১৩ মে ২০২৬
ঘুমের মধ্যেই টের পেলাম, ফোনটা কাঁপছে। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। এক হাতে ফোন তুলে নিলাম। হাতে নিয়ে দেখি, রাহাত ভাই। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগল। আমার বড় চাচার ছেলে রাহাত ভাই ফোন করেছেন। মোবাইলে ওনার গ্রামীণ নম্বর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু উনি তো দেশে নেই! দ্রুত কল রিসিভ করলাম। ঘুম চলে গেছে।
‘হ্যালো?’
‘হ্যালো, শান্ত? কেমন আছ?’
‘এই তো ভাইয়া, আপনি কেমন আছেন?’
‘ভালো নাই ভাই। সে জন্যই তোমাকে ফোন দিলাম। আমি গতকালই দেশে এসেছি। তুমি একটু বাসায় আসতে পারবা?’
‘কোনো সমস্যা হইছে, ভাইয়া?’
‘হ্যাঁ। বাসায় আসো, বলব। একটু দ্রুত আসতে পারবা?’
‘আসতেছি, ভাইয়া। আমি এখনই রওনা দিচ্ছি।’
‘একটা বাইক নিয়ে চলে আসো। কথা হবে।’
খুট করে কেটে গেল ফোনটা। কিছুক্ষণ চুপ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর উঠে বসলাম দ্রুত। বিশাল কোনো ঝামেলা হয়েছে নিশ্চয়ই। ভালো লাগছে না।
১৮ এপ্রিল ২০২৮
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড।
পুরো এলাকায় কোনো গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন দিক থেকে পিলপিল করে লোকজন হেঁটে আসছে। যোগ দিচ্ছে বাসস্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে যাওয়া লম্বা লাইনটিতে। লাইনটি ধরে যারা এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের গন্তব্য রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থান। বধ্যভূমির পাশে বিশাল সরকারি কবরস্থান করা হয়েছিল ২০১৮-১৯ সালের দিকে। বছরখানেক পরই পুরো কবরস্থান ভরে গেছে। করোনাভাইরাস নামের এক বিভীষিকা থমকে দিয়েছিল পুরো পৃথিবী। মড়ক লেগেছিল বাংলাদেশেও। মানুষ মরেছে সমানে; একের পর এক। তাদের অনেকের ঠিকানা হয়েছে এই কবরস্থান।
এখন যারা সারি ধরে এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের শেষ ঠিকানাও হবে ওটা। কিন্তু ওদের কিছু করার নেই। কিচ্ছু না।
পুরো এলাকায় কোনো গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন দিক থেকে পিলপিল করে লোকজন হেঁটে আসছে। যোগ দিচ্ছে বাসস্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে যাওয়া লম্বা লাইনটিতে।
১৩ মে ২০২৬
রাহাত ভাইয়ের বাসা মোহাম্মদপুর, কাদেরাবাদ হাউজিং। ৬ নম্বর রোড। আগে আমরাও এদিকেই থাকতাম। বছর দুয়েক আগে মিরপুর চলে গেছি।
চারতলায় ওনাদের ফ্ল্যাট। কলবেল বাজানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজাটা খুলে গেল। রাহাত ভাই। জোর করে হাসার চেষ্টা করছেন। মৃদু গলায় বললেন, ‘আমার রুমে বসি, চলো।’
রুমে ঢুকেই দরজা আটকে দিলেন।
‘চাচা-চাচি বাসায় নেই?’
‘আছে। আগে কাজের কথা শোনো।’
‘কী হইছে, ভাই?’
‘তুমি তো জানো, আমি ইউনিভার্সিটি অব উটাহতে কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি করতেছি।’
আমি ওপর-নিচে মাথা নেড়ে সায় দিলাম। ভাইয়া যেন দেখেনওনি, এমনভাবে বলে যাচ্ছেন, ‘যেটা কেউ জানে না, সেটা হচ্ছে, মাস ছয়েক আগে আমি আমেরিকান গভর্নমেন্ট থেকে একটা অফার পাই। ওদের একটা বায়োকেমিক্যাল ল্যাবে কাজ করার সুযোগ। ক্রিসপার নিয়ে কাজ। এটুকুই বলা হয় আমাকে। বলা হয়, রাজি হলে বাকিটা জানানো হবে। দুটি শর্ত দেয় ওরা আমাকে। এক. আমি আর ক্লাস বা কিছু করতে পারব না। পিএইচডি শেষ করব কাজটা শেষ হলে। আর দুই. বাড়ির কাউকে কিছু জানাতে পারব না।’
এটুকু বলে ভাইয়া একটু থামলেন। তারপর আবার শুরু করলেন, ‘সংক্ষেপে বলি, আমি রাজি হয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, আমার চাকরি হয়েছে ডাগওয়ে প্রুভিং গ্রাউন্ডে। এটা কী, জানো তো? যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গোপনীয় বায়োউইপন ল্যাব। ওখানে ওরা আমার মতো অনেককে তখন নিয়োগ দিয়েছিল। করোনাভাইরাসের পর ওরা বুঝতে পারে, বিভিন্ন বন্য প্রাণীর নানা রকম রোগে মানুষ আরও আক্রান্ত হবে। ওরা চাচ্ছিল, কোন রোগগুলো পরিবর্তিত হয়ে মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে, সেটা বুঝতে। সে জন্য বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ইত্যাদির ডিএনএ ক্রিসপার দিয়ে কেটে, কৃত্রিমভাবে মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে, এ রকম ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ইত্যাদি তৈরি করছিল ওরা। তারপর, সেগুলোর প্রতিষেধক বানানোর চেষ্টা করছিল। আমাদের কাজ, মূল কাজের আগে নানা রকম সিমুলেশন করে দেখা এবং কোন কম্বিনেশন কাজ করবে, সেটা বের করা।’
এটুকু বলে ভাইয়া একটু থামলেন। তারপর আবার শুরু করলেন, ‘সংক্ষেপে বলি, আমি রাজি হয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, আমার চাকরি হয়েছে ডাগওয়ে প্রুভিং গ্রাউন্ডে। এটা কী, জানো তো?'
মাথা ঝাঁকালাম। আমি বিজ্ঞান বিচিত্রায় কাজ করি, বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করি। ক্রিসপার নিয়ে আমার ধারণা আছে। এটা একধরনের জৈব কাঁচি। এটা দিয়ে ডিএনএ কেটে ফেলা যায়। তারপর ডিএনএকে ইচ্ছেমতো জোড়া দেওয়া যায়, ফলে তৈরি করা যায় নতুন ডিএনএ। মানে নতুন ধরনের জীব। এভাবেই মানুষ করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে, তৈরি করেছে উন্নত মানের ফলনশীল গাছ, শস্য ইত্যাদি।
ভাইয়া একটানা বলে যাচ্ছেন, ‘আমার ইউনিটে আরও তিনজন ছিল। দুজন বায়োকেমিস্ট আর একজন জেনেটিসিস্ট। আমরা গবেষণা করছিলাম অফিওকর্ডিসেপস ইউনিল্যাটেরেইলস নিয়ে। এটাকে সোজা বাংলায় বলে জম্বি ফাঙ্গাস।’
আবারও মাথা ঝাঁকালাম। ভাইয়া খেয়াল করলেন, তাই আর ব্যাখ্যায় না গিয়ে চলে গেলেন পরের কথায়।
আসলে জম্বি ফাঙ্গাস মূলত থাইল্যান্ড ও ব্রাজিলের কিছু রেইনফরেস্টে দেখা যায়। পূর্ণবয়স্ক কোনো জম্বি ফাঙ্গাস মাটিতে স্পোর ফেলে রেখে যায়। স্পোরকে সরলভাবে বলা যায় ছত্রাকের ডিম। পুরোপুরি ডিমের মতো না হলেও ছত্রাকের বংশবৃদ্ধি মূলত এর মাধ্যমেই হয়। কার্পেন্টার প্রজাতির পিঁপড়ারা বনের মধ্য দিয়ে চলাচলের সময় অজান্তেই ছত্রাকের স্পোর তুলে নেয়। তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিঁপড়াটির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়—মৃত্যু।
জম্বি ফাঙ্গাস পিঁপড়ার মস্তিষ্ক না; বরং দেহের যতগুলো সম্ভব কোষ ও পেশি দখল করে নেয়। এ সময় তারা পিঁপড়ার দেহে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছেড়ে দেয়। এই রাসায়নিক পদার্থ পিঁপড়ার রক্ত বহনকারী অঙ্গ হিমোসিলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে পিঁপড়াটার নিজের দেহের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মানুষের দেহে যেমন শিরা এবং ধমনি দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়, পিঁপড়ার দেহে হয় হিমোসিলের মাধ্যমে। এ অবস্থায় তারা পোষক দেহের পেশিতন্তুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তারপর পিঁপড়াটিকে চালিয়ে অনুকূল পরিবেশে নিয়ে আসার পর কোনো গাছের পাতার তলার পৃষ্ঠে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরতে বাধ্য করে। কামড়ে ধরার পর তারা পিঁপড়ার সব পেশি অকেজো করে দেয়। পিঁপড়ারা এ সময় মারা যায়। ধীরে ধীরে ভাইরাসটি বেড়ে ওঠে এবং স্পোর ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাঠির মতো হয়ে বেরিয়ে আসে পিঁপড়ার মাথা ফুঁড়ে।
জম্বি ফাঙ্গাস পিঁপড়ার মস্তিষ্ক না; বরং দেহের যতগুলো সম্ভব কোষ ও পেশি দখল করে নেয়। এ সময় তারা পিঁপড়ার দেহে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছেড়ে দেয়।
ভাইয়া বলে যাচ্ছেন, ‘আমরা সত্যি সত্যি এটাকে মডিফাই করে মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে, এমন ভাইরাস বানিয়েছি। অফিওকর্ডিসেপস হিউম্যানিস। আমাদের বিজ্ঞানীরা বলে, হিউম্যান জম্বি ফাঙ্গাস। সায়েন্স ফিকশনে যা হয়, ঠিক তা–ই হয়েছে। চার দিন আগের ঘটনা। আমরা ল্যাবে এসে দেখি, একটা স্যাম্পল ভায়াল কম। চুরি হয়েছে, নাকি কোনোভাবে ভেঙে গেছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম আমরা। ল্যাবের সিসিটিভি চেক করে দেখা হয়েছে। ঠিক চার মিনিটের ভিডিও নেই। দুই জায়গায় ব্যাকআপ রাখা হয় ভিডিওগুলো। দুই জায়গা থেকেই উধাও।’
খেয়াল করলাম, ভাইয়া কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে গেছেন। কেমন যেন জমে গেছেন বলে মনে হচ্ছে। তবু যেন খানিকটা জোর করেই বলে যাচ্ছেন, ‘পরশু হঠাৎ ল্যাবে ঢুকে দেখি, ভয়ংকর অবস্থা। পিলপিল করে ল্যাবের সবাই হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই ল্যাবটা তো বিশাল এলাকাজুড়ে। আমরা যে বিল্ডিংয়ে কাজ করি, সেখান থেকে কিছুটা দূরে বনের মতো এলাকা। সবাই ছুটে যাচ্ছে সেদিকে। কী হয়েছে, সেটা আন্দাজ করেছি সঙ্গে সঙ্গে। একছুটে বেরিয়ে এসেছি, সোজা দেশে। আমি বুঝতে পারছি না, কার কাছে যাব, কী করব। আমি আসার সময় একটা স্যাম্পল ভায়াল নিয়ে এসেছি। তোমার তো পরিচিত লোকজন আছে, কাউকে বলে কি কিছু করা যায়? আমার মনে হচ্ছে, শিগগিরই...’
ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এর মধ্যে আপনি এলেন কী করে? এয়ারপোর্টে ধরেনি আপনাকে?’
চার দিন আগের ঘটনা। আমরা ল্যাবে এসে দেখি, একটা স্যাম্পল ভায়াল কম। চুরি হয়েছে, নাকি কোনোভাবে ভেঙে গেছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম আমরা।
‘কত মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, তুমি বুঝতে পারছ? আমি যে মারা যাইনি, সেটা বুঝতেও ওদের সময় লাগবে। ল্যাবে কাজ করতাম ছদ্মপরিচয়ে। সবাই তা–ই করত, যাতে পরে চাইলেও কেউ কারও পরিচয় ফাঁস করতে না পারে। সেখান থেকে আমার আসল পরিচয় বের করার আগেই তো আমি পগার পার!’
‘কিন্তু ভাইয়া, আপনি আক্রান্ত হয়েছেন কি না, সেটা চেক করা দরকার না? যার কাছেই যাই, সবার আগে তো এটাই বলবে। তার ওপর কিছুদিন আগে করোনাকাল গেল।’
ভাইয়া কিছু বললেন না, চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তুমি বলো, কী করব?’
আমিও আসলে বুঝতে পারছি না কী করা উচিত। বললাম, ‘আচ্ছা দাঁড়ান, একটু সময় দেন, চিন্তা করে দেখি।’
‘বেশি সময় পাওয়া যাবে না। ওরা যখন বুঝবে...’
‘হ্যাঁ। আচ্ছা, আপনারা কোনো প্রতিষেধক বা কিছু...’
‘সেই সময়ই তো পাইনি।’
‘আচ্ছা চলুন, আন্টির সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। এর মধ্যে একটু ভাবি, তারপর বলছি, কী করা যায়।’
‘যাও, আমি একটু পরে আসছি।’
***
প্রায় আধা ঘণ্টা পর রুমে এসে দেখি, রাহাত ভাই রুমে নেই। বেরিয়ে গেছেন। কয়েকবার কল দিয়েও পেলাম না। শেষে ঘণ্টাখানেক আরও অপেক্ষা করে, আন্টিকে বলে বেরিয়ে এলাম। রাহাত ভাইকে মেসেজ দিয়ে বললাম, ফ্রি হয়ে যেন কল দেন। কী করব, এখনো জানি না। কিন্তু কিছু তো করতেই হবে।
‘কিন্তু ভাইয়া, আপনি আক্রান্ত হয়েছেন কি না, সেটা চেক করা দরকার না? যার কাছেই যাই, সবার আগে তো এটাই বলবে। তার ওপর কিছুদিন আগে করোনাকাল গেল।’
১৪ মে ২০২৬
গত রাতে এমনিতেও ঘুম হয়নি। চাচির সঙ্গে কথা হয়েছিল, রাহাত ভাই আর বাড়ি ফেরেননি। সম্ভবত টেস্ট করার কথা শুনে ঘাবড়ে গেছেন। হয়তো এ রকম জবাব আশা করেননি। বিজ্ঞান বিচিত্রায় এ নিয়ে রিপোর্ট করা যেত। কিন্তু রাতে ভাবতে গিয়ে টের পেলাম, স্যাম্পল ভায়াল চেয়ে নিতেও ভুলে গেছি। আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। লোকে শুনলে আমাকে পাগল বলবে।
সকাল সকাল উঠে পত্রিকা পড়া আমার অভ্যাস। আসলে পত্রিকা না, ই-পেপার পড়ি। ই-পেপার খুলেই চমকে উঠলাম। বড় বড় করে লাল কালিতে লেখা, মোহাম্মদপুরে বিকৃত লাশ উদ্ধার। তার ওপর একটা ছবি। বাকিটা পড়ার আগেই কল দিলাম আন্টিকে। কেউ ধরল না। খালি পেটেই বমি হয়ে গেল আমার। খানিকটা পানি বেরিয়ে এল, মুখ হয়ে গেল তিতকুটে। অনেক কষ্টে নিজের বড় চাচার নামটা পড়তে পারলাম পত্রিকার পাতায়। তারপর টের পেলাম, চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। চুপচাপ বসে রইলাম।
দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাচ্ছি। সেই ভায়ালটা নিজে নিজে চুরি হয়ে যায়নি। কোনো কিছুই নিজে নিজে হয় না। কজ অ্যান্ড এফেক্ট। কারণ লাগে। কারণ ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না।
কিন্তু রাহাত ভাই কি এখনো বেঁচে আছেন? গতকালও বেঁচে ছিলেন। কীভাবে? কিছু একটা গড়বড় আছে। ওনার গায়ে কি ভাইরাসটা ভিন্নভাবে অভিযোজিত হয়েছে? কী হয়েছে আসলে?
সকাল সকাল উঠে পত্রিকা পড়া আমার অভ্যাস। আসলে পত্রিকা না, ই-পেপার পড়ি। ই-পেপার খুলেই চমকে উঠলাম। বড় বড় করে লাল কালিতে লেখা, মোহাম্মদপুরে বিকৃত লাশ উদ্ধার।
১৮ এপ্রিল ২০২৮
এ দেশে এখনো যারা সুস্থ আছে, তাদের কেউ আর রায়েরবাজার বধ্যভূমির দিকে যায় না। গেলে দেখতে পেত, বাঁকা–ত্যাড়া হয়ে পড়ে আছে একেকজন মানুষ। কোনো এক বিচিত্র কারণে তাদের অনেকের শরীরই ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে আছে। সিজদার ভঙ্গি। মাথার খুলির চারপাশে ছোপ ছোপ সাদা মাকড়সার জালের মতো আস্তরণ। ওর মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আছে একটা লম্বা সাদা কাঠির মতো। কোনো কোনো কাঠির মাঝামাঝি একটা গোল চাক, মৌমাছির চাকের মতো, কিন্তু পুরোটা সাদা, মাকড়সার জালের মতো। জট পাকিয়ে আছে।
শুধু একজন মানুষ কবরস্থানের অনেকটা ভেতরে চুপচাপ বসে আছে। পেশেন্ট জিরো। অবশ্য তাকে মানুষ বলা যায় কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। মাথার খুলি ফেটে কোনো কাঠির মতো বের না হলেও হাত-পায়ের জায়গায় কাঠির মতো কিছু জিনিস বেরিয়ে আছে। আর পুরো শরীরের চারপাশ ঘিরে আছে মাকড়সার জালের মতো সাদা সাদা কিছু জিনিস।
যুক্তরাষ্ট্রে এ ভাইরাস বেশি দূর ছড়াতে পারেনি। সরকার কঠিন হাতে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বাংলাদেশে সেটা সম্ভব হয়নি। পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে দেশটাকে। কেউ আসেনি বাঁচাতে। সত্যি বলতে, তৃতীয় বিশ্বের এ রকম একটা দেশ পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে গেলেও কার কী যায় আসে?
কারও কিচ্ছু যায় আসে না।
