আদ্রিতা

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

ভোরের মৃদু বাতাসে দুলছে জানালার পর্দা। পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা আলো রাঙিয়ে দিয়েছে বিছানা। আলোর ঝলকানিতে ঘুম ভেঙে যায় রুমানার। আদ্রিতা তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে চা খাওয়া তাঁর ছোটবেলার অভ্যাস।

—গুড মর্নিং, মিসেস রুমানা। ঘুম হয়েছে ঠিকমতো?

—গুড মর্নিং, আদ্রিতা। খুব ভালো ঘুম হয়েছে।

রুমানা গরম চায়ে চুমুক দেন। বোঝাই যাচ্ছে চা ভালো হয়েছে, তবু আদ্রিতা জিজ্ঞেস করে, ‘চা কেমন হয়েছে?’

—খুব ভালো, আদ্রিতা। তোমার বানানো চা সব সময়ই স্পেশাল।

—আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন। আমার খুব ভালো লাগে আপনার কথা শুনতে। আচ্ছা, আজ কী রান্না করব?

—খিচুড়ি রান্না করো। ভুনা খিচুড়ি। তোমার হাতের সুস্বাদু খিচুড়ি খেতে খুব ইচ্ছে করছে। কবে মরে যাই, তা তো বলা যায় না!

—প্লিজ, এসব বলবেন না, আমি খুব কষ্ট পাই। আচ্ছা, আপনার পছন্দের খিচুড়িই আজ রান্না করব। এসব অলক্ষুনে কথা যেন আমি, আর না শুনি।

—ঠিক আছে, আর বলব না। আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও।

আরও পড়ুন
'খিচুড়ি রান্না করো। ভুনা খিচুড়ি। তোমার হাতের সুস্বাদু খিচুড়ি খেতে খুব ইচ্ছে করছে। কবে মরে যাই, তা তো বলা যায় না!'

দুই

রুমানা আলঝেইমারে আক্রান্ত। বয়স ৫০ পেরিয়েছে। বহুদিন ধরে ভুগছেন। ডাক্তার বলে দিয়েছেন, এ পর্যায়ে এসে এ রোগ নিরাময় আর সম্ভব নয়। তবে হাসিখুশি জীবন যাপন করে এ রোগের প্রভাব কিছুটা হ্রাস করা যায়। তার জন্য প্রয়োজন একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী, যে সব সময় তাঁর পাশে থাকবে।

বিধবা রুমানার একমাত্র ছেলে রোবট–বিশেষজ্ঞ। কাতারে একটি রোবট–ম্যানেজমেন্ট ফার্মে চাকরি করেন। অসুস্থ মায়ের জন্য পঞ্চম প্রজন্মের আধুনিক একটি রোবট পাঠিয়ে দিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় রোবট। দেহের গঠন অত্যন্ত সুন্দর। দেখে বোঝার উপায় নেই, মানুষ নাকি রোবট। ওটার নাম ছিল FGR S-20775। রুমানা গাণিতিক নাম বাদ দিয়ে রোবটের নাম রেখেছেন আদ্রিতা। এখন আদ্রিতাই তাঁর সব।

আদ্রিতা সারাক্ষণ রুমানার পাশে থাকে। খাবার বানিয়ে দেয়, ঘর পরিষ্কার করে, কাপড় ধোয়, কথা বলে, গল্প শোনায়। রুমানার সব কথা শোনে, আদেশ করামাত্র পালন করে। দুজন খুব ভালো বন্ধু। রুমানার মানসিক অবস্থা এখন খুব ভালো। একাকিত্ব শব্দটি মুছে গেছে তাঁর জীবনের পাতা থেকে। কিন্তু কথায় বলে, মানুষের প্রাণে সুখ বেশি দিন সয় না।

আরও পড়ুন
বিধবা রুমানার একমাত্র ছেলে রোবট–বিশেষজ্ঞ। কাতারে একটি রোবট–ম্যানেজমেন্ট ফার্মে চাকরি করেন। অসুস্থ মায়ের জন্য পঞ্চম প্রজন্মের আধুনিক একটি রোবট পাঠিয়ে দিয়েছেন।

একদিন বিকেলে রুমানা আদ্রিতার সঙ্গে লুডু খেলছিলেন। হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। আদ্রিতা ডাক্তার ডাকতে দেরি করেনি। কিন্তু মেজর হার্ট অ্যাটাক, ডাক্তারের কিছুই করার ছিল না।

আদ্রিতার ভীষণ মন খারাপ। নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় আদ্রিতার। চোখের সামনে ঘটে ব্যাপারটা। ধীরে ধীরে রুমানার বুকের ব্যথা বাড়তে থাকে। একসময় কথা বন্ধ হয়ে যায়, বন্ধ হয় শরীরের নড়াচড়া। অবশেষে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন রুমানা। পড়ে থাকে নিথর দেহ।

আদ্রিতা চেয়ে থাকে রুমানার মুখের দিকে। রুমানাকে কিছুতেই ভুলতে পারছে না সে। আদ্রিতা হয়তোবা চলে যাবে অন্য কোনো মানুষের সেবায়। হয়তোবা তাকে অন্য নামে ডাকা হবে। হয়তো নতুন কোনো বন্ধু পাবে। কিন্তু রুমানার স্মৃতি কিছুতেই ভুলতে পারবে না। বিদায় রুমানা। ভালো থেকো বন্ধু। ভালো থেকো...

লেখক: কেশাইরকান্দি, ছেংগারচর, মতলব উত্তর, চাঁদপুর

*লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন