অন্য পৃথিবীর গল্প
এক
বিজ্ঞানী থিবাস এখনো বিজ্ঞান সমিতির প্রেসিডেন্ট। বুকের ভেতর মরুঝড়ের মতো হাহাকার করে ছুটে বেড়াচ্ছে কষ্টগুলো, তবু বুকে স্মিত হাসি নিয়ে সভা শুরু করার নির্দেশ দিলেন তিনি।
মূল কম্পিউটার জি জিরো এক্স মিটিংয়ের মূল বক্তব্য পাঠ করা শুরু করল চমৎকার সুরেলা কণ্ঠে। ২৯১১ সালের আজ ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখ। সময় ১৯টা বেজে ৩২ মিনিট ২৪ দশমিক ৭ সেকেন্ড। ৩৩২তম বিজ্ঞান সমিতির ১৫তম সভা শুরু হচ্ছে। আমি নতুন একটি গ্রহ আবিষ্কারের জন্য সবার পক্ষ থেকে মহান বিজ্ঞানী অংচর্মাসকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।...২০ শতকের বিজ্ঞানীদের অবদানকে ধারাবাহিকতা দিয়ে অমরত্ব লাভ করেছেন বিজ্ঞানী অংচর্মাস এবং তাই বিজ্ঞান সমিতি...
কে কী বলছে, বিজ্ঞানী থিবাস শুনছেন, কিন্তু বুঝতে পারছেন না। মাথার কোষগুলোতে এখন নিষ্ফলা জমির বোবাকান্না। আজকের মৃত পৃথিবী যেমন কাঁদে। হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন বিজ্ঞানী অংচর্মাসের দিকে, মহান আবিষ্কারের জন্য একটু পরই তাঁর হাত ছুঁয়ে ধন্যবাদ জানাবেন। সবই করবেন। শুধু বুকের ভেতরে কেঁদে যাবে প্রাচীন পৃথিবীর গাছ থেকে ঝরে যাওয়া পাতাগুলো।
অথচ চরম উন্নত সভ্যতা নিয়ে গর্বে মানুষের মাটিতে পা পড়ে না। পড়বে কীভাবে? পৃথিবীর নরম মাটি নোংরা আবর্জনার ডাস্টবিন হয়ে গেছে। এখানে এখন কোনো গাছ শিকড় ছড়িয়ে মাটির বুক থেকে ভালোবাসা টেনে নেয় না। কোনো পাখি বাতাস থেকে শুষে নেয় না অক্সিজেনের ঢেউ। মহাবিশ্বের নানা জায়গায় কৃত্রিম তাঁবুটাবু বানিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে মানুষ, তবু বড়াই করা চাই—মানবসভ্যতা নাকি মহাজাগতিক সভ্যতা।
বিজ্ঞানী থিবাস সব ভুলে হাসতে শুরু করলেন। মহাজাগতিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় আসনে বসে থেকেও বুকের কষ্টকে ঠেলে ফেলতে পারলেন না। পাগলের মতো হাসতে গিয়েই দুই চোখের কোল গড়িয়ে পড়ল গরম কিছুটা পানি।
বিজ্ঞান সমিতির প্রত্যেক সভ্যের মুখে ব্যঙ্গের হাসি। কুৎসিতভাবে চোখ সরু করে সবাই তাকিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানী থিবাসের যন্ত্রণাকে। বলা যায়, রীতিমতো উপভোগ করছেন। মূল কম্পিউটার কণ্ঠ পাল্টে কর্কশ করে ফেলল। চিৎকার করে উঠল রুমের প্রতিটি শব্দযন্ত্র। দেয়ালের নরম আলো হঠাৎ নিভে আবার জ্বলে উঠল। এই প্রথম এখানে কেউ শব্দ করে হাসল। বাতাসে শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি বিশ্রীভাবে ওঠানামা করছে। ধাতব কণ্ঠে ধমকে উঠল জি জিরো এক্স, এক্ষুনি শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক করুন!
বিজ্ঞানী অংচর্মাস ক্রুদ্ধভাবে হাতের মুঠি পাকিয়ে বলেই ফেললেন, সহ্যের একটা সীমা আছে!
বিজ্ঞানী থিবাস বুঝলেন, বহুদিনের জমা আক্রোশ অংচর্মাসের ভদ্রতার মুখোশ ফুঁড়ে এইমাত্র লাফিয়ে পড়ল। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী পিথামুচ কাঁপা কাঁপা স্বরে বিজ্ঞানী থিবাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ তো রীতিমতো অপমান!
বিজ্ঞান সমিতির প্রত্যেক সভ্যের মুখে ব্যঙ্গের হাসি। কুৎসিতভাবে চোখ সরু করে সবাই তাকিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানী থিবাসের যন্ত্রণাকে। বলা যায়, রীতিমতো উপভোগ করছেন।
এতক্ষণে বারুদে আগুন ধরল। অপমান শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে বারবার ফিরে আসতে লাগল বিজ্ঞানী থিবাসের কানে। অপমান! গত সভায় ঠিক একই রকমভাবে সবাই মিলে অপমান করেছিলেন তাঁর ছেলে বিজ্ঞানী থিরানুকে। তিনি কিছুই বলেননি। মাথা নিচু করে শুনে গেছেন। শেষমেশ শান্তভাবে সভা সমাপ্ত করে বাড়ির পথ ধরেছেন। পেছনে তখনো বিদ্রূপের ফোয়ারা ছুটেছে।
যাক সে কথা। আজ কী ঘটে, দেখা যাক।
গম্ভীর স্বরে বিজ্ঞান সমিতির প্রেসিডেন্ট বিজ্ঞানী থিবাস বললেন, এই মুহূর্তে আমি আমার পদত্যাগের কথা ঘোষণা করছি। তবে এর আগে যে আবিষ্কারটির জন্য বিজ্ঞানী অংচর্মাসের নামের সঙ্গে মহামান্য শব্দটা জুটেছে, সেই আবিষ্কার...হ্যাঁ...আমি বলছি, তার জন্য আমি অভিনন্দিত করব বিজ্ঞানী থিরানুকে...আর...আপনাকে ধিক্কার জানাই...অবশ্যই!
কোথাও কোনো শব্দ নেই। প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে বিজ্ঞানী অংচর্মাস বিজ্ঞানী থিবাসকে লক্ষ করে সব ভদ্রতা জলাঞ্জলি দিয়ে বললেন, তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের স্বভাবই হচ্ছে অহেতুক আবেগ দেখানো। নাকি কান্না না কাঁদলে যেন শান্তি হয় না!
তৃতীয় বিশ্ব, অর্থাৎ থার্ড ওয়ার্ল্ড বলা হয় সেই পুরোনো পৃথিবীটাকেই। বিজ্ঞানী থিবাস সেখানেই তো ছিলেন। কেন যে চরম বোকামি করে বিজ্ঞানী হওয়ার নেশায় তথাকথিত ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড, এই কুৎসিত মঙ্গলে এসেছিলেন তিনি!
থিরানুও তা-ই বলে। এখনো সেই ছোটবেলার মতো বাবাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আবদারের স্বরে বলে, আমাদের পৃথিবী আমাদের স্বপ্নের ভেতর বাসা বানিয়েছে। চোখ বুজলেই দেখতে পাই...চমৎকার হলুদ রঙে মাখামাখি...সেই শর্ষেখেত...।
বিজ্ঞানী থিবাস পরম মমতায় ছেলের হাতের আঙুল নিয়ে খেলতে থাকেন আর হাসেন। শর্ষেখেতের হলুদ রং তুই চিনবি কী করে? তুই তো কখনো দেখিসনি।
তুমিও তো দেখোনি, বাবা। তবু কেন চোখ বুজলেই মনে হয়, সেই হলুদ রং চোখে গেঁথে গেছে? জানি, তোমারও তা-ই মনে হয়।
পূর্বপুরুষদের স্মৃতি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমরা। সে জন্যই এ রকম ভাবি।
কোথাও কোনো শব্দ নেই। প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে বিজ্ঞানী অংচর্মাস বিজ্ঞানী থিবাসকে লক্ষ করে সব ভদ্রতা জলাঞ্জলি দিয়ে বললেন, তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের স্বভাবই হচ্ছে অহেতুক আবেগ দেখানো।
থিরানু গর্ব করে বলে, এই ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের কারোর চোখে সেই পৃথিবীর স্বপ্ন নেই। আমরা খুব ভাগ্যবান, তা–ই না বাবা?
বিজ্ঞানী থিবাস তৃতীয় বিশ্বের প্রসঙ্গ তুলে কেউ ব্যঙ্গ করলেও কষ্ট পান না। মনে মনে হাসেন। মূর্খরা কখনো হলদে শর্ষে ফুলের প্রেমে পড়েনি। এ কারণেই বোধ হয় অন্যের আবিষ্কারও চরম নির্লজ্জভাবে গাপ করে দিতে পারে তারা। ঠান্ডা মাথায় মিথ্যা বলে। গলার স্বরে সামান্য কাঁপনও ধরা পড়ে না। থিরানুর আবিষ্কারও ওরা এভাবে কেড়ে নিল!
বিশ শতকের বিজ্ঞানীরা যখন জেনেছিলেন, মহাকাশের বেশির ভাগ নক্ষত্রের এক বা ততোধিক সঙ্গী আছে, তখন থেকেই তর্কের শুরু। আমাদের সূর্যের এ রকম জোড় আছে কি নেই। সূত্র বলে, প্রতিটি নক্ষত্রের ভেতর দূরত্ব থাকতে হবে ১০ হাজার জ্যোতির্বিদ্যাগত দূরত্ব, তবেই তাদের ভেতর কাজ করবে এক অদ্ভুত আকর্ষণ। সব কটি নক্ষত্রের খোঁজ করলে শতকরা ১৫ ভাগ জোড়া পাওয়া যাবে এই দূরত্বে। আলফা সেন্টরির সঙ্গী প্রক্সিমা সেন্টরিই তো এভাবেই জোড় বেঁধে বাস করছে। মিটমিটে আলোর প্রক্সিমা সেন্টরির মতো নক্ষত্রগুলোর নাম বাদামি বামন বা কালচে বামন।
বিজ্ঞানী থিবাস বিভিন্ন গ্রহে উপনিবেশ স্থাপনের পরিকল্পনা দিলেও তিনি মূলত মানুষের চিন্তাভাবনায় মুক্ত হাওয়া ঢোকাতে চেয়েছিলেন। মানুষ বেরিয়ে আসুক, খোলসটাকে ছুড়ে ফেলে মানুষের কাছেই ছুটে আসুক, এই তো ভেবেছিলেন। এ কারণেই থিরানুর নক্ষত্রদের জোড় বাঁধার গল্পের চেয়ে মানুষের জোড় বাঁধাটা তাঁর কাছে বেশি পছন্দের বিষয় ছিল। তাঁকে সবাই ঠাট্টা করে বলেন, প্রাচীন পৃথিবীতে এ ধরনের বহু সমাজকর্মী বাস করতেন। তিনি নাকি তাঁদেরই প্রেতাত্মা।
২০০০ সালের বিজ্ঞানীদের কাছে যখন সূর্যের জোড়া নক্ষত্র ‘শিব’ ধরা পড়ল, কী খুশিই না হয়েছিল সবাই! থিরানু তার পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকথা হাতড়ে জেনেছে, অলীক সম্ভাবনার আশায় এক সপ্তাহ নাকি পৃথিবীর কোথাও কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। রাতে তাকিয়ে থেকেছে আকাশের দিকে, যদি ‘শিব’কে দেখা যায়! বিজ্ঞানী থিরানু সূর্যের জোড় শিব নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্রহগুলোর ভেতর একটি গ্রহ আবিষ্কার করেছেন, সেটা দেখতে নাকি সেই প্রাচীন পৃথিবীর মতো। উত্তেজনায় দুই হাতে নিজের মাথার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে বাবার কাছে এসে এক নিশ্বাসে থিরানু বলল, এই পৃথিবীর মাটিতে শর্ষে ফলবে, বাবা। চোখজুড়ানো হলদে শর্ষে! সত্যি!
বিজ্ঞান সমিতির সভায় বিজ্ঞানী থিরানু তার আবিষ্কারের কথা জানাতেই চমকে উঠলেন প্রত্যেকে। বিজ্ঞানী থিবাস ভয়ে ভয়ে দেখলেন, হিংস্র হায়েনার মতো ভয়ংকর হয়ে উঠেছে তাঁদের সবার চোখ। তৃতীয় বিশ্বের বংশধর এত বড় স্পর্ধা কীভাবে পেলেন, সেটাই বোধ হয় ভাবছেন তাঁরা! মনে পড়ছে...এই তাঁরাই নিজেদের ভেতর হানাহানির চূড়ান্ত পর্যায়ে বলতে গেলে বিজ্ঞানী থিবাসের সামনে দুই হাত জোড় করে অনুরোধ করেছিলেন বিজ্ঞান সমিতির প্রেসিডেন্ট পদটা গ্রহণ করতে। তিনিই নাকি একমাত্র নিরপেক্ষ লোক ছিলেন, মহান বিজ্ঞানী ছিলেন। আর এখন!
উত্তেজনায় দুই হাতে নিজের মাথার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে বাবার কাছে এসে এক নিশ্বাসে থিরানু বলল, এই পৃথিবীর মাটিতে শর্ষে ফলবে, বাবা। চোখজুড়ানো হলদে শর্ষে! সত্যি!
সূর্য থেকে ৯০ হাজার জ্যোতির্বিদ্যাগত দূরত্বে রয়েছে শিব। তবে যখন ঘুরতে ঘুরতে এর কক্ষপথ আমাদের সৌরজগতের কাছে আসে, তখন দূরত্ব হয় ঠিক ১০ হাজার জ্যোতির্বিদ্যাগত দূরত্ব। প্রতি ৩০ লাখ বছর পরপর এই ‘শিব’ আঘাত করে আমাদের সৌরজগৎকে ঘিরে থাকা ওর্ট মেঘের বুকের ভেতর।
আচ্ছা! কই, আমরা তো টের পেলাম না। বিজ্ঞানী অংচর্মাস এভাবেই ব্যঙ্গ করেছিলেন।
মহাবিশ্ব টের পায়। বিজ্ঞানী থিরানু সংযতভাবেই বলেছিল সেদিন। বলেছিল, ধূমকেতুর ফুলকি ছোটে যেন মহাকাশজুড়ে। প্রচণ্ড আক্রোশে এগুলো লেজ উঁচিয়ে ছুটে চলে আমাদের সূর্যের সব কটি গ্রহের দিকে। বিশ্বাস না হয় জি জিরো এক্স এ ব্যাপারে আরও ভালো বলতে পারবে।
মূল কম্পিউটার জি জিরো এক্স শনির বলয়গুলোর বয়স সম্পর্কে বলল। ৩০ লাখ বছর আগে এগুলোর জন্ম হয়েছিল। এর পেছনে সূর্যের জোড়া নক্ষত্রের হাত আছে—এ রকম বলেছিলেন ২০ শতকের বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানী থিরানু সূর্যের সেই জোড় নক্ষত্রের নাম দিয়েছেন শিব। তিনি জানালেন, আর ১৫ বছর পর শিব আবার আসবে সূর্যের কাছে। ২৯২৬ সালে। শিবকে ঘিরে থাকা সেই গ্রহটি শিবের তৃতীয় বিশ্ব। সেই গ্রহের এক দিন প্রাচীন পৃথিবীর হিসাবে ৩০ লাখ বছরের সমান!
বিজ্ঞানী থিরানু গ্রহটির নাম দিয়েছেন ‘বসুন্ধরা’।
বিজ্ঞানী থিবাস লক্ষ করলেন, পৃথিবীর কথা বলতে গিয়ে থিরানু কী রকম আনন্দ পাচ্ছে! মাথা উঁচু করে প্রচণ্ড ভালোবাসা নিয়ে উচ্চারণ করল, পৃথিবী!
আর তখনই অন্যরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, থিরানু ভুল তথ্য দিচ্ছে, ওর হিসাবে গন্ডগোল আছে, গ্রহটির অবস্থান ঠিকভাবে প্রমাণিত হয়নি ইত্যাদি।
বিজ্ঞানী থিবাস চোখ বুজলেন। শর্ষে ফুলের আশ্চর্য হলুদের কথা ভাবলেন। এ রকম হলুদ রং আর কোথাও আছে, বিশ্বাস হয় না। তবু থিরানু যখন বলেছে, তখন আছেই।
বিজ্ঞান সমিতির মিটিংয়ে চরমভাবে লজ্জিত হওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথেই রাস্তায় বিশাল আকৃতির ত্রিমাত্রিক দৃশ্য প্রক্ষেপণযন্ত্রে দেখলেন, তাঁর পদত্যাগপত্রের কথা বলা হচ্ছে। তিনি নাকি লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছেন।
তিনি জানেন, বিজ্ঞান সমিতিতে ভিন্নমতের কোনো ঠাঁই নেই। আরও কঠিন বাস্তবতার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে তাঁকে। থিরানুকেও?
হোম কম্পিউটার ঋ জিরো এফে তথ্য রেখে গেছে থিরানু। জানিয়েছে, কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাচ্ছে। বলেছে, তাড়াতাড়ি ফিরবে।
হতাশ হলেন থিবাস। এই এখন ছেলের হাত ধরে বসে থাকতে পারলে খুব ভালো লাগত তাঁর। বোধশক্তিহীন মানুষের মতো হাত-পা ছড়িয়ে বসলেন। ঋ জিরো এফ বলে উঠল, আপনার শারীরিক প্রতিরোধক্ষমতা খুব সামান্য।
হোক। গোঁয়ারের মতো জবাব দিলেন থিবাস।
তখন ঋ জিরো এফ দেয়াল থেকে নেমে আলোর বিচ্ছুরণে মানুষের শরীরের আকার নিয়ে নরম পায়ে এগিয়ে এসে তাঁর কাছে দাঁড়াল। বলল, মহামান্য বিজ্ঞানী থিবাস! বুঝতে পারছি, আপনার মানসিক অবস্থা খুব বিক্ষিপ্ত। আমি কি এই মুহূর্তে আপনার পূর্বপুরুষদের গল্প বলব? আমি জানি, আপনি আপনার পূর্বপুরুষদের গল্প শুনতে ভালোবাসেন।
বিজ্ঞান সমিতির মিটিংয়ে চরমভাবে লজ্জিত হওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথেই রাস্তায় বিশাল আকৃতির ত্রিমাত্রিক দৃশ্য প্রক্ষেপণযন্ত্রে দেখলেন, তাঁর পদত্যাগপত্রের কথা বলা হচ্ছে।
থিবাস হাত বাড়িয়ে ঋ জিরো এফের হাত স্পর্শ করে যেকোনো যন্ত্রের কাছ থেকে পাওয়া স্বাভাবিক ঠান্ডা ধাতব অনুভূতি পেতে চাইলেন। তা–ও পেলেন না। আলোর বিচ্ছুরণ তাঁর হাত ছুঁয়ে গেল, কোনো অনুভূতি দিতে পারল না। গলা শুকিয়ে কাঠ। তবু বললেন, তোমার বুদ্ধিমত্তা উঁচু শ্রেণির। আন্দাজ করো তো আমার ও থিরানুর ভাগ্যে এরপর কী ঘটবে?
ফার্স্ট ক্লাস বিশ্ব ছেড়ে আপনাদের চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ দশমিক ৯৯।
বুকের ভেতর যেন একসঙ্গে অনেকগুলো দরজা খুলে গেল ঋ জিরো এফের কথা শুনে। তিনি তো এখান থেকে চলে যেতেই চান। তবে কোথায় যাবেন? কোথায়?
তৃতীয় বিশ্ব। আমার গাণিতিক হিসাব তা-ই বলছে মহামান্য।
উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন থিবাস। অসম্ভব! ওই মৃত পৃথিবীতে কোনো মানুষ বাস করতে পারে না, তুমি জানো ভালো করে। তবে?
এ ব্যাপারে আমি শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত মহামান্য।
ঋ জিরো এফ বারবার একই জবাব দিল। এরপর আর কী বলার আছে! রাতে ঘুম ভালো হলো না থিবাসের। অনেকক্ষণ থিরানুর জন্য অপেক্ষা করে না পেরে দরজার কাছে বসে ছিলেন। ওভাবেই দুঃস্বপ্নের মতো রাত কাটিয়ে দিলেন। হোম কম্পিউটার কিছুক্ষণ স্বাস্থ্য নিয়ে বকবক করতেই ওটার সার্কিট বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। কত আর সহ্য হয়!
যখন ঘুম ভাঙল, তখন থিবাস দেখলেন, নিজের চোখের পানিতে নিজেই ভিজে সারা। বুকের ভেতর কোনো এক অজানা কারণে কী এক অস্থিরতা! নিজের মনেই হাহাকার করে উঠলেন, থিরানু! বাপ আমার! কোথায় আছিস তুই?
থিবাস নিশ্চিত, থিরানুর কিছু হয়েছে। এভাবে তো ও কখনো বাবাকে দেওয়া কথা না রেখে থাকে না। আসবে বলেছে, তবু এল না। এ তো হতে পারে না।
হোম কম্পিউটারের সংযোগ ঘটিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন থিবাস। মিডিয়াগুলো মহামান্য বিজ্ঞানী থিরানুকে নিয়ে কোনো রিপোর্ট করেছে কি না, জানতে চান। বেশ কিছু হেডিং শুনেই মনে হলো বমি আসবে। থিরানু লোকের সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছে, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য থিরানুকে ব্যাখ্যা দিতে হবে, বিজ্ঞান এত সোজা নয় ইত্যাদি! অসহ্য!
কিছুক্ষণ পরই নড়েচড়ে বসল কম্পিউটারটি। মূল ল্যাবরেটরি থেকে খবর পাঠিয়েছে কেউ। থিবাস আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন, থিরানু!
এত বছর পর থিবাস বুঝলেন, তাঁর রক্তের ধারা কী প্রবল আকর্ষণে তাঁকে টানতে পারে! থিরানু তাঁকে সেই টান উপহার দিয়ে গেছে গত মধ্যরাতে। এই অভিজাত সভ্য ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ছেড়ে চলে গেছে থিরানু। এই প্রথম ও বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে পারল না। লিখেছে, বাবা! বসুন্ধরায় তোমার অপেক্ষায় থাকব আমি।
প্রাচীন পৃথিবীতে যায়নি থিরানু। গেছে বসুন্ধরায়! সেখানে অপেক্ষায় থাকবে বাবার।
থিবাস চোখভর্তি পানি নিয়ে বিড়বিড় করলেন, থার্ড ওয়ার্ল্ডে তোর সঙ্গে দেখা হবে, বাপ। অবশ্যই দেখা হবে।
যখন ঘুম ভাঙল, তখন থিবাস দেখলেন, নিজের চোখের পানিতে নিজেই ভিজে সারা। বুকের ভেতর কোনো এক অজানা কারণে কী এক অস্থিরতা! নিজের মনেই হাহাকার করে উঠলেন, থিরানু!
দুই
একটানা রঙের এত বৈচিত্র্য ছেলেটা আগে কখনো খুঁটিয়ে দেখেনি। আজ দেখছে। আসলে ওর পাশে লালচে রেশম চুলের এই মেয়ে থাকলে সবকিছুই ওর কেবল খুঁটিয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। মনের ভেতর আসন গেঁড়ে বসে এক অন্য রকম আনন্দ। লাল টুকটুকে ঠোঁটের এক ছোট্ট পাখির ডানার দারুণ নীল–হলুদের মাখামাখি দেখে হাসি ফুটল চোখে। গর্ব মিশিয়ে বলল, বসুন্ধরা! আমাদের বসুন্ধরা! এত সুন্দর!
মেয়েটির চোখেও মাটির মমতা। আপন মনে প্রশ্ন করল, এর চেয়ে সুন্দর জায়গা কোথাও নেই। ঠিক না?
ছেলেটি মাথা নাড়ল। মানতে পারল না মেয়েটির কথা। এ রকম সুন্দর এক পৃথিবী ছিল মহাকাশের কোনো এক জায়গায়। ছেলেটি অহেতুক রোদে ভরা মেঘে চোখ ঝলসে খুঁজতে লাগল রূপকথার রাজ্যের সেই হারিয়ে যাওয়া সুন্দর পৃথিবীকে। পেল না। তাতে কি! বাবা বলেছেন, ছিল। পৃথিবী এ রকমই সুন্দর ছিল। পৃথিবী বসুন্ধরার মতোই সুন্দর ছিল।
ঠোঁট উল্টে এমন ভঙ্গি করল মেয়েটি, যেন ওর বিশ্বাস হচ্ছে না।
বাবা বলেছেন, বসুন্ধরার বোন সেই পৃথিবী। আমাদের বংশ যুগ যুগ ধরে রক্ষা করে চলেছে হারানো পৃথিবীর ইতিহাস।
মেয়েটির দুই হাতের মুঠো ছেলেটির হাতে বন্দী। যেন কী এক মনকাড়া গল্প বলছে, এমনভাবে ছেলেটি বলল, অনেক অনেক দিন আগেকার কথা। এখন থেকে ৩০ লাখ বছর আগে...
এখন থেকে তি…তি…তিরিশ লাখ বছর আগেকার কথা!
তখন বসুন্ধরায় বাস করত আমাদের পূর্বপুরুষেরা। অসভ্য, জংলি, কাঁচা মাংসখেকো জন্তু তারা। না, মানুষ বলা যায় না তাদের। একদিন...একদিন অন্য পৃথিবীর এক মানুষ এল তাদের কাছে, সেই পৃথিবীর মানুষ।
হ্যাঁ। আমাদের জন্মদাতা। তিনি এসেছিলেন। তাঁর ভালোবাসায় ভরে উঠল এই মাটি, এই আকাশ।
তিনি না এলে আমরা হয়তো আরও পরে এ রকম সভ্য হয়ে উঠতাম। না-ও হতে পারতাম। তাঁর শিক্ষা আঁকড়ে ধরতে পেরেছি। এ আমাদের পরম পাওয়া।
চোখ ভিজে উঠল মেয়েটির। তিনি আমাদের ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, তা–ই না?
ঠিক তা–ই।
তাঁর শিক্ষাতেই আমরা ভালোবাসতে শিখেছি। আর এত বছর পরও এ কারণেই বুঝি আমরা ভালোবাসতে জানি। আচ্ছা, তিনি কি দেবতা? মেয়েটি জানতে চায়।
না, তিনি মানুষ ছিলেন। ঠিক আমাদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষ।
মাছরাঙা টুপ করে পানিতে ঢেউ জাগিয়ে বসল গাছের ডালে। তাই দেখে এই দুজন হেসে লুটোপুটি হয়। ওরা ভাবে, এ রকমভাবেই সেই পৃথিবীর মানুষেরাও কি হাসত?
আচ্ছা, অত সুন্দর গ্রহটা মরে গেল কেন?
মেয়েটির দুই হাতের মুঠো ছেলেটির হাতে বন্দী। যেন কী এক মনকাড়া গল্প বলছে, এমনভাবে ছেলেটি বলল, অনেক অনেক দিন আগেকার কথা। এখন থেকে ৩০ লাখ বছর আগে...
এই প্রশ্ন কতবার যে করে ওরা। বাবার কাছেও করে। বাবা কিছু বলেন না। ওরা জানে না, সেই পৃথিবীর মৃত্যুর জন্য সেই পৃথিবীর মানুষেরাই দায়ী। মানুষই পারে চরমতম কুৎসিত হতে, আবার এর উল্টোটাও হয়।
ছেলেটির বাবা প্রতিদিনের মতোই আকাশের দিকে তাকিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসা কোনো উল্কা খুঁজছেন। বুকের কাছে শক্ত করে ধরে রেখেছেন ৩০ লাখ বছরের পুরোনো এক শক্ত পাথরখণ্ড। তাদের পরিবারে পবিত্র বস্তু বলে স্বীকৃত এই পাথরখণ্ড, যার গায়ে নিঃসঙ্গ এক মানুষ দুবার ‘বাবা’ ডাকটি লিখে রেখেছেন।
কী আশ্চর্য এক ইতিহাস! একজন মানুষ তাঁর চারপাশের সবার কাছে কষ্ট পেয়ে প্রিয় পিতার আদর ছেড়ে এমন জায়গায় চলে এলেন, যেখান থেকে ফিরবেন না কখনো। অসভ্য বনমানুষের ভেতর শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছেন, যতটুকু পারা যায়। দিনের পর দিন পাথরে, মাটিতে, গাছের বাকলে নিজের দীর্ঘশ্বাস, নিজের জন্মদাতার প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন। বসুন্ধরার মানুষ যখন সভ্য হলো, তখন তারা জানল সব। জানল, তিনি বলে গেছেন, পিতা আসবেন।
সত্যিই কি আসবেন তিনি? কবে আসবেন? ৩০ লাখ বছর পেরিয়ে গেছে। এবার তো সময় হয়েছে তাঁর আসার। আসবেন তো? আসবেন তো পিতা?
ছেলে কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেননি বাবা। ফিসফিস করে ছেলেটা ওর বাবাকে বলল, উল্কাপাত হলে নাকি ইচ্ছা পূরণ হয়। তোমার কি ইচ্ছা পূরণ করা বাকি?
অপেক্ষা পূরণের ইচ্ছা।
ছেলেটা তো সবকিছু এখনো জানে না। তাই অবাক হলো। জানতে চাইল, কিসের অপেক্ষা?
বংশধরের জন্য সেই অন্য পৃথিবীর মানুষের অপেক্ষা। আর তার জন্য আমাদের অপেক্ষা। জানি না, ৩০ লাখ বছর আগে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া সেই মহান মানুষটির আত্মাও একই অপেক্ষায় আছে কি না।
ছেলেটি অত কিছু শুনল না। আনন্দে চিৎকার করে উঠল, বাবা! উল্কাপাত! দেখো!
আকাশের মাঝবরাবর ঝলসে উঠল প্রচণ্ড নীল রঙের এক আলো। একমুহূর্তের জন্য উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন বাবা। সারা গা কাঁপছে থরথর করে। বাবাকে খুব আচেনা লাগছে যেন। ছেলেটা ভয়ে ভয়ে বাবার বাহু আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে অহেতুক জপ করার মতো বলতে লাগল, কী হলো! কী হলো!
রাতের ঠান্ডা বাতাসে অন্য রকম কিছুর গন্ধ। লম্বা লম্বা পা ফেলে দুজন এগিয়ে চলল আলোর উৎসের দিকে। কী আছে ওখানে? প্রচণ্ড শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান। ছেলেটির কেন যেন মনে হচ্ছে, সেই পৃথিবীর খোঁজ এসেছে। মেয়েটিকে বলতে হবে সব। বাবা বলছেন, বসুন্ধরাবাসীদের অপেক্ষার দিন কি সত্যিই শেষ হলো? যদি তা–ই হয়, চিৎকার করে সবাইকে ডেকে তুলবেন তিনি। জানাবেন, পিতা এসেছেন! পিতা!
ছেলেটির বাবা প্রতিদিনের মতোই আকাশের দিকে তাকিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসা কোনো উল্কা খুঁজছেন। বুকের কাছে শক্ত করে ধরে রেখেছেন ৩০ লাখ বছরের পুরোনো এক শক্ত পাথরখণ্ড।
তিন
বুক ভরে নিশ্বাস নিলেন থিবাস। মনের ভেতর আনন্দগুলো বুদ্বুদ হয়ে বেরিয়ে আসছে। প্রচণ্ড দ্রুততায় কীভাবে যে এখানে এসে পৌঁছেছেন, বলতে পারবেন না। শুধু জানেন, মহাকাশযান নিয়ে শেষবারের মতো মহাকাশে ঝাঁপ দিতে গিয়ে কেবলই মনে হচ্ছিল, এ যাত্রা অনন্তের পথে। হাতের সঙ্গে বাঁধা হোম কম্পিউটারটি। বহুদিনের সঙ্গী, ছেড়ে আসতে মন চাচ্ছিল না। ঘড়ির মতো করে কবজিতে জড়িয়ে রেখেছেন। নিচু স্বরে ওটা বলল, ঠিক ২৪ ঘণ্টা ১৭ দশমিক ২০ মিনিট ৪ দশমিক শূন্য ৭ সেকেন্ড লেগেছে আমাদের, মহামান্য।
থিবাসের এখন ওসব শোনার সময় নেই। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। দেখছেন আশপাশের সবকিছুকে। তাঁর ভাবনার সঙ্গে মিলছে না কিছু। থিরানু তো বলেছিল, এই গ্রহে প্রাণের জন্ম হয়েছে কেবল। অসভ্য বনমানুষেরা থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু এ তো রীতিমতো সভ্য এলাকা! রাতের নিজস্ব শব্দের সঙ্গে মৃদু তাল মিলিয়ে চলছে সভ্যতার শব্দ। দূরে চোখধাঁধানো আলোর ঝলকানি। তিনি বুঝতে পারলেন না। তাঁর দিকে এগিয়ে আসা দীর্ঘকায় ছায়া দুটোর দিকে চেয়ে মনের অজান্তেই ভেজা কণ্ঠে ডাক দিলেন, থিরানু! বাপ আমার!
ছেলেটির বাবা বুঝলেন, এই আকুল আহ্বান সময়ের সীমাকে ছড়িয়ে ৩০ লাখ বছর আগে হারিয়ে গেল। বাতাসে পাতা ঝরার শব্দ। ওদের স্পষ্ট মনে হলো, কে যেন ফিসফিস করে তীব্র উত্তেজনা নিয়ে বলছে, তুমি এসেছ, বাবা? আমি জানতাম, তুমি আসবে।
থিবাস এখন কিছুই দেখছেন না। পানিতে ভরে গেছে দুই চোখ। তবু হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে স্পর্শ করলেন।ওরবুক, মুখ, গলা, চুল স্পর্শ করে থিরানুকে ফিরে পেতে চাইলেন।বিড়বিড় করে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকার মতো করে বলছেন, আমার বংশধর। থিরানু...
বসুন্ধরার বাতাসে এখনো সেই পৃথিবীর মতোই গন্ধ নাচছে। আকাশের কোণে লালচে আভা। ডিমের কুসুম ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে যেন। থিবাস কান্নাভেজা স্বরে আর্তনাদ করে উঠলেন, বাপ, আমার! এক দিন আমি তোকে দেখিনি, অথচ কেটে গেছে ৩০ লাখ বছর!