শান্তিপুরে অশান্তি

দুম!

কাজী রামিন হোসেন বেগুনি ধোঁয়ার মেঘটি ভেদ করে ওর সর্বশেষ গবেষণাটির ফলাফলের দিকে পিটপিট করে চেয়ে রইল। না, পরীক্ষাটা বিফল হয়েছে।

‘হুম, পরেরবার হয়তো আরেক চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো মেশাতে হবে,’ আপনমনে বিড়বিড় করল ও।

রামিন রসায়নবিদ্যার মহাভক্ত। গুঁড়ো, তরল, কাচের পাত্র আর নল—এসব জিনিস ওর বেজায় পছন্দ। এতটাই বেশি যে মা–বাবাকে বলেকয়ে বাসার গ্যারেজে একটা গবেষণাগার বসিয়েছে ও। রামিন ওখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এটা-সেটা মেশায়, নানা কিছু নাড়াচাড়া করে আর তার মহান (!) গবেষণাকর্ম চালিয়ে যায়।

ওর ওয়ার্কবেঞ্চটির পাশে, ইয়া বড় এক অ্যাকুয়ারিয়ামে একগাদা গোল্ডফিশ পালে ও। রসায়নবিদ্যার চেয়ে পোষা মাছগুলোকে কোনো অংশেই কম ভালোবাসে না রামিন। রঙিন গোল্ডফিশগুলো মুগ্ধ করে ওকে, মনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। সারা দিন মাছগুলোর দিকে চেয়ে থাকলেও যেন ওর এতটুকু খারাপ লাগবে না।

এখন যদিও মাছেদের কথা ভাবছে না ও। ভাবছে, কীভাবে ওর গবেষণা ‘ফাটাফাটি-শোঁ শোঁ’ সফল হবে। কিন্তু ওর আসলে ভাবা উচিত ছিল, ওকে এখনই ঝটপট তৈরি হয়ে নিতে হবে।

‘রামিন, তুই রেডি তো?’ বাসার ভেতর থেকে গলা ছাড়লেন ওর মা।

রামিন চোখ থেকে চট করে সেফটি গ্লাস খুলে ফেলল, ফলে ওর বেগুনি রংমাখা মুখটিতে চোখজোড়া ঘিরে দুটো সাদা সাদা গোল দাগ বেরিয়ে পড়ল। এটি বিস্ফোরণের ফল। ও কি তৈরি আছে? কিসের জন্য তৈরি হতে হবে যেন ওকে? ও, হ্যাঁ, হঠাৎই মনে পড়ল ওর! ওরা নানাবাড়ি বেড়াতে যাচ্ছে!

‘এই তো আম্মু, হয়ে গেছে প্রায়। জিনিসপত্রগুলো একটু গুছিয়ে রেখেই চলে আসছি,’ গুল মারল ও।

‘রামিন, আমরা কিন্তু তোর জন্য কখন থেকে বসে আছি। তুই আবার ওখানে এক্সপেরিমেন্ট করতে লেগে পড়িসনি তো?’

রামিন চটজলদি ওর গবেষণার ভাঙাচোরা অংশগুলো জড়ো করে, হাতের কাছে যে ফাঁকা পাত্রটি পেল, তার ভেতর ফেলে দিল। ওটা মাছের খাবারের একটি খালি ক্যান।

এবার টিনটি তাকের ওপর তুলে রেখে এক দৌড়ে গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে এল।

‘আসি, আম্মু!’

আরও পড়ুন
রামিন রসায়নবিদ্যার মহাভক্ত। গুঁড়ো, তরল, কাচের পাত্র আর নল—এসব জিনিস ওর বেজায় পছন্দ। এতটাই বেশি যে মা–বাবাকে বলেকয়ে বাসার গ্যারেজে একটা গবেষণাগার বসিয়েছে ও।

দুই

রাজীব বড়ুয়া রামিনদের পাশের বাসায় থাকে এবং ওর সবচেয়ে প্রিয় আর বিশ্বস্ত বন্ধু। রামিন কোথাও বেড়াতে গেলে সব সময় ওর মাছেদের দেখভালের দায়িত্বটি বিশ্বাস করে একমাত্র ওকেই দেয়। আর রাজীবও মাছেদের খাবার দেওয়ার কাজটি খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে নেয় এবং এবারও পরদিন যথারীতি সকাল সকালই ওখানে হাজির হয়ে গেল ও। রাজীব জানে, খাবার খুঁজে পেতে একটু দেরি হতে পারে।

রামিনের ল্যাবরেটরিটি সব সময়ই যা অগোছাল। আজও এটি বেহাল। কোথায় যে কী রেখেছে, কে জানে। আজ বরং অবস্থা আরও বেগতিক। মনে হচ্ছে, বিশাল কোনো নেকড়ে বুঝি এখানে হানা দিয়েছিল, তারপর সুস্বাদু খাবারের খোঁজে তছনছ করে ছেড়েছে পুরো জায়গাটিকে। রাজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তবে পরক্ষণেই দেখতে পেল ওটা। ওই তো, তাকের ওপরই মাছেদের খাবারের ক্যান। ওটার গায়ে লেখা: ফেবারিট ফুড, ফর দ্য ফিশ।

বাহ, ধন্যবাদ, রামিন, তাড়াতাড়িই পেয়ে গেছি, মনে মনে বলল ও।

রাজীব এবার খুশিমনে ক্যানের মুখটা খুলে খানিকটা খাবার ঢেলে দিল অ্যাকুয়ারিয়ামের ভেতর। তারপর রামিনের ওয়ার্কবেঞ্চে বিজ্ঞানী বন্ধুর সর্বশেষ গবেষণাটির ফলাফল দেখতে পেল। কখনোই রামিনের কাণ্ডকারখানার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝে না ও, তবে তারপরও এ ব্যাপারে ওর আগ্রহের কোনো কমতি নেই।

আরও পড়ুন
মনে হচ্ছে, বিশাল কোনো নেকড়ে বুঝি এখানে হানা দিয়েছিল, তারপর সুস্বাদু খাবারের খোঁজে তছনছ করে ছেড়েছে পুরো জায়গাটিকে। রাজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তবে পরক্ষণেই দেখতে পেল ওটা।

এ সময় ঢেকুর তুলল কে যেন!

‘কে?’ বলে উঠল রাজীব। এবার মনে পড়ল ওর—এখানে তো ও ছাড়া আর কেউ নেই!

আবারও ঢেকুরের বিশ্রী শব্দ!

ভয়ার্ত রাজীব চরকির মতন ঘুরে গেল—কে করছে শব্দটা?

আবারও সেই একই আওয়াজ!

শব্দটা মাছের ট্যাংকটি থেকে আসছে! ওটাকে দেখে মনে হচ্ছে, কোনো সোডার বোতলকে যেন ইচ্ছেমতো ঝাঁকিয়েছে কেউ।

পানির উপরিভাগে গ্যাসের বড় বড় ভুড়ভুড়ি ছিটকে উঠে এসেছে, তারপর বুদ্‌বুদগুলো ঢেকুর তোলার মতো বিটকেল শব্দ করে ফেটেছে এবং ল্যাবরেটরিটি ছেয়ে ফেলেছে বেগুনি ধোঁয়ার মেঘে।

ভয় পেয়ে টিনের লেবেলটি পড়ল রাজীব। এখানে তো পরিষ্কার লেখা রয়েছে: ফেবারিট ফুড, ফর দ্য ফিশ। ঠিকই তো আছে। এটা তো মাছের খাবারই, অন্য কিছু তো নয়, তাই না?

অ্যাকুয়ারিয়ামের পানির রং এখন ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাচ্ছে। প্রথমে সবুজ, তারপর টকটকে লাল, তারপর উজ্জ্বল নীল, এবার হলদে এবং পরমুহূর্তে বেগুনি হয়ে গেল।

হিস হিস!

শোঁ শোঁ!

ফটাস!

অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ওপর দিকে ছিটকে উঠে মেঝে সয়লাব করে দিল পানিতে। মাছের ট্যাংকটি ঘিরে ক্রমেই আরও ঘন হয়ে পাক খাচ্ছে বেগুনি ধোঁয়ার কুণ্ডলী। সঙ্গে পানির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধোঁয়া বারবার রং পাল্টাচ্ছে।

ভয়াতুর রাজীব ঘুরেই দিল দৌড়।

আরও পড়ুন
পানির উপরিভাগে গ্যাসের বড় বড় ভুড়ভুড়ি ছিটকে উঠে এসেছে, তারপর বুদ্‌বুদগুলো ঢেকুর তোলার মতো বিটকেল শব্দ করে ফেটেছে এবং ল্যাবরেটরিটি ছেয়ে ফেলেছে বেগুনি ধোঁয়ার মেঘে।

তিন

রাজীব ভেবেছে, ও বুঝি রামিনের মাছগুলোকে মেরেই ফেলেছে, কিন্তু আসলে তা নয়। সুখবরটি হচ্ছে, মাছগুলো এখনো দিব্যি বহাল তবিয়তেই আছে। আর দুঃসংবাদটি হচ্ছে—না, দুঃখিত, ভয়াবহ দুঃসংবাদটি হচ্ছে, ট্যাংকের ভেতর রাজীবের ফেলা রাসায়নিকগুলো রামিনের অপূর্ব সুন্দর, গোবেচারা পোষা মাছগুলোকে...পরিণত করেছে দানবীয় গোল্ডফিশে!

দানব গোল্ডফিশের ব্যাপারে তিনটি তথ্য দিয়ে রাখা ভালো।

১. মাছগুলো ভয়ানক হিংস্র।

২. ওরা ডাঙায় বাস করতে আর লেজে ভর দিয়ে হাঁটতে পারে।

৩. এবং ওরা আকারে বিশাল।

রাত নামতেই মাছগুলো অ্যাকুয়ারিয়ামের বেগুনি, ধোঁয়াটে পানি থেকে গুড়ি মেরে বেরিয়ে এল; একটা আরেকটার ওপর ধীরেসুস্থে চড়ে, প্রকাণ্ড, পিচ্ছিল এক মাছের পিরামিড তৈরি করে।

ট্যাংকের কিনারা দিয়ে হড়কে গ্যারেজের মেঝেতে পড়ল ওরা এবং ওখানে শুয়ে থেকে আকারে আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল। শেষমেশ শরীর টেনে তুলে, টান টান করে, টলতে টলতে দরজা লক্ষ্য করে এগিয়ে চললএবং ভেঙেচুরে নিজেদের পথ তৈরি করে নিল।

দানব মাছগুলো শহর অভিমুখে চলেছে এবং ওরা ক্ষুধার্ত!

আরও পড়ুন
রাত নামতেই মাছগুলো অ্যাকুয়ারিয়ামের বেগুনি, ধোঁয়াটে পানি থেকে গুড়ি মেরে বেরিয়ে এল; একটা আরেকটার ওপর ধীরেসুস্থে চড়ে, প্রকাণ্ড, পিচ্ছিল এক মাছের পিরামিড তৈরি করে।

চার

শান্তিপুর শহরটি রামিন আর রাজীব যেখানে বাস করে, তার নামটির মতোই চিরকাল নিরিবিলি আর শান্তিময় ছিল—একটু আগে অবধি আরকি।

দানব গোল্ডফিশগুলো শহরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে। হরেক পদের মাছ রান্নার জন্য বিখ্যাত দারুচিনি দ্বীপ এ শহরের একমাত্র রেস্টুরেন্ট। মানুষজন তাদের সেরা পোশাকটি পরে ফুলবাবু সেজে এখানে আসে এবং সবাই এখানে এলে ভারী ভদ্র আচরণ করে; এমন ভাব করে, যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। কিন্তু আচমকা যদি দেখা যায়, এমন চমৎকার এক রেস্তোরাঁয় একদল দানব গোল্ডফিশ সারি বেঁধে টলমল পায়ে ঢুকে পড়েছে, তবে মানুষের তো পিলে চমকাবেই, তা–ই না?

হেড বেয়ারা অবশ্য চমকায়নি। কারণ, সে চোখে কম দেখে—তার চশমা লাগবে। লোকটা দানোগুলোকে মানুষ ভেবে স্বাগত জানাতে এগিয়ে গেল। খদ্দের মানেই তো লক্ষ্মী!

‘মাফ করবেন,’ নম্রস্বরে বলল সে, ‘টাই ছাড়া এখানে ঢোকা নিষেধ।’

নেতা দানোটা মুহূর্তখানেক বেয়ারার দিকে বড় বড় চোখ পাকিয়ে চেয়ে রইল, তারপর বেচারির মাথাটা কপ করে গিলে ফেলার অপচেষ্টা করল।

‘বাঁচাও!’ অমনি ছিটকে সরে গেল ভয়ার্ত ওয়েটার, ‘খেয়ে ফেলল!’

দারুচিনি দ্বীপ রেস্তোরাঁয় মাছ এখন আর খাবারের মেনুতে নেই—মেনুতে রয়েছে তার খদ্দেররা! তারাই এখন মাছের খোরাক।

আরও পড়ুন
হেড বেয়ারা অবশ্য চমকায়নি। কারণ, সে চোখে কম দেখে—তার চশমা লাগবে। লোকটা দানোগুলোকে মানুষ ভেবে স্বাগত জানাতে এগিয়ে গেল। খদ্দের মানেই তো লক্ষ্মী!

মাছদানোগুলো খাবারের খোঁজে হন্যে হয়ে সবকিছুর ওপর একে একে হামলে পড়তে লাগল। ন্যাপকিন নাড়াচাড়া করল, চেয়ারসুদ্ধ চিবিয়ে খেয়ে ফেলল, খদ্দেরদের হাঁটুতে খামচি মারল এবং বেচারিদের পশ্চাদ্দেশে কামড়ে দিল। খাদ্যরসিক অতিথি আর বেয়ারারা প্রাণভয়ে আর্তচিৎকার ছেড়ে, ব্যথায় ককিয়ে উঠে পড়িমরি দরজার দিকে দৌড় মারল। ওদিকে তাণ্ডবরত মৎস্যদানবদের ভাবখানা এমন, যেন মাছের তেলে মাছ ভাজার দিন শেষ—ওসব আর সহ্য করা হবে না।

মুহূর্তের মধ্যেই খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল—শহরে মৎস্যদানবেরা হানা দিয়েছে। কিন্তু কেউ ভেবে পেল না, হঠাৎ করে কেন খেপে গিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে নিরীহ গোল্ডফিশগুলো। আর ওরা আকারে এত বাড়লই–বা কীভাবে?

এরপর শান্তিপুরের মৎস্যশিকারিদের প্রিয় দোকান, ‘আদি তারকনাথ ছিপ-বড়শি ভান্ডার’-এ পায়ের ধুলো দিল ভয়ংকর গোল্ডফিশের দল। অসহায় মাছশিকারিরা হঠাৎই আবিষ্কার করল, এখন দিন বদলে গেছে, শিকারি পরিণত হয়েছে শিকারে! ‘ধরিব মৎস্য খাইব সুখে’, সেটি আর চলবে না!

‘পালাও! পালাও!’ রব উঠল।

ছিপ, হুইল, বড়শি, নানা রকমের টিন, সব ঝনঝন করে আছড়ে পড়ল মেঝেময় আর খিড়কি দরজা দিয়ে জান নিয়ে পালিয়ে বাঁচল ভীতসন্ত্রস্ত মাছশিকারিরা।

শহরবাসী রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল! এমন আচমকা এ কোন বিপদ নেমে এল তাদের ঘাড়ে!

আরও পড়ুন
মুহূর্তের মধ্যেই খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল—শহরে মৎস্যদানবেরা হানা দিয়েছে। কিন্তু কেউ ভেবে পেল না, হঠাৎ করে কেন খেপে গিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে নিরীহ গোল্ডফিশগুলো।

পাঁচ

রামিন নানাবাড়ি থেকে ওর মা–বাবার সঙ্গে শান্তিপুরে ফিরতে না ফিরতেই টের পেল, এখানে গোলমেলে কিছু একটা ঘটছে। পুলিশ রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছে। দানব মাছের কী সব গাঁজাখুরি গল্প রটেছে শহরে। বাসায় গিয়ে আরও তাজ্জব বনতে হলো রামিনকে।

‘আরে, আমার গোল্ডফিশগুলো নেই!’ হাহাকার করে উঠল ও, দৌড়ে বেরিয়ে এল ওর ল্যাবরেটরি থেকে।

‘ওরা হয়তো আর ওই গ্যারেজে থাকতে চায়নি, তাই ভালো কোনো বাসায় চলে গেছে,’ সব শুনে ওর বাবা ঠাট্টা করে বললেন।

‘না—দরজাটা ভাঙা আর মেঝেটা পানিতে ভেসে গেছে!’

‘শান্তিপুরের কেউ তোর মাছ চুরি করতে যাবে না,’ ওর মা ওকে আশ্বস্ত করলেন। ‘রাজীব নিশ্চয়ই সব জানে। ওকে জিজ্ঞেস কর না।’

রামিন ঊর্ধ্বশ্বাসে রাজীবদের বাসার দিকে ছুটল। মাছদানবদের নিয়ে যেসব গল্প শুনেছে, সেগুলোর কথা ভাবছে ও। এই দুটোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই তো?

অবশেষে গিয়ে হাজির হলো ওখানে।

‘আন্টি, ভালো আছেন? রাজীব কোথায়?’ রাজীবের মা অনুরাধা বড়ুয়া দরজা খুললে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রামিন।

‘হ্যাঁ, বাবা, ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?’

‘ভালো, আন্টি।’

‘রাজীবকে পেছনের আঙিনায় পাবে।’

এক দৌড়ে পেছনের উঠানে চলে গেল রামিন। কিন্তু কেউ নেই ওখানে।

‘রাজীব!’ ডাক ছাড়ল রামিন।

সাড়া নেই।

এ সময় রাজীবের ট্রি হাউসটিতে মৃদু ক্যাঁচকোঁচ শব্দ হলো। ঝট করে চোখ তুলে চাইল রামিন—আর অমনি সাঁত করে জানালা থেকে মাথাটা নুইয়ে ফেলল রাজীব।

আরও পড়ুন
‘শান্তিপুরের কেউ তোর মাছ চুরি করতে যাবে না,’ ওর মা ওকে আশ্বস্ত করলেন। ‘রাজীব নিশ্চয়ই সব জানে। ওকে জিজ্ঞেস কর না।’

হতভম্ব রামিন মই বেয়ে উঠে এল গাছবাড়িতে। রাজীব ওকে দেখে কেমন জড়সড় হয়ে গেল। বেচারির চোখেমুখে অপরাধীর অভিব্যক্তি।

‘তোর মাছগুলোকে আমি মেরে ফেলেছি। আমাকে মাফ করে দে, দোস্ত,’ কাঁচুমাচু হয়ে বলল রাজীব।

‘তুই ওদের মেরে ফেলেছিস!’ সবিস্ময়ে বলে উঠল রামিন।

‘হ্যাঁ, খাবার দিতেই বুদ্‌বুদ উঠে পানি বেগুনি হয়ে যায়। সরি, দোস্ত।’

‘তুই কি কাউন্টারের তলায় রাখা খাবারের কথা বলছিস?’ প্রশ্ন করল রামিন।

‘না, অ্যাকুয়ারিয়ামের পাশে যে তাকটা আছে, সেটার খাবার,’ জবাব দিল রাজীব।

‘অ্যাকুয়ারিয়ামের পাশে...হায়, আল্লাহ!’ রাজীব কী করেছে, নিমেষে বুঝে ফেলল রামিন। ওর শেষ গবেষণাটির পরিত্যক্ত অংশ অ্যাকুয়ারিয়ামের পানিতে ঢেলে দিয়েছে!

‘ওটা তো মাছের খাবার নয়! ওটা ছিল আমার শেষ এক্সপেরিমেন্ট-ফাটাফাটি-শোঁ শোঁ!’

এবার ও রাজীবকে খুলে বলল আদতে কী ঘটেছে। কিন্তু গোল্ডফিশগুলো ট্যাংকে নেই কেন, এর কোনো জুতসই ব্যাখ্যা মিলল না।

যদি না...

‘হ্যাঁ, বুঝেছি! ওই দানব মাছগুলো—ওগুলোই আমার গোল্ডফিশ!’

‘বলিস কী!’ অবাক কণ্ঠে বলে উঠল রাজীব।

‘হ্যাঁ, পাউডারের কারণে ওরা অমন হয়ে গেছে! শোন, আমাদেরকেই আবার ওদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে!’

একলাফে উঠে দাঁড়াল রামিন।

‘কোথায় যাচ্ছিস?’ জিজ্ঞেস করল রাজীব।

‘ল্যাবে। অ্যান্টিডোট বানাতে। তুইও চল, তোর সাহায্য লাগবে আমার।’ বলল বিশিষ্ট (!) বিজ্ঞানী রামিন।

আরও পড়ুন
‘অ্যাকুয়ারিয়ামের পাশে...হায়, আল্লাহ!’ রাজীব কী করেছে, নিমেষে বুঝে ফেলল রামিন। ওর শেষ গবেষণাটির পরিত্যক্ত অংশ অ্যাকুয়ারিয়ামের পানিতে ঢেলে দিয়েছে!

ছয়

ছেলেরা দৌড়ে গিয়ে রামিনের ল্যাবরেটরিতে ঢুকল।

‘তুই অ্যান্টিডোট বানালে বানা, আমার এখানে কী কাজ?’ জবাব চাইল রাজীব।

‘তুই মাছগুলোকে লোভ দেখিয়ে টেনে আনবি।’

‘কীভাবে টেনে আনব?’ জিজ্ঞেস করল রাজীব।

‘তুই টোপ হয়ে ওদেরকে আমাদের পাতা ফাঁদের কাছে নিয়ে যাবি।’

‘ফাঁদ আছে নাকি আমাদের?’ শুধাল রাজীব।

‘এখনো নেই—তবে হয়ে যাবে।’

রামিন গ্যারেজের কোনায় রাখা কিছু বাক্স থেকে কাগজ-কলম আর তার বের করল।

‘এই যে,’ বলল রামিন।

‘এগুলো দিয়ে তুই ফাঁদ পাতবি?’

‘না, তোর কস্টিউম দিয়ে,’ জবাবে বলল রামিন। ‘মাছগুলোকে কাছে টানতে তুই এটা পরবি।’

‘পাগল নাকি!’ বলে উঠল রাজীব। ‘কক্ষনো না! জীবনেও না!’ মাছের টোপ হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই ওর। মাছে টোপ গিললেই তো ও শেষ!

কিন্তু ১০ মিনিট পর দেখা গেল, ঢাউস এক ক্যানের সাজে সাজছে রাজীব। ওতে লেখা: ফেবারিট ফুড, ফর দ্য ফিশ।

‘ধুর! আমাকে দেখে সবাই হাসাহাসি করবে,’ গজগজ করে বলল রাজীব, রামিন যখন ওকে কস্টিউমটার ভেতর ঢুকতে সাহায্য করল।

‘তোকে দুর্দান্ত লাগছে, দোস্ত—আর এটা তো আমাদের প্ল্যানেরই অংশ,’ সান্ত্বনা দিয়ে বলল রামিন। ‘ওদের পেটে রাজ্যের খিদে, তাই ওরা তোর পিছু নেবে।’

আরও পড়ুন
‘পাগল নাকি!’ বলে উঠল রাজীব। ‘কক্ষনো না! জীবনেও না!’ মাছের টোপ হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই ওর। মাছে টোপ গিললেই তো ও শেষ!

‘ওরা তো আমাকে খেয়ে ফেলবে!’ চিৎকার ছাড়ল রাজীব।

‘তুই ছুটে পালালে ওরা তোকে ধরতেই পারবে না,’ খোশমেজাজে বলল রামিন। ‘এখন আমার মাছগুলোকে খুঁজে বের করগে যা—আমার একটু জরুরি গবেষণা আছে। কাজ শেষে আমি তোর মোবাইলে ফোন করব।’

২১তমবারের মতো টিনের জবরজং কস্টিউমটির বদৌলতে ঠনঠনিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ল রাজীব। রাস্তায় শুয়ে শুয়ে আপনমনে নালিশ করতে লাগল ও।

‘ধুর! যত্তসব পাগলের কারবার!’ রেগেমেগে বিড়বিড় করে বলল। ‘ওর মাছগুলোকে তখন মেরে ফেললেই ভালো হতো! এই জিনিস পরে আমি দৌড়াব কীভাবে? আর ওই বিটকেল মাছগুলোকে খুঁজে পাবই–বা কোত্থেকে! কোন চুলোয় যে গেছে ওগুলো, তার আমি কী জানি!’

রাজীব বেচারি কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে উল্টো ঘুরে বাসার পথ ধরল। আর অমনি...

এ কী!

ওই যে ছানাবড়া, মরাটে চোখ মেলে ওর দিকেই ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রয়েছে ১৬টা মৎস্যদানব—রামিনের সাধের গোল্ডফিশ!

আরও পড়ুন
‘রামিন!’ হাঁপ ছাড়ল ও, দৌড়ানোর সময় দুপাশে বুনো চাউনি হানছে, কিন্তু টিনের পোশাকটির সরু ফুটোজোড়া দিয়ে কিছু দেখা অত সহজ কম্ম নয়। হঠাৎ মাটি কেমন যেন লাফাতে লাগল।

সাত

‘আআআআ!’ তারস্বরে আর্তনাদ ছাড়ল রাজীব। ফুটপাত দিয়ে সাধ্যমতো জোরে দৌড় দিল ও। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যথেষ্ট গতি আনতে পারেনি ওর পা জোড়া। পারবে কীভাবে? প্রাণপণ ছুটতে বাধা দিচ্ছে যে ওর টিনের উদ্ভট পোশাকটি, তাই মাছদানোরা ওর ঠিক পেছনেই লেগে রয়েছে এবং ক্রমেই শিকারের নাগাল ধরে ফেলছে!

কস্টিউমের ভেতর রীতিমতো পেরেশান, কষ্টেসৃষ্টে মোবাইল ফোনটা বের করতে পারল রাজীব।

‘দোস্ত, আমার অবস্থা তো খুবই খারাপ...!’ বন্ধুকে কোনোরকমে বলল ও।

‘ফোন কেটে দিস না!’ অপর প্রান্ত থেকে জরুরি কণ্ঠে তাগিদ দিল রামিন। ‘মাছগুলোর কোনো খোঁজ পেলি?’

‘আরে, ওরাই তো আমাকে খুঁজে নিয়েছে,’ চিঁ চিঁ করে বলল রাজীব।

‘বাহ, খুব ভালো। ওদেরকে তোর পিছু নেওয়াতে পারবি?’ প্রশ্ন রামিনের।

‘সে আর বলতে,’ বলল রাজীব। ‘তোর প্ল্যানের এই অংশ না দারুণ কাজে দিচ্ছে!’

এরই মধ্যে দানব গোল্ডফিশগুলো আরও কাছে চলে এসেছে। ওকে ধরে ফেলে আরকি!

‘সত্যি?’ রামিনের খুশি ধরে না। ‘কিন্তু তুই এত হাঁপাচ্ছিস কেন? এক কাজ কর, মাছগুলোকে সুইমিংপুলে নিয়ে আয়—আমি ওখানেই আছি।’

‘তুই আমার এখানে আয় না!’ মিনতি করে বলল রাজীব, কিন্তু রামিন ততক্ষণে ফোন কেটে দিয়েছে। রাজীবের মনে হলো, ওর বন্ধুটি ঘোলা পানিতে নয়, বরং সুইমিংপুলের স্বচ্ছ পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে!

দানোগুলো এখন এতটাই কাছে, রাজীব ওদের গায়ের আঁশটে গন্ধ পাচ্ছে, কিন্তু কোনা ঘুরলেই শান্তিপুরের সুইমিংপুলটি। রাজীবের পেছনে, ফুটপাতে মৎস্যদানবদের লেজ আছড়ানোর শব্দ। দুপদাপ করে ওকে ধরতে আসছে ওরা। পেলে স্রেফ খেয়ে ফেলবে!

দানোগুলোকে ঠিক পেছনে নিয়ে, প্রবেশপথ দিয়ে একছুটে ভেতরে ঢুকে পড়ল রাজীব।

‘রামিন!’ হাঁপ ছাড়ল ও, দৌড়ানোর সময় দুপাশে বুনো চাউনি হানছে, কিন্তু টিনের পোশাকটির সরু ফুটোজোড়া দিয়ে কিছু দেখা অত সহজ কম্ম নয়। হঠাৎ মাটি কেমন যেন লাফাতে লাগল। নিচের দিকে চাইল রাজীব—আরে, ও তো দাঁড়িয়ে রয়েছে ডাইভিং বোর্ডটির শেষ প্রান্তে, পানির ওপর টালমাটাল অবস্থায়। সাবধানে ঘুরে দাঁড়াল ও বোর্ড থেকে নামার জন্য, কিন্তু বোর্ডের ওপর দিয়ে তখন টলমল পায়ে ওকে ধরতে আসছে ভয়ংকর মৎস্যদানবের দল!

আরও পড়ুন
দানোগুলো এখন এতটাই কাছে, রাজীব ওদের গায়ের আঁশটে গন্ধ পাচ্ছে, কিন্তু কোনা ঘুরলেই শান্তিপুরের সুইমিংপুলটি। রাজীবের পেছনে, ফুটপাতে মৎস্যদানবদের লেজ আছড়ানোর শব্দ।

আট

‘রাজীব—জলদি লাফ দে!’ সুইমিংপুলের কিনারা থেকে চেঁচিয়ে উঠল রামিন।

রাজীব দুবার ভাবল না।

ইতিমধ্যে মৎস্যদানবেরা বেসামাল পায়ে টলতে টলতে বোর্ডের কোনায় চলে এসেছে। ঝপাৎ করে পরপর আরও ১৬ বার আওয়াজ হলো। দানোগুলো রাজীবকে ধরতে পানিতে লাফিয়ে পড়েছে! ততক্ষণে অবশ্য রামিন ওর প্রাণের বন্ধুটিকে ডাঙায় টেনে তুলেছে।

এক পাশে বসে, ভেজা কস্টিউমের ভেতর খকখক করে কাশছে আর মুখ দিয়ে পানি ফেলছে রাজীব।

রামিন এ সময় প্লাস্টিকের বালতিভর্তি প্রতিষেধক ঢেলে দিল জলাধারের জলে।

কিছুই ঘটল না। তারপর...

ফটাস!

পানি সেদ্ধ হয়ে বাষ্প উঠতে শুরু করেছে। বড় বড় ভুড়ভুড়ি উঠে ধোঁয়ার সবুজ মেঘ ফাটছে। পানি বেগুনি থেকে হলদে, তারপর গাঢ় নীল থেকে ক্যাটকেটে লাল হয়ে সবুজ রং ধরল। ফটাস ফটাস শব্দটা আরও জোরালো হলো, ধোঁয়া আরও ঘন হয়ে উঠল। রামিন আর রাজীব এখন আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আচমকা শেষবারের মতো বিকট শব্দে এক বিস্ফোরণ হলো—ফটাস! এবং ছেলেরা সবুজ পানিতে আর শেওলায় ভিজে–নেয়ে একসার হয়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত ধোঁয়া দূর হলো। বেশির ভাগ পানি এখন পুলের বাইরে। তবে যেটুকু পানি ভেতরে রয়ে গেছে, তাতে ১৬টা স্বাভাবিক আকৃতির গোল্ডফিশ দিব্যি পরমানন্দে সাঁতরে বেড়াচ্ছে!

‘হুর রে! আমরা পেরেছি!’ গলা ফাটিয়ে চিৎকার ছাড়ল রামিন।

রাজীব জবাব দিল না। মূর্ছা গেছে বেচারি।

আরও পড়ুন
ইতিমধ্যে মৎস্যদানবেরা বেসামাল পায়ে টলতে টলতে বোর্ডের কোনায় চলে এসেছে। ঝপাৎ করে পরপর আরও ১৬ বার আওয়াজ হলো। দানোগুলো রাজীবকে ধরতে পানিতে লাফিয়ে পড়েছে!

পরদিন। বলার অপেক্ষা রাখে না, শান্তিপুরে বিপুল উৎসাহে বিজয় উৎসবটি পালিত হলো। মেয়র দীর্ঘ একঘেয়ে বক্তৃতা করলেন, বাদক দল প্যাঁ-পোঁ করে বেসুরো বাজনা বাজাল এবং স্থানীয় সংবাদপত্র কিছু ঝাপসা ছবি তুলল। জনতা হাততালি দিচ্ছে, এমনই সময় রাজীবের উদ্দেশে ঝুঁকে পড়ল রামিন।

‘কিরে, তুই এমন মনমরা কেন? তুই খুশি হসনি? আরে, তুই তো নায়ক বনে গেছিস!’

‘হুম, নায়ক না ছাই! কাজের কাজ তো সব তুই-ই করলি। আমি শুধু টিনের পোশাক পরে সং সেজে শহরময় মাছদানোদের তাড়া খেয়ে বেড়ালাম!’ জবাবে গজগজ করে বলল রাজীব।

‘কিন্তু তুই না থাকলে কি আমি প্রতিষেধকটা বানানোর সুযোগ পেতাম, বল? আমরা দুজন মিলেই তো একটা টিম। এটা তো একটা টিমওয়ার্ক!’

এবার হাসি ফুটল রাজীবের মুখে।

‘তা ঠিক। তবে একটা কথা, তুই কিন্তু আর কখনো আমাকে তোর মাছেদের খাবার দিতে বলবি না!’

হো হো করে হেসে উঠল রামিন।

‘ধুর, কী যে বলিস! অমনটা বারবার ঘটবে নাকি?’

শহরের আরেক প্রান্তে, রামিনের ল্যাবরেটরিতে সব সুনসান-এলোমেলো, তবে নির্ঝঞ্ঝাট। অ্যাকুয়ারিয়ামে মনের সুখে ভেসে বেড়াচ্ছে ১৬টা নিরীহ, স্বাভাবিক গোল্ডফিশ। স্বাভাবিকই বটে, পার্থক্য শুধু এটুকুই—ওদের পিঠ থেকে পাখনা গজাতে শুরু করেছে...।

বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন