উড়ান
যেকোনো ধরনের উড্ডয়ন, মাটি ছেড়ে ওঠা কিংবা বাতাস অথবা রকেটের শক্তি ব্যবহার করে বাতাসে ভাসা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হবে।
উড্ডয়নজনিত অপরাধে অভিযুক্ত অপরাধীর সাজা মৃত্যুদণ্ড; সেই সঙ্গে দৈবচয়নের ভিত্তিতে তিনজন মানুষকে বেছে নেওয়া হবে এবং তাদের পরোক্ষ অপরাধের দায়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
উড্ডয়নজনিত অপরাধে অভিযুক্ত অপরাধীর পরিচিতদের এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
কোনো নাগরিক যদি নিরাপত্তা-কার্ডের অধিকারী হয়, তাহলে তাকে পরোক্ষ অপরাধের দায় থেকে একবারের জন্য অব্যাহতি দেওয়া হবে।
কেউ যদি উড্ডয়নজনিত অপরাধের খবর কর্তৃপক্ষকে জানায়, তাহলে সে নিরাপত্তা-কার্ডের অধিকারী হবে; যা একজন কেবল একবারের জন্য ব্যবহার করতে পারবে।
—ঘোষণা, উড্ডয়ন আইন
কোনো নাগরিক যদি নিরাপত্তা-কার্ডের অধিকারী হয়, তাহলে তাকে পরোক্ষ অপরাধের দায় থেকে একবারের জন্য অব্যাহতি দেওয়া হবে।
১.
এটাই শেষ স্টপ।
ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়ল মেয়েটি। ছোট্ট ব্যাকপ্যাকে থাকা ইনস্ট্যান্ট নুডলসের পাত্রগুলো শব্দ করে নড়ে উঠল। একটু নার্ভাস বোধ করছে সে, সেই সঙ্গে উত্তেজিতও। যদি ধরা পড়ে, তাহলে নিজের তো মরতে হবেই...সেই সঙ্গে আরও তিনজনকে নিয়ে মরবে! ইতস্তত করে একটু থেমে দাঁড়াল মেয়েটি, তারপর আবার পা বাড়াল।
শহরটা ছোট্ট, মূল সড়কের শেষ মাথা দেখতে পাচ্ছে খুব সহজে। ছায়ায় বিশ্রামরত এক অচেনা লোকের কাছে গিয়ে মৃদুস্বরে জানতে চাইল মেয়েটি: এই বছর দুয়েক আগে এক লোক এখানে এসে বাস করতে শুরু করেছে কি না।
না, না, বিয়ে করতে আসেনি। একাই এসেছে।
হ্যাঁ, সম্ভবত একাকী বসবাস করে।
না, শহরেই বাস না-ও করতে পারে। তবে প্রথমে এখানেই আসার কথা।
যাক, ধন্যবাদ। দেখি অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে লাভ হয় কি না...
হ্যাঁ, এক লোক, বয়স তিরিশের বেশি হবে। একাই থাকে...
এভাবে বেশ কজনের সঙ্গে কথা বলার পর, সম্ভাব্য একটা ঠিকানা পেল সে। তবে জায়গাটা অনেক দূরে—পায়ে হেঁটে গেলে আধা দিন তো লাগবেই।
ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়ল মেয়েটি। ছোট্ট ব্যাকপ্যাকে থাকা ইনস্ট্যান্ট নুডলসের পাত্রগুলো শব্দ করে নড়ে উঠল। একটু নার্ভাস বোধ করছে সে, সেই সঙ্গে উত্তেজিতও।
গাড়ি? নাহ, এখানে গাড়িটাড়ি নেই। পেডিক্যাবে করে কিছুদূর হয়তো যাওয়া যাবে, তারপর পায়ে হাঁটতে হবে। একটা উপত্যকায় থাকে লোকটি, মাশরুমের খামার দিয়েছে।
লোকজন ধরে ঠিকানা আর পথনির্দেশনা বুঝে নিয়ে পথে নামল মেয়েটি। শরতের বাতাস শীতল বেশ, সেই সঙ্গে শুষ্কও। মেটে পথ থেকে ধুলা উড়ছে, বাঁ পায়ের জুতাটা তো একেবারে মরচে-রঙা হয়ে গেছে! ঘন নীল জিনসেও লেগেছে হলদে মাটি।
‘আসলেও...অনেক দূর,’ ভাবল সে।
তবে বিদ্রোহের নির্বাসিত নেতার তো এমন দুর্গম কোথাও থাকার কথা, তাই না? একটা হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। বহুদিন ধরে খুঁজছে লোকটিকে। ওর বন্ধুদের মতো তরুণ-তরুণীদের এই লোকের ব্যাপারে গল্প বলে সময় কাটে। আমাদের পৃথিবীটাকে ভিনগ্রহীরা দখল করে নেওয়ার পর, একমাত্র সে-ই আকাশে উড়েও বেঁচে আছে! মুক্ত আকাশের অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিল লোকটি, একটা প্রবল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিল; তারপর হেরে আত্মগোপন করে আছে...আর কখনো তরুণদের পথ দেখিয়ে আকাশে নিয়ে যাবে?
এই ছিল তাদের গল্পের বিষয়বস্তু।
মেয়েটির বন্ধুরা কিংবদন্তি মনে করত গল্পটিকে, কিন্তু মেয়েটি কখনো সেভাবে ভাবেনি—পথে নেমেছে আর খুঁজে বের করেছে লোকটির ঠিকানা!
ক্লান্ত হয়ে গেছে তার পা, তাই মাটিতে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্যানটিনে চুমুক দিল কয়েকটা। সামনে এগিয়ে শেষ হয়েছে ওটা সবুজ পাহাড়ের সঙ্গে, ওখানকার গাছ আর পাতাগুলো এরই মধ্যে লালচে-সোনালি বর্ণ ধারণ করতে শুরু করে দিয়েছে। দৃশ্যটা মনোমুগ্ধকর।
বন্ধুরা এই দৃশ্য দেখার সুযোগটাও পাবে না—ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল বেচারির।
আমাদের পৃথিবীটাকে ভিনগ্রহীরা দখল করে নেওয়ার পর, একমাত্র সে-ই আকাশে উড়েও বেঁচে আছে! মুক্ত আকাশের অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিল লোকটি।
শুরুতে এমন পরিকল্পনা ওদের ছিল না। কথায় কথায় বলে ফেলেছিল, চলো উড়তে যাই। কে ভেবেছিল, ছেলেরা কথাটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবে? শুধু তা–ই না, একটা গ্লাইডার পর্যন্ত বানিয়ে ফেলবে! কে যেন সে কথা জানিয়ে দিল কর্তৃপক্ষকে। সরাসরি জড়িত ছিল না বলে মেয়েটি বেঁচে গেল সেই যাত্রায়। আকাশ থেকে একটা লেজার ভেসে এসে আছড়ে পড়েছিল ছেলেদের ওপর, ভয়ানক মরণ মরতে হয়েছিল বেচারাদের।
এরপর ওই ছেলেগুলোর পরিচিত ব্যক্তিরা আতঙ্কে দিন কাটাতে লাগল—জানে, তিনজনকে বেছে নেওয়া হবে। মেয়েটা বেঁচে গেল সে যাত্রাতেও...
...তবে ওর ছোট বোনটা বাঁচতে পারেনি!
বোনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি মেয়েটি। খবর শোনামাত্র পথে নেমে যায়। রাগে ফুঁসছিল ভেতরটা। এমনিতে কোনো সঙ্গী কিংবা প্রেমিক নেই ওর, তাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সঙ্গে ভেবেছিল—কিংবদন্তিটার শেষ দেখে ছাড়বে...
...যদি ফায়দা হয়!
ক্যানটিনের ঢাকনা লাগিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে লাগল সে।
তোমাকে আমি খুঁজে পাব, কিংবদন্তির বিদ্রোহী। শিখে নেব কীভাবে এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। শিখে নেব—কীভাবে আকাশের ওই অজ্ঞাতনামা আতঙ্কের সঙ্গে লড়তে হবে!
বোনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি মেয়েটি। খবর শোনামাত্র পথে নেমে যায়। রাগে ফুঁসছিল ভেতরটা। এমনিতে কোনো সঙ্গী কিংবা প্রেমিক নেই ওর।
২.
সূর্যাস্তের দিকে সে এসে পৌঁছাল উপত্যকায়।
একটা ছোট্ট, নিদাগ সাদা দালানের চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কুড়াল দিয়ে কাঠ চিড়ছে এক লোক। তার পরনে টি-শার্ট আর ধূসর সোয়েটপ্যান্ট। কপালে আর মাংসে দেখা যাচ্ছে স্বেদবিন্দু, বাদামি চামড়ার নিচে কিলবিল করছে পেশি। ঘন, কালো চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে সামনের দিকে, কুড়ালটা নামছে আর উঠছে...চিড়ছে একের পর এক কাষ্ঠখণ্ড...
ইতস্তত করল মেয়েটি।
‘মি. চিন,’ নরম কণ্ঠে বলল অবশেষে।
কাজ থামিয়ে মুখ তুলে অনাহূত আগন্তুকের দিকে তাকাল লোকটি।
‘কিছু মনে করবেন না দয়া করে,’ সাহস জুগিয়ে বলল মেয়েটি। ‘আপনিই তো মি. চিন ইয়েহেং?’
‘হ্যাঁ, আমিই,’ নিস্পৃহ ভঙ্গিতে ভুরু মুছল লোকটি। ‘কী চাই তোমার?’
আরও খানিকক্ষণ চুপ থেকে অস্ফুট কণ্ঠে জবাব দিল মেয়েটি, ‘আমি উড়তে চাই, স্যার।’
বিদ্রূপে বিকৃত হয়ে গেল লোকটির চেহারা। ‘নাহ, তুমি নিছক উড়তে চাও না। তুমি চাও ওড়ার পরও বেঁচে থাকতে, আমার মতো। আকাশের ওই হারামিগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পরও—আমার মতো—কীভাবে বেঁচে থাকতে হবে তা জানতে চাও!’ আকাশের দিকে ইঙ্গিত দিল সে।
জমে গেল যেন মেয়েটি। কথোপকথন এই রূপ নেবে, তা কস্মিনকালেও কল্পনা করেনি!
‘আমি কীভাবে বেঁচে আছি এখনো, তা বলছি, ছোট্ট মেয়ে,’ এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল চিন। পালাতে চাইল মেয়েটি, কিন্তু মনে হলো যেন পায়ে শিকড় গজিয়েছে।
‘শোনো,’ গভীর শোনাল লোকটির কণ্ঠ, মনে হলো যেন টেনে নিচ্ছে নিজের দিকে। ‘আমাদের অনেককে ধরে ফেলেছিল বদমাশগুলো, আমিও ছিলাম তাদের মধ্যে। কিন্তু অনেকে পালাতেও সক্ষম হয়েছিল। ওরা বলল—যদি পলাতকদের ধরিয়ে দিই, তাহলে আমাকে যেতে দেবে। সে জন্যই আমি বেঁচে আছি এখনো, বুঝলে? দাঁড়িয়ে আছি তোমার সামনে। আমি বিশ্বাসঘাতক। বিদ্রোহীদের পিঠে ছুরি মেরেছি। বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি নারী-পুরুষ-শিশুর, সেই মানুষদের, যারা আমার ওপর আস্থা রেখেছিল,’ দাঁত বের করে খ্যাঁকাল সে। ‘পেলে প্রশ্নের জবাব, ছোট্ট মেয়ে?’
জবাবে কী বলবে, বুঝে পেল না মেয়েটি। অবশ্য তার দরকারও ছিল না। লোকটি জবাবের প্রত্যাশায় প্রশ্ন করেনি!
সেই রাতে খামারের অতিথি কামরায় মাথা গুঁজল ও। লোকটির স্ত্রী নেই, তবে এক বৃদ্ধাকে রেখেছে কাজে সাহায্য করার জন্য। সেই বৃদ্ধার সঙ্গেই শুলো মেয়েটি, কিন্তু দুর্গন্ধের চোটে ঘুম আসা দায়। রাতটা কেটে গেল এপিঠ-ওপিঠ করে।
পরদিন সকালে বিদায় না নিয়েই চলে গেল ও। প্রতিজ্ঞা করল—এখানে আর কখনো পা রাখবে না!
‘আমি কীভাবে বেঁচে আছি এখনো, তা বলছি, ছোট্ট মেয়ে,’ এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল চিন। পালাতে চাইল মেয়েটি, কিন্তু মনে হলো যেন পায়ে শিকড় গজিয়েছে।
৩.
শহরে ফিরে এক লোককে বিয়ে করে নিল মেয়েটি। ওর স্বামী ছোট্ট একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। কখনো কখনো ট্রেনে করে কিংবা গাড়ি চালিয়ে ছুটির দিনে বেড়াতে যেত শহরের বাইরে। জীবন কেটে যেতে লাগল, উড্ডয়নের প্রসঙ্গ আর ওঠে না বললেই চলে। তবে হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে স্মৃতিচারণা করে বলাবলি করে ওরা—বিমানযাত্রা খুব আরামের ছিল। বেশ কিছুদিন পর একটা বাচ্চা হলো ওদের।
তার কিছুদিন পরই এল এক যান্ত্রিক দূত।
আকাশ-প্রভুরা পাঠিয়েছে ওটা।
‘আমেরিকার সাম্প্রতিক বিদ্রোহের কারণে পরোক্ষ অপরাধের দায়ে ১২২ জন নাগরিক অভিযুক্ত হয়েছে। আপনাকে আফসোসের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে আপনি তাদের একজন।’
যান্ত্রিক কণ্ঠে জানাল দূত, এ ধরনের যন্ত্রমানবকে ব্যবহার করে নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ডের খবর জানানো হয়। আকাশ-প্রভুরা অবিবেচক নয়। এক ঘণ্টা সময় দেয় তারা কাজ সামলে নেওয়ার।
একেবারে সাদা হয়ে গেল ওর স্বামীর চেহারা, বাচ্চাটা কিছু বুঝতে না পারলেও বাপের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল। মেয়েটার মনে হলো, যেন আত্মাটা বেরিয়ে গেছে ওর দেহ থেকে।
হাতে আর একটা ঘণ্টা আছে তার।
‘দাঁড়াও!’ কিছু একটা খেলে গেল ওর মাথায়। আশা বেশি নেই, তবে হতাশার সাগরে এক টুকরা আশার আলো কম না! যন্ত্রমানব শীতল, ধাতব হাতটা ধরল সে; ওটা যেন খড়কুটো, ডুবন্ত মানুষের শেষ আশ্রয়। ‘যদি কোনো অপরাধীর কথা জানাই, ধরিয়ে দিই, তাহলে বাঁচতে পারব?’
‘আমেরিকার সাম্প্রতিক বিদ্রোহের কারণে পরোক্ষ অপরাধের দায়ে ১২২ জন নাগরিক অভিযুক্ত হয়েছে। আপনাকে আফসোসের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে আপনি তাদের একজন।’
থমকে গেল যন্ত্রমানব, মনে হলো প্রভুদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
‘যদি অপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে আপনাকে ক্ষমা করা হবে,’ জবাব দিল কিছুক্ষণ পর।
‘আমি জানাতে চাই,’ চেঁচিয়ে বলল মেয়েটা। ‘এক লোক তার বাড়িতে বিমান রেখে দিয়েছে! সে বাস করে বেইলিন শহরের ঠিক বাইরে, একটা মাশরুমের খামার আছে তার...’
সেই কিংবদন্তির কাছে এলেও বিমান আছে কি না, জানে না সে। তবে অনুসন্ধানে সময় লাগবে। আর ভিক্ষার চাল...কাঁড়া আর আকাঁড়া। যে সময়টা তাতে খরচ হবে, ততক্ষণ তো বেঁচে থাকবে পারবে!
তাই–বা কম কী?
এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে ফিরে এল যন্ত্রমানব।
মেয়েটার মনে হলো: মনটা যেন হতাশায় ডুবে গেছে।
‘আপনি যে অপরাধের কথা জানিয়েছেন, তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে,’ এখনো একঘেয়ে কণ্ঠ যন্ত্রমানবের। ‘অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আপনি ক্ষমা পেয়েছেন, এবারের মতো অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে আপনাকে। বিদায়, ম্যাডাম।’
শূন্য দৃষ্টিতে দূরে তাকিয়ে রইল মেয়েটি, স্থাণু হয়ে গেছে যেন। মানতে পারছে না—কিংবদন্তি মারা গেছে, আর সে বেঁচে আছে!
ওর মাথার ভেতর খেলে যাচ্ছে একটা প্রশ্ন: সত্যি সত্যি বিমান ছিল লোকটির বাড়িতে?
সেই কিংবদন্তির কাছে এলেও বিমান আছে কি না, জানে না সে। তবে অনুসন্ধানে সময় লাগবে। আর ভিক্ষার চাল...কাঁড়া আর আকাঁড়া। যে সময়টা তাতে খরচ হবে, ততক্ষণ তো বেঁচে থাকবে পারবে!
৪.
উপত্যকায় ফিরে এল মেয়েটি।
স্বামী অনেক কাকুতিমিনতি করেছিল, যেন না আসে। বাচ্চাটাও কাঁদছিল রেখে আসার সময়। কিন্তু কৌতূহল থামাতে পারেনি সে, তাই আরও একবার দেখা গেল ওকে...ধুলার মেঘ সঙ্গে নিয়ে এগোচ্ছে বর্তমানে নিঃসঙ্গ উপত্যকার দিকে।
কিংবদন্তি লোকটির মৃত্যুর পর কেটে গেছে একটি মাস। বাড়িটি এখন ধুলায় ঢাকা, পথে দেখা যাচ্ছে ঘাসের বড় বড় ডগা। রঙের উজ্জ্বলতায় যেন ধাঁধিয়ে গেল ওর চোখজোড়া।
পেছনের প্রাঙ্গণে খুঁজে পেল একটা সিঁড়ি, বেয়ে উঠে এল পাহাড়ের শীর্ষে। সেখানে নজরে পড়ল লম্বা, সমতল এক টুকরা মাঠ। কেউ নিশ্চয়ই হাত লাগিয়ে জায়গাটা সমতল বানিয়েছে। মাঠের শেষ প্রান্তে, ছাউনির নিচে বসে আছে একটা বিমান!
সেদিকে এগিয়ে গেল ও, হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল রুক্ষ ডানা; সেই সঙ্গে হাতে বানানো গ্লাইডারও। মনে হচ্ছে, যেন যত্নের সঙ্গে বানানো হয়েছে ওটা, রক্ষণাবেক্ষণও করা হতো।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো যেন লোকটা ওর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে!
দুজনেই ওরা বিদ্রোহী...দুজনেই বিশ্বাসঘাতক। আর হ্যাঁ, দুজনেই মৃত! এখানে দাঁড়িয়ে কী ভাবত লোকটি? যাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের কথা? যারা ওর জন্য পরোক্ষ অপরাধে অভিযুক্ত হতো, তাদের অন্তিম মুহূর্তের দৃশ্য দেখতে পেত কি মানসচোখে?
নিশ্চয়ই ঠিক এখানে...এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকত সেই কিংবদন্তি।
লোকটি যেদিকে চাইত, সেদিকে তাকাল ও নিজেও। বিশাল পর্বতমালার শৈরশিরা দেখতে পাচ্ছে। রানওয়েটা শেষ হয়েছে একটা খাদে।
ওখান থেকে উড়াল দিলে...থামাতে পারবে না কেউ!
ডানা মেলে বাতাসে ভাসতে পারবে সে।