নিমায়েরের সঙ্গে করমর্দন করলেন প্রফেসর।
‘আচ্ছা, ওই সেলে কি কেবল একজনেরই ব্যবস্থা আছে?’ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন নিমায়ের।
‘হ্যাঁ, কেবল একজনের,’ বার্ণের মুখে আন্তরিক দরদ ফুটল, ‘আপনাকে আগে বলে রাজি করাইনি দেখে এখন যেন আফসোসই হচ্ছে।’ তারপর নামার জন্য পা বাড়িয়ে বললেন, ‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে এই গর্তটার কাছ থেকে চলে যাবেন কিন্তু।’ তাঁর পাকা মাথাটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
বার্ণ সেলের দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর পোষাক ছেড়ে যে জিনিসটি পরলেন, সেটা একটা ডুবুরি-পোষাকের মতো, নানা রকম নল লাগানো আছে তাতে। এ পোষাক পরে তিনি তাঁর দেহের ছাঁচে মাপসই করে বানানো একটা প্লাস্টিক তোষকের ওপর শুলেন। একটু নড়েচড়ে দেখলেন, কোথাও কিছু চাপ দিচ্ছে না। সামনের কন্ট্রোল প্যানেলের সংকেতবাতিগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল যন্ত্র সব প্রস্তুত।
বিস্ফোরকের সুইচটায় হাত দিলেন তিনি, একমুহূর্ত অপেক্ষা করে চাপ দিলেন। অল্প একটু কম্পন বোধ করা গেল, কিন্তু সেলের ভেতরে কোনো শব্দ পৌঁছাল না। শেষ কালে শৈত্যযন্ত্রের পাম্প আর নারকসিস যন্ত্র চালু করলেন, হাতটা নামিয়ে আনলেন ‘খাটের’ যথাস্থানে, ছাদের একটা চকচকে বিন্দুর দিকে তাকিয়ে মুহূর্ত গুণতে লাগলেন...
ওপরে নিমায়ের একটা চাপা বিস্ফোরণের শব্দ শুনলেন, এক রাশ ধূলোবালি উঠে গেল আকাশে। বার্ণের সেল এবার মাটির তলে ১৫ মিটার নিচুতে চাপা পড়ে গেল... চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন নিমায়ের, নিস্তব্ধ মরুভূমির মধ্যে কেমন গা ছমছম করতে লাগল তাঁর। ধীরে ধীরে হেলিকপ্টারের দিকে হেঁটে গেলেন তিনি।
পাঁচ দিন পর, হেলিকপ্টারটাকে নির্দেশ মতোই উড়িয়ে দিয়ে তিনি পৌঁছান এক ছোট্ট মঙ্গোল শহরে।
সপ্তাহখানেক পরে শরতের ঝড়ে বালিয়াড়ির পাহাড়গুলো এলোমেলো হয়ে গর্তটার সব চিহ্ন মুছে ফেলে। কালের মতোই অসীম বালুতে ঢাকা পড়ে যায় বার্ণের শেষ অভিযানের ডেরাটা। আশপাশের জায়গা থেকে তাকে আলাদা করে চেনার আর কোনো উপায় রইল না...
একটা দপদপে ঝাপসা সবুজ আলো ধীরে ধীরে জেগে উঠল অন্ধকারের মধ্যে। সেটা স্থির হয়ে এলে বার্ণ বুঝলেন, এটা ওই তেজস্ক্রিয় রিলের সংকেত বাতি। জিনিসটা কাজ করেছে তাহলে।
ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে এল তাঁর চেতনাটা। বাঁ দিকে দেখলেন, তাঁর চিরন্তন ঘড়ির ইলেকট্রোস্কোপের প্লেট দুটো পড়ে আছে—কাঁটাটা ১৯ আর ২০-এর মাঝখানে। ‘বিশ সহস্রকের মাঝামাঝি,’ ভাবলেন তিনি। মস্তিষ্ক তাঁর নিখুঁতভাবেই কাজ করছে, একটা সংযত উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠলেন তিনি।
‘এবার দেহটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।’ সাবধানে তিনি তাঁর হাত, পা, ঘাড় নাড়িয়ে দেখলেন। মুখ খুললেন, বন্ধ করলেন। দেহটা ঠিকই চলছে, কেবল ডান পাটা তখনো অসাড়। স্পষ্টতই তা ‘নিদ্রাভিভূত’ অথবা তাপমাত্রা উঠেছে একটু বেশি দ্রুত। দ্রুত হাত পা চালিয়ে তিনি একটু চাঙা হয়ে নিলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। যন্ত্রপাতিগুলোর দিকে তাকালেন—ভোল্টমিটারের কাঁটাটা নেমে গেছে। বোঝা যায়, শৈত্য কাটাবার সময় অ্যাকুমুলেটরদের সঞ্চয় ফুরিয়ে এসেছে একটু। সবকটি তাপ ব্যাটারিকে চার্জ করতে শুরু করলেন বার্ণ, সঙ্গে সঙ্গে কাঁটা কেপে উঠে গেল। চকিতে মনে পড়ল নিমায়েরের কথা। থার্মো-এলিমেন্টরা সত্যিই তাঁকে ডোবায়নি। সে কথা মনে পড়তেই একটা অদ্ভুত দ্বিমুখী ব্যথিত ভাবনা আচ্ছন্ন করে তুলল মনকে। ‘নিমায়ের, সে তো যুগযুগ আগের একটা লোক। এখন আর কেউ বেঁচে নেই...’
ছাদে ধাতুর গোলকটার দিকে চোখ পড়ল তাঁর। এখন ওটা অন্ধকার, মোটেই চকচক করছে না। অস্থির বোধ করলেন বার্ণ। ফের ভোল্টমিটারের দিকে চাইলেন—অ্যাকুমুলেটরে এখনো খুব বেশি বিদ্যুৎ নেই, কিন্তু সব থার্মো-ব্যাটারি যদি একই সঙ্গে চালু করা যায়, তাহলে ওপরে উঠে আসার মতো যথেষ্ট শক্তি পাওয়া সম্ভব। পোষাক বদলে তিনি কামরার ছাদের দরজা দিয়ে উঠে গেলেন ওপরে আচ্ছাদনের কাছে, সেখানে স্বয়ংক্রিয় কুমুখ ফিট করা আছে।
সুইচ টিপলেন তিনি, গোঁ গোঁ করে ঘুরতে শুরু করল ইলেকট্রিক মোটর। আচ্ছাদনের স্ক্রু মাটি খুঁড়তে শুরু করেছে। কক্ষের মেঝে একটু সরে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বার্ণ দেখলেন, আচ্ছাদনটা ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করেছে।