‘কফি খাবে?’
‘না।’ নির্বিকারভাবে কথাটা বলে পল্লব উঠে গেল। ঢুকে গেল নিজের স্টাডিরুমে। ভেজা ভেজা চোখ নিয়ে সেদিকে চেয়ে রইল বিদিতা।
প্লেয়ারে কিশোর কুমারের গান বেজে চলেছে। ‘পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে/ তুমি আমি একই আছি, দুজনে যা ছিলাম আগে।’
গানটা শুনে তার কিঞ্চিৎ মন খারাপ হচ্ছে। পল্লব আগে যেমন ছিল, এখন তেমন নেই। বদলে গেছে, রাতারাতি। বিয়ের এত বছর পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে খানিক মরচে ধরা অস্বাভাবিক কিছু নয়, ধরতেই পারে। কিন্তু তাই বলে কেউ তাল থেকে তিল হয়ে যাবে, তা কি মেনে নেওয়া যায়!
সাগরতল থেকে আসার পর থেকে পল্লব যেন একদম অচেনা মানুষে পরিণত হয়েছে। আগে খুব বকবক করত। কাজ থেকে ফিরে কী হয়েছে না হয়েছে, সব উগরে দিত বিদিতার কাছে। এখন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে নিজের ভেতর। প্রয়োজনের বেশি কোনো শব্দ খরচ করছে না। থাকছে চুপচাপ, নিজের ভেতর। কেন? বিদিতা সেটা এখনো জানে না।
নিজের দেশ ছেড়ে সে পল্লবের সঙ্গে এই বিদেশবিভুঁইয়ে পাড়ি জমিয়েছে আজ ১৫ বছর হয়ে গেল। পল্লব তখন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা যুবক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল্ডমেডেলিস্ট ছাত্র। চোখে তার তখন স্বপ্ন, উচ্চাশা আর বিদিতার জন্য তীব্র প্রেম। যুক্তরাষ্ট্রে সে স্কলারশিপটা পেয়ে যাওয়ার পর দুজন ঝটপট বিয়েটা সেরে ফেলে। নতুন দেশে পাড়ি জমায়। দুজনই বেশ আনন্দিত ছিল, সুখী ছিল।
সাগরতল থেকে আসার পর থেকে পল্লব যেন একদম অচেনা মানুষে পরিণত হয়েছে। আগে খুব বকবক করত। কাজ থেকে ফিরে কী হয়েছে না হয়েছে, সব উগরে দিত বিদিতার কাছে।
পিএইচডি শেষ হলে পল্লব একটি গবেষণা সংস্থায় যোগ দেয়। সমুদ্রগর্ভের নানান বিষয়, যেমন সামুদ্রিক পরিবেশ, প্রাণিকুল, সামুদ্রিক পদার্থবিদ্যা ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করে সে। সম্মানজনক চাকরি। এই পেশার মানুষদের দারুণ সমীহ করে চলে সবাই, আমেরিকানরাও। বাড়ি, গাড়ি, নারী, সম্মান…আর কী চাই একজন পুরুষের জীবনে? ওদিকে বিদিতারও একটা স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি হয়ে যায়। দুজন সুখে-শান্তিতে সব পেয়েছির দেশে বসবাস করতে শুরু করে। ওদের ছোট বাড়িটা যুক্তরাষ্ট্রের মফস্সল এলাকায়। বাড়ি থেকে পাহাড় আর একটি উপত্যকা চোখে পড়ে। সকালে ঝলমলে সূর্যের আলোয় ভরে যায় ঘর। বিদিতার মনে হতো, তারা স্বপ্নের জীবনে বসবাস করছে। নিখুঁত একটি প্রেমের গল্প দুজনের!
তারপর কেটে গেল এতগুলো বছর। সন্তানসন্ততি নেই এই দম্পতির। দুজনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সন্তান নেবে না তারা। পৃথিবীতে জনসংখ্যা কম নাকি! একটা মানুষ কম হলে পৃথিবীর উপকার বৈ অপকার হবে না।
কিন্তু বিপত্তি বাধল পল্লবের আচরণে। এমন নয় যে আস্তেধীরে অল্প অল্প করে বদলে গেছে সে। পরিবর্তনটা হুট করেই হয়েছে এবং এই পরিবর্তন অপরিবর্তিত হওয়ারও কোনো নামগন্ধ নেই।
গবেষণার কাজে প্রশান্ত মহাসাগরের একটা ট্রেঞ্চের ভেতর সপ্তাহখানেক কাটিয়েছিল পল্লব। হ্যাঁ, এক সপ্তাহ, সাতটা দিন। ফিরে এসেছে গত শনিবার। সাত দিনে কী হয়েছে তার? কারণ, ফেরার পর নিজে থেকে একটাও কথা বলেনি সে। বাড়ি এসে ব্যাগট্যাগ রেখে নিজে নিজে কফি বানিয়ে খেয়েছে। নিজ হাতে! পল্লব নিজ হাতে পানিও গরম করেনি আজ পর্যন্ত! আর কফি?
‘পল্লব, তুমি ঠিক আছ?’
‘হ্যাঁ’ বলেই নিজের স্টাডিরুমে ঢুকে গিয়েছিল সে। ওখানেই থাকে সে আজ দিন-রাত। ফেরার পর থেকে অফিসেও যায়নি একবারও।
কিছু একটা হয়েছে সমুদ্রগর্ভে। কী সেটা? মেয়েলি কৌতূহলে মরে যাচ্ছে বিদিতা। তার চেয়েও বেশি হচ্ছে দুশ্চিন্তা। পল্লব এত বদলে গেল কী করে?
কিন্তু বিপত্তি বাধল পল্লবের আচরণে। এমন নয় যে আস্তেধীরে অল্প অল্প করে বদলে গেছে সে। পরিবর্তনটা হুট করেই হয়েছে এবং এই পরিবর্তন অপরিবর্তিত হওয়ারও কোনো নামগন্ধ নেই।
দুই.
‘কী বলো বিদিতা! পলেরও একই অবস্থা। ফেরার পর থেকে মুখে একদম কুলুপ এঁটে বসে আছে।’
বিকেলে লিন্ডার সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল বিদিতার। লিন্ডা পলের প্রেমিকা। ওরা দুজন একই সঙ্গে থাকে। বিদিতার ভালো বান্ধবী এই বিদেশি মেয়েটা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, উপলক্ষে বহুবার দেখা হয়েছে। পল আর পল্লব, নামের খানিক মিলের কারণেই কি না কে জানে, দুজনের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব।
বিকেলে কী মনে করে লিন্ডাকে ফোন করে ব্যাপারটা খুলে বলল বিদিতা। শুনে সে অবাক। পলও নাকি বদলে গেছে। তা কী করে হয়! দুজন সমুদ্রবিজ্ঞানীর মাথা একসঙ্গে বিগড়ে গেল কী করে!
‘কী করা যায়, বলো তো লিন্ডা?’
‘এক কাজ করো, চুপি চুপি ওর স্টাডিরুমে ঢুকে দেখো কী করে সে! তার মুঠোফোন, ল্যাপটপ ঘেঁটে দেখো।’
‘সেটা মোটেও সহজ হবে না। আজকাল সে স্টাডিরুম থেকে খুব একটা বের হয় না।’
‘অন্তত বাথরুমে যাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই বের হবে!’
‘আজকাল তো বাথরুমে গেলেও খুব দ্রুত ফিরে আসে আবার। খাওয়াদাওয়াও সেখানে করে। এমনকি ঘুমানোর জন্যও বের হয় না।’
‘ধৈর্য ধরো, অপেক্ষা করো। একসময় সুযোগ পাবেই।’
বিদিতা অপেক্ষা করতে লাগল। করেই গেল সারা সন্ধ্যা। কিন্তু না, বের হলো না পল্লব। জেদ চেপে গেল এবার মেয়েটার। একটা হেস্তনেস্ত সে করেই ছাড়বে।
রাতের বেলা অবশেষে যখন রুমের বাইরে পা রাখল পল্লব, বিদিতা কিছুই বলল না তাকে। ওর দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে দ্রুত পায়ে হলরুমটা পেরিয়ে সে বাথরুমে ঢুকে গেল। তড়াক করে উঠে দাঁড়াল বিদিতা। এই সুযোগ।
আমেরিকার বাথরুমগুলোয় সব সময় বাইরে থেকে দরজা লাগানোর সিস্টেম থাকে না, কিন্তু ওদের বাড়িতে আছে। বাঙালি বুদ্ধি থেকেই হয়তো ওভাবে তৈরি করেছিল পল্লব। তবে সুযোগটা আজ কাজে লেগে গেল বিদিতার। দ্রুত বাইরে থেকে লাগিয়ে দিল সে দরজাটা।
বিকেলে কী মনে করে লিন্ডাকে ফোন করে ব্যাপারটা খুলে বলল বিদিতা। শুনে সে অবাক। পলও নাকি বদলে গেছে। তা কী করে হয়! দুজন সমুদ্রবিজ্ঞানীর মাথা একসঙ্গে বিগড়ে গেল কী করে!
তিন.
দরজা ধাক্কানোর তীব্র শব্দ শুনতে পাচ্ছে বিদিতা। কিন্তু আমলে নিচ্ছে না। তার হাতের ডায়েরিটা দেখছে মনোযোগ দিয়ে।
স্টাডিরুমে ঢুকে সে আবিষ্কার করেছে, এই কয় দিন ল্যাপটপ-মুঠোফোন ছুঁয়েও দেখেনি পল্লব। ধুলা জমে আছে ল্যাপটপের মনিটরে। একটা ডায়েরিতে সে আঁকিবুঁকি করেছে শুধু। বিদঘুটে সব আঁকাআঁকি। একটি বীভৎস প্রাণীর চেহারা দেখা যাচ্ছে তাতে। এক পায়ে দাঁড়ানো বৃহদাকার একটি প্রাণী। প্রাণীটির ধড়টা চতুর্ভুজের মতো। অসমতল চতুর্ভুজ। মাথা বলতে কিছু নেই। আছে অসংখ্য টেন্টাকল, অক্টোপাসের মতো। এমন একটা প্রাণী কেন আঁকতে যাবে পল্লব?
ডায়েরিজুড়েই যে এই প্রাণীর ছবি, বিষয়টা তা নয়। একদিকে কিছু কথা লেখা আছে। কথাগুলো পড়তে যাবে, তখনই শুনতে পেল দরজা ধাক্কাচ্ছে পল্লব, ভীষণভাবে। সে উপেক্ষা করার চেষ্টা করল। মনোযোগ দিল ডায়েরি পড়ার দিকে।
পড়তে পড়তে তার চোখগুলো আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল, কোঁচকাতে লাগল ভ্রু, কপালে ভাঁজ পড়ল। এ কী অবিশ্বাস্য কথা লিখে রেখেছে পল্লব?
স্টাডিরুমে ঢুকে বিদিতা আবিষ্কার করেছে, এই কয় দিন ল্যাপটপ-মুঠোফোন ছুঁয়েও দেখেনি পল্লব। ধুলা জমে আছে ল্যাপটপের মনিটরে। একটা ডায়েরিতে সে আঁকিবুঁকি করেছে শুধু। বিদঘুটে সব আঁকাআঁকি।
চার.
পল্লবের ডায়েরি থেকে
কিছুতেই বুঝতে পারছি না, কী করা উচিত। কাকে বিশ্বাস করা যায়? কাকে যায় না? জানা নেই আমার। বোঝার উপায়ও নেই। যা হয়েছে, সেটা এই ডায়েরিতে লেখাও বোধ হয় উচিত হবে না। যেকোনো সময় ওদের কারও হাতে পড়ে যেতে পারে। আমি সন্দেহ করছি তাদের, এটা জানতে পারলে নিশ্চয়ই বসে থাকবে না তারা, ব্যবস্থা নেবে। সেটা হতে দেওয়া যায় না। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ এখন আমাদের মতো গুটিকয় মানুষের হাতে টিকে আছে। সাবধান হতে হবে আমাকে।
তারপরও না লিখলে চিন্তাগুলো গোছাতে পারছি না!
কোথা থেকে শুরু করব? হ্যাঁ, গত মাসের ২০ তারিখে আমি আর পল গবেষণার কাজে একটা সাবমেরিনে করে প্রশান্ত মহাসাগরের একটা ট্রেঞ্চে নামি। খুব ছোট একটা সাবমেরিন, তবে সরু পরিখায় ঢোকার জন্য উপযুক্ত বাহন। যদিও দুজনের বেশি মানুষ উঠলে চলাফেরা কষ্টকর হয়ে যায়। তাই পানির ওপরে একটা জাহাজে বেজ স্টেশন বানিয়েছিলাম আমরা। সব টেকনিক্যাল স্টাফ সেই জাহাজে বসে আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করত। সাগরতলে থাকতাম শুধু আমরা দুজন। আমাদের কাজ ছিল ট্রেঞ্চের ভেতর থেকে পর্যবেক্ষণ করা, নমুনা সংগ্রহ করা ও কিছু রিডিং নেওয়া।
এমন অভিযাত্রা এবারই প্রথম নয়, করেছি আগেও। কিন্তু এবারের যাত্রা আগেরগুলোর মতো ছিল, তা বলা যাবে না। এবার বিশেষ কিছু ব্যাপার ঘটেছে।
গত মাসের ২০ তারিখে আমি আর পল গবেষণার কাজে একটা সাবমেরিনে করে প্রশান্ত মহাসাগরের একটা ট্রেঞ্চে নামি। খুব ছোট একটা সাবমেরিন, তবে সরু পরিখায় ঢোকার জন্য উপযুক্ত বাহন।
চতুর্থ দিন রাতে হঠাৎ বেজ স্টেশনের সঙ্গে অর্থাৎ সাগরের ওপরে থাকা জাহাজের সঙ্গে আমাদের সব রকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেন হলো, আমরা বুঝতে পারছিলাম না। যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও সাধারণত সেটা আবার ঠিক হয়ে যায় দ্রুত। কিন্তু এবার তা হলো না। পাক্কা এক ঘণ্টা আমরা বেজের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগই করতে পারলাম না। এমন নয় যে সিগন্যাল পাইনি। যন্ত্রপাতি, সিস্টেম—সব ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু অপর পক্ষ থেকে কেউ উত্তর দিচ্ছিল না।
এক ঘণ্টা পর আমাদের টেকনিক্যাল টিমের লিডার রবার্ট এসে শান্তসুরে জানাল, সিস্টেমের গোলযোগের কারণে এতক্ষণ যোগাযোগ করতে পারেনি তারা। ক্ষমা চাইল। কিন্তু আমি আর পল সেটা মানলাম না। সিস্টেমে কোনো সমস্যা হলে আমরাও সেটা টের পেতাম। আমরা বিজ্ঞানী, ‘টেকনিক্যাল সমস্যা’ বলে পার পাওয়া যাবে না আমাদের কাছে।
কিন্তু যত প্রশ্নই করি, রবার্ট খুব শান্তভাবে একই উত্তর দিচ্ছিল বারবার। একসময় সন্দেহ হলো, জাহাজে ডাকাত পড়ল না তো আবার? ওদের কেউ জিম্মি করেনি তো?
আমরা এবার কাছে থাকা একটা নেভির জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। জানালাম আমাদের উদ্বেগের কথা। তারা দ্রুতই চলে এল ঘটনাস্থলে। জানাল, সব ঠিক আছে। জাহাজে কোনো চোর-ডাকাত আসেনি।
এক ঘণ্টা পর আমাদের টেকনিক্যাল টিমের লিডার রবার্ট এসে শান্তসুরে জানাল, সিস্টেমের গোলযোগের কারণে এতক্ষণ যোগাযোগ করতে পারেনি তারা। ক্ষমা চাইল। কিন্তু আমি আর পল সেটা মানলাম না।
কিন্তু এতে আমাদের সন্দেহ আরও বাড়ল। কারণ, যদি জাহাজে কিছু না থেকে থাকে, আর আমরা নেভির সঙ্গে যোগাযোগ করে এমন একটা কথা বলি, তাহলে রবার্টের রেগে যাওয়ার কথা ছিল। হেড অফিসে যোগাযোগ করে আমাদের নামে নালিশ করে দিলেও অবাক হতাম না। কিন্তু সে এসবের কিছুই করল না। আশ্চর্য ঘটনা। এ কোন রবার্ট!
এর প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর যখন আমরা ওপরে উঠলাম, কথা বললাম রবার্টের সঙ্গে, দলের অন্যদের সঙ্গে, আমরা অস্বাভাবিক কিছু পেলাম না। সবাই খুব সহজ-স্বাভাবিক আচরণ করছিল। কিন্তু এতে আমাদের মনে হতে লাগল, সবাই বুঝি জোর করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। কিছু একটা হয়ে গেছে জাহাজে, কিন্তু সেটা কী, আমরা বুঝতে পারছিলাম না কিছুতেই।
আমরা ডাঙার উদ্দেশে রওনা হলাম। রাতে কেবিনে ঘুমাচ্ছিলাম যখন, তখন হঠাৎ জোরে জোরে থাবা বসাল কেউ আমার কক্ষে। ভয় পেলাম।
‘কে?’
ওপাশ থেকে ফিসফিস করে কেউ বলল, ‘আমি পল। দরজা খোলো জলদি, কথা আছে।’
আমি দরজা খুলতেই বোতল থেকে ছুটে আসা ছিপির মতো দ্রুতবেগে ঘরে ঢুকে গেল সে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। মুঠোফোন বের করে আমাকে দেখাল। দেখলাম, একটা ছবি। বোধ হয় জাহাজের ইঞ্জিনরুমে তোলা। ছবিতে একটা রক্তাক্ত লাশ। লাশটা আর কারও নয়, রবার্টের।
নিচু গলায় সে বলল, ‘রবার্ট মারা গেছে, অন্ততপক্ষে আরও ২৪ ঘণ্টা আগে। আমরা যে রবার্টকে দেখেছি, সে আমাদের রবার্ট নয়, অন্য কেউ।’
আমি দরজা খুলতেই বোতল থেকে ছুটে আসা ছিপির মতো দ্রুতবেগে ঘরে ঢুকে গেল সে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। মুঠোফোন বের করে আমাকে দেখাল। দেখলাম, একটা ছবি।
পাঁচ.
জাহাজ থেকে আমরা ভালোয় ভালোয় ফিরলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি গেলাম না। গেলাম না অফিসেও। আমাদের একটা ক্ষীণ সন্দেহ ছিল, সেটা পরখ করে দেখলাম সত্য কি না। সত্য।
পল আর আমি অনেকগুলো হাইপোথিসিস নিয়ে ভাবলাম। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা গেল।
পৃথিবী বদলে গেছে। যে এক ঘণ্টা সময় সবার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল বেজ স্টেশনের, তখন কেউ আক্রমণ করেছে পৃথিবীতে। বেশির ভাগ মানুষকেই হত্যা করা হয়েছে, আর তাদের জায়গায় কিছু নকল মানুষকে রাখা হয়েছে।
কীভাবে বুঝলাম, সে অনেক কথা। তবে কেউ যদি সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে, তাহলে দেখবে, পৃথিবীর কোনো ক্যামেরায় ওই এক ঘণ্টার কোনো ছবি নেই।
আমাদের ধারণা, এই নকল মানুষগুলো আসলে এলিয়েন, ভিনগ্রহবাসী। তারা নিশ্চয়ই মানুষের ডিএনএ থেকে তথ্য নিয়ে হুবহু প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। আমাদের মতো অল্প কিছু মানুষ, যাদের সে সময় এলিয়েনরা হত্যা করতে পারেনি, কিংবা ইচ্ছা করেই হত্যা করেনি, তাদের বোকা বানানো ছিল এলিয়েনের উদ্দেশ্য। সম্ভবত সমাজের বিভিন্ন স্তরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, যেমন বিজ্ঞানী, দার্শনিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীদের তারা বাঁচিয়ে রেখেছে ভবিষ্যতের কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য।
আমাদের ধারণা, এই নকল মানুষগুলো আসলে এলিয়েন, ভিনগ্রহবাসী। তারা নিশ্চয়ই মানুষের ডিএনএ থেকে তথ্য নিয়ে হুবহু প্রতিকৃতি তৈরি করেছে।
কিন্তু একটা জায়গায় মার খেয়ে গেছে তারা। তাদের তৈরি কৃত্রিম মানুষগুলো প্রায় নিখুঁত হলেও একটা খুঁত আছে। তা হলো চোখ। এই নকল মানুষগুলোর চোখের মণি খানিকটা বাঁকানো, ঠিক গোল নয়।
পল এর একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছে। কালের আবর্তে অভিযোজনের ধারায় চোখ একটা রহস্যময় অধ্যায়। আলোকসংবেদনশীলতা, চোখের পাতার গঠন, লেন্স তৈরি হওয়া—এসব বিষয় বেশ জটিল, অবিশ্বাস্য। যে এলিয়েনরা এতগুলো মানুষকে হত্যা করেছে, তারা বোধ হয় এতটাও বুদ্ধিমান নয় যে পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি করে ফেলবে।
তবে সবচেয়ে বিষাদ লেগেছিল তখন, যখন ঘরে ফিরে বিদিতার চোখের মণি লক্ষ করেছিলাম। এই মেয়ে বিদিতা নয়। আমার বিদিতাকেও মেরে ফেলেছে ওরা! এ কোন নকল বিদিতার সঙ্গে সংসারের অভিনয় করতে হচ্ছে?
পল আর আমি সত্যিকার মানুষ খুঁজে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে জোট করে সম্মিলিতভাবে এই এলিয়েনদের প্রতিহত করতে হবে।
কিন্তু বিদিতার শোক আমি কাটাব কী করে?
তবে সবচেয়ে বিষাদ লেগেছিল তখন, যখন ঘরে ফিরে বিদিতার চোখের মণি লক্ষ করেছিলাম। এই মেয়ে বিদিতা নয়। আমার বিদিতাকেও মেরে ফেলেছে ওরা!
ছয়.
বিদিতা এতটুকু পড়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ডায়েরির পাতার দিকে। সে বিদিতা নয়? তবে কে? এলিয়েন?
আয়নার সামনে গিয়ে নিজের চোখটা দেখে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এখন দেখার সাহস হচ্ছে না।
দুরুদুরু বুকে শোবার ঘরে গেল সে। তাকাল আয়নার দিকে। কিন্তু অস্বাভাবিক তো মনে হলো না কিছু। পল্লবের কি ভুল হচ্ছে কোথাও? মানুষের চোখের মণি তো এমন বাঁকানোই থাকে, নাকি!
আসলেই কি তাই?