প্রফেসর বার্ণের নিদ্রাভঙ্গ – ৭

হাঁটতে লাগলেন প্রফেসর, হোঁচট খেতে লাগলেন গাছের শিকড়ে ঝাঁকুনিতে চশমাটা বার বার খসে পড়ছিল নাক থেকে, বার বার ঠেলে তুলছিলেন সেটাকে। হঠাৎ ডালপালার ওদিকে মড়মড় আর ঘোঁৎঘোঁৎ এক শব্দ হলো। গাছগুলোর ফাঁক থেকে বেরিয়ে এল একটা জন্তুর বাদামী দেহ, মাথাটা মোচার মতো। ‘বন-শুয়োর,’ বার্ণ ভাবলেন। ‘কিন্তু বন-শুয়োর আগে যেমন হতো সে রকম নয়। এটার নাকের ওপর আবার একটা শিশুও আছে।’ শুয়োরটা একমূহূর্ত স্থির হয়ে থেকে তারপর কেঁউ কেঁউ করে পালাল গাছপালার মধ্যে। ‘আরে, মানুষকে ভয় পাচ্ছে দেখছি।’ অবাক হয়ে জানোয়ারটাকে লক্ষ্য করতে লাগলেন বার্ণ। কিন্তু হঠাৎ ধক করে উঠল তাঁর হৃৎপিণ্ড—শিশির ভেজা ধূসর শ্যাওলার ওপর কালো সোঁদা দাগ চলে গেছে ফাঁকা জায়গাটার ওপর দিয়ে। সে দাগ মানুষের খালি পায়ের দাগ!

একটা পদচিহ্নের ওপর ঝুঁকে পড়লেন বার্ণ। দাগটা চ্যাপটা গোছের, অন্য আঙুলগুলো থেকে বুড়ো আঙুলটা অনেক তফাতে। এ যে সবই মিলে যাচ্ছে দেখছি! এখান দিয়ে কিছুক্ষণ আগে একটা মানুষই হেঁটে গেছে নাকি? সবকিছু ভুলে পদচিহ্ন অনুসরণ করতে লাগলেন। তিনি ভালোভাবে দেখার জন্য ঝুঁকে পড়লেন। ‘এখানে তাহলে মানুষও আছে, আর বন-শুয়োর যখন তাদের ভয় পায় তখন নিশ্চয়ই খুব বলবান আর ক্ষিপ্র হবে তারা।’

…সাক্ষাৎটা ঘটল অকস্মাৎ। পদচিহ্ন চলে গেছে একটা ফাঁকা মতো জায়গায়, সেখান থেকে প্রথমে কিছু তীক্ষ্ম হু-হা শব্দ শোনা গেল; তারপর ধূসরহলুদ লোমে ভরা কতকগুলো প্রাণী দেখা গেল। চেহারাগুলো কুঁজো মতো, হাত দিয়ে ডাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো গাছের কাছে। প্রফেসরের দিকে তাকাল তারা। বার্ণ দাঁড়িয়ে পড়লেন, সব সতর্কতা বিসর্জন দিয়ে চেয়ে রইলেন এই দুপেয়েদের দিকে। কোনো সন্দেহই নেই যে এরা অ্যানথ্রপয়েড বানর, হাতে পাঁচটা করে আঙুল, ছোট্ট নাক আর কড়া চোয়ালের ওপর ঝুলে আছে ঢিপ হয়ে ওঠা ভুরু। সেখান থেকে ঢালু হয়ে উঠে গেছে নিচু কপাল। দেখলেন ওদের মধ্যে দুজনের কাঁধের ওপর চামড়ার একধরনের আবরণ বস্ত্রও আছে।

সেটাই তাঁর ভুল হয়েছিল। যদি ফাঁকাতে দৌড়ে যেতেন, তাহলে খুব সম্ভবত তারা তাঁর নাগাল ধরতে পারত না। কেননা খাড়া হয়ে হাঁটার পক্ষে তাদের পা যথেষ্ট অভ্যস্ত হয়নি।

সত্যিই ঘটেছে তাহলে! হঠাৎ একটা ক্রুদ্ধ, স্মৃতিবিধুর নিঃসঙ্গতা বোধ করতে লাগলেন বার্ণ। ‘পুরো চক্র আবর্তন করে এল তাহলে। হাজার হাজার বছর আগে যা ছিল তা ফিরে এল হাজার হাজার বছর পরে...’

ইতিমধ্যে একটি অ্যানথ্রপয়েড বানর বার্ণের দিকে এগিয়ে এসে চিৎকার করল, শব্দটা শুনে মনে হলো আদেশব্যঞ্জক। প্রফেসর বার্ণ দেখলেন তার হাতে একটা ভারী কাঠের লগুড়। বোঝা যায় সে-ই নেতা। তার পিছে পিছে এগিয়ে এল বাকি সবাই। এতক্ষণে বিপদটা বুঝলেন বার্ণ। এগিয়ে আসতে লাগল বানরেরা। আধ বাঁকা পায়ে হাঁটছিল আনাড়ির মতোই। বেশ তাড়াতাড়ি রিভলভারের সবকটা গুলি শূন্যে নিঃশেষ করে বার্ণ পালালেন বনের ভেতর।

সেটাই তাঁর ভুল হয়েছিল। যদি ফাঁকাতে দৌড়ে যেতেন, তাহলে খুব সম্ভবত তারা তাঁর নাগাল ধরতে পারত না। কেননা খাড়া হয়ে হাঁটার পক্ষে তাদের পা যথেষ্ট অভ্যস্ত হয়নি। কিন্তু বনের মধ্যে তাদেরই সুবিধা। তীক্ষ্ম বিজয়োল্লাসে গাছ থেকে গাছে ঝুলে ঝুলে তারা এগুতে লাগল, ডাল থেকে ডালে দুলে দুলে প্রচণ্ড লাফ দিলে কেউ কেউ। সবগুলোর সামনে মুষল হাতে সেই দলপতি।

বানরেরা যখন তাঁকে এসে ঘিরে ধরছিল, তখন পেছন থেকে উঠছিল এক উল্লসিত বন্য চিৎকার। কেন জানি মনে হলো, এ যেন একটা লিঞ্চিংয়ের মতো। দৌড়নো উচিত হয়নি তাঁর। যে পালায় তার হার অনিবার্য। হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠল তাঁর, ঘাম ঝরতে লাগল মুখ থেকে, পা দুটো মনে হলো যেন তুলো দিয়ে ঠাসা। হঠাৎ আতঙ্ক চলে গেল, একটা পরিষ্কার নির্মম চিন্তা ঝলক দিল মনে: ‘পালিয়ে কী হবে, কার কাছ থেকে পালাব? পরীক্ষার এই তো শেষ...’ থেমে গেলেন তিনি। একটা গাছের কাণ্ডে হাত রেখে ঘুরে দাঁড়ালেন তাঁর অনুসরণকারীদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

সবার আগে আসছিল দলপতি। মুষলটা সে ঘোরাচ্ছিল মাথার ওপর। প্রফেসর চেয়ে দেখলেন তার আঁখিপল্লব লালচে লোমশ আর ছোট ছোট চোখদুটো হিংস্র অথচ ভীরু, ব্যাদিত দাঁত। ডান কাঁধের লোমগুলো পোড়া পোড়া। ‘তাহলে আগুন কী তা এরা জানে দেখছি,’ দ্রুত সিদ্ধান্ত টানলেন বার্ণ। বেগে ধেয়ে এল দলপতি, একটা হুঙ্কার ছেড়ে মুষলটা দিয়ে মারল প্রফেসরের মাথায়। ভয়ঙ্কর আঘাতে ধরাশায়ী হলেন বৈজ্ঞানিক, মুখ ভেসে গেল রক্তে। এক মুহূর্তের জন্য অচৈতন্য হয়ে পড়লেন তিনি, তারপর চকিতের জন্য জ্ঞান হতেই দেখলেন, অন্য বানরেরাও ছুটে আসছে তাঁর দিকে। শেষ আঘাতের জন্যে হাত তুলছে দলপতি, আর রূপালি মতো কী একটা জিনিস চকচক করছে নীল আকাশে।

(চলবে…)

মূল: ভ্‌লদিমির সাভ্‌চেঙ্কো

অনুবাদ: ননী ভৌমিক

 

* সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘প্রগতি প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন গ্রহান্তরের আগুন্তুক থেকে নেওয়া।