ছায়াভূমি বহির্ভূমি

১.

আমার সঙ্গে ক.-এর প্রথম দেখা হয়েছিল আমার বন্ধু ইকিতাইয়ের বাসায়। রাতে খাবারের নিমন্ত্রণ ছিল। উনি বেশ কয়েকটি নামকরা সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে সে রকম খ্যাতি পাননি—এ নিয়ে ওনার ক্ষোভ ছিল। বললেন, কেউ তাঁর গল্প বা উপন্যাসের ভালো অনুবাদ করতে পারেননি। নইলে এত দিনে বিশ্বজুড়ে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ত। আমার বন্ধু আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল একজন উঠতি বিজ্ঞান কল্পগল্প লেখক হিসেবে। এটা শুনে উনি তাঁর অবজ্ঞা ঢেকে রাখতে পারলেন না। বললেন, ‘আপনাদের কাজই হলো ডিসটোপিয়া, দুঃস্বপ্নের নগরী সৃষ্টি করা। মানুষের হৃদয়কে সঠিকভাবে চিত্রিত করার ব্যাপারে আপনাদের কোনো প্রয়াস নেই। সেখানে আপনারা একটা সহজ পন্থা অবলম্বন করেন—যন্ত্রের সাহায্য নেন এবং শেষ পর্যন্ত যন্ত্রের হাতে ধ্বংস দেখান। এই তো আপনাদের সাহিত্য!’

ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। মিনমিন করে পৃথিবীর তাবৎ কল্পবিজ্ঞান লেখকের পক্ষ হয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলাম—মানবসমাজ কী ধরনের বিপত্তির সম্মুখীন হতে পারে, এই ধারার লেখকেরা তা নিয়ে ভাবেন; যা নেই, তা কল্পনা করেন এবং সেই কাল্পনিক জগৎ আমাদের নানাবিধ প্যারাডক্স বা হেত্বাভাসের সামনে সরাসরি দাঁড় করায়। আমরা যে সমাধান দিতে পারি, তা নয়। কিন্তু মানুষের চিন্তাশক্তি বাড়ানোর জন্য এই ধারার সাহিত্য প্রয়োজনীয়।

ক. হেসে উঠলেন, ‘এগুলো হলো নিতান্ত সহজ পথ বেছে নেওয়া। এর মধ্যে বড় কৃতিত্বের কিছু নেই। সময় ভ্রমণ, এলিয়েন, মহাকাশযাত্রা, রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসব দিয়ে যা করা সত্যিই কঠিন—সামাজিক প্রেক্ষাপটের বিশাল ক্যানভাসে মানুষের চরিত্র অঙ্কন, দৈনন্দিন টানাপোড়েন—এসব কি আপনারা পারবেন? আপনাদের দৌড় ডিসটোপিয়া পর্যন্ত। সেখানে অন্ধকার, কোনো আশা নেই।’

ক.–এর কথা যে একেবারে অযৌক্তিক, এমন নয়; কিন্তু সাইফাই লেখক হিসেবে ওঁর সমালোচনাটা যে আমার আঁতে ঘা দিল, তা বলা বাহুল্য। বললাম, ‘এতই যখন সহজ, তখন আপনি নিজেই লিখুন না একটা সাইফাই।’

আরও পড়ুন
মেহেরিকা দেখে, দূরে একটা বালুর ঘূর্ণি ধূসর আকাশে উঠে যাচ্ছে। আকাশের তো নীল থাকার কথা, তাই না? গতকাল এখানে একটা সবুজ হ্রদ ছিল, হিমবাহের জল ঝরনাধারায় গড়িয়ে সেখানে ঢুকছিল।

জীবনানন্দ লিখেছিলেন—

‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা—’

বলিলাম ম্লান হেসে; ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর।

এ ক্ষেত্রে কিন্তু ছায়াপিণ্ড উত্তর দিতে সময় নিল না। ক. বললেন, ‘আমাকে চ্যালেঞ্জ করছেন? ঠিক আছে, গ্রহণ করলাম। খুব শিগগির দেখতে পাবেন।’

পরের সপ্তাহে আমার ই-মেইলে একটি লিংক পেলাম। ক. একটি উপন্যাস শুরু করেছেন। নাম ‘ধূসর প্রাচীরের আখ্যান’। উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে একটি ওয়েব পত্রিকায় বের হচ্ছে। লিংকটি ছিল প্রথম পর্বের। একটি প্রলয়োত্তর পৃথিবী, তাতে কিছু মানুষ বেঁচেছে। সেই পৃথিবীতে একটি প্রাচীরঘেরা জায়গা আছে। বিশাল জায়গা, তাতে অরণ্য আছে, আছে মরুভূমি, কিছু পঙ্কক্ষেত্র, জলাশয়। তাতে একজন তরুণী বাস করে, সে কীভাবে সেখানে এসেছে, আমরা জানি না। সেই তরুণী সেই প্রাকারের বাইরে যেতে চায়, কিন্তু পারে না। সেই তরুণীর মনে হয়, তাকে কেউ চোখে চোখে রাখছে, কিন্তু তাকে বা তাদের সে দেখতে পায় না। তরুণীর নাম মেহেরিকা।

মেহেরিকা দেখে, দূরে একটা বালুর ঘূর্ণি ধূসর আকাশে উঠে যাচ্ছে। আকাশের তো নীল থাকার কথা, তাই না? গতকাল এখানে একটা সবুজ হ্রদ ছিল, হিমবাহের জল ঝরনাধারায় গড়িয়ে সেখানে ঢুকছিল। পাহাড়ের বাঁকটা পেরোলেই এক গভীর গিরিখাতের শেষে একটা বড় জায়গাজুড়ে ছিল হ্রদটা। কেমন করে সে ওই পাহাড়ের ওপর উঠেছিল, মনে করতে পারে না। যেমন মনে করতে পারে না সে কেমন করে এখানে এসেছে, তার মা-বাবার কথা। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারে যে যেখানে একটি পাহাড়ি হ্রদ থাকার কথা, সেটি একদিনে যদি মরুভূমির বালিয়াড়ি হয়ে যায়, তবে সেটির পেছনে একটা কার্যকারণ আছে। সেই কারণ সহজ নয়। সেই কারণ বাস করে এই বিশাল ছায়াভূমির বাইরে।

আরও পড়ুন
পাহাড়ের বাঁকটা পেরোলেই এক গভীর গিরিখাতের শেষে একটা বড় জায়গাজুড়ে ছিল হ্রদটা। কেমন করে সে ওই পাহাড়ের ওপর উঠেছিল, মনে করতে পারে না।

মেহেরিকাকে বাঁচাতে পারেন শুধু একজন তরুণ। সেই তরুণ একজন লেখক, তিনি লেখেন বিজ্ঞান কল্পগল্প।

প্রথম পর্বের শেষ এখানেই। ভাবলাম, এ রকম একটি বহুল ব্যবহৃত প্লটকে কেন ক. ব্যবহার করলেন। এতে তো কোনো মৌলিকত্ব নেই। কিন্তু তরুণ কল্পবিজ্ঞান লেখক বলতে কি ক. আমাকে বুঝিয়েছেন? আমার এখানে কী করার আছে?

সেই রাতে—গভীর রাত তখন, তিনটা হতে পারে—আমার ফোন বেজে উঠল। নম্বরটা অচেনা। আমি সাধারণত অচেনা নম্বর ধরি না, কিন্তু অচেনা নম্বর থেকে এত রাতে ফোন আসে না। ধরলাম, অন্যদিক থেকে প্রথমে খসখস একটা শব্দ। তারপর একটি নারী কণ্ঠ, ‘হ্যালো, হ্যালো, কেউ আছেন ওখানে?’

‘কে বলছেন?’

একটা উত্তর এল, ‘মেহেরিকা, আমার নাম মেহেরিকা। আমি কোথায় যেন আটকে আছি, আমাকে বের করতে পারবেন?’ এটুকুই, এরপরই ফোনটা কেটে গেল।

এর মানে কী? ক. কি ইচ্ছা করে আমাকে বিরক্ত করছেন? একজন তরুণীকে দিয়ে আমাকে ধাঁধায় ফেলতে চাইছেন? বলা বাহুল্য, খুব বিরক্ত হলাম। পরদিন ইকিতাইয়ের কাছ থেকে ফোন নম্বর জোগাড় করে ক.–কে ফোন করলাম, পেলাম না। ইকিতাইও ক–এর হদিস করতে পারল না।

আরও পড়ুন
সেই রাতে—গভীর রাত তখন, তিনটা হতে পারে—আমার ফোন বেজে উঠল। নম্বরটা অচেনা। আমি সাধারণত অচেনা নম্বর ধরি না, কিন্তু অচেনা নম্বর থেকে এত রাতে ফোন আসে না।

২.

সেই রাতে আমি কাগজের ওপর একটা দরজার ছবি আঁকলাম। পুরোনো দিনের কাঠের দরজা। তাতে খিল, নিচে চৌকাঠ, কড়াতে একটা তালা ঝুলছে। ওই দরজার পেছনে মেহেরিকা আছে। টেবিলে বসে কম্পিউটার খুললাম, শুরু করলাম লিখতে—

‘ধূসর প্রাচীরের আখ্যান’ - দ্বিতীয় পর্ব। বাইরে বিশাল দরজা, কিন্তু সেই দরজা একটি প্রতীকমাত্র, যেই মুহূর্তে মেহেরিকা বুঝবে দরজাটি অলীক, সেই মুহূর্তে তার কারাগার মিলিয়ে যাবে…

এটুকু লেখামাত্র ঘরটা একটা হালকা ধাতব গন্ধে ভরে গেল, দূরে জানালার বাইরে মনে হলো বহু পাখি উড়ছে। জানালার কাছে এসে ঝালরের ফাঁক দিয়ে অন্ধকারে পাখিদের খুঁজলাম আমি। মনে হলো পাখি নয়; বরং কিছু ড্রোন উড়ছে। টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মনে হলো দরজার ছবিটা কাঁপছে। ধীরে ধীরে দরজাটা বড় হতে শুরু করে। বড় হতে হতে ঘরের ছাদ পর্যন্ত ঠেকে। মন হলো, দরজাটা খুলতে হবে, কিন্তু তাতে তালা ঝুলছে। সেই তালার চাবিটা তো আঁকিনি।

চাবি আঁকা হয়নি, অথচ দরজাটা ভারী হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। ঘরের ছাদ যেন সরে গিয়ে জায়গা করে দিয়েছে দরজার জন্য। এই নিস্তব্ধ শীতের রাতেও আমার কপালে ঘাম জমে উঠল। হাত বাড়ালাম কড়ার দিকে, কিন্তু স্পর্শ করার আগেই ঘরটা ভিন্ন এক নিরবতায় ভরে ওঠে—শব্দ নেই, অথচ শব্দের আভাসে মন্দ্রিত। সেই নিঃশব্দতা কানের খুব কাছে ফিসফিস করল, ‘চাবি আঁকো!’

দরজাটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, আতঙ্কিত হয়ে কলম হাতে নিলাম। দ্রুত চাবি আঁকলাম, চাবি তালায় ঢোকানো—বন্ধ তালা খুলে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে গেল, ঘরটা অন্ধকার। জানালার বাইরের আকাশে কয়েকটা ঝলকানি। ড্রোনগুলো কি এখনো আছে, নাকি সেগুলো ছিল অর্ধমানব, অর্ধপিশাচমুখী প্রাচীন উড়ন্ত গারগয়েল?

আরও পড়ুন
চাবি আঁকা হয়নি, অথচ দরজাটা ভারী হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। ঘরের ছাদ যেন সরে গিয়ে জায়গা করে দিয়েছে দরজার জন্য। এই নিস্তব্ধ শীতের রাতেও আমার কপালে ঘাম জমে উঠল।

টর্চ খুঁজে পেলাম না, মোমবাতি পেলাম একটা। সেটা জ্বালালাম। সেটার কম্পমান শিখায় দরজাটাকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে দেখলাম। সেটা পুরোপুরি মিলিয়ে যেতেই বাইরের দরজায় জোরে আঘাতের শব্দ পেলাম, ‘দরজা খুলুন’, চিৎকার করে কেউ। আমি যেন এ রকম কিছু হওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলাম। গিয়ে যখন তাদের পরিচয় জানতে চাইলাম, কোনো উত্তর পেলাম না; বরং দরজাটা যেন আপনা থেকেই খুলে গেল। এরপর অন্তত সাতজন লোক ভেতরে ঢুকে গেল। তাদের পরনে ভাঁজহীন সামরিক উর্দি, সবার মুখ যেন একই রকম। শুধু একজন, যার বুকের ওপর কিছু চকচকে ধাতব ব্যাজ ছিল, তার মুখে ছিল নৃশংস ভাব। সে চিৎকার করে উঠল, ‘তোমার নাম কী?’

আমার নাম? সেই মুহূর্তে আমার নাম মনে করতে পারলাম না এবং সেই মুহূর্তে এটি যে নিতান্ত একটি স্বপ্ন, তাতে মনে কোনো সন্দেহ রইল না। কারণ, নিজের নাম কি কেউ মনে না করতে পারে?

আর তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল। দূর থেকে নম্বরটা না দেখতে পেলেও ফোনটা যে মেহেরিকার কাছ থেকে আসছে, তাতে নিঃসন্দেহ ছিলাম। দলনেতা আবার চিৎকার করে ওঠে, ‘ফোনটা ধরো এখনই,’—এই বলে সে আমাকে খুব নিম্নরুচির একটি কথা বলে সম্বোধন করল। তখনই খেয়াল করলাম, তার থুতনির দুদিক বেয়ে পানের রস গড়াচ্ছে।

আমি ফোনের দিকে এগোনোর আগেই সে একটা বিরাট লাফ দিয়ে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে সেটার স্পিকারটা অন করে দিল। মেহেরিকার গলা ভেসে আসে, ‘আমি…আমি বের হচ্ছি…দরজাটার জন্য অনেক ধন্যবাদ…’

আরও পড়ুন
দলনেতা আবার চিৎকার করে ওঠে, ‘ফোনটা ধরো এখনই,’—এই বলে সে আমাকে খুব নিম্নরুচির একটি কথা বলে সম্বোধন করল। তখনই খেয়াল করলাম, তার থুতনির দুদিক বেয়ে পানের রস গড়াচ্ছে।

আমি চিৎকার করে বলতে চাই, এখন বের হবে না, তোমাকে ধরার জন্য ওরা এসেছে। কিন্তু কিছু বলার আগেই দলনেতা ফোনটা কেটে দেয়। আবার আমাকে খুব নিম্নরুচির সম্বোধন করে বলে, ‘দরজা কোথায় গেল? ছবি আঁকো, আঁকো এখনই।’

আমি মাথা নাড়লাম, না, দরজা আমি আর আঁকছি না। দলনেতার এক সঙ্গী তার বন্দুকের বাঁট দিয়ে আমার পেটে আঘাত করে। আমি মাটিতে পড়ে যাই। আরেকজন আমাকে তুলে ধরে টেবিলের পাশে চেয়ারে বসায়। হাতে কলমটা গুঁজে দেয়। আরও একজন আমার হাতটা ধরে কাগজের ওপর ঘোরায়—দরজাটা আঁকতে চায়। কিন্তু এই দরজা আগের দরজার মতো হয় না।

আমার ফোন আবার বেজে ওঠে। নতুন একটা অজানা নম্বর। দলনেতা ফোনটা ধরে না। ভয়েস মেইলে ক–এর কণ্ঠ শোনা যায়, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, মেহেরিকাকে মুক্ত করার জন্য।’

দলনেতার মুখ দেখে মনে হলো, সে বিভ্রান্ত। ক.–কে সে চেনে না? এর পরের ঘটনাটির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। দলনেতা তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে। কিন্তু কেউ যদি আসলেই বিভ্রান্ত হয়, সে হলো আমি।

ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে এল। মনে হলো, একটা শব্দহীন নীল শূন্যতা ওপরের ছাদ থেকে পাক খেতে খেতে নিচে নামছে। এদিকে আমার খিদে পেয়েছে, কিন্তু খাবার কোথায়? রান্না করতে হবে। দেখলাম, দূরে শেলফের ওপর রাখা রান্নার ধাতব বাসনগুলো প্লাস্টিকের মতো গলে পড়ছে। ফ্রিজে সবজি আছে, কিন্তু ফ্রিজটাও এঁকেবেঁকে নড়ছে। কেন জানি মনে হলো, আমি এই চেয়ার ছেড়ে উঠলে সবকিছু মিলিয়ে যাবে। তাই সামনের টেবিলের দুই পাশ ধরে বসে রইলাম। তারপর টেবিলে মাথা রেখে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম, মনে নেই।

আরও পড়ুন
আমার ফোন আবার বেজে ওঠে। নতুন একটা অজানা নম্বর। দলনেতা ফোনটা ধরে না। ভয়েস মেইলে ক–এর কণ্ঠ শোনা যায়, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, মেহেরিকাকে মুক্ত করার জন্য।’

৩.

সকালে হালকা সূর্যের আলো খোলা জানালার আন্দোলিত পর্দার ফাঁক দিয়ে এসে আমার মুখের ওপর পড়ে, আমাকে জাগিয়ে দেয়। সকালটা ছিল মৃদু, আলোটা নরম। জানালায় এসে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কিছু দূরের অট্টালিকার ওপর দিয়ে পাখি উড়ছে—একটা, দুটা, হয়তো দশটা কিংবা বারোটা। ওপরে উঠছে, নামছে, ঘুরছে—এদের ডানার স্পন্দনে শীতের সকাল উষ্ণ হয়ে উঠছে। গতকাল রাতের সব বিমূর্ততা দূর হয়েছে, প্রফুল্লমনে সকালের নাশতা বানাই।

ইকিতাইকে ফোন করি, গতকালের সব ঘটনার বর্ণনা করি। সে সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘আজ খুব ভোরে ক. আমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। বলেছে, তুমি যেন আমার এখানে আসো, আর এলে পরে তাকে একটা মেসেজ পাঠাতে।’

ইকিতাইয়ের ফ্ল্যাট আমার থেকে দূরে নয়, হেঁটেই যাওয়া যায়। সূর্যের আলোয় দুধসাদা অ্যালাবাস্টার বাড়িগুলো ফুটপাতের আগ্নেয় শিলায় কালো ছায়া ফেলছিল। মেহেরিকাকে আমি মুক্ত করেছি। কীভাবে করেছি, তা আমার ধারণায় নেই, কিন্তু করেছি। সেই খুশিতে, সেই উৎসাহে লম্বা লম্বা পা ফেলছিলাম। মনে হচ্ছিল, অন্য দিনগুলোর তুলনায় আজ ট্রাফিক শান্ত, সুশৃঙ্খল। এমন যেন, সবাই জেনে গেছে মেহেরিকা মুক্তি পেয়েছে, ক.–কেও খুঁজে পাওয়া গেছে, আজ সবার উৎসব। এই শহরে এ রকম উৎসব আগে হয়নি। এ রকম ফুর্তির মেজাজেই ইকিতাইয়ের ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলাম।

ইকিতাই প্রফুল্ল ছিল না, মেঝেতে মাদুরের ওপর পদ্মাসনে বসে ছিল। ওর মুখমণ্ডল অন্য দিনের থেকে বেশি সিঁদুররঙা। কোনো কথা না বলে ওর পাশে বসি। ও ফোনে ক.–কে মেসেজ করে। আমি মুখ খুলতে চাইলে তর্জনী ঠোঁটের সঙ্গে লাগিয়ে আমাকে চুপ করতে বলে। এক মিনিটের মধ্যেই ক.–এর মুখ ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আপনাদের দুজনকে কী বলে যে আমি ধন্যবাদ দেব, তা বুঝতে পারছি না। মেহেরিকাও আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আপনাদের কাছে আমার একটা শেষ অনুরোধ আছে।’

আরও পড়ুন
ইকিতাইয়ের ফ্ল্যাট আমার থেকে দূরে নয়, হেঁটেই যাওয়া যায়। সূর্যের আলোয় দুধসাদা অ্যালাবাস্টার বাড়িগুলো ফুটপাতের আগ্নেয় শিলায় কালো ছায়া ফেলছিল। মেহেরিকাকে আমি মুক্ত করেছি।

রাগ হলো। বললাম, ‘আপনি আমাকে একটা চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে মেহেরিকার ব্যাপারে জড়ালেন। প্রথম থেকে বললেই হতো।’

ক. বললেন, ‘আসলে সেটা সম্ভব ছিল না। কেন সম্ভব ছিল না, সেটা একটু পরই বুঝতে পারবেন। তার আগে জিজ্ঞাসা করি, আমার সঙ্গে ইকিতাইয়ের বাড়িতে যেদিন দেখা হয়েছিল, সেদিন আকাশের রং কী ছিল?’

বললাম, ‘কী আর হবে, আজ আকাশের রং রাজকীয় বেগুনি। এ ছাড়া আকাশের অন্য কোনো রং হয় নাকি?’

ক. হেসে ওঠেন। বলেন, ‘আপনার আকাশ ছিল সব সময় অতল নীল, আপনি ভুলে গেছেন। আর আপনার নিজের নামটি কি মনে আছে?’

আমার নামটি মনে করতে চাইলাম, এ-ও কি সম্ভব? নিজের নাম ভুলে যাওয়া?

ক. বলেন, ‘আপনাকে কষ্ট দেব না। আপনার নাম হলো “জিজীবিষা”। এর মানে কি জানেন? এর মানে বাঁচার প্রবল ইচ্ছা। এই নাম আমারই দেওয়া। কারণ, আপনার মধ্য দিয়েই আমি বাঁচতে চেয়েছি। কারণ, যে জগতে আমি বেঁচে আছি, সেই জগৎ আমাকে পিষে ফেলতে চায়। আর ‘ইকিতাই’ জাপানি শব্দ, মানে হলো “বাঁচতে চাই”। আপনাদের দুজনকে আমার সৃষ্টি করতে হয়েছে তিলে তিলে, সব চেতনা, অভিলাষ, প্রবৃত্তি অবলম্বন করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনারা এ পরিবেশে “ইমার্জেন্ট” হিসেবে নিজেরাই আত্মপ্রকাশ করেছেন। যে জগতে—ছায়াভূমিতে—আপনারা বাস করছেন, সেটি শুধু আমার তৈরি নয়, সেটি গড়ে উঠেছে আমার মতো মানুষদের দিয়ে, গত ৫০ বছরে। আমরা সেটাকে বহির্ভূমির ডিস্টোপিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত আমাদের সব নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়। গতকাল রাতে আপনার ফ্ল্যাটে যে সেনারা গিয়েছিল, তারা বহির্ভূমির কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছিল। তাদেরও ওরা আপনাদের মতো ইমার্জেন্ট হিসেবে গড়তে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। ওই সেনাদের কোনো চেতনা নেই, স্বজ্ঞা নেই।’

আরও পড়ুন
ক. বলেন, ‘আপনাকে কষ্ট দেব না। আপনার নাম হলো “জিজীবিষা”। এর মানে কি জানেন? এর মানে বাঁচার প্রবল ইচ্ছা। এই নাম আমারই দেওয়া। কারণ, আপনার মধ্য দিয়েই আমি বাঁচতে চেয়েছি।'

আমি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করি, ‘জিইইজীঈঈবিইষাআ…।’ সেই উচ্চারণে আমার অস্তিত্ব খুঁজি। দেকার্ত বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।’ আর আমি আমার অস্তিত্বকে আমার নামের উচ্চারণের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমার জিব তালুতে লাগে, সেই স্পর্শের বাস্তবতা, প্রাকৃকতা, আদিমতা দিয়ে ‘আমি আছি’, সেটা আমার কাছেই স্পষ্ট করতে চাই।

ক. বলতে থাকেন, ‘তারা ছায়াভূমিকে আবিষ্কার করে সেটাকে ধ্বংস করে দিতে চায়, কিন্তু সেটা তাদের জন্য বুমেরাং হলো। এ কাজ করতে গিয়ে তারা বহির্ভূমিকে ছায়াভূমির সঙ্গে যুক্ত করতে বাধ্য হলো। এই যুক্ত করাটা একটি নাজুক প্রক্রিয়া। সেটি আমরা ব্যবহার করতে পারি। কিছুদিন আগে বহির্ভূমিতে ক্ষমতাবদল হলো, একটু অশান্তভাবেই। মেহেরিকার মতো অনেককে তারা কারাগারে ঢোকাল। মেহেরিকাকে বহির্ভূমিতে বন্দী করেছিল বটে, কিন্তু তাদের অদক্ষতার কারণে ছায়াভূমির সঙ্গে সেই কারাগারের তথ্য-সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল, সেই সংযোগের মধ্যে অনেক ভুলভ্রান্তি ছিল, যেমন ছায়াভূমির অতল নীল আকাশকে তারা রাজকীয় বেগুনি করে ফেলল। এই যে দুটি ভূমির মধ্যে দুর্বল যোগাযোগ, সেটিকে ব্যবহার করে মেহেরিকাকে মুক্ত করতে আপনার সাহায্য দরকার ছিল।’

‘কিন্তু আপনি নিজেই এই কাজ করতে পারতেন’, আমি বলি।

‘পারতাম,’ ক. বলেন। ‘কিন্তু আমি থাকি বহির্ভূমিতে, সেখানে দরজা আর সেটার তালার চাবি বানানোর আগেই ওরা আমাকে ধরে ফেলত।’

ইকিতাইয়ের ঘরে ক.–এর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ বাস্তবে ঘটেনি। কিন্তু কোন বাস্তবটি সত্য? বহির্ভূমির, নাকি ছায়াভূমির? আমি যে জগতে বাস করি, তা কি সত্য নয়? আমার অস্তিত্ব নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

‘মেহেরিকা আর আমি বহু দূরদেশে চলে যাচ্ছি,’ ক. বলেন, ‘যাওয়ার আগে আপনাদের কাছে অনুরোধ—আমাদের পালাবার একটি ছবি আঁকবেন। কী আঁকবেন, সেটা আপনারা ঠিক করবেন। কারণ, আমি আপনাদের সেটা বললে ওরা জেনে যাবে।’

আরও পড়ুন
ক. বলতে থাকেন, ‘তারা ছায়াভূমিকে আবিষ্কার করে সেটাকে ধ্বংস করে দিতে চায়, কিন্তু সেটা তাদের জন্য বুমেরাং হলো। এ কাজ করতে গিয়ে তারা বহির্ভূমিকে ছায়াভূমির সঙ্গে যুক্ত করতে বাধ্য হলো।'

ক. ফোন রেখে দেন। ইকিতাই কোনো কথা না বলে একটি স্কেচপ্যাডে আঁকা শুরু করে—মেহেরিকা আর ক. একটি কুজ্ঝটিকাময় পর্বত গিরিখাত পার হচ্ছে। মেহেরিকা আর ক. কোথায় কীভাবে যাচ্ছেন, আমরা জানি না। বহির্ভূমিকে এই পর্বত গিরিখাত দেখিয়ে তাঁদের অন্য পথে পালাবার সুযোগ আমরা করে দিতে চাইছি। কিন্তু বহির্ভূমি কি আমাদের এই চাতুরী ধরে ফেলতে পারবে না?

এর উত্তর আমার জানা নেই। ভাবলাম, ক. কল্পবিজ্ঞান লেখকদের গালমন্দ করেছিলেন আমাকে দলে টানতে, কিন্তু তাঁর চেয়ে বড় সাইফাই লেখক আর কে হতে পারেন? জানালার বাইরে তাকালাম। দেখলাম, আকাশটা রাজকীয় বেগুনি থেকে অতল নীল হচ্ছে। ইকিতাই সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রকৃতিতে রং নেই, রং আমাদের মনের সৃষ্টি।’

ইকিতাইয়ের চোখের দিকে তাকালাম, সেখানে আগ্নেয় শিলার কালো গভীরতা চঞ্চল হচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ক.–কে কি তুমি সৃষ্টি করেছিলে?’

ইকিতাই উত্তর না দিয়ে হাসল। দেখলাম, তার চোখের মণি অঙ্গার কালো থেকে অঙ্গার ধূসর হয়ে যাচ্ছে।

*লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন