নীরব ঘাতক

অলংকরণ: রাকিব

আমি যখন প্রফেসর সোবহানের অফিসে তাঁর পাবলিসিটি এজেন্ট হিসেবে যোগ দিই, তিনি তখন কোম্পানিটি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন সবে। ‘চৌধুরী ইন্টিগ্রেটর’ নামে অত্যাধুনিক ক্যালকুলেটর বিক্রি করতাম আমরা, যেটি কাজে ডিফারেন্সিয়াল অ্যানালাইজারের সমান, কিন্তু দামে এর ২০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র। হু হু করে বিক্রি হচ্ছিল যন্ত্রটি, গোল বাধল ইন্টিগ্রেটরের সবশেষ সংস্করণটি নিয়ে।

এত দিন আমাদের জন্য কাজ করলেও প্রফেসর সোবহানের সঙ্গে আলাপ না করেই হায়দার এন্টারপ্রাইজ নামের অন্য এক কোম্পানির কাছে লেটেস্ট ভার্সনটির পেটেন্ট বিক্রি করে দিলেন ড. আসাদ চৌধুরী। মানে যন্ত্রটির উদ্ভাবক। ওই কোম্পানি অবশ্য অনেক দিন ধরেই ছোঁক ছোঁক করছিল চৌধুরীর পেছনে।

পেটেন্টটি আবার কিনে নেওয়ার জন্য গেলাম আমরা তাদের অফিসে। কিন্তু ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসতে হলো। আকাশছোঁয়া দাম চাইছে হায়দার এন্টারপ্রাইজ। ফেরার পথে মাথা ঠান্ডা করার জন্য সুন্দর এক উপত্যকায় থামানো হলো গাড়ি। সোবহান স্যার সোজা গিয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়লেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নাক ডাকতে লাগলেন তিনি। আমারও শুয়ে থাকতে থাকতে তন্দ্রা লেগে এল।

বিকেলের দিকে বিকট এক আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। কান পেতে বুঝলাম, লাউডস্পিকারে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে জনৈক আক্কাস আলীর। গমগমে আওয়াজটা দূরে মিলিয়ে যাওয়ার পর শব্দদূষণ নিয়ে আলোচনা শুরু হলো আমাদের।

‘যখন-তখন ব্যবহার করার মতো সাউন্ড ব্যারিয়ার সিস্টেম থাকলে খুব ভালো হতো, তাই না?’ মন্তব্য করলেন প্রফেসর।

‘তা তো হতোই, স্যার।’ বলি আমি, ‘কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, বাতাস না সরিয়ে সাউন্ড ব্যারিয়ার তৈরি করা যায় না।’

‘হুম। চলো, গাড়িতে ফেরা যাক,’ বললেন প্রফেসর অন্যমনস্ক স্বরে।

আরও পড়ুন
এত দিন আমাদের জন্য কাজ করলেও প্রফেসর সোবহানের সঙ্গে আলাপ না করেই হায়দার এন্টারপ্রাইজ নামের অন্য এক কোম্পানির কাছে লেটেস্ট ভার্সনটির পেটেন্ট বিক্রি করে দিলেন ড. আসাদ চৌধুরী।

দুই

মাসখানেক পর প্রফেসরের অফিস কামরায় ডাক পড়ল আমার।

‘তরঙ্গ প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে কী জানো তুমি?’ সরাসরি জানতে চাইলেন তিনি।

‘ঠিক কোন জিনিসটা জানতে চাইছেন, স্যার?’ পাল্টা জিজ্ঞাসা করি।

‘প্রথমে উঁচু, তারপর নিচু—এ রকম একটি শব্দতরঙ্গের কথা চিন্তা করো। এবার আরেকটি তরঙ্গ নাও, যেটি আগেরটির মতোই; তবে প্রথম অংশ নিচু এবং পরের অংশ উঁচু—এভাবে এগিয়েছে। এখন যদি এই দুই তরঙ্গকে একটির ওপর আরেকটি ফেলা যায়, কী পাচ্ছ তাহলে?’

‘তাহলে তো, স্যার, একটির উঁচু অংশ অন্যটির নিচু অংশের ওপরে পড়বে এবং দুটি তরঙ্গই একে অন্যকে বাতিল করে দেবে—কোনো শব্দই আর শোনা যাবে না।’

‘ঠিক বলেছ। এবার দেখো...।’ বলে একটা পেপারওয়েট তুলে নিয়ে ডেস্কের ওপর ফেললেন প্রফেসর, কিন্তু কোনো আওয়াজই হলো না। এবার পকেটে হাত দিয়ে কী একটা নাড়াচাড়া করে আবার ফেললেন তিনি ভারী জিনিসটা। শোনা গেল জোরালো শব্দ।

কী ঘটেছে, হৃদয়ঙ্গম করতে পেরে মূর্তির মতো বসে রইলাম আমি। একটু পর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘এ যে অবিশ্বাস্য!’

‘আবার দেখতে চাও?’

‘না, স্যার! তা, কোথায় রেখেছেন যন্ত্রটা?’

টেবিলের একটা ড্রয়ার খুলে দেখালেন প্রফেসর।

মোটামুটি সহজ সার্কিটের ছোটখাটো যন্ত্র। বহনযোগ্য। প্রফেসরের নিজের তৈরি।

‘আর স্পিকারটা—ওটাকে যদি স্পিকার বলা যায় আরকি—আছে ওই পর্দার পেছনে,’ বললেন তিনি।

‘এটার রেঞ্জ কতটুকু, স্যার?’ জানতে চাইলাম।

‘৩০ ফিট, তবে যন্ত্রের পাওয়ার বাড়ালে রেঞ্জও বাড়বে।’

‘তা, কী করতে চাইছেন এখন এটা নিয়ে?’

‘আপাতত একটা রিপোর্ট তৈরি করো এটার ওপর। খুঁটিনাটি তথ্যগুলো মেইল করে দিয়েছি তোমাকে।’

আরও পড়ুন
‘তাহলে তো, স্যার, একটির উঁচু অংশ অন্যটির নিচু অংশের ওপরে পড়বে এবং দুটি তরঙ্গই একে অন্যকে বাতিল করে দেবে—কোনো শব্দই আর শোনা যাবে না।’

তিন

রিপোর্ট জমা দেওয়ার কিছুদিন পর একদিন বেশ খুশি খুশি মনে হলো প্রফেসরকে। কারণ জানতে চাইলে একটা চেক দেখালেন আমাকে।

মোটা অঙ্কের বিনিময়ে সাইলেন্সার যন্ত্রটির পেটেন্ট বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।

তবে কথা কিন্তু সেটি নয়। আকাশ থেকে পড়লাম চেকে কার সই, তা দেখে। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির কর্ণধার গোলাম হায়দারের!

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম তাঁর দিকে।

মিটিমিটি হাসি দিয়ে উত্তরটা এড়িয়ে গেলেন প্রফেসর।

কদিন বাদে শুনি, হায়দার এন্টারপ্রাইজের নামে বাজারে চলে এসেছে যন্ত্রটা। এমন রাগ লাগল আমার যে বলার নয়!

শিগগিরই তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠল ওই সাইলেন্সার। বিশেষ করে হাসপাতালগুলো থেকে প্রচুর অর্ডার পেতে লাগল হায়দারের কোম্পানি।

আরও পড়ুন
তবে কথা কিন্তু সেটি নয়। আকাশ থেকে পড়লাম চেকে কার সই, তা দেখে। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির কর্ণধার গোলাম হায়দারের!

চার

একদিন কথায় কথায় জানালেন প্রফেসর, ইতালিয়ান অপেরা দল এসেছে বাংলাদেশে। শিল্পকলা একাডেমিতে শো আছে তাদের। অপেরা দেখতে যাওয়ার প্রস্তাব করলেন তিনি। অবাক লাগল। কারণ গানবাজনার প্রতি বিশেষ কোনো ঝোঁক তাঁর আছে বলে মনে হয়নি কখনো।

যা-ই হোক, গেলাম আমরা অপেরার অভিজ্ঞতা নিতে। রোজ রোজ তো চর্মচক্ষে এসব দেখার সুযোগ মেলে না!

ভালোই লাগছিল দেখতে। হঠাৎ হলরুমজুড়ে নেমে এল নিস্তব্ধতা। দর্শক, অভিনেতা—এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে সবাই। শুরু হলো আয়োজকদের ছোটাছুটি।

প্রথমে ভাবলাম, মাইক্রোফোনের সমস্যা। কিন্তু না, পাশের দর্শকের মুখ নড়ছে, তা-ও কোনো আওয়াজ আসছে না কানে। এমনকি নিজের কথাও নিজে তিনি শুনতে পাচ্ছেন বলে মালুম হচ্ছে না। আর সে জন্যই বোধ হয় চোখজোড়া ছানাবড়া তাঁর। একই অবস্থা অন্য সবারও।

হতভম্ব চেহারায় তাকালাম প্রফেসরের দিকে। আমারই দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছেন তিনি।

এক লহমায় পরিষ্কার হয়ে গেল, কী ঘটছে আসলে এখানে।

পরদিন হায়দার এন্টারপ্রাইজ ও তাদের সাইলেন্সার যন্ত্রটিকে যাকে বলে একেবারে ধুয়ে দিল খবরের কাগজগুলো। এ-ও শোনা যেতে লাগল, লাইসেন্সও নাকি বাতিল হয়ে যেতে পারে হায়দারের কোম্পানির।

বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে

আরও পড়ুন