শেষবারের মতো মাথা তোলার চেষ্টা করল প্রাণীটি। কিন্তু তার আগেই পা দিয়ে ওর মাথাটা পুরো পিষে দিলাম। কেমন যেন আঠালো পদার্থ বেরিয়ে এল, থক করে ছিটকে এসে পড়ল আমার মুখের ওপর।
আশপাশে তাকালাম, ওরই মতো আরও চারজন পড়ে আছে। সব মরেছে আমার হাতে।
কয়েক মাস ধরেই ওরা আসছে, এসেই যাচ্ছে। কখনো এক-দুজন আসে, কখনো দল বেঁধে। একবার তো ৫০ জনের মতোও এসেছিল।
শুধু আসেই, ফিরে যাওয়া আর কারও কপালে জোটে না। ওদের কাউকে জীবিত ফিরতে দিতে পারি না আমি।
সম্ভবত ওদের গ্রহ কোনো কারণে বরবাদ হয়ে গেছে, আর সে জন্যই নতুন গ্রহের খোঁজে এখানে আসে ওরা। ওদের ব্যাপারে যতটা জেনেছি—এক বিশাল মহাকাশযানে থাকে, ওটা এখান থেকে কয়েক শ আলোকবর্ষ দূরে।
আকাশের দিকে তাকালাম। সন্ধ্যা প্রায় হতে চলেছে।
ধীরে ধীরে ন ঘরের দিকে এগোতে লাগলাম। আমি একা, খুব একা। কেউ নেই আমার।
আসলে আমি ছাড়া আর কেউই নেই এখানে। আমাকে রাখাই হয়েছে এখানকার রক্ষক হিসেবে, যাতে বাইরের গ্রহ থেকে নোংরা কোনো প্রাণী এসে এখানে আবাস গড়তে না পারে।
হাঁটছি আমি।
রাস্তার দুই পাশ ফাঁকা। বহুকাল আগে হয়তো অনেকে ওই রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটত।
একাকিত্ব! সম্ভবত এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য। মাঝেমধ্যে ভাবি, ভিনগ্রহ থেকে আসা প্রাণীগুলোকে বাধা দেব না। বসত গড়ুক ওরা এখানে। ফের আগের মতো হোক আমার জগৎ, যেমনটা এক শ বছর আগেও ছিল।
কিন্তু আমি অসহায়। প্রভু আদেশ করে গেছেন, বাইরের কাউকেই যেন আমি এই গ্রহে টিকতে না দিই।
আসলে আমি ছাড়া আর কেউই নেই এখানে। আমাকে রাখাই হয়েছে এখানকার রক্ষক হিসেবে, যাতে বাইরের গ্রহ থেকে নোংরা কোনো প্রাণী এসে এখানে আবাস গড়তে না পারে।
***
আকাশের দিকে চেয়ে চুপচাপ ভাবছি। আমি জানি, ওরা আবার আসবে। আসতেই হবে।
ওরা যতবার আসবে, ততবারই আমি ওদের ঠেকাব; এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার। ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলো খুব অসভ্য। নিজেদের গ্রহের শাসনভার পাওয়ার পর মাত্র ১৮ হাজার বছরেই ওরা নির্মমভাবে নষ্ট করে ফেলেছে গ্রহটাকে।
তারপর আরও দু-তিনটা গ্রহ হয়েছে ওদের লালসার শিকার।
বর্তমানে ওদের নজর এই গ্রহের দিকে। কিন্তু আমার জন্য পারছে না এখানকার দখল নিতে।
***
একটা অদ্ভুত জায়গা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমি। সবুজ গাছপালায় ভরা জায়গাটা। সবকিছুই অদ্ভুত...
কেমন যেন একটা অশুভ নিঃস্তব্ধতা। লতাপাতার ভিড় ঠেলে এগিয়ে চলেছি। কোথায় যাচ্ছি, তা জানি না। কিন্তু তারপরও যাচ্ছি।
ঠিক তখনই দেখতে পেলাম ওদের...গাছগুলো থেকে লাফিয়ে নেমে আসতে লাগল ওগুলো, হাজারে হাজারে...
আমাকে ঘিরে ফেলল ওরা।
স্বপ্ন দেখছিলাম। আজকাল একটু ঘুমালেই স্বপ্ন দেখি। যদিও ঘুমানোর অনুমতি প্রভু আমায় দেননি। তারপরও আজকাল মাঝেমধ্যে ঘুম পায় ।
যে উঁচু স্তম্ভটার ওপরে আমি থাকি, সেটা কেন যেন দুলছে।
তবে কি ওরা আবার এসেছে?
নিচের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ, ওরা ফিরে এসেছে। ৬০ থেকে ৭০ জনের মতো। স্তম্ভটাকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে শয়তানগুলো।
ঘুমের মধ্যেই আমাকে মেরে ফেলতে চায়।
অত সোজা? ওপর থেকে গুলি শুরু করলাম ওদের লক্ষ্য করে। ১০-১২ জন আমার গুলিতেই চিড়েচ্যাপটা হয়ে গেল।
বাকিরা আমাকে দেখতে পেয়ে গুলি করতে করতে একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। এক লাফে পৌঁছে গেলাম সেখানে।
গুলির একটা তীব্র বৃষ্টি যেন বয়ে গেল আমার ওপর দিয়ে। কিন্তু আমার শরীরের বর্ম ভেদ করতে পারে না ওদের গুলিগুলো।
দেখতে দেখতেই সবাইকে মেরে ফেললাম।
ওদের খণ্ড-বিখণ্ড শরীরগুলোর দিকে তাকিয়ে মায়াই লাগছিল। কিন্তু কিছুই আর করার নেই। ওদেরকে এই গ্রহের দখল আমি দিতে পারি না।
কোনোভাবেই না।
স্বপ্ন দেখছিলাম। আজকাল একটু ঘুমালেই স্বপ্ন দেখি। যদিও ঘুমানোর অনুমতি প্রভু আমায় দেননি। তারপরও আজকাল মাঝেমধ্যে ঘুম পায় ।
***
আজকাল বসে থাকলেই শুধু পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে আমার।
এককালে এই গ্রহ এমন নির্জন ছিল না। অনেক প্রাণীতে ভরপুর ছিল সব জায়গা। আমার মতো অনেকে ছিল।
সে সময়ে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। একটা মেয়েকে আমার খুব ভালো লেগে যায়।
একটা রেস্তোরাঁর কাউন্টারে বসত মেয়েটা। খাওয়া শেষ করে সবাই ওর হাতে বিল দিত। আমিও মাঝেমধ্যে যেতাম ওখানে। কিছু খেত না যদিও, চুপচাপ বসে থেকে মেয়েটাকে দেখতাম। দেখেই যেতাম...
কেমন যেন মায়াভরা চাহনি। দেখে মনে হতো, আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব শুধু একটা দুঃস্বপ্নমাত্র। একদিন এই স্বপ্ন আর থাকবে না। আমি বাকিদের মতো হয়ে যাব। জেগে উঠব…কথা বলতে পারব ওই মেয়েটার সঙ্গে।
ওই মেয়েটার শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল? কে জানে। তবে ও আর বেঁচে নেই, এটা নিশ্চিত।
এই গ্রহের সবাই মারা গেছে, আমিই শুধু আছি, একরাশ বিষণ্নতা আর নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বের বোঝা নিয়ে। সত্যি বলতে, আমার আর ভালো লাগে না।
খুব কষ্ট হয় একা থাকতে।
ওই যে প্রাণীগুলো বারবার আসে, ওদের এখানে থাকতে দিলে কী হয়?
তা আমি পারি না। সেই ক্ষমতা প্রভু আমাকে দেননি, আর যদিও–বা কোনোভাবে সেই ক্ষমতা আমি পেয়ে যাই আর ওদের থাকতে দিই, তাহলেও তো ওরা আমায় বাঁচিয়ে রাখবে না।
ওদের অসংখ্য মানুষের প্রাণ গেছে আমার হাতে।
কেমন যেন মায়াভরা চাহনি। দেখে মনে হতো, আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব শুধু একটা দুঃস্বপ্নমাত্র। একদিন এই স্বপ্ন আর থাকবে না। আমি বাকিদের মতো হয়ে যাব।
***
সকাল সকাল ঘুমটা হুট করেই ভেঙে গেল।
গ্রহে আবার নতুন হানাদার এসেছে। বেশ দূর থেকে দেখছে পাচ্ছি ওকে।
পুরো শরীরটা কেমন যেন থকথকে ধরনের ওর, মনে হয় যেন একতাল জেলি হুট করেই প্রাণ পেয়ে গেছে। ব্যাটার নামও ও রকমই, ‘জেলো’। জেলোর ব্যাপারে অনেক কিছুই জানি আমি, এই গ্যালাক্সির সবচেয়ে ভয়ংকর ভাড়াটে খুনি শয়তানটা।
কিন্তু আমাকে মারার জন্য ওকে ভাড়া করল কে?
নিশ্চয়ই ওই প্রাণীগুলো।
কাছাকাছি এসে পড়েছে জেলো। প্রথমেই একগাদা বিষাক্ত তরল নিক্ষেপ করল সে আমার দিকে, কিছু হলো না আমার, এসব জিনিস আমার বর্ম ভেদ করতে অক্ষম।
গুলি চালালাম ওকে লক্ষ্য করে। কোনো লাভ হলো না, গুলিগুলো ওর থকথকে শরীরের ভেতর গিয়ে আটকে গেল।
‘খ্যা... খ্যা,’ বিকট শব্দ করে হেসে উঠল জেলো। ওর দেহে কোনো মাথা, মুখ, চোখ কিছুই নেই...তারপরও কী করে যে ব্যাটা হাসে, কে জানে?
লাফিয়ে উঠল সে, তারপর নিজের শরীর প্রসারিত করতে লাগল...অনেকটা...বেশ অনেকটা।
একটা জালের মতো সেই শরীর নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে।
ওর শরীরের ভেতর একদম ঢুকে গেল আমার শরীরটা।
এই অপেক্ষাতেই ছিলাম। নিজেই শরীরের তাপমাত্রাকে ক্রমাগত কমাতে লাগলাম, প্রথম প্রথম জেলো বুঝল না, কিন্তু যতক্ষণে বুঝল, ততক্ষণে ওর শরীরের অর্ধেকটা জমে গেছে।
প্রায় মাইনাস ১৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রাতে পৌঁছে তারপর থামলাম।
জেলোর বরফ হয়ে যাওয়া শরীরটা ভেঙে বেরিয়ে এলাম। টুকরা টুকরা হয়ে গেল ব্যাটা জেলো।
গ্যালাক্সির সবচেয়ে ভয়ংকর খুনি প্রাণ হারাল আমার হাতে! ভাবা যায়?
কাছাকাছি এসে পড়েছে জেলো। প্রথমেই একগাদা বিষাক্ত তরল নিক্ষেপ করল সে আমার দিকে, কিছু হলো না আমার, এসব জিনিস আমার বর্ম ভেদ করতে অক্ষম।
***
এভাবেই চলতে লাগল সবকিছু। প্রতি মাসেই অন্তত একবার করে হানা দিতে লাগল ওরা। প্রতিবারই আনতে লাগল নতুন নতুন অস্ত্র।
আসত, কিন্তু প্রাণ নিয়ে কেউ ফিরে যেত না।
প্রত্যেককেই নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতাম আমি।
তবু ব্যাটারা হাল ছাড়ল না, বেশ ভালো রকমের ধৈর্যশক্তি আছে ওদের।
***
আজকের ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। মাত্র দুজন এসেছে। দুজনের পিঠেই সিলিন্ডারের মতো কী যেন। সেগুলো থেকে একটা করে পাইপ এসে যুক্ত হয়েছে ওদের হাতে বন্দুকের মতো জিনিসটাতে।
এটা আবার কী?
এই দিয়ে আমাকে মারতে চায় নাকি?
মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল।
স্তম্ভটার ওপর থেকে লাফিয়ে পড়লাম ওদের ওপর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজনের মাথাটা পুরোপুরি পিষে দিলাম।
আর তখনই শুরু হলো ব্যাপারটা...
আমার ডান হাতটা প্রচণ্ড জ্বলছে, ফিরে তাকালাম! আশ্চর্য...ওটা গলে যাচ্ছে!
বেঁচে যাওয়া সেই প্রাণী ক্রমাগত একটা একটা তরল স্প্রে করে চলেছে আমার দিকে। আমার একটা হাত আর একটা পা পুরোটাই গলে গেল...
আমার ডেটাবেজ আমাকে বলছে, ওই তরলটার নাম হলো ‘পানি’। আমার শরীরের বর্ম ওটা সহ্য করতে পারে না!
পড়ে রয়েছি আমি, আর ওই প্রাণী স্প্রে করেই চলেছে।
আজকের ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। মাত্র দুজন এসেছে। দুজনের পিঠেই সিলিন্ডারের মতো কী যেন। সেগুলো থেকে একটা করে পাইপ এসে যুক্ত হয়েছে ওদের হাতে বন্দুকের মতো জিনিসটাতে।
মানুষ নামের এই প্রাণীগুলো এককালে বাস করত পৃথিবী নামের এক গ্রহে। সেই গ্রহ বহুকাল আগেই শেষ হয়ে গেছে। তারপর এদের নতুন গ্রহের সন্ধান শুরু হয়েছে।
অদ্ভুত ব্যাপার, আমার কৃত্রিম মস্তিষ্ক এই অন্তিম মুহূর্তেও আমাকে জানান দিচ্ছে যে এই তরলটাই ওই প্রাণীগুলো পান করে। আমাকে শেষ করার হাতিয়ারটা ওদের কাছে বহুকাল আগে থেকেই ছিল, কিন্তু ওরা জানত না!
যাহোক, আমি গলে যাচ্ছি!
আমি একজন অ্যান্ড্রয়েড, এই গ্রহের রক্ষার ভার প্রভু দিয়েছিলেন আমার ওপর, নিজের জীবন দিয়ে সেই দায়িত্ব আমি পালন করলাম। আমার প্রভু কখনো আমাকে বলেননি যে পানি নামের এই তুচ্ছ জিনিসটার সামনে এমন অসহায় হয়ে পড়ব আমি।
আমি একজন রক্ষী ছিলাম, আমৃত্যু আমি একজন প্রহরীই থাকব, আমার পুরো শরীর গলে গেছে, মাথাটাও গলতে শুরু করেছে।
তার আগেই আমি আমার শেষ রিপোর্ট পেশ করছি। এই রিপোর্ট তড়িৎ–চৌম্বক তরঙ্গ আকারে চলে যাবে প্রভুর কাছে।
৫০ বছর পর্যন্ত এই গ্রহে বেশ আরামেই থাকবে মানুষগুলো। কিন্তু তারপর...ওদের জন্য মহাপ্রলয় নিয়ে আসবেন প্রভু। এদের ধারণাও নেই, এরা কোন ভয়ংকর গ্রহে বসতি স্থাপন করছে।
আমার রিপোর্ট পাঠানো শেষ।
মাথাটা প্রায় গলে গেছে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখেও হাসি ফুটে উঠছে।
বিদায়...