ইকোন

ডক্টর রূপন্তীর চোখের কোনায় ভাঁজ পড়েছে। ভাঁজের রেখা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে কানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ভাঁজগুলো হয়ে যাচ্ছে আরও গভীর। এমন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু হচ্ছে। ডক্টর রূপন্তী একদৃষ্টে তাঁর সামনের মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখ সরু হতে হতে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। মনিটরের সবুজ রঙের সরলরেখা কাঁপতে কাঁপতে ঢেউখেলানো দড়ির মতো হয়ে যাচ্ছে। রং বদলে যাচ্ছে সরলরেখার। সবুজ থেকে কমলা হয়েছে। কমলা থেকে লাল হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মনিটরের রেখা লাল হওয়া মানে বিপজ্জনক ঘটনা। যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

ঘরের এক পাশে পাঁচজন পাশাপাশি বসে আছেন। পাঁচজন পাঁচ রকমের পেশার সঙ্গে জড়িত। একজন ইমপোর্ট–এক্সপোর্টের ব্যবসা করেন। তাঁর পাশেরজন সবজি বিক্রেতা। তাঁর পাশে বসে আছেন সরকারি কর্মকর্তা। পরেরজন বেকার। সবার ডানে যিনি বসে আছেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। এই পাঁচজনকে নিয়ে এসেছে তক্কেল। সে ডক্টর রূপন্তীকে নানা ধরনের মানুষ সাপ্লাই দেয়। তক্কেল সাতজনকে নিয়ে এসেছিল। তাঁদের একজন কলেজের শিক্ষক, আরেকজন রাজনীতিবিদ। বিশেষ বিবেচনায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ডক্টর রূপন্তী পেশায় নিউরোসায়েন্টিস্ট ও ফিজিসিস্ট। তিনি বিশেষ ধরনের যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। যন্ত্রের নাম দিয়েছেন ‘ইকোন’। ইমোশনাল এনার্জি কনভার্টার। তিনি দেখেছেন, মানুষের আবেগ কখনো বিলীন হয়ে যায় না। এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়।

রেলওয়ে জংশনে ট্রেন থেমেছিল লাইন বদল করবে বলে। ডক্টর রূপন্তী ট্রেনের জানালার পাশে বসে ছিলেন। খোলা জানালা দিয়ে তিনি প্ল্যাটফর্মে নানা রকমের মানুষ দেখছেন। খানিক আগেও যখন ট্রেন এসে স্টেশনে থামে, তখন এসব মানুষের ভেতর প্রচণ্ড ব্যস্ততা ছিল। এখন সবাই অদ্ভুত রিলাক্স মুডে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ আয়েশ করে কফি খাচ্ছে। কোনো দুজন গল্প করতে করতে প্ল্যাটফর্মের এক মাথা থেকে আরেক মাথার দিকে হেঁটে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন
রেলওয়ে জংশনে ট্রেন থেমেছিল লাইন বদল করবে বলে। ডক্টর রূপন্তী ট্রেনের জানালার পাশে বসে ছিলেন। খোলা জানালা দিয়ে তিনি প্ল্যাটফর্মে নানা রকমের মানুষ দেখছেন।

ট্রেনের হুইসেল বাজছে। ইঞ্জিন ঘুরে এসেছে। ট্রেন এখন অন্য লাইনে নেওয়া হবে। তারপর রওনা হয়ে যাবে গন্তব্যে। আচমকা এক লোককে প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে ছুটে আসতে দেখা গেল। তিনি ‘চিনি–মধু’ বলে চিত্কার করছেন আর ছুটছেন। ঘটনা তখন জানা গেছে। ভদ্রলোকের দুই যমজ মেয়ে। চিনি আর মধু। তাদের বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। তারা স্টেশনের কল থেকে খাওয়ার পানি আনতে গেছে। এখনো ফেরেনি।

ভদ্রলোক দুই মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে অস্থির হয়ে গেছেন। জোরে জোরে ট্রেনের হুইসেল বাজছে। ট্রেন পেছানো শুরু করেছে। পাশের লাইনে গিয়ে অন্য প্ল্যাটফর্ম ঘেঁষে বেরিয়ে যাবে। ভদ্রলোক ‘চিনি–মধু’ বলে গলা ছেড়ে ডাকছেন আর প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন। চিনি আর মধুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চিত্কার করে ডাকতে ডাকতে ভদ্রলোকের গলা দিয়ে আর কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। তার গলা দিয়ে কান্নার মতো অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে।

কয়েকজন মানুষ এগিয়ে গিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানালেন, যতক্ষণ চিনি আর মধুকে পাওয়া যাবে না, ততক্ষণ যেন ট্রেন প্ল্যাটফর্ম না ছেড়ে যায়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ রাজি হয়েছে। তখন দেখা গেল, প্ল্যাটফর্মের এক পাশ থেকে বোতলে পানি ভরে নিয়ে চিনি আর মধু হাসিমুখে গল্প করতে করতে এগিয়ে আসছে।

ভদ্রলোক মেয়েদের দেখতে পেয়েছেন। তিনি তাদের দিকে ছুটে গেলেন। ডক্টর রূপন্তী তাকিয়ে আছেন তাদের দিকে। ভদ্রলোকের শোক আচমকা রাগে রূপান্তরিত হয়ে গেল। তিনি ঠাস ঠাস করে দুই মেয়ের গালে দুটি চড় মারলেন। চড় খেয়ে মেয়ে দুজন হতভম্ব হয়ে গেছে। তারা বুঝতে পারছে না বাবা কেন তাদের মারল। তাদের হতভম্ব ভাব কাটার আগেই বাবা দুই মেয়েকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। ডক্টর রূপন্তীর মনে হলো, মানুষের আবেগও শক্তির মতো এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তরিত হয়।

আরও পড়ুন
ভদ্রলোক দুই মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে অস্থির হয়ে গেছেন। জোরে জোরে ট্রেনের হুইসেল বাজছে। ট্রেন পেছানো শুরু করেছে। পাশের লাইনে গিয়ে অন্য প্ল্যাটফর্ম ঘেঁষে বেরিয়ে যাবে।

সেই ভাবনা থেকে ডক্টর রূপন্তী তৈরি করলেন ইমোশনাল এনার্জি কনভার্টার। সংক্ষেপে, ইকোন। আবিষ্কার করলেন আনন্দ, দুঃখ, রাগ, ভয়, বিস্ময় কিংবা ঘৃণা—সব আবেগকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার কৌশল। দেখালেন হাসির একমুহূর্তের শক্তি দিয়ে একখানা ছোট ঘরকে আলোকিত করা সম্ভব।

যে পাঁচজন ঘরের এক পাশে বসে আছেন, তাঁদের ভেতর পাঁচ রকম আবেগ সঞ্চারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আনন্দ, দুঃখ, রাগ, ভয় আর ঘৃণা। বিস্ময়ের ব্যাপারটিকে আপাতত সরিয়ে রাখা হয়েছে। ডক্টর রূপন্তী পরীক্ষা করে দেখেছেন, সব আবেগের শক্তি এক রকম নয়। হাসির শক্তি কোমল, স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী। রাগের শক্তি প্রচণ্ড অস্থির এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক। দুঃখের শক্তি ধীর, গভীর ও রহস্যময়। আনন্দের শক্তি সৃষ্টিশীল ও হৃদয়স্পর্শী। ভয়ের শক্তি অস্থির ও এলোমেলো। সেখানে ঘৃণার শক্তি কখনো প্রবল, কখনো হালকা। খুব বেশি ধারাবাহিকতা পাওয়া যায় না। আবার খানিক বিচ্ছিন্নও। তাই ঘৃণাকে এর সঙ্গে রাখা হয়নি।

সুরক্ষা চেম্বারে ডক্টর রূপন্তীর পাশে এথিন বসে আছে। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। বয়সে তুখোড় তরুণ। এই আবিষ্কারে প্রথম থেকে সে ডক্টর রূপন্তীকে সহযোগিতা করে আসছে। এথিন ছাড়া অন্য কাউকে এখনো ইকোন আবিষ্কারের ঘটনা জানানো হয়নি।

আরও পড়ুন
যে পাঁচজন ঘরের এক পাশে বসে আছেন, তাঁদের ভেতর পাঁচ রকম আবেগ সঞ্চারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আনন্দ, দুঃখ, রাগ, ভয় আর ঘৃণা। বিস্ময়ের ব্যাপারটিকে আপাতত সরিয়ে রাখা হয়েছে।

এথিন অস্থির গলায় বলল, ‘ডক্টর, খেয়াল করছেন, মনিটরে একটা রেখা লাল আর মোটা হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ কেউ অত্যধিক রাগে আক্রান্ত হয়েছে। তার শক্তি হয়ে গেছে অতিরিক্ত।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘এটা কার আবেগ?’

এথিন উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে উত্কণ্ঠিত গলায় বলল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।’

‘তাদের ভেতর আবেগ সঞ্চারের ব্যবস্থা নিশ্চয় পরিকল্পনামতো হয়েছে?’

‘প্রত্যেকের ব্রেনের লিম্বিক সিস্টেমের সঙ্গে নির্ধারিত আবেগ সৃষ্টির কাহিনি জুড়ে দেওয়া হয়েছে।’

‘সেখানে নিশ্চয় নির্দিষ্ট মাত্রায় আবেগ তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে?’

‘হয়েছিল, কিন্তু রাগের আবেগ সৃষ্টির লিম্বিক সিস্টেমে ছোট সমস্যা দেখা দিয়েছে। লিম্বিক সিস্টেমের সঙ্গে অ্যামিগডালা অংশ আলাদা হয়ে গেছে।’

‘কার?’

‘সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।’

‘তুমি বুঝতে পারছ, এখন কী হতে পারে! অ্যামিগডালা আগ্রাসন তৈরি করে। কারও রাগের আবেগ আগ্রাসী পর্যায়ে চলে গেলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে, ধারণা করতে পারছ!’

এথিন কিছু বলল না। মনিটরে লাল দাগ মোটা হয়ে পুরো মনিটর গ্রাস করে ফেলেছে। যেকোনো সময় ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে। এখান থেকে এত দ্রুত সেটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এথিন সুরক্ষা চেম্বার থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। রাগের আবেগ তৈরির চ্যানেল বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। এথিন এগিয়ে যেতে পারল না। তার আগেই বিস্ফোরণ ঘটল। সেই বিস্ফোরণে এথিন ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারিয়েছে। পরীক্ষার জন্য যে পাঁচজনকে নিয়ে আসা হয়েছিল, তাদের পাওয়া গেছে ছিন্নভিন্ন অবস্থায়। ডক্টর রূপন্তী বিশেষ সুরক্ষা চেম্বারে থাকায় রক্ষা পেয়েছেন।

আরও পড়ুন
তুমি বুঝতে পারছ, এখন কী হতে পারে! অ্যামিগডালা আগ্রাসন তৈরি করে। কারও রাগের আবেগ আগ্রাসী পর্যায়ে চলে গেলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে, ধারণা করতে পারছ!’

২.

এথিনের সামনে শরবতভর্তি গ্লাস। কমলালেবুর শরবত। তার বিশেষ পছন্দের। শরবত খেতে ইচ্ছা করছে না। কয়েক দিন ধরে এক গভীর চিন্তা তাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। ডক্টর রূপন্তীর ল্যাবরেটরিতে দুর্ঘটনার পর এক বছর সে কোনো কাজ করতে পারেনি। বিস্ফোরণে তার ডান পাশ পুড়ে গেছে। পরে কৃত্রিম ডান হাত আর ডান পা লাগানো হয়েছে।

ডক্টর রূপন্তী এর ভেতর তার বানানো ইকোন মেশিন দিয়ে মানুষের আবেগ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উত্পাদন শুরু করেছেন। বিজ্ঞান একাডেমি ও সরকার দেশের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ডক্টর রূপন্তীর বিদ্যুৎ উত্পাদনের এই প্রক্রিয়াকে অনুমোদন দিয়েছে। বিজ্ঞান একাডেমি ও সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে দেশে এখন বাণিজ্যিকভাবে মানুষের আবেগ থেকে বিদ্যুৎ তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এথিন সুস্থ হওয়ার পর অনুমোদন নিয়ে নিজেই আবেগের বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে বিদ্যুৎ উত্পাদন করে যাচ্ছে। তার সামনে যে লোকটি বসে আছে, তার নাম ক্রিসি। সে আবেগ বিক্রি করতে এসেছে। কিন্তু গত সাড়ে তিন ঘণ্টা চেষ্টা করেও তার ভেতর কোনো আবেগ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি।

এথিন জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আবেগ বিক্রি করতে চাইছেন কেন?’

ক্রিসি বলল, ‘গত ১৫ দিন কোনো কাজ পাইনি। এখান থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে এক অ্যাগ্রো খামারে কাজ করতাম। সেখানে কাজের জন্য নতুন রোবট নিয়ে এসেছে। আমরা ৪৫ জন একসঙ্গে কাজ হারিয়েছি। জমানো যে টাকা ছিল, তাই দিয়ে ২৫ দিন আমাদের খাবার জোটাতে পেরেছি। তার পর থেকে আমরা পরিবারের সবাই আবেগ বিক্রি করে ইউনিট দিয়ে খাবার কিনে খাচ্ছি।’

আরও পড়ুন
এথিন সুস্থ হওয়ার পর অনুমোদন নিয়ে নিজেই আবেগের বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে বিদ্যুৎ উত্পাদন করে যাচ্ছে। তার সামনে যে লোকটি বসে আছে, তার নাম ক্রিসি। সে আবেগ বিক্রি করতে এসেছে।

এথিন বলল, ‘কিন্তু আপনার ভেতর তো কোনো আবেগ অবশিষ্ট নেই! কৃত্রিমভাবে কোনো আবেগ তৈরিও করা যাচ্ছে না।’

ক্রিসি প্রায় কেঁদে ফেলেছে। বুজে আসা গলায় বলল, ‘আমাদের পরিবারের কারও আর কোনো আবেগ নেই। আমাদের সব আবেগ বিক্রি হয়ে গেছে। আমার আবেগ, আমার ছেলেমেয়ে, স্ত্রী—সবার। কোনোভাবে কারও ভেতর আবেগ তৈরি হচ্ছে না। আপনি আরেকবার চেষ্টা করে দেখুন। তা না হলে না খেয়ে মারা যেতে হবে।’

এথিন বলল, ‘তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আপনি একইভাবে চেষ্টা করে দেখতে বলে যাচ্ছেন। আমরাও চেষ্টা করছি। কিন্তু আপনার ভেতর রাগ বা ঘৃণার আবেগও সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না। কী করব বলুন!’

হতাশ গলায় ক্রিসি বলল, ‘আমার মন মরে গেছে।’

স্থির দৃষ্টিতে এথিন তাকিয়ে আছে। ভেঙে পড়া শরীর ও মন নিয়ে ক্রিসি উঠে দাঁড়িয়েছে। সে ঘুরে ধীর পায়ে চলে যাচ্ছে। তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এথিনের মনে হলো, মানুষ যখন তার আবেগ বিক্রি করে দেয়, তখন কি সে শুধু তার আবেগ হারায়, নাকি অনুভূতিও হারিয়ে ফেলে!

মনের ভেতর দোটানা ভাব স্থায়ী হতে দিল না। এথিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। মানুষের শরীরের রক্তপ্রবাহ ও মস্তিষ্কের তরঙ্গপ্রবাহ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে এক অদৃশ্য শক্তি বের হয়। সেটা মানুষের আবেগ। সেই আবেগ কেবল মানসিক নয়, বিশুদ্ধ শক্তি। এটা সম্পূর্ণ জৈবিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া। এখানে অনুভূতির কোনো ব্যাপার নেই।

ঘরের দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতে ক্রিসি মিলিয়ে গেল। এথিনের মনে হলো, আবেগকে শক্তির উত্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ঠিকই, তবে সেই সঙ্গে মানুষ তার অনুভূতির গভীরতা হারিয়ে ফেলছে।

আরও পড়ুন
এথিন বলল, ‘তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আপনি একইভাবে চেষ্টা করে দেখতে বলে যাচ্ছেন। আমরাও চেষ্টা করছি। কিন্তু আপনার ভেতর রাগ বা ঘৃণার আবেগও সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না। কী করব বলুন!’

৩.

আবহাওয়ার অবস্থা হয়ে আছে এলোমেলো। কিছুক্ষণ আগে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আবহাওয়া শীতল হওয়ার কথা। কিন্তু হয়ে আছে গরম। মনে হচ্ছে, মাটি দিয়ে ভাপ উঠছে। তক্কেল বিরক্ত হয়ে বাইরে থেকে কারখানার ভেতরে তার নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল।

তক্কেল একখানা বিদ্যুৎ উত্পাদন কারখানা বানিয়েছে। সেখানে আবেগ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ বানানোর ব্যবসা করে। তবে তার কারখানা বিজ্ঞান একাডেমি বা সরকারের কাছ থেকে আবেগ থেকে বিদ্যুৎ উত্পাদনের অনুমতি পায়নি। তাকে ব্যবসা করতে হয় গোপনে। তক্কেলের বেশ কয়জন ভাড়াটে দালাল আছে। তারা কমিশনের বিনিময়ে লোক ধরে আনে, যারা কম মূল্যে তাদের আবেগ বিক্রি করতে চায়। এখানে যে বিদ্যুৎ উত্পাদন হয়, তক্কেল সেই বিদ্যুৎ গোপনে চোরাই পথে ছোট ছোট কারখানায় সাপ্লাই দেয়।

তক্কেলের পেছন পেছন ক্রিসি ঢুকেছে। তার মুখ হয়ে আছে বিষণ্ন। পথে এক লোক তাকে এখানকার সন্ধান দিয়েছে। বলেছে, ‘তক্কেল মরা মানুষের ভেতর আবেগ সঞ্চার করতে পারে।’

সেই লোকের কথা শুনে ক্রিসি অনেক আশা নিয়ে তক্কেলের কাছে এসেছে। তক্কেল তার কারখানায় আবেগ সৃষ্টির নানা রকম আয়োজন করে রেখেছে। এখানে আবেগময় মুভি, জনপ্রিয় হাসির শো, রোমান্টিক গান—সবকিছুর ব্যবস্থা করা আছে। তা ছাড়া কিছু মানুষ রাখা হয়েছে, যারা তাদের বিরক্তিকর আচরণ দিয়ে কাউকে রাগিয়ে দিতে পারে। তবে এখানে রাগের অতিরিক্ত শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। কখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যায়।

আরও পড়ুন
তক্কেলের পেছন পেছন ক্রিসি ঢুকেছে। তার মুখ হয়ে আছে বিষণ্ন। পথে এক লোক তাকে এখানকার সন্ধান দিয়েছে। বলেছে, ‘তক্কেল মরা মানুষের ভেতর আবেগ সঞ্চার করতে পারে।’

গত পরশু একজন এসেছিল আবেগ বিক্রি করতে। মুভি দেখে, গান শুনে কোনোভাবেই তার আবেগ সৃষ্টি করা গেল না। তখন তক্কেল ডাক দিল, ‘কিকো!’

ডাক শুনে কিম্ভূতদর্শন এক লোক এগিয়ে এল। তার মুখে বসন্তের দাগ। মোটা দুই ঠোঁট। চোখ দুটো কুতকুতে। থ্যাবড়া নাক। সে জানে, তাকে কেন ডাকা হয়েছে। সে এসে সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে বলল, ‘ঘরে ঢুকেই চুরি করেছিস! আবেগ বিক্রি করতে এসেছিস, আবেগ বেচে ইউনিট নিয়ে চলে যাবি। চোর–ছ্যাঁচড়দের মতো ঘরে ঢুকেই জিনিস হাতিয়ে নিলি কেন?’

অমনি সেই মানুষ রেগে গেল। তার মাথায় আর বুকে নানা রকমের পোর্ট আটকানো। কিছুক্ষণ আগে তার ভেতর আবেগ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। আবেগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সে দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘মুখ সামলে কথা বলবে। তুইতোকারি করবে না। দায়ে পড়ে আবেগ বিক্রি করতে এসেছি। চুরি করতে আসিনি।’

কিকো বলল, ‘তোর কাপড় খুললেই বের হয়ে যাবে চুরি করতে এসেছিস, নাকি আবেগ বিক্রি করতে। তুই চোর, তোর বাপ চোর, তোর মা চোর। তোর গোষ্ঠীর সবাই চোর।’

তখনই মানুষটি কিকোর দিকে তেড়ে এল। কয়েক পা এগিয়ে এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। যেন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তক্কেল সামনে এসে বলল, ‘মেশিন অফ করে দিয়েছি। তোমার রাগের আবেগ থেকে অতিরিক্ত শক্তি তৈরি হয়েছে। তাতে যতটুকু বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে, তাই বিক্রি করে তুমি এক সপ্তাহ ভালোভাবে চলতে পারবে।’

আরও পড়ুন
কিকো বলল, ‘তোর কাপড় খুললেই বের হয়ে যাবে চুরি করতে এসেছিস, নাকি আবেগ বিক্রি করতে। তুই চোর, তোর বাপ চোর, তোর মা চোর। তোর গোষ্ঠীর সবাই চোর।’

পায়ের আওয়াজ শুনে তক্কেল পেছনে তাকিয়েছে। দেখে, শুকনা মুখে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তক্কেল চোখ দিয়ে ইশারা করে বসতে বলল। নিজে সামনে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল। শান্ত গলায় বলল, ‘তোমার নাম কী?’

ক্রিসি বসতে বসতে নিজের নাম বলল।

তক্কেল জিজ্ঞেস করল, ‘আবেগ বেচবে? সরকারি কারখানায় গিয়েছিলে?’

ক্রিসি বলল, ‘গিয়েছিলাম। তারা আমার ভেতর আবেগ খুঁজে বের করতে পারেনি। শুনেছি, আপনি মরা মানুষের ভেতর আবেগের সন্ধান করতে পারেন। আজ আবেগ বিক্রি করতে না পারলে বউ–ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে মারা যাব।’

অত্যন্ত গভীর আবেগপ্রবণ গলায় তক্কেল বলল, ‘শুধু মানুষের আবেগ নয়, গরুর চোখে পানি দেখেছ? প্রাণীর আবেগ নিয়েও কাজ করছি। বানর, গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল, কাক সবার আবেগ থেকেই শক্তি নিয়ে বিদ্যুৎ বানাব।’

মাথা নিচু করে বসে আছে ক্রিসি। তার পানির পিপাসা পেয়েছে কি না, বুঝতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে, কী যেন দরকার। কী দরকার, আন্দাজ করতে পারছে না।

তক্কেল উঠে ক্রিসির মাথায় আর বুকের কাছে কতগুলো পোর্ট আটকে দিল। ইসিজি বা ইইজি মানে ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাম করার সময় এ ধরনের পোর্ট লাগানো হয়। তবে এখানে কোনো কেবল ব্যবহার করা হয় না। ওয়্যারলেস।

ক্রিসি কিছু বলল না। সে চুপচাপ বসে থাকল। তক্কেল উঁচু গলায় ডাকল, ‘জিন্টু!’

আরও পড়ুন
মাথা নিচু করে বসে আছে ক্রিসি। তার পানির পিপাসা পেয়েছে কি না, বুঝতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে, কী যেন দরকার। কী দরকার, আন্দাজ করতে পারছে না।

এক লোক ঘরে ঢুকেছে। ক্রিসি মুখ তুলে তাকাল। যে ঘরে ঢুকছে, তাকে ক্রিসি চেনে। এই লোক তাকে তক্কেলের কারখানার খবর দিয়েছে। জিন্টু ঘরে ঢুকে ক্রিসির কাঁধে আলতোভাবে হাত রাখল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘বাড়িতে চলুন।’

জিন্টুর গলায় কিছু ছিল। ক্রিসি অস্থিরতা বোধ করছে। সে বলল, ‘কী হয়েছে?’

জিন্টু বলল, ‘আপনার কাছ থেকে সব শুনে আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। আপনার স্ত্রী ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দুই সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছে।’

ক্রিসির মস্তিষ্কে অদ্ভুত মিশ্র আবেগ তৈরি হয়েছে। রাগ, দুঃখ ও ঘৃণা একসঙ্গে। আবেগ বাড়ছে। বিপৎসীমা অতিক্রম করার আগেই তক্কেল মেশিন বন্ধ করে দিল। প্রসন্ন হাসি দিয়ে বলল, ‘তোমার বউ–ছেলেমেয়ের কিছু হয়নি। তোমার আবেগ পাওয়া গেছে। তার জন্য বেশ ভালো ইউনিট দিচ্ছি তোমাকে। বাড়িতে গিয়ে কয়েক দিন আরাম করে খাওয়াদাওয়া করো। আর প্রয়োজন হলে আমার কাছে চলে আসবে।’

জিন্টুর দিকে তাকিয়েছে ক্রিসি। জিন্টুর মুখ হাসি হাসি।

আরও পড়ুন
জিন্টু বলল, ‘আপনার কাছ থেকে সব শুনে আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। আপনার স্ত্রী ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দুই সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছে।’

৪.

গম্ভীর মুখে এথিন বলল, ‘ডক্টর রূপন্তী, আমি কনফেস করতে এসেছি। আশা করছি, আপনি আমাকে বুঝবেন।’

ডক্টর রূপন্তী নরম চোখে এথিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। এই ছেলেকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন। সে তাকে ছেড়ে গেলেও তার প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি।

এথিন বলল, ‘প্রতিদিন দেশে কয়েক হাজার মানুষের আবেগ থেকে শক্তি সংগ্রহ করা হচ্ছে। মনোযোগ দিলে দেখবেন, এখন আর কারও আবেগ তার নিজের আবেগ নয়। তার হাসি, রাগ, প্রেম সব কৃত্রিমভাবে বানিয়ে শক্তি উত্পাদনের কাজে লাগানো হচ্ছে। তাতে মানুষের ভেতর তৈরি হয়েছে একাকিত্ব ও শূন্যতা। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক উষ্ণতা কমে এসেছে। স্পন্দন ধীর হয়ে গেছে। মানুষ একা হয়ে গেছে। হাহাকারের মতো একা।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘কী চাও তুমি?’

এথিন বলল, ‘মানুষ তার সত্যিকারের আবেগ ফিরে পাক।’

ডক্টর রূপন্তী বললেন, ‘তোমাকে ভালোবাসি, এথিন। কথা দিচ্ছি মানুষকে তার ভালোবাসা আর সাহসের মতো পবিত্র আবেগ ফিরিয়ে দিতে কাজ করব। তুমি আমার সঙ্গে থেকো।’

এথিন তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ডক্টর রূপন্তীর হাত ধরে সে বলল, ‘আপনাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’

ডক্টর রূপন্তী ও এথিন দুজনই বুঝতে পারছে, তাদের ভেতর আবেগ তৈরি হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে আবেগের সেই শক্তি বিদ্যুৎ বানিয়ে ঘর উজ্জ্বল করার জন্য নয়, নিজেদের মনকে আলোকিত করার জন্য।

*লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন