মহাবিশ্বের কি কোনো সীমানা আছে

মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং সীমানা কোথায়?ছবি: রবার্তো মাচাদো নোয়া/গেটি ইমেজ

মহাবিশ্ব কি অসীম? নাকি এর কোনো নির্দিষ্ট সীমানা আছে? এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মহাবিশ্বের বিশালতা মাপা ও তাত্ত্বিক গবেষণার পর আমরা কি অবশেষে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, মহাবিশ্ব আসলেই অসীম?

উত্তর হ্যাঁ, পারি। আবার না-ও বলতে পারি! কারণ পুরো ব্যাপারটা বেশ জটিল। চলুন, একদম নিশ্চিতভাবে জানা একটি বিষয় দিয়ে শুরু করা যাক।

আমরা জানি, একটি সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বে আমরা বাস করি। কিন্তু মহাবিশ্ব যদি ক্রমাগত প্রসারিত হতেই থাকে, তবে প্রশ্ন জাগে, এটি ঠিক কীসের ভেতরে প্রসারিত হচ্ছে? এর প্রসারণটা শুরুই বা হয়েছিল কোথা থেকে? মহাবিশ্বের শেষ সীমানা কোথায়, এর কেন্দ্রই বা কোথায়?

মহাবিশ্বের এই প্রসারণ কল্পনা করা খুব কঠিন কিছু নয়। এটি বোঝার জন্য আমরা দারুণ কিছু উদাহরণের সাহায্য নিতে পারি। ধরুন, একটি বেলুনের গায়ে আপনি ছোট ছোট কয়েকটি গ্যালাক্সি আঁকলেন। এবার বেলুনটি ফোলালে দেখা যাবে গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথবা, কিশমিশ দেওয়া পাউরুটির কথা ভাবুন। রুটিটা যখন ফুলে ওঠে, তখন এর ভেতরের কিশমিশগুলোও একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়।

কিন্তু সমস্যা হলো, বেলুন বা পাউরুটির একটি কেন্দ্র এবং একটি বাইরের সীমানা আছে। তাহলে মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং সীমানা কোথায়?

উত্তরটা আপনার কাছে একটু অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র নেই, নেই কোনো সীমানাও! কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?

আরও পড়ুন
সব জায়গা মানেই মহাবিশ্বের অংশ। বিগ ব্যাং মহাকাশের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ঘটা কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল মহাকাশেরই বিস্ফোরণ, যেখান থেকে মহাবিশ্বের প্রসারণ শুরু হয়েছিল।

প্রথমে কেন্দ্রের কথায় আসা যাক। বিগ ব্যাং ঠিক কোথায় শুরু হয়েছিল? এই তো এখানে! আবার ওই সেখানে! এমনকি পাশের গ্যালাক্সিতেও! আসলে বিগ ব্যাং সব জায়গায় একই সঙ্গে ঘটেছিল। আর এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ সংজ্ঞানুযায়ী, সব জায়গা মানেই মহাবিশ্বের অংশ। এটি মহাকাশের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ঘটা কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল মহাকাশেরই বিস্ফোরণ, যেখান থেকে মহাবিশ্বের প্রসারণ শুরু হয়েছিল। তাই বিগ ব্যাং কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, বরং এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়।

এবার মুদ্রার উল্টো পিঠের কথা ভাবা যাক। মহাবিশ্ব যদি প্রসারিত হতে থাকে, তবে এটি ঠিক কীসের ভেতরে প্রসারিত হচ্ছে? আমাদের সেই ফুলে ওঠা পাউরুটির বাইরের সীমানা আসলে কোথায়?

বিষয়টা এখন একটু অদ্ভুত মনে হতে পারে। মহাবিশ্ব শূন্যতার ভেতরে প্রসারিত হচ্ছে বলাও ঠিক নয়। কারণ এতে মনের ভেতর একটা ভুল ছবি তৈরি হতে পারে। আমরা হয়তো কল্পনা করে বসব, মহাবিশ্বের একটা বিশাল দেয়াল বা সীমানা আছে; যার একপাশে গ্যালাক্সি ও গ্রহ-নক্ষত্র আছে, অন্য পাশে আছে শুধুই শূন্যতা! মহাবিশ্ব সেই শূন্যতা পূরণের জন্যই একটু একটু করে প্রসারিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন
সংজ্ঞানুযায়ী, মহাবিশ্ব মানেই অস্তিত্বশীল সবকিছুর সমষ্টি। মহাবিশ্ব ছাড়া ভৌত বাস্তবতার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। দেয়াল সাধারণত এক জায়গাকে অন্য জায়গা থেকে আলাদা করে।

কিন্তু এই ধারণাটি পুরোপুরি ভুল। মহাকাশের শূন্যতাও কিন্তু একটা অস্তিত্ব। সেখানেও বিন্দু বা নির্দিষ্ট অবস্থান আছে। মহাবিশ্বের বাইরে বলে কিছু নেই। কারণ বাইরে শব্দটি বললেই কোনো কিছুর অস্তিত্ব বোঝায়, হোক সেটা একদম ফাঁকা! সংজ্ঞানুযায়ী, মহাবিশ্ব মানেই অস্তিত্বশীল সবকিছুর সমষ্টি। মহাবিশ্ব ছাড়া ভৌত বাস্তবতার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। দেয়াল সাধারণত এক জায়গাকে অন্য জায়গা থেকে আলাদা করে। কিন্তু মহাবিশ্ব একই সঙ্গে সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ধারণ করে।

এর যদি কোনো সীমানা থাকত, তবে আপনি হয়তো অনেক চেষ্টা করে সেই সীমানার বাইরে যাওয়ার কল্পনা করতে পারতেন। কিন্তু সেটা অসম্ভব। মহাবিশ্বের কোনো বাইরে নেই, কোনো পাশ বা সীমানাও নেই। যা আছে, তা হলো শুধুই বিশাল মহাবিশ্ব!

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর

সূত্র: স্পেস ডটকম

আরও পড়ুন