এক দিনে কেন ২৪ ঘন্টা, এক ঘন্টায় কেন ৬০ মিনিট

আমাদের সময় মাপার পদ্ধতিটা আসলে বেশ উদ্ভট!ছবি: সায়েন্স এবিসি

সময় নিয়ে একটা বিখ্যাত প্রবাদ আছে—‘সময় হলো তীরের মতো; একবার ধনুক থেকে বেরিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না।’ সেই কারণেই হয়তো আমরা ক্ষণে ক্ষণে খোঁজ নিই, এখন কটা বাজে? সে জন্য প্রতিদিন অসংখ্য বার ঘড়িতে, মোবাইল বা কম্পিউটারে সময় দেখি। কিন্তু ঘড়ি দেখতে গিয়ে কি কখনো ভেবেছেন, সময়ের হিসেবটা এরকম গোলমেলে কেন?

মানে, আমরা অন্যান্য ব্যাপার সংখ্যা দিয়ে যেভাবে হিসেব করি, সময়ের হিসেব সেরকম নয় কেন? কেন দিনকে সমান দশ বা একশো ভাগে ভাগ না করে ঠিক ২৪ ভাগেই ভাগ করা হলো? কিংবা একটা দিন কেন পনেরো ঘন্টা বা ২০ ঘন্টা হলো না? তেমনি মিনিট বা সেকেন্ডকে ১০০ ভাগে ভাগ না করে কেন ভাগ করা হলো ৬০ ভাগে?

একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, আমাদের সময় মাপার পদ্ধতিটা আসলে বেশ উদ্ভট! যেমন এক দিনে ২৪ ঘণ্টা, এক ঘণ্টায় ৬০ মিনিট, এক মিনিটে ৬০ সেকেন্ড, অথচ এক সেকেন্ডে এক হাজার মিলিসেকেন্ড। চব্বিশ, ষাট, ষাট, হাজার—এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে যেন কোনো ধারাবাহিকতা নেই। যেন জোড়াতালি দেওয়া একটা ব্যবস্থা। এরকম হওয়ার কারণ কী?

দেখতে যত আজগুবিই মনে হোক না কেন, এই হিসেবটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং মিশরীয় এবং ব্যাবিলনীয়দের গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ফল। চলুন, ব্যাপারটা খোলাসা করা যাক।

আরও পড়ুন
এক দিনে ২৪ ঘণ্টা, এক ঘণ্টায় ৬০ মিনিট, এক মিনিটে ৬০ সেকেন্ড, অথচ এক সেকেন্ডে এক হাজার মিলিসেকেন্ড। চব্বিশ, ষাট, ষাট, হাজার—এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে যেন কোনো ধারাবাহিকতা নেই।

ইতিহাস বলে, প্রাচীন মিশরীয়রাই প্রথম দিনকে ২৪ ঘণ্টায় ভাগ করার প্রথা চালু করেছিল। তবে তাদের এই হিসেবটা শুরুতে আজকের মতো এতটা নিখুঁত ছিল না। তারা মূলত সূর্যঘড়ি ব্যবহার করে দিনকে ১০টি সমান ভাগে ভাগ করেছিল। এই দশ ভাগের সঙ্গে মিশরীয়রা ভোরবেলা এবং সন্ধ্যার গোধূলির জন্য আরও দুটি ভাগ যোগ করেছিল। তাতে দিনের মোট ভাগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১২টি। দিনের হিসেব তো হলো, কিন্তু রাতে সময় মাপার উপায় কী? তখন তো আকাশে সূর্য নেই, তাই সূর্যঘড়িও কোনো কাজ করে না।

তার উপায়ও বের করেছিল সেকালের মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জ পর্যবেক্ষণ করে রাতকেও ১২টি সমান ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। আকাশের বিশেষ কিছু নক্ষত্রকে সেকালে বলা হতো ডেকান। ডেকানে ছিল প্রায় ৩৬টি বিশেষ তারা-দল। এগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে আকাশে উদয় হতো। এই নক্ষত্রগুলোর উদয় দেখে সময়ের কাঁটা নির্ধারণ করা হতো প্রাচীন মিশরে। ফলে দিন ও রাতের এই দুই ১২ ঘণ্টার সমন্বয়ে পূর্ণ একটি দিনচক্র ২৪ ঘণ্টায় রূপ নিল।

মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জ পর্যবেক্ষণ করে সময়ের কাঁটা নির্ধারণ করত
ছবি: মোটুয়ো / শাটারস্টক

তবে এই ব্যবস্থায় একটা বড় ফাঁক ছিল। ঘণ্টার দৈর্ঘ্য বদলে যেত ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে। যেমন গ্রীষ্মে দিন লম্বা, তাই দিনের বারোটি ঘণ্টাও লম্বা। শীতে দিন ছোট, তাই ঘণ্টাও ছোট। এভাবে ঋতুভেদে দিনের আলোর দৈর্ঘ্য বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টার দৈর্ঘ্যও ছোট-বড় হতো। শুধু বিষুব দিনে, মানে যেদিন দিন ও রাত সমান হতো, সেদিন ঘণ্টাগুলোও হতো সমান দৈর্ঘ্যের। বছরের বাকি দিনগুলোতে সময়ের এই তফাত সাধারণ মানুষ হয়তো গায়ে মাখত না, কিন্তু যারা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি হিসাব করতেন, তাঁদের জন্য এটা ছিল মহা-মাথাব্যথা।

আরও পড়ুন
আকাশের বিশেষ কিছু নক্ষত্রকে সেকালে বলা হতো ডেকান। ডেকানে ছিল প্রায় ৩৬টি বিশেষ তারা-দল। এই নক্ষত্রগুলোর উদয় দেখে সময়ের কাঁটা নির্ধারণ করা হতো প্রাচীন মিশরে।

সেই মাথাব্যথার সমাধান দেন প্রাচীন গ্রিক জ্যোতির্বিদ হিপার্কাস। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে তিনি একটি যুক্তিসংগত ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন। তিনি বললেন, দিনকে ২৪টি সমান ভাগে ভাগ করা উচিত। ঋতু যাই হোক, ঘণ্টার দৈর্ঘ্য একই থাকবে। প্রস্তাবটা যুক্তিসঙ্গত হলেও সাধারণ মানুষ সহজে তার কথা মানতে রাজি হয়নি। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী চলতে লাগল পুরনো ব্যবস্থায়। অবশেষে ১৪ শতকে ইউরোপে যন্ত্রচালিত ঘড়ি আসার পর সবাই মেনে নিল সমান ঘণ্টার নিয়ম। তারপর থেকে সারা পৃথিবী এই ২৪ ঘণ্টার ছন্দেই চলছে।

প্রাচীন অনেক সভ্যতা গণনার জন্য হাতের আঙুল ব্যবহার করত
ছবি: সায়েন্স এবিসি

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ১০ বা ২০-এর মতো পরিচিত সংখ্যার বদলে কেন ১২ সংখ্যাটিই বেছে নেওয়া হয়েছিল?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের হাতের আঙ্গুলে। প্রাচীন অনেক সভ্যতা গণনার জন্য হাতের আঙুল ব্যবহার করত। তবে তারা পুরো আঙুল না গুনে বুড়ো আঙুল দিয়ে বাকি চার আঙুলের প্রতিটি কর বা হাড়ের জোড়া গুণত। বুড়ো আঙুল বাদ দিলে প্রতিটি আঙুলে তিনটি করে কর থাকে। ফলে চার আঙুলে মোট ১২টি কর পাওয়া যায় (ভারতবর্ষে অবশ্য এক হাতের আঙুলে কর গোনা হয় ২০টি)। এই সহজ ও কার্যকরী গণনা পদ্ধতিই ১২ সংখ্যাটিকে সময়ের মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিল।

আরও পড়ুন
প্রাচীন অনেক সভ্যতা গণনার জন্য হাতের আঙুল ব্যবহার করত। তবে তারা পুরো আঙুল না গুনে বুড়ো আঙুল দিয়ে বাকি চার আঙুলের প্রতিটি কর বা হাড়ের জোড়া গুণত।

এবার আসা যাক ৬০-এর প্রশ্নে। ঘণ্টাকে কেন ৬০ ভাগে ভাগ করা হলো? ১০ বা ১২ ভাগে নয় কেন?

আসলে ঘণ্টার হিসেব যদি মিশরীয়দের দান হয়, তাহলে মিনিট এবং সেকেন্ডের জন্য আমাদের ঋণী থাকতে হবে প্রাচীন সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয়দের কাছে। আজকের দিনে আমরা যেমন ডেসিমাল বা দশমিক পদ্ধতিতে ১০ ভিত্তিক সব হিসেব করি, তারা ব্যবহার করত সেক্সাজেসিমাল বা ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি। গণিতবিদদের কাছে ৬০ একটি জাদুকরী সংখ্যা। কারণ একে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১০, ১২, ১৫, ২০ এবং ৩০ দিয়ে অনায়াসেই ভাগ করা যায়। ভগ্নাংশের ঝামেলা এড়াতে এই সংখ্যাটি ছিল অতুলনীয়।

প্রাচীন সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয়দের আবিষ্কৃত সেক্সাজেসিমাল বা ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি
ছবি: ওরাক

আবার এখানে আঙুলের কর গোনারও একটা ভূমিকা আছে। আগেই বলেছি, বুড়ো আঙুলকে গণনার কাঁটা হিসেবে ব্যবহার করে এক হাতে গোনা যেত বারো পর্যন্ত। পাঁচ আঙুলের পাঁচটি ধাপে ৫ × ১২ = ৬০। এইভাবেই মানুষের শরীর হয়ে উঠেছিল গণনার প্রথম হাতিয়ার, আর সেই শরীরের ছাপ পড়ে গেছে আমাদের ঘড়ির ডায়ালে, ক্যালেন্ডারে, জ্যামিতির বইয়ে। বৃত্তের মোট ৩৬০ ডিগ্রি কোণের ধারণাটিও এখান থেকেই এসেছে।

আরও পড়ুন
আজকের দিনে আমরা যেমন ডেসিমাল বা দশমিক পদ্ধতিতে ১০ ভিত্তিক সব হিসেব করি, প্রাচীন সুমেরীয় এবং ব্যাবিলনীয়রা ব্যবহার করত সেক্সাজেসিমাল বা ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি।

যাই হোক, এত সব সুবিধার কথা ভেবে ব্যাবিলনীয়রা এক ঘণ্টার পূর্ণ চক্রকে ৬০টি ছোট ভাগে ভাগ করে নাম দিল মিনিট। আর প্রতিটি মিনিটকে আবারও ৬০ ভাগে ভাগ করে নাম দিল সেকেন্ড। অবশ্য সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এত সূক্ষ্ম সময়ের হিসাব ১৫ শতাব্দীর আগে খুব একটা প্রয়োজন পড়ত না। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জটিল সব গবেষণার জন্য এই ৬০ ভিত্তিক বিভাজন ছিল অপরিহার্য।

মজার বিষয় হলো, ইতিহাসের বিভিন্ন মানুষ এই গণনা পদ্ধতি বদলানোর চেষ্টা করেছে। যেমন ফরাসি বিপ্লবের পর সে দেশের বিপ্লবীরা সবকিছু নতুন করে সাজাতে চেয়েছিল। তাই দিনকে দশ ঘণ্টায়, প্রতি ঘণ্টাকে এক শ মিনিটে ভাগ করার প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু সেই চেষ্টা শেষপর্যন্ত ধোপে টেকেনি। কারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও মাথার গভীরে গেঁথে থাকা প্রাচীন পদ্ধতি বদলানো সহজ নয়।

তবে সময় গণনার হিসাব পুরোপুরি এক জায়গায় থেমে থাকেনি। প্রযুক্তি যতই সূক্ষ্ম হয়েছে, সময়ের ভাগও ততই মিহি হয়েছে। যেমন সেকেন্ডের পরে এল মিলিসেকেন্ড—মানে ১ সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ। এখানে ৬০-ভিত্তিক গণনার বদলে আধুনিক দশমিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষা দশমিক।

আবার জিপিএস স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারের সার্ভার, টেলিযোগাযোগের নেটওয়ার্ক—সবখানে দরকার অতি-সূক্ষ্ম সময়ের হিসাব। তাই এরপর এলো মাইক্রোসেকেন্ড (এক সেকেন্ডের ১০ লাখ ভাগের এক ভাগ বা ১০-৬), ন্যানোসেকেন্ড (এক সেকেন্ডের ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগ বা ১০-৯)।

আরও পড়ুন
ফরাসি বিপ্লবের পর সে দেশের বিপ্লবীরা সবকিছু নতুন করে সাজাতে চেয়েছিল। তাই দিনকে দশ ঘণ্টায়, প্রতি ঘণ্টাকে এক শ মিনিটে ভাগ করার প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু সেই চেষ্টা শেষপর্যন্ত ধোপে টেকেনি।

সভ্যতা বদলেছে, প্রযুক্তি পালটেছে, বিজ্ঞান ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার ভিত্তিতে এখনও রয়ে গেছে সেই প্রাচীন মিশরীয় ও ব্যাবিলনীয়দের চিন্তার কাঠামো। মানুষ একদিন সময় গুনতে গিয়ে নিজের হাতের আঙুল দিয়ে যে পদ্ধতি তৈরি করেছিল, সেই ইতিহাসের চিহ্ন এখনো রয়ে গেছে ঘড়ির কাঁটায়। প্রতিবার ঘড়ির দিকে তাকানোর সময় এটুকু মনে রাখবেন।

সময় গোনার জন্য মানুষের হাতের আঙুল দিয়ে তৈরি করা পদ্ধতির ইতিহাস আজও বেঁচে আছে ঘড়ির কাঁটায়
ছবি: গেটি ইমেজ

আরও মনে রাখবেন মার্কিন ব্যবসায়ী ও লেখক হার্ভে ম্যাককের কথাটা—‘সময় ফ্রি, কিন্তু তা অমূল্য। আপনি সময়ের মালিক হতে পারবেন না, কিন্তু ব্যবহার করতে পারবেন। আপনি সময় জমা রাখতে পারবেন না, কিন্তু খরচ করতে পারবেন। একবার হারিয়ে ফেললে সময় আর কখনোই ফিরে পাবেন না।’

সূত্র: সায়েন্স এবিসি

উইকিপিডিয়া

আরও পড়ুন