যন্ত্রটা দেখতে সুন্দর। তবে শুধু সুন্দর দেখতে হলে যন্ত্রটার প্রেমে আমি পড়তাম না। টিনএজ কাল আমার নেই যে কথায়–কথায় প্রেমে পড়ব। যন্ত্রটা আসলে দুর্দান্ত কাজের। ছোট্ট একটা ডিভাইসের মতো জিনিসটা। আমার মোবাইলের সঙ্গে সেটি ব্লুটুথের মাধ্যমে যুক্ত আছে। মোবাইলে একটি অ্যাপ আছে আমাদের গোপন সংগঠনের। সেই অ্যাপ থেকে যন্ত্রটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু তার আগপর্যন্ত যন্ত্রটা নিতান্তই একটা বোতাম যেন। ম্যাগনেটিক বিষয়-আশয়ও আছে। ফলে যন্ত্রটাকে আরাম করে জামার বোতামের সঙ্গে আটকে রাখা যায়। আমাদের সংগঠন এটার নাম দিয়েছে—পিটু।
এই খুদে পিটুকে কার্যকর করতে বেশি কিছু নয়, অ্যাপে গিয়ে স্রেফ অন করতে হয়; সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রটা লাফ দিয়ে পড়তে পারে আটকে থাকা জায়গা থেকে। সোজা একটা গড়ান দিয়েই উঠে দাঁড়ায়। আক্ষরিক অর্থেই দাঁড়ায় আরকি। মানে তখন তার ভেতর থেকে দুটি পা বেরিয়ে আসে। সঙ্গে দুটি হাতও। বৃত্তাকার পিটু লহমায় একটা রোবটে পরিণত হয়। কিন্তু জিনিসটাকে নিতান্ত এক রোবট ভাবলে ভয়ানক ভুল হয়ে যেতে পারে। কারণ, তখন সে ভয়েস অ্যাকটিভ আগ্নেয়াস্ত্রে পরিণত হয়। ছুড়তে পারে বুলেট, হয়ে যাতে পারে বোমাও। যখন যেটা আমার প্রয়োজন, তখন সেটাই। আমার শার্টের পাঁচটা বোতামে পাঁচটা পিটু নিজেকে সাঁটিয়ে আছে। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি ১২৭ তলা ভবনের ছাদে। রাত একটা বেজে সাত!
আকাশে চাঁদ ছিল যতক্ষণ, ততক্ষণ আমরা অপেক্ষা করেছিলাম। তারপরই শব্দহীন চপারে করে জোন ফাইভের সর্বোচ্চ সেফ হাউসের রুফটপে আমাকে নামিয়ে ফেলা হয়েছে। এখান থেকে আমাকে যেতে হবে একা। ৯৯ তলার অ্যাপার্টমেন্টে। সেটা খুব সহজ হবে না অবশ্য। দেড় মাস আমরা ছক কষেছি। ভবনজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরার গোপন উপস্থিতি যে রয়েছে তা–ই শুধু নয়, রয়েছে চলমান রোবটদের গার্ডগিরিও। আমাকে এদের উপেক্ষা করেই পৌঁছাতে হবে। পৌঁছাতে হবে মহামান্য ভার্নিসের বেডরুম পর্যন্ত। রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত মহামান্য ভার্নিস বেডরুমে থাকেন। হেড জোনের তথ্য অনুযায়ী, ভার্নিস এ সময় ইলেকট্রা সিরামের ডোজ নেন, তারপর ধ্যানস্থ হন। তাঁকে মেরে ফেলতে হবে এই সময়ের মধ্যে। আমার ডিউটি এটুকুই।
আকাশে চাঁদ ছিল যতক্ষণ, ততক্ষণ আমরা অপেক্ষা করেছিলাম। তারপরই শব্দহীন চপারে করে জোন ফাইভের সর্বোচ্চ সেফ হাউসের রুফটপে আমাকে নামিয়ে ফেলা হয়েছে।
ছাদের গ্লাস কাটতে ৩০ সেকেন্ডের বেশি সময় ব্যয় করি না আমি। যদিও সময়ের চেয়েও আমাকে বেশি সাবধান থাকতে হবে সুরক্ষার ব্যাপারে। যদি ধরা পড়ে যাই, সংগঠন চিনবেও না আমাকে। বলবে কোনো দুষ্কৃতকারী। পৃথিবীজুড়ে আমার ছবি ছাপানো হবে মহান নেতা মহামান্য ভার্নিসের হত্যাচেষ্টাকারী হিসেবে। আমাকে চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হবে, সবচেয়ে কঠিন মৃত্যুটি দেওয়া হবে। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বড় যে ব্যাপারটি ঘটবে, সেটি হলো আগামী এক দশকেও তাহলে আর ভার্নিসকে মেরে ফেলা সম্ভব হবে না। তাঁর নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে বাধ্য হবে রাষ্ট্র। অথচ আমি নিজেও রাষ্ট্রপক্ষের লোক।
লাফ দিয়ে এলিভেটরের ওপর পড়ি আমি। শরীরটা গড়িয়ে দিই। তাতে যতটা শব্দ হওয়ার কথা, হয় না। কিন্তু মৃদু তরঙ্গরোল ঠিকই ওঠে। সেটা সেন্সরে ধরা পড়ে গেলে এখনই ছুটে আসবে চলন্ত জাঁদরেল রোবটগুলো। গুলি চালানোর পূর্ণ ক্ষমতা তাদের দেওয়া আছে। আমাকে দেখামাত্র গুলি করবে তারা। কিছু শুনতেও চাইবে না!
এলিভেটরটা এখন নেমে যাওয়ার কথা। হেড জোন থেকে এটা নিয়ন্ত্রিত হবে। দাঁড়াবে ঠিক ১০০ তলায়। কারণ, ৯৯ তলায় এটি থাকলে আমাকে অবশ্যই মুখোমুখি হতে হবে ষন্ডা রোবটগুলোর। মহামান্যের সুরক্ষায় যারা সদা তৎপর। তবে মহামান্য ভার্নিসের এমন সুরক্ষা থাকাই যুক্তিযুক্ত—যেখানে এই একটিমাত্র লোক বদলে ফেলেছেন পুরো পৃথিবীকে।
নামছে এলিভেটরটা। তার মানে এখন পর্যন্ত সব ঠিক আছে। কিন্তু পৃথিবীটা, সেটা কি ঠিক আছে?
নেই।
মহামান্য ভার্নিসের একটিমাত্র বই, আরও ভালো করে বলা ভালো, তাঁর একটিমাত্র থিওরি পুরো পৃথিবীর রূপরেখা এমনভাবে বদলে ফেলেছে যে ভীষণভাবে অস্তিত্ব–সংকটে পড়েছে এর একটা জগৎ। সেই সংকট তখনই কাটবে, যখন মহামান্য মৃত্যুবরণ করবেন।
এলিভেটরটা এখন নেমে যাওয়ার কথা। হেড জোন থেকে এটা নিয়ন্ত্রিত হবে। দাঁড়াবে ঠিক ১০০ তলায়। কারণ, ৯৯ তলায় এটি থাকলে আমাকে অবশ্যই মুখোমুখি হতে হবে ষন্ডা রোবটগুলোর।
তা–ই কি?
নিজের কাছে প্রশ্ন করে নিজেই দ্বিধা অনুভব করি আমি। আরও কিছু ভাবতে যাওয়ার আগেই খুলে যায় এলিভেটরের দরজা। দেখি দাঁড়িয়ে আছে দুটো ষন্ডা। কটমটে চোখে। হ্যাঁ, রোবটই ওগুলো। আর রোবট বলেই ওরা ভয়ংকর। কোনো শব্দ না করেই তাদের ধাতব হাতে বেরিয়ে আসে দুটি কুৎসিত আগ্নেয়াস্ত্র। আমার দিকেই তাক করা। ফায়ার ওপেন হয়। বুঝতে পারছি মরতে যাচ্ছি আমি, এমনকি নড়ার সুযোগও পাব না। ঠিক সেই মুহূর্তে দুলে ওঠে এলিভেটর। দরজা বন্ধ হয় বিদ্যুতের গতিতে। হ্যাঁচকা টানে নামতে শুরু করে সেটা। বুঝতে পারি, হেড জোন এখনো নজর রেখেছে আমার ওপর। এখনো তারা বাঁচিয়ে রাখতে চায় আমাকে। কারণ, আমি বেঁচে থাকলেই মহামান্যের মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু পরিসংখ্যানে সেই সম্ভাবনা একেবারেই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বুঝতে পারছি, সিকিউরিটি অ্যালার্ম বেজে উঠেছে। এখান থেকে এখন মহামান্যের রুমে যাওয়ার উপায় নেই আমার। এমনকি পথ নেই বেরিয়ে যাওয়ারও। আমি এখন সেই ইঁদুর…যে শস্য চুরি করতে সাপের গর্তে ঢুকেছিল…তারপরই গর্তের মুখ আটকে গেছে সাপ চলে আসায়। কোথাও যাওয়ার কি আছে আমার?
এলিভেটর খুলে যায় নিরানব্বইয়ে। চলছে না আর। এর অর্থ একটাই, হেড জোন চাইছে আমি মিশনটা এখনো সম্পন্ন করি। এ ছাড়া তাদের চাওয়া আর থাকবেই–বা কী! কিন্তু আমি জানি, এটা এখন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। বেরিয়ে আসি আমি এলিভেটর থেকে…যা ভেবেছিলাম…দেয়ালে দেয়ালে লালচে নিয়ন আলো জ্বলছে–নিভছে…সেই সঙ্গে সমানে চলছে শব্দ। ধাতব শব্দ আসছে দূর থেকে। বোঝা যাচ্ছে, ছুটে আসছে রোবটগুলো। একবার মিস করেছে তারা…কিন্তু বারবার মিস করার যোগ্যতাই নেই তাদের। গুলি এবার তারা আমার খুলির ভেতর ঢুকিয়ে ছাড়বে। দ্রুত এলিভেটরে উঠে পড়ি। বারবার বোতামগুলোতে চাপ দিই…না…চলছে না এলিভেটর।
এলিভেটর খুলে যায় নিরানব্বইয়ে। চলছে না আর। এর অর্থ একটাই, হেড জোন চাইছে আমি মিশনটা এখনো সম্পন্ন করি। এ ছাড়া তাদের চাওয়া আর থাকবেই–বা কী!
হেড জোন আসলে কোনো কিছুই পরোয়া করছে না। হয় আমি মহামান্যকে মারব, না হয় মরব। এর মাঝামাঝি কিছু নেই। এই এলিভেটর কার্যত এখন অচল। হেড জোন এটাকে আর সচল করবে না। ভেতরটা কেঁপে ওঠে। আমার ট্রেনিং এভাবেই হয়েছে। জেনেছি, রাষ্ট্রীয় বিবিধ তৎপরতায় আমাদের পরিচয় ও প্রাণের কোনো মূল্য নেই, তবু এ রকম ঘেরাটোপের মধ্যে পড়ে হঠাৎ করেই নিজেকে ভীষণ প্রতারিত মনে হলো। কিন্তু সেটা শুধু ওই একটা মুহূর্তের জন্যই। লহমায় বেরিয়ে এলাম এলিভেটর থেকে। সামনেই পাঁচটা রোবট। তাক করে আছে তাদের কুৎসিত অস্ত্রগুলো। নোটগুলো মনে এল তখনই—‘মহামান্য ভার্নিস, তাঁকে রুখে দিতে হবে। তাঁকে মরতে হবে। না হলে বাঁচবে না পৃথিবী!’
‘কিন্তু একটা চিন্তা কি মানুষকে আলোড়িত করতে পারে?’
‘যদি চিন্তাগুলো মানুষকে মুক্তি দেয়, তাহলে?’
‘তাহলে তো সে আমাদের সম্পদ, তাই না?’
‘না। আমাদের অর্থনীতি ধসে পড়েছে। ধসে পড়ছে আমাদের সমাজব্যবস্থা। তাঁর “আগুনের বিপরীতে” থিওরি আমাদের পুরো সভ্যতাকে ধ্বংস করে ফেলবে!’
‘আমাদের কী করা উচিত?’
‘ধ্বংসের বিপরীতে ধ্বংস।’
‘আগুনের বিপরীতে অর্থ তাহলে ধ্বংস।’
এখন আমার বিপরীতেও ধ্বংস। অনিবার্য ধ্বংস। আমি অ্যাপে চাপ দিলাম। পাঁচটা পিটুই একসঙ্গে ঝাঁপ দিল। ওদিকে ওপেন হলো ফায়ার। আর এ দুই সময়ের মধ্যেই বুঝলাম, একটা হাত আমাকে টেনে নিল কোথাও। কোথায়…জানি না। কার সেই হাত…জানি না। শুধু বুঝলাম, আমার চোখের সামনে ঝপ করে নেমে এল অন্ধকার।
‘না। আমাদের অর্থনীতি ধসে পড়েছে। ধসে পড়ছে আমাদের সমাজব্যবস্থা। তাঁর “আগুনের বিপরীতে” থিওরি আমাদের পুরো সভ্যতাকে ধ্বংস করে ফেলবে!’
২.
পিটপিটে চোখে তাকিয়ে আছি। আমার মুখের দিকে ঝুঁকে আছে একটা মুখ। ভয়ানক শুকনা চামড়া। চোখের রং প্রায় হলদে। ঠোঁট দুটো কালচে খটখটে। সময় লাগল; কিন্তু চিনতে পারলাম—মহামান্য ভার্নিস। যাঁর একটি থিওরি পাল্টে দিয়েছে পৃথিবীকে।
‘বেঁচে আছ তাহলে তুমি?’
কোনো উত্তর দিলাম না। ধাতস্থ হতে সময় লাগছে আসলে আমার।
‘গুলি খেয়েছ তুমি। পাঁজরের নিচে। একটাই। হাড় মিস করে গেছে ওদের বুলেট। রক্ত ঝরেছে। তবে সেটা বন্ধ করে দিয়েছি।’
আমার ধন্যবাদ বলা উচিত হয়তো। কিন্তু এত বড় জান্তাকে চোখের সামনে দেখে জিব নড়ছে না। মুখের ভেতর শুধু পাচ্ছি খসখসে স্বাদ।
‘তোমাকে কে পাঠিয়েছে, জানি আমি। আসলে বলা ভালো, কারা পাঠিয়েছে সেটা জানি।’ একটু কি হাসলেন মহামান্য ভার্নিস? হতে পারে। পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। ‘তোমাদের সংগঠন তাহলে এভাবেই কাজ করে? চোরের মতো?’
এমনই ট্রেনিং…এত কিছুর পরও সংগঠন নিয়ে টিটকারি করতেই জ্বলে উঠল ভেতরটা। বললাম, ‘কিছু বিষয় গোপনেই সারতে হয়।’
‘অথচ আমি যা করেছি সব প্রকাশ্যে, তা–ই নয় কি?’
‘যারা চোখে ধুলা দেয়, তারা ভান করে যে সব প্রকাশ্যে করছে। রুমালকে বিড়াল বানানো শুধুই তো ট্রিকস!’
যেন না হেসে পারলেন না, এভাবেই খানিকক্ষণ হাসলেন মহামান্য ভার্নিস, ‘কিছুই জানো না দেখছি তুমি!’
‘সবই জানি। এক অদ্ভুত থিওরি দিয়ে পুরো পৃথিবীকে ঠেলে দিয়েছেন ধ্বংসের মুখে। শুধু ওই গালভরা নাম…“আগুনের বিপরীতে”!’
‘দ্বিতীয় থিওরিও তৈরি আছে শিশু…শুনবে?’
‘আপনার কোনো থিওরিই শোনার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।’
‘যা করতে এসেছিলে, তা করতে পারোনি, তোমার মিশন একেবারেই ব্যর্থ। এখান থেকে বেরোলে পুরো ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে তোমাকে খুন করবে ওরা। জানো নিশ্চয়?’
‘তোমাকে কে পাঠিয়েছে, জানি আমি। আসলে বলা ভালো, কারা পাঠিয়েছে সেটা জানি।’ একটু কি হাসলেন মহামান্য ভার্নিস? হতে পারে। পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলেন।
‘আপনার থিওরি শুনলে বেঁচে উঠব নাকি?’ শ্লেষের সঙ্গে বললাম কথাগুলো। দেখলাম, খুব থমকে তাকিয়ে আছেন মহামান্য ভার্নিস। মৃদু মাথাটাও কি নাড়ালেন?
‘মানুষ এত দিন যা করেছে, তা মৃত্যুরই আয়োজন করেছে, বুঝেছ? আমিই বলেছি বাঁচার কথা…জীবনের কথা। আর মানুষের এই মৃত্যুর আয়োজনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক আগুন। আমি তাই দিয়েছি আমার প্রথম থিওরি…“আগুনের বিপরীতে”। আমি চাই এই পৃথিবীটা পাল্টে যাবে। এখানে কোনো আগুন থাকবে না। আর আগুন না থাকলে মানুষ তার খাদ্য প্রসেস করবে না। আর সেটা যদি না করে…’
‘তাহলে তারা অপুষ্টিতে মরবে তিলে তিলে…’
‘প্রকৃতির এমন সব খাদ্য উপস্থিত, যেগুলো খেলে মানুষ বাঁচবে আরও দারুণভাবে। অনেকে বলে মানুষের দুঃখ-জরা-ব্যাধির কারণ নাকি ক্ষুধা। আসলে তা নয়…ওগুলোর কারণ খাদ্য। আমরা তা–ই খাই, যা আমাদের খাওয়া উচিত নয়। আমরা আগুনে পোড়াই, সেদ্ধ করি…করে আমাদের যা খাবার নয়, তা খেয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত। খেয়ে অসুস্থ হচ্ছি, মরে যাচ্ছি সময়ের আগে। আবার এই আগুন দিয়েই আমরা কারখানা চালিয়ে তৈরি করছি তা–ই, যা আমাদের তৈরি করার কোনো প্রয়োজন নেই। বড় অদ্ভুত…বড় অদ্ভুত যে এত দিন এ ব্যাপারটি কেউ ভাবেনি। কিন্তু কেউ না ভাবলেও আমি ভেবেছি…আমি তাই নতুন থিওরি দিয়েছি এই পৃথিবীতে। আগুনের বিপরীতে যদি আমরা আমাদের সভ্যতা নিয়ে দাঁড়াতে পারি…তাহলে আমরা আরও নিবিষ্ট হতে পারব জ্ঞানচর্চায়। আরও বেশি বুঝতে শিখব প্রাণীদের। আরও বেশি সহমর্মী হব আমরা, আমরা হব আরও বেশি মানবিক। তাই না?’
‘একদমই না। আপনার এই থিওরি অনেকেই গ্রহণ করতে শুরু করেছে। তাতে ধসে পড়ছে সমাজব্যবস্থা। মানুষের পুরো খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাতে নষ্ট হচ্ছে পুরো অর্থনীতি। আর কে না জানে, অর্থনীতি যখন ধসে পড়ে, তখন ধসে পড়ে সমাজ–রাষ্ট্রনীতিও…ধসে পড়ে মানুষের সবকিছু!’
‘নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চাইলে আমাদের অতীতের ধ্বংসের ওপরই দাঁড়াতে হবে।’
‘পুরোনোকে অস্বীকার করে নতুন কিছু তৈরি হতে পারে না। পৃথিবীর বহু জায়গায় এখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। আপনার এই থিওরি মেনে চলতে গিয়ে খাদ্যপুষ্টির অভাবে নতুন নতুন অসুখের সৃষ্টি হচ্ছে। এরই মধ্যে নাকি আপনি আপনার দ্বিতীয় থিওরি নিয়েও প্রস্তুত। সেটা নাকি বই আকারে আগামী সপ্তাহেই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন…’
‘আর সে জন্যই আমাকে মরতে হবে তোমার হাতে, তাই না?’
‘চেয়েছিলাম তো সেটাই। কিন্তু তা আর হলো কই!’
‘মানুষ এত দিন যা করেছে, তা মৃত্যুরই আয়োজন করেছে, বুঝেছ? আমিই বলেছি বাঁচার কথা…জীবনের কথা। আর মানুষের এই মৃত্যুর আয়োজনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক আগুন।'
‘শোনো শিশু, আমি মরলেও কিছু যাবে–আসবে না। সাধারণ মানুষ আমার থিওরি গ্রহণ করেছে। তারা বুঝতে শুরু করেছে, কী অপরিসীম ভ্রান্তির মধ্যে থেকেছে আমাদের পূর্বপুরুষেরা। কোন সে অন্ধকার দিনে আমাদের কোনো পূর্বপুরুষ আগুনকে নিজেদের সঙ্গী করে নিয়েছিল। তারপরই এত দ্রুত সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল…কিন্তু আর নয়! এবার আমাদের ফিরতে হবে। নতুন পৃথিবী তৈরি করতে হবে আমাদের। আগুনকে পেছনে রেখে, জীবনকে করে তুলতে হবে প্রাণবন্ত। মানুষকে অকারণ প্রস্তুতকরণ থেকে, অকার্যকর তথ্য থেকে এবার আমি মুক্তি দেব। মানুষের জীবন এবার হয়ে উঠবে চিন্তা আর কল্পনার। ঠিক যে কারণে মানুষের মস্তিষ্ককে প্রকৃতি এতটা উর্বর করেছে।’
‘নিতান্তই হাস্যকর কথা, বলতেই হয়। কিন্তু শুনতে বেশ ভালো লাগে। আপনার দ্বিতীয় থিওরিটা কী? সেটাও নিশ্চয় পুরো পৃথিবী বদলে ফেলারই হুংকার দিচ্ছে…’
কিছু একটা বলতে যান মহামান্য ভার্নিস, কিন্তু তখনই ধাতব কণ্ঠ শোনা যায়। যেন দেয়াল ফুঁড়েই আসছে, ‘মহামান্য ভার্নিস, আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি আমাদের শত্রুর স্থানাঙ্ক। সে আপনার জোনেই রয়েছে। আমরা এখন আক্রমণ চালাতে চাই।’
‘না।’
‘মহামান্য ভার্নিস, শত্রু অত্যন্ত বিপজ্জনক। সে আপনার জীবননাশের চেষ্টা করছে। যেকোনো সময় সে আপনাকে আক্রমণ করবে। আপনি তাকে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন।’
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই ধুপধাপ আওয়াজ আসতে থাকে ভেতরের দিকে। মহামান্য ভার্নিস আমার দিকে তাকালেন। মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘পালাও…’
‘কী?’
‘ওরা তোমাকে মারতে এসেছে, তোমাকে এবং আমাকে…আমাদের দুজনকেই মারবে আসলে। তুমি যেমন তোমার সংগঠন থেকে কাজ করছ…ওরা রাষ্ট্রের অন্য এক সংগঠনের রোবট। ওরা আমাদের একসঙ্গে মেরে তোমাকে খুনি হিসেবে প্রচার করবে। এটাই ওদের ছক। এ জন্যই তুমি প্রায় কোনো রকম বাধা ছাড়া এ পর্যন্ত আসতে পেরেছ।’
‘আপনি আবারও ভুল করছেন।’
‘একদম ভুল করছি না।’
‘মহামান্য ভার্নিস, শত্রু অত্যন্ত বিপজ্জনক। সে আপনার জীবননাশের চেষ্টা করছে। যেকোনো সময় সে আপনাকে আক্রমণ করবে। আপনি তাকে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন।’
মহামান্য ভার্নিস একটা ছোট্ট পিন আমার হাতে দেন দ্রুততার সঙ্গে, ‘এই যে এখানে। আমার বইয়ের স্ক্রিপ্ট আছে। যেটা আগামী সপ্তাহে প্রকাশ করতে চাই আমি। আমার দ্বিতীয় থিওরি…গতির বিপরীতে। প্লিজ রু…তুমি আমাকে হেল্প করো। ওরা আমাকে বাঁচতে দেবে না…এতে আমার কোনো আফসোস নেই। কিন্তু ওরা আমার দ্বিতীয় থিওরি প্রকাশ করতে দেবে না, এটা আমি হতে দেব না!’
‘কিন্তু আমি কীভাবে…’
‘তুমি এখান থেকে জোন এইটে যাবে, সেখানেই…’
‘কিন্তু এখান থেকে আমি বের হব কীভাবে? রোবটগুলো আপনাকে মারুক বা না মারুক, আমাকে তো মারবেই।’
মহামান্য ভার্নিস আমার কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, ‘রু…ভালো করে শোনো আমার কথা…’
লোকটা দু–দুবার আমার নাম বললেন। আমার নাম কীভাবে জানেন তিনি, জানি না। কিন্তু নিজের নামটা তার মুখ থেকে শোনার সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন একটা বিশ্বাস তৈরি হতে শুরু করেছে আমার ভেতর। মহামান্য ভার্নিসের প্রথম থিওরিটা কি সত্যি ততটা খারাপ…যতটা খারাপ সবাই বলছে? নাকি সবাই আসলে নিজের স্বার্থের জন্য এই থিওরিতে যেতে চায় না? কে যেন বলেছিল, মানুষ কখনোই নতুন পরিস্থিতি মেনে নিতে চায় না। তাই নতুন পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, তার জন্য লড়াই করতে থাকে। ব্যাপারটা তাহলে এটাই?
বাইরের শব্দগুলো এখন খুব কাছে। মহামান্য ভার্নিস আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এলেন। বললেন, ‘আমি তোমাকে রাস্তা বলে দিচ্ছি…তুমি চলে যাও…আমার দ্বিতীয় থিওরিকে বাঁচাও…’
কোনো উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতি আমার ছিল না। ধাম ধাম আওয়াজ চলছে ওদিকে। বুঝতে পারছি, তারা দরজা ভেঙে আসছে। তাহলে কি মহামান্য ভার্নিসের কথাই সত্যি…তারা ভার্নিসকে মারতে চায়? না হলে দেয়াল–দরজা এসব ভাঙবে কেন?
মহামান্য ভার্নিস একটা বোতামে চাপ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে একটি চতুষ্কোণ আলো ছড়িয়ে পড়ল। আমাকে পথ দেখিয়ে দিলেন ভার্নিস, ‘এর ভেতরে ঢুকে পড়ো। তুমি এই জোন থেকে বেরোনোর রাস্তা পেয়ে যাবে। মনে রাখবে, এই পিনের ভেতর আছে মানুষের মুক্তির উপায়। আমার এই দুই থিওরি মানুষ যখন নিজের জীবনে গ্রহণ করবে…পাল্টে যাবে তার দুনিয়া। আর এভাবে আসলে পাল্টে যাবে পুরো পৃথিবীই!’
দড়াম করে আওয়াজ হলো এবার। রোবটগুলো ঢুকে পড়েছে রুমে। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু সেগুলো অদ্ভুতভাবে তাক করা মহামান্য ভার্নিসের দিকে। মহামান্য ভার্নিস আমাকে চাপা স্বরে বললেন, ‘যাও। আর সময় নেই আমাদের হাতে।’
ফায়ার ওপেন হলো। আমি লাফ দিলাম সেই চতুষ্কোণের ভেতর। মহামান্য ভার্নিসের ভোঁতা গোঙানির শব্দ পেলাম, নাকি ভুল কিছু শুনলাম কানে…বুঝতে পারলাম না। কিন্তু আমি যেন মিলিয়ে গেলাম চতুষ্কোণের ভেতর। শুধু হাতের ভেতর শক্ত করে আঁকড়ে থাকলাম সেই পিনটা। যার ভেতরে রয়েছে পৃথিবী বদলে ফেলার চাবিকাঠি—ভার্নিসের দ্বিতীয় থিওরি!