আগ্রাসন
এক
হাসপাতালের পেশেন্ট রুমে নিজের বেডে আধশোয়া হয়ে আছে পঁয়ত্রিশ বছরের রিজওয়ান। হালকা সবুজ রঙের ঢিলেঢালা রোগীর পোশাক তার পরনে। হাতে মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন। বইয়ের প্রচ্ছদে উড়ন্ত সসারের ছবি। তবে বইটা পড়ছে না সে। তাকিয়ে আছে সামনের টিভির পর্দার দিকে। চোখজোড়া দেখে অবশ্য মনে হচ্ছে না, টিভি দেখছে যুবক, দৃষ্টি সুদূরে কোথাও। বাইরের কড়া রোদ ঠেকাতে জানালার পর্দাগুলো টেনে দেওয়া হয়েছে।
‘আরেকবার ভেবে দেখো, রিজু, অপারেশন করাবে কি না।’ এ নিয়ে বোধ হয় শততমবারের মতো কথাটা বলল বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবন্তী।
স্ত্রীর সঙ্গে চোখাচোখি হলো রিজওয়ানের। পরির মতো মেয়েটির চেহারায় দুশ্চিন্তার ছায়া দেখে হাসল ও। ‘চিন্তা কোরো না, জানু। আমাদের চেয়ে তো ভালো বোঝেন ডাক্তাররা, তাই না?’
‘কিন্তু খোদা না করুক, কোনো একটা বিপদ–আপদ যদি হয়ে যায়?’
কথাটা বলামাত্রই কেবিনে প্রবেশ করলেন মাঝবয়সী চিকিৎসক সাফায়েত খন্দকার। চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে তাঁর।
‘এখন কেমন বোধ করছেন, রিজওয়ান সাহেব?’ নির্ভরতার হাসি দিয়ে জানতে চাইলেন তিনি।
‘আরেকবার ভেবে দেখো, রিজু, অপারেশন করাবে কি না।’ এ নিয়ে বোধ হয় শততমবারের মতো কথাটা বলল বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবন্তী।
‘একটু যে নার্ভাস লাগছে না, এটা বললে মিথ্যে বলা হবে।’ হাসিটা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো রিজওয়ান। টেনশনে গলা শুকিয়ে গেছে।
‘স্বাভাবিক।’ মাথা নাড়লেন চিকিৎসক। ‘তবে এটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে সময়মতো আমাদের কাছে এসেছেন বলে কতটা ভাগ্যবান আপনি।’
ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়ল যুবক।
‘আপনার কন্ডিশনটা এতটাই রেয়ার যে দেশের আর কোনো হাসপাতালে এর ট্রিটমেন্ট করতে রাজি হতো না।’ জানালেন ডাক্তার। ‘আমাদের সৌভাগ্য যে সমস্যাটা ধরতে পেরেছি আমরা।’
‘রোগটার ব্যাপারে যা বললেন আপনারা, এখনো এর অনেক কিছুই মাথায় ঢুকছে না আমার।’ বিপন্ন দেখাচ্ছে রিজওয়ানকে—‘আগে তো কখনো শুনিনি এ ব্যাপারে।’
‘এ ধরনের কেসগুলো দুর্লভ বলেই হয়তো শোনেননি আগে।’ হাসি লেগেই রয়েছে ডাক্তারের ঠোঁটে। ‘শোনেন না মাঝেমধ্যে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের কথা? ও রকমই আরকি। পার্থক্য কেবল এ রোগের নিরাময় সম্ভব।’ চকিতে চাইলেন তিনি রিজওয়ানের স্ত্রীর দিকে। ‘তা, তৈরি তো আপনি?’
‘জি ডক্টর, তৈরি।’
‘আপনার কন্ডিশনটা এতটাই রেয়ার যে দেশের আর কোনো হাসপাতালে এর ট্রিটমেন্ট করতে রাজি হতো না।’ জানালেন ডাক্তার। ‘আমাদের সৌভাগ্য যে সমস্যাটা ধরতে পেরেছি আমরা।’
দুই
হলওয়ে ধরে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চাকা লাগানো বিছানাটা। খানিক পরই ঢুকে পড়ল ওটা ‘অপারেটিং রুম’ লেখা জোড়া দরজা দিয়ে।
প্রমাণ সাইজের এক জোড়া অপারেটিং লাইটের উজ্জ্বল আলোর নিচে এনে রাখা হলো বেডটা।
সার্জনের এক সহকারী গিয়ে অ্যানেসথেটিক ট্যাংকের সেটটা নিয়ে আসতে আসতে সার্জিক্যাল মাস্ক আর ক্যাপ পরে নিলেন ডাক্তার। বললেন, ‘অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হবে এখন আপনাকে।’
রিজওয়ান ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতেই ট্যাংকের সঙ্গে যুক্ত প্লাস্টিকের মাস্ক তার নাকে–মুখে পরিয়ে দিলেন তিনি।
তিন
সাড়ে তিন ঘণ্টা পর চেতনা ফিরল রিজওয়ানের। দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে আসতেই ধড়াস করে লাফ মারল তার হৃৎপিণ্ড।
বিরাট মাথাওয়ালা, কোঁচকানো নীল চামড়ার এক মানবসদৃশ প্রাণী কী যেন করছে তার দিকে পেছন ফিরে।
ঝট করে আশপাশে তাকিয়ে প্রায় একই রকম আরও দুটি কদাকার প্রাণী দেখতে পেল রিজওয়ান।
কী এগুলো? দেখে তো মনে হচ্ছে ভিনগ্রহের জীব। অপারেটিং রুমে কী করছে তারা?
ধড়মড় করে উঠে বসার চেষ্টা করতেই এক নীল জীব ছুটে এসে চেপে ধরল তাকে বিছানার সঙ্গে।
বুকের মধ্যে টনটন করে উঠল রিজওয়ানের। ধস্তাধস্তির মধ্যেই চোখ নামিয়ে দেখতে পেল সে বুকের মাঝখানটায় ইঞ্চি চারেক লম্বা সেলাইয়ের দাগটা।
সার্জনের এক সহকারী গিয়ে অ্যানেসথেটিক ট্যাংকের সেটটা নিয়ে আসতে আসতে সার্জিক্যাল মাস্ক আর ক্যাপ পরে নিলেন ডাক্তার। বললেন, ‘অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হবে এখন আপনাকে।’
ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নেমে পড়ল রিজওয়ান বিছানা থেকে। টলমল পায়ে দরজা লক্ষ্য করে দৌড় দিতেই সাফায়েত খন্দকারের কণ্ঠে শোনা গেল পেছন থেকে:
‘কোথায় পালাচ্ছেন, রিজওয়ান সাহেব? গোটা হাসপাতালই তো চালাচ্ছি আমরা।’
ছিটকে বেরোল রিজওয়ান দরজা দিয়ে।
ছুটতে ছুটতে চারপাশে তাকিয়ে এলিয়েনটার বক্তব্যের সত্যতা উপলব্ধি করল ও হাড়ে হাড়ে। গ্রহান্তরের প্রাণীতে গিজগিজ করছে হাসপাতাল। ডেস্কের পেছনে বসা রিসেপশনিস্ট, করিডর দিয়ে হেঁটে যাওয়া সিকিউরিটি গার্ড; এমনকি ছোট ছোট শিশু নিয়ে যারা হাসপাতালে এসেছে, কেউই আসলে মানুষ নয়।
এ কী হচ্ছে এখানে!
হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল রিজওয়ান। বেদম হাঁপাচ্ছে পেট চেপে ধরে। খিঁচে দৌড় দেওয়ায় চিনচিন করছে পেটের মধ্যে। সে সঙ্গে অপারেশনের ধকল আর যন্ত্রণা মিলে দাঁড়াতে পারছে না সোজা হয়ে।
আচমকা বিজাতীয় হাসির আওয়াজে চোখ তুলে চেয়ে দেখে, হাসছে সবাই তার দিকে তাকিয়ে। মস্ত কোনো তামাশার সাক্ষী হয়েছে যেন তারা।
শরীরে কেমন একধরনের অস্বস্তিবোধ টের পেল রিজওয়ান। কিছু যেন কিলবিল করছে চামড়ার নিচে। তাকিয়ে দেখে, নীলচে হতে শুরু করেছে তার চামড়া। হাতের আঙুল থেকে শুরু হয়ে নীলের স্রোত ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে।
দেহকাঠামোয় পরিবর্তন শুরু হতেই হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল সে। মরণচিৎকার বেরিয়ে এল আত্মার গহিন থেকে।
হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল রিজওয়ান। বেদম হাঁপাচ্ছে পেট চেপে ধরে। খিঁচে দৌড় দেওয়ায় চিনচিন করছে পেটের মধ্যে।
চার
জ্ঞান ফিরতেই হাসপাতালের বিছানায় নিজেকে আবিষ্কার করল রিজওয়ান। ধক্ ধ্ক করছে বুকটা। ডান হাত চোখের সামনে তুলে ধরে নিশ্চিত হয়ে নিল, না, ঠিকই রয়েছে তার চামড়ার রং।
বাপ রে বাপ...কী বিচিত্র স্বপ্ন! কদিন ধরে সায়েন্স ফিকশন পড়ার ফল নাকি?
বাঁ দিকে ঘাড় কাত করতেই চোখে পড়ল, ছোট্ট সোফাটায় পা তুলে দিয়ে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে আছে অবন্তী।
স্ত্রীর প্রতি মমতা বোধ করল রিজওয়ান। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তার সেবা–যত্নে ত্রুটি করছে না মেয়েটা।
অপারেশনের পর কতক্ষণ পার হয়েছে, বোঝার জন্য তাকাল সে টিভির দিকে। নিঃশব্দে চলছে টিভিটা।
খবর পড়ছে সংবাদপাঠিকা। চোখেমুখে রাজ্যের উদ্বেগ আর উত্তেজনা।
নিউজ হেডলাইনের ওপর চোখ পড়তে আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল রিজওয়ান। মুহূর্তে ঠান্ডা বরফ পুরো শরীর।
খবরের শিরোনাম ঘোষণা করছে—ভিনগ্রহবাসীর অতর্কিত হামলায় বিপর্যস্ত ঢাকা! বিশাল এলাকায় আস্তানা গেড়েছে মহাকাশের প্রাণীরা!