একটা ছবি দেখাব। তাহলেই বুঝতে পারবেন।’

নীরার চেঁচামেচির মধ্যেই জ্ঞান হারাল রিয়াদ। তারপর খিঁচুনির ইনজেকশন দেওয়ার কারণে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল সে। তার ঘুম ভেঙেছিল পাক্কা দেড় দিন পর। ঘুম ভাঙার পর প্রথমেই সে দেখে, বিছানার পাশে টুলটাতে নীরা বসে আছে। আজকে তার পরনে সবুজ একটা শাড়ি, চুলগুলো অল্প সময়েই লম্বা হয়ে গেছে। কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে ওকে। উদ্বিগ্ন মুখ। আশ্চর্য, নীরা কি দুই দিন ধরে হাসপাতালেই পড়ে আছে নাকি?

রিয়াদ একটু হাসার চেষ্টা করল, ‘নীরা, কেমন আছেন? আপনাকে সেদিন ইরার ছবি দেখাতে চেয়েছিলাম। কষ্ট করে ওই পায়ের কাছে রাখা আমার ব্যাগটা দেবেন? ওটার মধ্যে ইরার সঙ্গে আমার ছবি আছে একটা। পানামনগরে গিয়ে তুলেছিলাম। সেদিন ইরা একটা খয়েরি রঙের টপস পরে ছিল। শীতকাল ছিল তো, তাই একটা শাল ছিল গায়ে। কটকটে হলুদ একটা শাল। আমার সব স্পষ্ট মনে আছে।’

পাশে বসা নীরা এবার কাঁদতে শুরু করল। রিয়াদ বিব্রত হয়ে বলল, ‘কী মুশকিল! কাঁদছেন কেন নীরা?’

মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি ইরা। নীরা কে? কার সঙ্গে কথা বলছ তুমি?’

রিয়াদ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘নীরা? তুমি কখন এসেছ?’

অলংকরণ: আরাফাত করিম

‘গতকাল। ডাক্তার রূপম মেইল করেছিলেন কদিন আগে। তোমার কথা জানালেন, সঙ্গে বললেন আমাকেও নাকি দরকার, কী একটা টেস্টের জন্য। কিন্তু ইরা কে?’

‘ইরা? ইরা তোমার ডপেলগ্যাঞ্জার।’

‘মানে?’

রিয়াদ চোখ বন্ধ করে বলল, ‘জানি না। পৃথিবীতে এক ট্রিলিয়ন মানুষের একজন হচ্ছ তুমি। যার ডপেলগ্যাঞ্জার আছে।’

‘কী সব বলছ, আবোলতাবোল?’

‘জানি না। আমি বুঝতে পারছি না কিছুই। আমার মনে হয় সত্যি ক্যাপগ্রাস সিনড্রোম আছে। একটা অদ্ভুত বিভ্রান্তি আর ডিলিউশনের মধ্যে ডুবে আছি। তবে তুমি যে-ই হও না কেন, প্লিজ আমাকে একা ছেড়ে যেয়ো না। আমার ভয় করছে খুব।’

‘যাব না।’

এতক্ষণে অন্য কেউ কথা বলে উঠল। রিয়াদ চোখ খুলে দেখল ইরাও চলে এসেছে। সে পরেছে একটা বেগুনি রঙের শাড়ি। তার মুখটাও ফ্যাকাশে। রিয়াদের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে এখন। দুজন ডপেলগ্যাঞ্জার দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। দুজনই তার জন্য উৎকণ্ঠিত। দুজনই নীরবে কাঁদছে। রিয়াদ আবার চোখ বুজল। আশ্চর্য, এমন ভাগ্য কজনের হয়?

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন