ফিজিকস টিচার

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

পদার্থবিজ্ঞান বইয়ের দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রেহানা। বেশ মোটাসোটা। ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করল তার। কিন্তু আকার দেখে আর সাহস হলো না। বইয়ের দিকে তাকাতেই ইচ্ছে করছে না। অথচ মাস তিনেক পর পরীক্ষা। পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে কোনো লাভ হয়নি। সারা রাত পড়ার ফল মাত্র ১৮! অগত্যা পড়তেই হবে।

দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বইটা হাতে নেয়। ঠিক তখনই কলবেল বেজে ওঠে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন এক দীর্ঘাঙ্গী নারী। চোখে পুরু চশমা, হাতে বড়সড় এক কালো হাতব্যাগ। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল রেহানা। ছেলেধরা নয় তো। হ্যাঁ, ছেলেধরাই—রেহানা এখন নিশ্চিত। তাই বলে চিৎকার করবে না। শিশু নয় সে এখন আর। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল, ‘কী চাই?’

‘এটা কি রেহানাদের বাড়ি?’ চোখের মোটা চশমা ঠিকঠাক করে আগন্তুক বললেন।

হুম, বেশ এক্সপার্ট ছেলেধরা, খোঁজখবর নিয়েই এসেছে, ভাবল সে। হ্যাঁ বা না, কিছু বলার আগেই আগন্তুক বললেন, ‘তোমার ফিজিকস ভালো লাগে না?’

আরও পড়ুন
দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বইটা হাতে নেয়। ঠিক তখনই কলবেল বেজে ওঠে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন এক দীর্ঘাঙ্গী নারী। চোখে পুরু চশমা, হাতে বড়সড় এক কালো হাতব্যাগ।

এবার সত্যিই অবাক হয় রেহানা। আজকাল যে কিডন্যাপাররা পড়ালেখারও খোঁজখবর নেয়, তা তার জানা ছিল না। হায় কপাল! পরক্ষণেই একটা ভাবনা খেলে যায় তার মাথায়, লেখাপড়ায় ভালো না করলে মনে হয় ছেলেধরা শিশুদের কিডন্যাপ করে না। নিজেকে সামলে নিয়ে নাক সিঁটকে উত্তর দেয়, ‘নাহ, ভালো লাগে না।’

‘আমি ফিজিকস পড়াব তোমাকে, পড়বে?’

উত্তর দেওয়ার আগেই মা হাজির, ‘কার সঙ্গে কথা বলছিস, রেনু?’ আগন্তুকের ওপর চোখ পড়তেই বদলে গেল তাঁর অভিব্যক্তি। আগন্তুকের উদ্দেশে, ‘জি বলুন, কাকে চাই?’

আগন্তুক অনেক কথা বললেন একসঙ্গে। সারমর্ম হলো, আগন্তুকের নাম মণি। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রেহানাকে পড়াতে চান, এতে নিজের লেখাপড়ার খরচ বহন করার সুবিধা হবে।

‘বেশ তো, কাল থেকেই শুরু করে দিন।’ বেশ কিছু প্রশ্ন করে আগন্তুকের সম্পর্কে ভালোভাবে জানার পর যখন নিশ্চিত হলেন ওই নারী আসলে সত্যি কথাই বলছেন, তখন সম্মতি দিলেন রেহানার মা। বেশ পছন্দ করে ফেলেছেন শান্তশিষ্ট, ছিমছাম মণি আপাকে।

আরও পড়ুন
উত্তর দেওয়ার আগেই মা হাজির, ‘কার সঙ্গে কথা বলছিস, রেনু?’ আগন্তুকের ওপর চোখ পড়তেই বদলে গেল তাঁর অভিব্যক্তি। আগন্তুকের উদ্দেশে, ‘জি বলুন, কাকে চাই?’

দুই

মণি আপার পড়ানোর ধরন অসাধারণ। জাদুমন্ত্রের মতো কাটছিল পড়ার সময়টা। রেহানা ভাবতেই পারেনি যে ফিজিকস এত মজার আর সুন্দর হতে পারে। মণি আপা কখনো নিয়ে আসেন বিভিন্ন যন্ত্র, কখনো ছবি এঁকে বুঝিয়ে দেন, কত কিছু। মাঝেমধ্যেই বাইরে নিয়ে যান। বল ছুড়ে, ক্রিকেট খেলে বুঝিয়ে দেন এর পেছনের বিজ্ঞানটা। নিজের অজান্তেই ফিজিকস ভালোবেসে ফেলে রেহানা। এই ভালোবাসা শুধু পরীক্ষার পড়ার জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনেও ভালো লাগার এক অনুভূতি।

এভাবেই কেটে যায় দুটি বছর। স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফল করা এখন রেহানার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। এসএসসির ফিজিকস পরীক্ষার আগের দিন মণি আপা এসেছেন রিভিশন ঠিকঠাক হয়েছে কি না দেখার জন্য। সন্তুষ্ট তিনি।

সে সময় রেহানার চোখ আটকে যায় মণি আপার কালো ব্যাগের ভেতরে। সেই প্রথম দিনের কৌতূহল জেগে ওঠে আবার। এত দিন এই ব্যাগ কখনো খোলা দেখেনি। আজ বোধ হয় আপা জিপার লাগাতে ভুলে গেছেন। ব্যাগের ভেতরে কিলবিল করছে কী একটা জিনিস!

‘ছি!’ মুখ বিকৃত হয়ে গেছে রেহানার। ‘তেলাপোকা নাকি? আপা, আপনার ব্যাগের ভেতর ওটা কী?’

ঝট করে ব্যাগের চেইন বন্ধ করে ফেলেন তিনি, ‘তাই নাকি, হ্যাঁ পোকাই হবে হয়তো। যাক, তুমি টেনশন নিয়ো না, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নাও।’ বলেই তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে যান তিনি।

আরও পড়ুন
স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফল করা এখন রেহানার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। এসএসসির ফিজিকস পরীক্ষার আগের দিন মণি আপা এসেছেন রিভিশন ঠিকঠাক হয়েছে কি না দেখার জন্য। সন্তুষ্ট তিনি।

তিন

এসএসসির ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এসএসসিতেও ফিজিকসে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে রেহানা। খুশির এই খবর মণি আপাকে জানাতে চায় আগে। কিন্তু আপা ফোন ধরছেন না। একবার, দুবার, পঁচবার…নাহ্‌, ধরছেন না।

ফোনে না পেয়ে পরদিন মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে মণি আপার মেসে হাজির হয় রেহানা। কিন্তু তাজ্জব বনে যেতে হয় তাকে। মণি আপা নামে কেউ নাকি ছিলই না এই মেসে। অথচ তিনি এ ঠিকানাই দিয়েছিলেন।

চার

ব্যাগের ভেতরের পোষা প্রাণীকে যত্ন করে খাওয়ালেন মণি আপা। নিজ গ্রহ থেকে বিতাড়িত হওয়ার সময় যে তাকে নিয়ে আসতে পেরেছেন, সেটাই অনেক। চোখের মোটা চশমা খুলে নিজের চারটা ছলছল চোখ দিয়ে তাকালেন আকাশের দিকে, অজান্তেই বলে উঠলেন, ‘আসছে ওরা, মানুষদের রক্ষা করতে হবে ওদের কাছ থেকে, রক্ষা করতে হবে মানুষের করা সন্ধি। আর মাত্র কয়েক শ বছর, এর মধ্যেই পৃথিবীর বিজ্ঞান এগিয়ে নিতে হবে বহুদূর। এ জন্য দুই শ বছর ধরে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। নিজের চোখ মুছে সন্ধান করতে শুরু করলেন অন্য কোনো শিশুর, যে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে চায় না।

লেখক: শিক্ষার্থী, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর

*লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন