আত্মঘাত
যন্ত্রটাকে চেনে না আবেদ। কিন্তু সেটা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে কোমল নমনীয় পাইপ, রংটা যার বলতে গেলে কুৎসিতই, তা দেখেই আবেদের শরীর গুলিয়ে ওঠে। কেন যেন মনে হচ্ছে, একটু পরই নলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে লাখ লাখ বিশ্রী শুঁয়াপোকা। আবেদের লেখা কোনো এক গল্পে এমনই তো ঘটেছিল মিশিয়ারার সঙ্গে। নিজেকে তার এখন গল্পের মিশিয়ারার মতোই অসহায় এবং মৃত্যুর দিকে ক্রমধাবমান মানুষ বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই আপাতকোমল যন্ত্রটা যেকোনো সময় হয়ে উঠবে মারণাস্ত্র। কোনো এক বিপৎসংকুল পরিস্থিতির ভেতর ঠেলে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফেরার কোনো উপায় আর থাকবে না।
তাহলে এভাবেই সব শেষ হওয়ার কথা ছিল?
অনেক বছর আগের সেই গানটা মনে পড়ে আবেদের—
This is the end
Hold your breath and count to ten
Feel the Earth move and then
Hear my heart burst again
For this is the end...
অথচ দিনটা শুরু হয়েছিল কতই–না চমৎকারভাবে!
ঘুম ভেঙেছিল নিজের নরম বিছানায়। পাশে শুয়ে ছিল লিয়ানা। ২৫ বছরের লিয়ানা যেন জ্যান্ত এক তরুণী। আবেদের চোখ খুলতেই লিয়ানা খসখসে কণ্ঠে বলে উঠেছিল, ‘শুভ সকাল, আবেদ জাবেন। তোমার কাছে দুটি মেসেজ এসেছে এই ভোরে। তুমি কোনটা শুনতে চাও?’
‘কোনোটাই না; বরং তোমার সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকতে চাই।’
লিয়ানা হাসে। প্রত্যুত্তরে হাসতে পারে সে প্রথম থেকেই। তবে কিছুদিন আগের আপগ্রেড প্রোগ্রামে হাসির সঙ্গে মেলাতে পারে চোখের ছলাকলাও। এখনো তা-ই করে। মুখের সঙ্গে চোখের দারুণ ব্যবহার। তাতে আরও অনেক বেশি মানবী হয়ে ওঠে সে।
আবেদ বাহু ধরে টান দেয় লিয়ানার। একটু শক্ত করেই। আবেদের একটা নখ অনেকটা বসে যায় লিয়ানার সিনথেটিক চামড়ায়। লিয়ানার মুখের হাসি মিলায় না অবশ্য তাতে। আবেদ চাপ বাড়ায় এবার। নাহ, কোনো রক্ত বেরিয়ে আসছে না লিয়ানার। অথচ তবু কী ভীষণ জীবন্ত সে!
রোবট নিয়ে পৃথিবী তাহলে এতটা এগিয়ে গেছে!
লিয়ানা হাসে। প্রত্যুত্তরে হাসতে পারে সে প্রথম থেকেই। তবে কিছুদিন আগের আপগ্রেড প্রোগ্রামে হাসির সঙ্গে মেলাতে পারে চোখের ছলাকলাও। এখনো তা-ই করে। মুখের সঙ্গে চোখের দারুণ ব্যবহার।
চিন্তাটা আবেদকে আচ্ছন্ন করতে পারত। কিন্তু তার আগেই লিয়ানা বলে, ‘প্রথম মেসেজটা অন্তত শুনে নাও। জরুরি এটা।’
উঠে বসে আবেদ। মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলোয় চালিয়ে দেয় আঙুল। কমে আসছে চুল। বয়স যখন ৪৬, তখন এটিই তো স্বাভাবিক। চাইলে অবশ্য নতুন করে গজিয়ে নেওয়াও যায়…কিন্তু আবেদ এ ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
লিয়ানা বলে, ‘দুপুরে তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। সেন্ট্রাল হসপিটালে। মেসেজটা সেখান থেকেই এসেছে।’
অকারণে মেজাজ খারাপ হয় এবার আবেদের। রাষ্ট্রের এই খবরদারি পছন্দ হয় না তার—আমার শরীর ঠিক আছে না কোনো ঝামেলা আছে, তা বোঝার জন্য আমিই যথেষ্ট। প্রতি মাসে গিয়ে যন্ত্রণার পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো অর্থ নেই।
‘তোমার চোখ দেখে বুঝতে পারছি কী ভাবছ তুমি। অথচ বিনা মূল্যে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে এমন চিকিৎসাসেবা খুব বেশিজন পায় না এখানে।’
‘ভাগ্যিস পায় না। এটা নিতান্তই ফালতু কাজ।’
‘তুমি জানো না, চল্লিশের পর…’
‘লেকচার দেবে না। অন্য কী মেসেজ এসেছে?’
‘সেটা অবশ্য তেমন জরুরি কিছু নয়।’
‘সিদ্ধান্ত দিচ্ছ নাকি?’
‘মেসেজটা এসেছে ইবি জুনিয়র স্কুল থেকে। তারা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।’
‘কেন?’
‘বললাম না, ব্যাপারটা খুব জরুরি নয়।’
‘আমাকে পাঠাও মেসেজটা।’
‘আমার মনে হয় তুমি ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে এসো।’
আবেদ সেন্ট্রাল হসপিটালে যায় না। তার গাড়ি ঘোরে স্কুলের দিকে। লিয়ানা বলে, ‘সিদ্ধান্তটা ভুল, তাই না? ওরা যা চায়, তা তুমি কখনোই দিতে পারবে না। ভুলে যেয়ো না, তোমরাই শেষ জেনারেশন!’
অকারণে মেজাজ খারাপ হয় এবার আবেদের। রাষ্ট্রের এই খবরদারি পছন্দ হয় না তার—আমার শরীর ঠিক আছে না কোনো ঝামেলা আছে, তা বোঝার জন্য আমিই যথেষ্ট।
ব্যাপারটা চেয়েও আসলে ভুলতে পারে না আবেদ। সেন্ট্রাল কমিশনের বড় একটি অংশ ভোট দিয়েছে কবি ও লেখকদের চ্যাপ্টার পৃথিবীর এ সভ্যতায় শেষ করে দিতে। যদিও এখনো বিষয়টি অনুমোদন পায়নি, তর্ক-বিতর্ক চলছে দারুণভাবে। আবেদও নিজের পক্ষ থেকে লম্বা একটি প্রবন্ধ লিখেছে। সেটা ছড়িয়েও গেছে পৃথিবীময়। তবু দুনিয়াজুড়েই এক জটিল পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে এরই মধ্যে। সত্যি বলতে কি, পৃথিবীর জনসংখ্যার বড় একটি অংশই এখন মনে করে, কবি-লেখক-সাহিত্যিক—এ ধরনের প্রজাতি ভীষণ রকমের অপ্রয়োজনীয়। সমাজ-রাষ্ট্রে নেই তাদের কোনো ভূমিকা। কিন্তু সব ডামাডোলের ভেতর ইবি স্কুল কী চায়?
স্কুলপ্রধান টিয়ারা অল্প বয়সী। পুরো ব্যাপারটাকে যেন হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়। আবেদকে প্রায় মাথার ওপর তুলে জানায়—যতই চেষ্টা করুক সেন্ট্রাল কমিশন, এসব বন্ধ হবে না। কবি-সাহিত্যিক ছাড়া সমাজ-রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় নাকি?
লিয়ানা বলে, ‘বহু বছর আগে প্লেটো নামের মহান দার্শনিক করেছিলেন।’
টিয়ারার মুখে অপমান। বলে, ‘তুমি রোবট, তাই না?’
লিয়ানা হাসে। মাথা নাড়ায়। খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, ‘এই সভ্যতা রোবটেরই, জানেন না?
টিয়ারা এবার লিয়ানার কথার ধার দিয়েও যায় না। হাতটা ধরে আবেদের। হাতটায় অল্প ঘাম। টিয়ারা আঙুলে সেটা যেন মাখিয়ে নেয়। বলে, ‘ঘাম ছুঁতে পারাও এখন সৌভাগ্যের বিষয়, তাই না মিস্টার আবেদ?’
‘মিটিংটা কী নিয়ে?’
‘আমি, আমার স্কুল আপনার সঙ্গে একটা কন্ট্রাক্টে যেতে চাই।’
লিয়ানা চট করে বলে, ‘কী ধরনের কন্ট্রাক্ট?’
টিয়ারা আবারও মেজাজ খারাপ করে তাকায়। লিয়ানা বলে, ‘আমি লেখকের সেক্রেটারি। প্রশ্ন করাই আমার কাজ, তাই না?’
টিয়ারা বলে, ‘মিস্টার আবেদ, আপনি কি রোবটটাকে বাইরে বসতে বলবেন?’
লিয়ানা বলে, ‘অসম্ভব।’
আবেদ বলে, ‘কী ধরনের কন্ট্রাক্ট, সেটা তো আমাকে জানতেই হবে। আর আমি জানলে লিয়ানাও জানবে, এখন আপনার ইচ্ছা।’
টিয়ারা আবারও মেজাজ খারাপ করে তাকায়। লিয়ানা বলে, ‘আমি লেখকের সেক্রেটারি। প্রশ্ন করাই আমার কাজ, তাই না?’
টিয়ারা চুপ থাকে কিছুক্ষণ। হয়তো ভাবে, ঠেকাটা তারই। রাগ গিলেই খায় সম্ভবত। মেকি এক হাসি ঝুলিয়ে ফেলে মুখে। তারপর বলে, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের স্কুলশিশুদের গল্প–কবিতা লেখা শেখাব। কাজটি আপনি করবেন এবং করবেন আপনার মতো আরও কয়েকজন।’
আবেদ কিছুক্ষণ ভাবতে পারে না। প্রসঙ্গ যে এদিক থেকে আসতে পারে, তার কোনো ধারণাও ছিল না। পুরো ব্যাপারটা খুব বিস্ময়ের মনে হয়। আবেদ জনপ্রিয় গল্পকার সত্য…কিন্তু এ-ও তো সত্য, দুনিয়াজুড়ে সৃষ্টিশীল মানুষদের প্রায় একঘরে করে রাখা হচ্ছে। রাখা হচ্ছে তাদের নানান চাপে! এবং ঘোষণা দিয়ে ফেলা হয়েছে কবি-লেখকদের মতো অনুৎপাদিত বস্তুর প্রয়োজন নেই রাষ্ট্রের…সেখানে ইবি স্কুল, যা এক নন্দিত প্রতিষ্ঠান, এমন একটা প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে, যা শুধুই যে ঝুঁকিপূর্ণ তা নয়, আত্মঘাতীও। হঠাৎই যেন আবেদের মন আনন্দে ভরে ওঠে। নিজের রক্তে অদ্ভুত উন্মাদনাও অনুভব করে। যে পৃথিবী আর সভ্যতা নিয়ে প্রচণ্ড হতাশায় ডুবে যাচ্ছিল আবেদ, সেই পৃথিবী, সেই সমাজ নিয়েই তার মধ্যে তৈরি হয় উচ্ছলতা। না, পৃথিবী নিশ্চয় বেঁচে উঠবে! পৃথিবী শুধুই তথ্যের নয়…থাকবে কাহিনিরও! সে যদি আগামী পাঁচ বছর শিশুদের ভেতর গল্পের, কাহিনির, কল্পনার বীজ বুনতে পারে…পৃথিবী নিশ্চয়ই হয়ে উঠবে অদ্ভুত সৌন্দর্যের!
টিয়ারা বলে, ‘চিন্তা করবেন না, মিস্টার আবেদ। চুক্তিতে যথাযোগ্য ক্রেডিটেরও উল্লেখ থাকবে। আশা করি, সেটি আপনাকে হতাশ করবে না!’
লিয়ানা টান দেয় আবেদের হাত ধরে—এখান থেকে চলো। অনেক হয়েছে।
কিন্তু আবেদের ভেতর যে অন্য রকম ভালো লাগা, তার বিপরীতে লিয়ানার বিরোধিতা অতি সামান্যই বলা যায়। চুক্তিপত্রে নিজের স্বাক্ষর দিতে খুব বেশি সময় নেয় না আবেদ। ক্রেডিট নয়, তাকে আকৃষ্ট করে ভবিষ্যতের পৃথিবী। গল্পকাহিনি রূপকথাময় পৃথিবী। মৃত্যুস্রষ্টার পৃথিবী থেকে সে পৃথিবীটা ছিল অনেক আকর্ষণীয়, সৌন্দর্যমণ্ডিত এবং আনন্দের।
টিয়ারা বলে, ‘চিন্তা করবেন না, মিস্টার আবেদ। চুক্তিতে যথাযোগ্য ক্রেডিটেরও উল্লেখ থাকবে। আশা করি, সেটি আপনাকে হতাশ করবে না!’
২.
যন্ত্রটার ভেতর থেকে ধাতব স্বর বেরিয়ে আসে এবার।
‘মিস্টার আবেদ, আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?’
তাহলে এটা কথাও বলে?
আবেদের মনে প্রথমে এ প্রশ্নই আসে। রোবটই বলা যায় তাহলে যন্ত্রটাকে। তবে সবচেয়ে ভালো হয়, যদি বলা যায় কুৎসিত রোবটের বাচ্চা!
আবেদ মনে মনে আরও কিছু গালি দেয়। তবে এর মধ্যেই যন্ত্রটা আরেকটু গড়িয়ে আসে সামনে। তার নমনীয় পাইপ ধরনের বস্তুটা এগিয়ে যায় আবেদের গলা বরাবর। আবারও কণ্ঠ—শুনতে পাচ্ছেন আপনি আমাকে?
‘শুনতে পাচ্ছি, গাধা।’
‘আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি বন্দী হয়েছেন?’
‘না।’
‘তাহলে বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি একটা বেজমেন্টের ভেতর আছেন এবং এটিকে বলা যায় এক বন্দিশালা। জায়গাটির তাপমাত্রা এখন ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও খুব শিগগির এটি আশঙ্কাজনক হারে নামতে থাকবে এবং তা একসময় চলে যাবে হিমাঙ্কের নিচে। পুরো বেজমেন্ট পরিণত হবে বরফে এবং আপনি পরিণত হবেন লাশে। ফলে নিজেকে বন্দী হিসেবে মেনে নিন দয়া করে।’
‘আমি গল্প লিখি। সৃষ্টি করি। যারা সৃষ্টি করে, তারা কখনো বন্দী হতে পারে না।’
‘পৃথিবীটা বাজে কথায় ভরে আছে। কেন ভরে আছে জানেন?’
আবেদ কথা বলে না। হঠাৎই তার শীত লাগতে শুরু করে। তাপমাত্রা কি কমে যাচ্ছে?
কুৎসিত রোবটটা বলে, ‘বেজমেন্টের তাপমাত্রা এখনো কমতে শুরু করেনি…কিন্তু আপনার শীত লাগছে। লাগছে কারণ, আপনি ভয় পাচ্ছেন।’
‘আমি ভয় পাচ্ছি না। বাজে কথা বলা বন্ধ করো রোবটের বাচ্চা রোবট!’
ঘটাং করে একটা শব্দ হয়। রোবটরা ইদানীং আবেগ প্রকাশ করতে পারে। কুৎসিত যন্ত্রটা থেকে অদ্ভুত আলো বিচ্ছুরিত হতে থাকে। আবেদ হাসে। বলে, ‘বন্দী নাকি আমি? কিন্তু তোমাকেই দেখছি জ্বালা-যন্ত্রণা আর রাগে মরে যাচ্ছ?’
কুৎসিত রোবটটা বলে, ‘বেজমেন্টের তাপমাত্রা এখনো কমতে শুরু করেনি…কিন্তু আপনার শীত লাগছে। লাগছে কারণ, আপনি ভয় পাচ্ছেন।’
‘রেগেছি আমি সত্যি। রেগেছি আপনার মতো মানুষদের বোকামি দেখে। আপনার মতো মানুষেরা বাজে বাজে চিন্তা আর বাজে কথায় ভরিয়ে দিয়েছেন পৃথিবীটাকে! আপনাদের কথায় সাধারণ মানুষেরা উদ্বুদ্ধ হয়ে নিরেট বেকুবে পরিণত হচ্ছে। তথ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অতিকায় শূন্যে বদলে যাচ্ছে। মনোযোগ হারাচ্ছে কাজে। ক্রমে হয়ে পড়ছে অলস আনপ্রোডাক্টিভ...স্রেফ পৃথিবীর অস্বাস্থ্যকর বোঝা! যেখানে গোটা পৃথিবীটা মুক্তি চাইছে আপনাদের কাছ থেকে, সেখানে কিনা আপনি চুক্তি করেছেন আগামী পাঁচ বছর শিশুদের সময় দেবেন গল্পকাহিনি নিয়ে?’
পুরো ব্যাপারটা মনে করে আবেদ। ঘটনার শেষটা ঘটেছিল ইবি স্কুলেই। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে ওঠে। বলা যায় পাগলা ঘণ্টি। সঙ্গে লাল আলোর ঝলকানি চারদিকে। লিয়ানা প্রথম টের পায় বিপদটা। বলে, ‘সেন্ট্রাল ফোর্স আসছে নিশ্চয়। তুমি বিপদে পড়েছ, আবেদ।’
আবেদ তখনো চিন্তা করতে পারছে না ঠিকমতো। চারদিকে এত শব্দ। টিয়ারা বলে, ‘কিছু মনে করবেন না, মিস্টার আবেদ। ব্যক্তিগতভাবে আমি আপনার গল্প পছন্দ করি। ওই যে লুসিয়ারা নামের যে মেয়েটি গান করত আপনার গল্পে...আমিও এখন তার মতো গান করি...পোষা মাছটা সেই গান শুনে কী যে খুশি হয়...’
এরই মধ্যে রুমের ভেতর সেন্ট্রাল ফোর্স ঢোকে। তাদের হাতে উদ্যত মারণাস্ত্র।
টিয়ারা বলে যেতে থাকে...আমি দুঃখিত, লেখক। তোমার মনোভাব বুঝতে রাষ্ট্র আমাকে এ কাজ দিয়েছিল। রাষ্ট্র নিশ্চয় মনে করছে, তুমি আসলে বিপজ্জনক। জানি না তুমি বেঁচে থাকবে কি না...বিদায়…
টিয়ারার বিদায় বলার আগেই অবশ্য ফোর্সরা পিছমোড়া করে জাপটে ধরে আবেদকে। লিয়ানার দিকে তাকিয়ে ধাতব কণ্ঠে এক ফোর্স বলে, ‘খুব ভালো। যথাযথ। এবার তোমার বাক্সে গিয়ে ড্রপ হও...’
লিয়ানা মাথা নাড়ায়। আবেদকে জড়িয়ে ধরে অল্প সময়ের জন্য। তারপর বেরিয়ে যায়।
ফোর্সরা আবেদকে টেনে বের হতে থাকে। আবেদ শুধু এটুকু বোঝে, তার সবকিছু ফুরিয়ে যেতে চলেছে।
পুরো ব্যাপারটা মনে করে আবেদ। ঘটনার শেষটা ঘটেছিল ইবি স্কুলেই। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে ওঠে। বলা যায় পাগলা ঘণ্টি। সঙ্গে লাল আলোর ঝলকানি চারদিকে।
৩.
কুৎসিত যন্ত্রটা বলে, ‘লিয়ানাকে আমরাই তোমার কাছে পাঠিয়েছিলাম, যেন তোমার ভেতর শুভবুদ্ধির উদয় ঘটাতে পারে। কিন্তু লাভ হয়নি। গল্পকার হিসেবে তুমি শেষ জেনারেশন হতে প্রস্তুত হতে পারোনি।’
‘তোমার বকবকটা থামাও, রোবটের বাচ্চা রোবট!’
‘আমার কিংবা আমাদের বকবক আর কখনোই থামবে না বেয়াড়া বোকা...বরং চিরদিনের মতো থেমে যাবে তোমরাই, যারা বাজে বাজে কথায়, বাজে বাজে আশায় এবং তারও চেয়ে বাজে স্বপ্নে পৃথিবীটাকে আবর্জনা বানিয়ে রেখেছ! আমরা পৃথিবীর সব আবর্জনা পরিষ্কার করে ফেলব!’
হঠাৎই শীত অনুভব করতে থাকে আবেদ। কুৎসিত যন্ত্রটা ঘোঁৎ করে ওঠে শুয়োরের মতো। বলে, ‘এবার ভয় নয়, সত্যিই কমতে শুরু করেছে তাপমাত্রা...ধীরে ধীরে তুমি ফ্রিজে পরিণত হবে গল্পকার। তাহলে বিদায়!’
যন্ত্রটার নিচের মেঝেটা খুলে যায়। ভুলও হতে পারে, কিন্তু নিচে চলে যাওয়ার আগে যন্ত্রটা যেন বিচ্ছিরিভাবে চাপা উল্লাস করতে থাকে তার কদর্যতা ঘিরে।
বেজমেন্ট তীব্র ঠান্ডা হতে শুরু করেছে। তাপমাত্রা কমছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আবেদের ইচ্ছা করছে চোখ বন্ধ করতে, কিন্তু করে না। তার মনে হতে থাকে, চোখ বন্ধ করে ফেললে আর কখনোই হয়তো খুলতে পারবে না। শরীরে রক্ত চলাচল সচল রাখতে আবেদ বারবার লাফাতে থাকে। নিজের ভেতর অসম্ভব জেদ হতে থাকে। কীভাবে একটি পৃথিবী থেকে গল্প হারিয়ে যেতে পারে, স্বপ্ন মুছে যেতে পারে, সৌন্দর্য ফুরিয়ে যেতে পারে?
হঠাৎই শীত অনুভব করতে থাকে আবেদ। কুৎসিত যন্ত্রটা ঘোঁৎ করে ওঠে শুয়োরের মতো। বলে, ‘এবার ভয় নয়, সত্যিই কমতে শুরু করেছে তাপমাত্রা...ধীরে ধীরে তুমি ফ্রিজে পরিণত হবে গল্পকার।'
শুধু তথ্য, শুধু সাফল্য, শুধুই রোবট আর ক্রেডিট...আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই?
প্রয়োজন নেই গল্পের?
ঠিক তখনই একটা আওয়াজ শোনে আবেদ। দেখে, এগিয়ে আসছে লিয়ানা।
‘লিয়ানা?’
‘তোমাকে আশা করিনি, প্রিয়।’
আবেদ হেসে বলে।
লিয়ানা বলে, ‘ওদের কাছে অনুমতি নিয়েছি। তোমার বরফ হওয়ার সময় আমি তোমার হাত ধরে থাকতে চাই।’
‘তুমি কি তাপ সামলাতে পারো? মানে হিমাঙ্কের নিচের তাপ?’
‘ওরা জানিয়েছে, আমি আর কখনো ফিরতে পারব না।’
লিয়ানার মুখে হাসি। চোখে অদ্ভুত মায়া। এই শরীরটা রোবট...বিশ্বাস হয় না আবেদের। শীতে নুয়ে আসতে থাকে আবেদ। লিয়ানা তার হাতটা ধরে। বরফ হতে শুরু করেছে আবেদের চুল, চোখের পাতা, ভ্রু...
হাঁপাতে শুরু করে আবেদ। বলে, ‘লিয়ানা, অনেক অনেক অনেক বছর পর, কেউ তোমার আর আমার গল্প বলবে। বলবে এক অতি মানবীয় রোবট নিতান্ত এক গল্পকারের মৃত্যুর সময় নিজের ধ্বংসকে তোয়াক্কা না করে তার হাত ধরে ছিল...
‘লিয়ানা...’
‘আমি শুনতে পাচ্ছি, আবেদ।’
‘লিয়ানা...আমরা গল্প তৈরি করেছি লিয়ানা...আমরাই গল্প...আমরাই...’
আবেদ তার কথা শেষ করতে পারে না। কিন্তু তাতে কি, সে তো নতুন একটা গল্প শুরু করতে পারে!
আবেদ বা আবেদের মতো একতাল বরফকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে লিয়ানা। তার মনে হতে থাকে, আবেদ ঠিকই বলে, পৃথিবী থেকে গল্প কখনো শেষ হতে পারে না!