শেষ পর্যন্ত পাথরের সঙ্গে ধাতুর সংঘাতের শুকনো মুড়মুড় শব্দ শেষ হয়ে গেল। আচ্ছাদন উঠে এসেছে ওপরে। বিশেষ একটা চাবি দিয়ে বার্ণ দরজার নাটগুলো খোলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সহজ হলো না। আঙুল ছড়ে গেল। অবশেষে একটা ফাটল দিয়ে দেখা গেল গোধূলির নীলাভ আলো। আরও কয়েকবার চেষ্টার পর আচ্ছাদনের তল থেকে বেরিয়ে এলেন প্রফেসর।
সদ্য নামা সন্ধ্যায় গোধূলিতে চারদিক কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্তব্ধ অরণ্য। আচ্ছাদনের শঙ্কুমুখটা মাটি খুঁড়ে উঠেছে ঠিক একটা গাছের শিকড়ের কাছে। মস্ত কাণ্ড গাছটার, অন্ধকার হয়ে ওঠা আকাশের উঁচুতে উঠে গেছে তার পাতার মুকুট। ‘বাঁ দিকে আর ঠিক আধ মিটার সরে যদি গাছটা থাকত, তাহলে কী যে হতো!’ এই ভেবে শিউরে উঠলেন বার্ণ। গাছটার কাছে গিয়ে পরখ করে দেখলেন তিনি। তার ফাঁপা ছালটা কেমন ভেজা ভেজা। কী ধরনের গাছ এটা? জানতে হলে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তাঁকে।
প্রফেসর বার্ণ তাঁর আচ্ছাদনে ফিরে এসে নিজের রসদ যাচাই করে দেখলেন। পানি, খাবারের টিন; কম্পাস, রিভলভার। একটা সিগারেট ধরালেন তিনি। ‘আমার ধারণা তাহলে ঠিক’ এই ভাবনাটাই এখন তাঁর মনজুড়ে রয়েছে, ‘মরুভূমি ছেয়ে গেছে অরণ্যে...তেজস্ক্রিয় ঘড়িটা ঠিক সময় দিয়েছে কি না, দেখতে হবে; কিন্তু কেমন করে?’
গাছগুলো খুব ঘেঁষাঘেঁষি নয়, তার ফাঁক দিয়ে আকাশের ঝকঝকে নক্ষত্রগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। তাকিয়ে দেখতেই তাঁর মাথায় খেলে গেল, ‘এখন ধ্রুব নক্ষত্রের জায়গায় অভিজিৎ থাকার কথা।’
কম্পাসটা নিয়ে তিনি নিচু ডালওয়ালা একটা গাছের দিকে এগোলেন। আনাড়ির মতো চেপে বসলেন তাতে। ডালপালায় মুখ ছড়ে গেল তাঁর, হৈচৈয়ের ফলে সজোরে ডেকে একটা পাখি উড়ে গেল ডাল থেকে, যাওয়ার সময় বেশ সজোরেই বার্ণের গালে পাখার ঝাপটা দিয়ে গেল। তার অদ্ভুত ডাকটা কিছুক্ষণ ধরে ঝমঝম করতে লাগল বনের মধ্যে। হাঁপাতে হাঁপাতে প্রফেসর ওপরের একটা ডালে ভালো করে বসে আকাশের দিকে তাকালেন।
একটা ধূসর স্বচ্ছ কুয়াশা উঠল গাছপালার মধ্য থেকে। পায়ের নিচে মোটা লম্বা ঘাসটার দিকে তাকিয়ে বার্ণ আবিষ্কার করলেন, সেটা একটা অতিকায় শ্যাওলা! ঠিক যা ভেবেছিলেন। তুষার যুগের পর ফার্ণজাতীয় উদ্ভিদ—সবচেয়ে আদিম, সবচেয়ে কঠিনপ্রাণ উদ্ভিদটাই বাড়তে শুরু করেছে
ততক্ষণে বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। মাথার ওপরে অজস্র উজ্জ্বল তারা ভরা আকাশটা তাঁর একেবারেই অপরিচিত। তাঁর চেনা নক্ষত্রমণ্ডলগুলো খুঁজতে চাইলেন তিনি। সপ্তর্ষিমণ্ডলটা কোথায়, আর ক্যাসিওপিয়া? নেই তো, থাকবেই-বা কেমন করে? হাজার হাজার বছরের পর তারাগুলো যে সরে গিয়ে পুরোনো সব নির্ঘণ্ট উল্টোপাল্টা করে দিয়েছে! ছায়াপথটা কিন্তু তারা ধূলির একটা ধুধু ফিতের মতো ঠিকই আছে আকাশে। প্রফেসর বার্ণ কম্পাসটা চোখের কাছে এনে কাঁটার আবছা উজ্জ্বল উত্তর মুখটা দেখলেন। তারপর তাকালেন উত্তরের দিকে। কালো দিগন্তের ঠিক ওপরে, নক্ষত্রখচিত আকাশ যেখানে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সেখানে জ্বলজ্বল করছে অভিজিৎ—আকাশের উজ্জলতম তারা, প্রায় স্থির একটা সবুজ মতো আলো আসছে তার কাছ থেকে। এর আশপাশে দেখা যাচ্ছে ছোটখাটো অন্য তারাদের, বিকৃত আকারের লিরা নক্ষত্রমণ্ডল।
সব সন্দেহের অবসান হলো। সত্যি সত্যিই প্রেসেসনের নতুন পর্যায়ের শুরুতে এসে গেছেন বার্ণ, বিশ সহস্রকে....
ভাবনায় ভাবনায় রাত কেটে গেল। ঘুমুতে পারেননি, অধীর হয়ে উঠেছিলেন সকালের জন্য। শেষ পর্যন্ত ঝাপসা হয়ে এল তারাগুলো, তারপর মিলিয়ে গেল। একটা ধূসর স্বচ্ছ কুয়াশা উঠল গাছপালার মধ্য থেকে। পায়ের নিচে মোটা লম্বা ঘাসটার দিকে তাকিয়ে বার্ণ আবিষ্কার করলেন, সেটা একটা অতিকায় শ্যাওলা! ঠিক যা ভেবেছিলেন। তুষার যুগের পর ফার্ণজাতীয় উদ্ভিদ—সবচেয়ে আদিম, সবচেয়ে কঠিনপ্রাণ উদ্ভিদটাই বাড়তে শুরু করেছে।
উদগ্র কৌতূহলে বনের মধ্য দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন বার্ণ। শ্যাওলার লম্বা লম্বা নমনীয় ডাঁটায় পা জড়িয়ে যেতে লাগল তাঁর, অজস্র শিশিরে অচিরেই ভিজে উঠল তাঁর জুতো। বোঝা যায়, ঋতুটা এখন শরৎ।
উদগ্র কৌতূহলে বনের মধ্য দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন বার্ণ। শ্যাওলার লম্বা লম্বা নমনীয় ডাঁটায় পা জড়িয়ে যেতে লাগল তাঁর, অজস্র শিশিরে অচিরেই ভিজে উঠল তাঁর জুতো। বোঝা যায়, ঋতুটা এখন শরৎ। গাছের পাতায় সবুজ, লাল, হলুদ আর কমলা রঙের সমারোহ। একধরনের সুঠাম গাছ আর তাদের তামাটে লাল বাকলের দিকে মনোযোগ গেল তাঁর। তাদের তাজা সবুজ পাতাগুলো ফুটে উঠেছে অন্য গাছগুলোর পটে। আরও কাছিয়ে গেলেন তিনি। দেখতে পাইন গাছের মতো, কিন্তু পাইন গাছে পাতার বদলে যেমন কাঁটা থাকে, এগুলোয় তেমনি কাঁটার বদলে এবড়োখেবড়ো ছুঁচলো পাতা, গন্ধটা ধূপের মতো।
ক্রমশ সজীব হয়ে উঠতে লাগল অরণ্য। একটা হালকা ফুরফুরে হাওয়ায় উড়ে গেল শেষ কুয়াশাটুকু। সূর্য উঠে এল গাছগুলোর মাথায়: সেই পরিচিত সূর্য, তার ঝকঝকে ঔজ্জ্বল্য এতটুকু পুরোনো হয়নি। ১৮ হাজার বছরে এতটুকুও বদল হয়নি তার।